যুগ যুগ জীয়ে

আব্দুল আজিজ

আজই এইমাত্র আমাকে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে একটি অন্ধকার বলয়ে ; সেখান থেকে বসে আমি যেন লিখতে পারি, সে ব্যবস্থাও রয়েছে। আমাকে কলম দেওয়ার সময় বলা হল - ' বাছা কলম পাচ্ছ কিন্তু তার বদলে তোমার লিঙ্গ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে । ' লিঙ্গের শাদা কালিতে মানবজনম আর কলমের কালো কালিতে কার জনম গো সই?

সইগুলি সব হারিয়ে গেছে -

আমি এতটুকুও বিরক্ত আর অবাক হইনি, কারণ আমি অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত এক মানুষ আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই। আমাকে কেউ উদ্ধার করবে না, অথবা শ্বেতডানা ভেঙে আসবেনা কোন দেবদূত। তবুও এসেছি!

- তবে

কি লিখব ভেবে জনৈক লেখকের অভিযোগ খন্ডাতে মানুষের জীবন কুড়াতে শৈশবে হামাগুড়ি দিলাম। অন্ধকারে কি সবকিছু ঠাওর করা সম্ভব?
প্রথম সন্ধানেই আমার হাতে উঠে এল কালকেউটের ফণা। হিন্দু দেবতা শিবের মতো সেই ফণার চঞ্চলতা নিজের গলায় পেঁচিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। অন্ধকারে অন্ধকারক্ষয়।

এই বাংলাদেশের সকল সবুজ আর বরেন্দ্রীর কালো মানুষেরা আমাকে তাদের চামড়ার ঢোল বাজিয়ে ধিক্কৃত করল। আসলে আমি কি চাইছি!

আসলে আমি গল্প চাইছি, ভিক্ষা দাও। এই রকমের ভ্যাদা টাইপের প্রার্থনা কি প্রভুর দরবারে কবুল হবে জানা নেই।

আমার খুব মনে আছে তরতীপুরের শশ্মানে সাদা একটি খরগোশের পেছনে দৌড়াচ্ছিল ক্ষুধা, আমি কুয়াশা ভেদ করে দেখছিলাম সেই দৃশ্য। পাগলা তখন শুকিয়ে এসেছে ; প্লাস্টিকের বোতলে বোতলে সেই পাগলা নদীর পানি গঙ্গাজল হয়ে বিশ্বাসের বুদবুদ তুলছে। এ পথ শ্রী চৈতন্যদেবের। রামকেলী। গৌড়যাত্রা।

অন্ধকারে কল্পনায় সেই নদীটিকে মনে হল গোদাগাড়ীর টমেটোর ক্ষেত, কার্পেট রং হাতে গুলখোর দাঁতগুলি হাসছে, দূরে হাইওয়ে। মহানন্দা, গেটলক কিংবা বাইপাসের বাসগুলি যাত্রীদের মাথা নিয়ে গোপালপুরের মিষ্টির দোকান ছেড়ে এসেছে, যেখানে সাদা - ঘিয়ে স্পঞ্জের মিষ্টির মধ্যে প্রান্তিক মানুষের মুখ, অথবা ভিতরপাসের হরিশংকরপুরে বসেছে মাদারের গান।

শা - শা - শব্দে কেঁপে উঠল আমার আসন। কেউ একজন কাঁদছেন।
- নন্দী?
- ‎পার্বতী?
- ‎নাহ!
- ‎মনসা?
- ‎বেহুলা?
- ‎নাহ!
- ‎বিধবা সাত বেনে বউ?
- ‎নিতি?
- ‎নাহ!
- ‎ধনন্ত্বরি!
- ‎নাকি সনোকা এখনো কাঁদছে পুত্র শোকে!
- ‎নাহ!
- ‎তবে!
কে? কে কাঁদছেন?
কেউ না। ভ্রমে চোখ এঁটে আসলে চুনী কোটালকে দেখতে পাচ্ছি।
না। চুনী কোটাল কেউ নয়, তোমাদের, আমাদের এমনকি ইতিহাসের ও।
সে আত্মহত্যা করেছিল অখ্যাত একটি দিনে। ১৯৯২ সালের পেরেকে আঁটা হয়েছিল তার জীবন।

