শহিদবেদি নিষিদ্ধ

অগ্নিজিৎ

পৃথিবী আস্তিন গোটাচ্ছে। আর কোনো গ্রাম থাকবে না। ঘর। জঙ্গল। মিছিল। সমুদ্র থাকবে, নাবিক থাকবে না। পাহারা বসবে পাহাড়ে। ছাকনির মধ্য দিয়ে বইতে হবে নদীকে। নমুনা পরীক্ষা হবে ঝরনার। সব জনপদ সন্দেহ করবে। কারণ যেকোনো সঙ্গই বিপজ্জনক এখন। তুমি প্রমাণ করতে চাইবে সংখ্যা। আর যোগ ভুল হয়ে যাবে বিয়োগে।

কারা চলে যেতে বলেছিল ওদের? নাকি ওরা নিজেরাই মাদুলি খুলে চলে গিয়েছিল দোষ গুণের বাইরে? নাকি সেই সাপুড়ে তার ঝোলা থেকে সাপ বের করতেই সবাই দৌড়… দৌড়… দৌড়…। পঞ্চানন ঘাটের সিঁড়ি থেকে, জামে মসজিদের পেছনের দরজা থেকে, সন্ধের মুড়ি তামাসা থেকে, ইট ভাটার বেয়াড়া রোদ্দুর থেকে, বিবাহ থেকে, কেন চলে গিয়েছিল ওরা? কিসের গন্ধে? মরুভূমির সত্য বুঝতে পেরেছিল তাই কি মরীচিকা হয়ে মিলিয়ে গেল…? নাকি অলৌকিক কোনো শর্তে সাড়া দিয়ে ফেলেছিল? রাজি হয়ে গিয়েছিল দক্ষতার অভিযানে? ওদের বাসভূমিতে কারা সন্ধে দেয়ে এখন? ওদের উঠোন কি স্থানান্তর বোঝে? মানুষ চলে গেলে খিদে কমে গেরস্থালির?

সবাইকে একসঙ্গে ঘুম পেতে নেই। ওরা জানত না। কিন্তু কীভাবে গুহায় বসে আদিম হতে হয় শিখেছিল। বারুদে চেপে ধরেছিল আগুনের গলা। সেই পোড়া হাত কত জোনাকির ঘর বেধেছে। শিরা গলিয়ে কতবার ফুলঝুরি করেছে তোমাদের। রঙের টানে টানে আলো করেছে দেওয়াল। কত খাবারের পেট ভরিয়ে দিয়েছে নির্দ্বিধায়। আমাদের পর্যটন পৌঁছে দিয়েছে ঘরে ঘরে আর লুকিয়ে ফেলেছে আঘাতের স্থান।

গত রাস্তা থেকে পালটে পালটে গেছে পথ। যতটা ক্ষয়েছে পা ততটাই ধারাল হয়েছে রাষ্ট্র। একটাই প্রতিবিম্ব ওদের। খুন অথবা মৃত্যু নয়, আবিষ্কার করে শুধু দেহ। কিছুই পাওয়া যায় না ওদের ভেতর হাড় বা মাংস ছাড়া। চামড়া খুলে আসে আর পোশাক রয়ে যায়। তবে ওদের শরীর ঘাঁটলে পাওয়া যায় গল্প। বিক্রি হয়। মানুষের ঘরে দোকান তৈরি হয়েছে। দর্শক মানে ক্রেতা। বায়ুবিলাসে মধ্য মেধার যুক্তি। গুলতানি আর গালাগালির সোফা। বাথরুমে সঙ্গমের হাসি। সব সম্প্রদায়ের কানই দীর্ঘ। তবু কোনো দৈব বাণীর মতো আগাম সংবাদ পায়নি ওরা। আসলে শিবিরের পরিচয়পত্র ছাড়া ঘোষণা নিষিদ্ধ।

ওরা ফিরে আসছিল। প্রকৃত পথিক বলেই রেললাইনে পেতেছিল বিছানা। তারপর জীবন চেবাতে চেবাতে সূর্যাস্তের শেষে মাথা রেখে শুয়ে পরেছিল। পরিযায়ী শহিদ। ঘুমকে কিছুতেই ঘৃণা করতে পারেনি ওরা। আহা! মৃত্যুর কি কঠোর অনুশীলন।

ইতিহাস যদি জীবনের হয় তবে আত্মহত্যারও। ইতিহাস যদি অক্ষরের হয় তবে নিরক্ষরেরও। ইতিহাস যদি ঠিকানার হয় তবে ঠাইনাড়ারও। ইতিহাস যদি খুঁজে পাওয়ার হয় তবে নিরুদ্দেশেরও। আসলে ইতিহাস বলে এখন থেকে আর কিছু নেই। সবই খবর। সবই ঘণ্টা খানেক। কেউ আর ঐতিহাসিক নয়। কৌশলে স্মৃতিবিদ হয়েছে। সময়ের পুনর্মূল্যায়ন কেউ দাবি করে না। কেউ আর লজ্জা পায় না এতটুকু।
তবু ওরা ফিরে আসছে। ঝড়ের মতো। হরিণের মতো। কোনো সবুজ সংকেত ছাড়াই। এই ধূসর জটিলতা কাটিয়ে, এই নিশ্চিন্ত ধানের মহরৎ কাটিয়ে, যন্ত্রের বিষণ্ণতা কাটিয়ে, মুচলেখা ছিঁড়ে। ছায়াকাল ধরে ধরে, অন্তমিল কবিতার মতো। প্রতিটা ঘাসের বেদনাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে, পাখির মতো। যারা কোনোদিন আকাশ অর্জন করতে পারেনি অথচ উড়ছে। ঝাক বেঁধে। এই তো ডানা মেলার সময়। জোট বাঁধো… তৈরি হও…

সবাই জন্মভুমি খুঁজছে। পায়ে পায়ে জড়ো হচ্ছে মাটি। প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করছে জঙ্গল, সমুদ্র, পাহাড়, গ্রাম। যেন একসঙ্গে জ্বলে উঠছে সব উনুন আর এই বিপুল অন্ধকার ক্রমশ পবিত্র হচ্ছে। যেন জ্যোৎস্নার উৎসব লেগে গেছে। পাপ পুণ্যের অবাস্তব রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে ওরা। একটা গোটা দেশ হাঁটছে…আমার ভারতবর্ষ বাড়ি ফিরছে…