তবে কি জানেন আমার বাম কান শুনল, মহাশ্বেতা দেবী নাকি চুনীর কথা বলেছে লিখেছে আর ডান কান শুনল কয়েকটা পত্রিকার দায়সারা বিবৃতি।

আমার বিবৃতি কি? - রজনী আর সজনী নামের দুইবোন যখন বড়বাড়ি দেখে হাত পাতে তৃতীয় বোনের বিয়ের নামে, পঞ্চাশ থেকে একশোটা টাকা কিংবা এক সের চালের পাঁচালি গেয়ে তখন আমার হাতে কালকেউটের লেজ। আমি কৃপণ। অসৎ। ভীরু।


ধানক্ষেত -
মাঠ ভেঙে চুনী কোটাল হাঁটছে। খাড়া বিটি আস্তে হাঁট পায়ে কাঁকর ফুটবে গলগলিয়ে রক্ত বেরুবে। কার জন্যি লড়ছিস?
লোধা ঘরের বিটি। ঘিন্না, অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছ - তাচ্ছিল্য দেখেই বড় হওয়া।
এ লড়াই আসলে কার জন্যে চুনী নিজেকেই প্রশ্ন করে, হাঁটে তার যে পথের ভেতর লড়াই। জন্মে লড়াই। খাদ্যে, রেশনের চালে, ডালে আর কেরোসিনে লড়াই। অবশেষ মৃত্যুর জন্যেও লড়াই।

আমার কলম সেই লড়াইয়ের মাঠে, এখানে কোন নদী নেই আছে চরের মতো ধূ - ধূ প্রলাপ। মানুষের। জীব ও জীবনের। তবুও থামতে হয়, মহিষের লেজের চুলে লেপ্টে থাকা মাছির মতো।
তিরের পাছার ন্যায় কালকেউটের জিব্বা আবার বুকে রক্ত ফেনিয়ে কালি তৈরি করে।
আমি আছি অন্ধকারে, যে অন্ধকারে প্রবেশ করতে মানুষের প্রয়োজন দৃষ্টিপ্রদীপ।

লালনের আখড়ার সেই শ্বেত গম্বুজে একটি লেজঝোলা পাখি দেখে মুখ টিপে হেসেছিল বিদেশি বৈরাগী, তার হাতের একতারার তারটি ছিঁড়ে গেছিল আশ্বিনের গভীর রাতে যখন ঢেউ উঠেছিল আমার বাসনায়। বড়লোকের বাসনায় মাটির গন্ধ নেই, ফুলের তীব্রতর আকর্ষণ নেই। আছে সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যের উর্বর জমিন। বীজ বপণ কর, ফলাও, মাড়াও তারপর.........

- তারপর কি?

আমার উলঙ্গ কানে ফিসফিসিয়ে সেই লেজঝোলা পাখিটি অচিন দুখের কথা বলতে আসতেই কালকেউটের ভোক হিস হিস শব্দে কোমর দুলিয়ে উঠল। অবচেতনে তখন আমার মন কলকাতার একটি ঘুপচি গলির অন্দরমহল থেকে 'রানি শিরোমনি এসসি এন্ড এসটি গার্লস' হোস্টেলের বারান্দায়।

চুনী কোটাল হাঁটছে। আবার।

-তুই স্কুলে যাবি?

-‎হ্যাঁ স্কুলে যাচ্ছি। লোধা সম্প্রদায়ের গ্রামে ভাঙছে হাজার হাজার মানুষের মাঝে একটি স্কুল ফাইনাল মেয়ের কালো পা। রক্তাক্ত।

- ভদ্র হবি?

যারা কয়েকজন চুনী কোটালের সাথে স্কুলে গেছে, ঘরের মধ্যে ঘর করে, নিজের জাতের ভেতর। তাদের কথায় বলছি। সুযোগে ছেঁড়া জামার মধ্যে বেতের ডগা গলিয়ে টেনে মাস্টারমশাই বলত, অ্যাঁ! স্কুলে আসা হচ্ছে। ভদ্র হতে! গভীর তাচ্ছিল্য। আর এদিকে পড়া যে পারিসনা। জামাটি এমনভাবে ছেঁড়া হত যেন স্কুলে পরদিন না আসা যায়। বেত ভাঙত, পিঠে।

চুনী কান্দে, কান্দে পথের কদমগাছ।

যুগের প্রখর উত্তাপ নিয়ে সূর্য রাবণের মতো রথে চেপে হো - হো শব্দে হেসে যাচ্ছে।

হেসে যাচ্ছে মাস্টারমশাই, হেসে যাচ্ছে বড়লোকেরা।

২.
বড়ই হাস্যকর। পুরুষ পুরুষ খেলার মধ্যে নারী হয়ে ওঠা, ভাবনার কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়। কালকেউটে ফণা গুটালে আমি হাতড়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করি। চোখ বুঁজি ভেসে উঠে গুলাম তাড়িখোরের বাথান। নাহ কাঁচা বয়সে সেখানে যাওয়া ঠিক হবেনা।
ঘোর মাতাল ছাড়া কেউ সেখানে যায় না, যাওয়ার কথাও না। যারা যায় তারা নগ্ন হয়ে জোঁকভরা পুকুরে দাপাদাপি করে ; তালগাছের গোড়ায় বসে হস্তমৈথুন করে। গাঁজা টানে, ফেন্সিডিল খায়। সেদিন বড় উত্তাপের দিন, অন্ধকারে আমি উত্তাপ বুঝতে পারিনা কালকেউটের শীতল গতরের সকল ঠান্ডা আমার পিলে চমকে দিয়েছে।

৩.
যন্ত্রণার মাংস ছিড়ে ছিটকে পড়তে থাকে ; মানুষের দাঁতের ফাঁক থেকে তার ভাবনা, হিংসা ও ক্রোধ। মানুষ শক্তির উৎস হলেও অনেকেই বোধে প্রাচীর গড়ে তোলে অর্থাৎ বিভেদ । তৈলাক্ত দিনের বাতাস ব্যঙ্গ আকৃতি নিয়ে শরীরে সুঁচ হয়ে ফোটে।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে নয়তো পায়ের তলার মাটি সড়ে যায়, কঠোর হয়ে আসে সমাজ। কালকেউটের ভাষায় সমাজ হল বড়লোক, যারা ভেদ ও সংকট সৃষ্টি করে।

ভেবে দেখবেন কি অন্ধকারে শ্রবণশক্তির রং! আমি কান্নায় নটীর ঘুঙুর আর হাসিতে চোখের কটমট চাহনি বাজতে শুনি।
অদ্ভুত না!

- হো - হো - হো
- ‎ইঁদুর ধরিস! খাস! - হো - হো- হো
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়াল - লেট দুই বছর - বজ্জাত - ডিগ্রি লিবি? হো - হো - হো
- ব্ল্যাক!
- জংলী!
- ‎দাগী - খুনী কা আওলাদ
- ‎হো - হো - হো


ষোলোই আগস্ট।

হ্যাঁ আত্মহত্যাই! এটাই তো চেয়েছিলেন আপনারা। চাননি কি? ফাঁসিতে ঝুলে পড়া কিংবা বিষপান!
চুনী তার মনের সমস্ত জোর আর ঘোর থেকে নিজের স্বপ্নে পৌঁছেও যে হয়রানি, অপমান, অবজ্ঞা পেয়েছিল সেখান থেকে তার মাতাল হওয়াটাই স্বাভাবিক। মাতালরাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে।
এই মাতালপনা যুদ্ধজয়ের এই মাতালপনা প্রশ্ন তোলার, পেরেছি পরবর্তীর চুনী কোটাল তৈরি হও।

চুনী কোটাল হাঁটছে। আবার। রক্তাক্ত পায়ে।

আর এদিকে কালকেউটে নেমে এসেছে আমার নামোধরে। মাঁজা পেঁচিয়ে কোমরবন্ধনী তৈরি করে দুই উরুর মাঝে ফণা গুটিয়ে ঝুলে রইল অবিকল লিঙ্গের মতো।
জানেন তার নীল কালিতে মৃত্যু ছাড়া অন্ধকারে আর তেমন কিছুই খুঁজে পাওয়া গেলনা। সেই মৃত্যু চুনী কোটালের আত্মহত্যার মতোই করুণ ও প্রবঞ্চনাময়।