দেখা হল হেমন্ত বাগানের

শুভংকর গুহ

ঠিক এই মুহূর্তে একটি নদী বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। গামছা কাঁধে একজন মাঠকর্মী উবু হয়ে বসে আছে নদী ভাঙনের দুর্দশার মধ্যে। বছরের পর বছর ধরে শ্রাবণের শেষের ধারা ভাসিয়ে দেয় নদীজল প্রবাহ, গ্রামের পর গ্রাম জলের দখলে চলে যায়। মাটি ভাঙ্গে, তলিয়ে যায় প্লাবনের তোড়ে। মাথার ওপরে মেঘশত্রু গভীরতর অন্ধকার হয়ে ভারি বর্ষণের জন্য প্রস্তুত। এই গ্রাম থেকে সেই গ্রাম সংযোগের রাস্তা সব ডুবে যায়, সেতু কাঠপোল সব ভেঙ্গে যায়।
দিক চিহ্নহীন ফসলের সব জমি সাগর হয়ে যায়, কি সব গ্রামের নাম, সব নাম মুছে যায়। নামজল হয়ে ভেসে থাকে চরাচর। মানুষের দেখা পাওয়া যায় না, সরকারি বা গ্রামীণ শিবিরে গ্রামবাসীরা আশ্রয় নেয়। কিছু বিছিন্ন মানুষ এদিক ওদিক প্লাবনের জলে ভেলা ভাসিয়ে চলে যায় কোথায় কেউ জানে না। জল নেমে গেলে ফিরে আসে বেশ কিছুদিন পরে, বসে পড়ে কপাল চাপড়ায়, কোথায় তার কুটির আর কোথায় তার গোয়ালঘর। আমি এই বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি, মাঠকর্মীর পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। একটি বিপন্নতার শরীরকে অবলম্বন করতে করতে ছেলেবেলার ভূগোলের বইয়ের পাতার স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে পাই জল প্লাবনের কালি কলমে আঁকা স্কেচ। মনে হয় আমরা যেন বিপন্নতার ছবি বড় ভালোবাসি। ভালোবাসি অধিক বিপন্ন স্মৃতির ছবি।
আমার দীর্ঘনিঃশ্বাসে কি যায় আসে প্রান্তরের।
শুধু বললাম,- চারদিকে শুধুই কি জল দেখছ?
সে বলল,- দেখার চোখ থাকলে সব দেখা যায়। না হলে জল আর জল।
আমি তার উত্তর শুনে শুধুই তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই তো দেখার চোখ থাকলে সব দেখা যায়। না হলে কিছুই নয়। এখন যেমন জল আর জল। তবুও শুধু জল দেখার মধ্যে স্রোত যেমন থাকে, তেমনি প্লাবনের হাহাকারের নানান খুঁটিনাটি। সত্যিই দেখার থাকলে অনেক কিছুই। না দেখার থাকলে শুধুই জলবিবরণ।
সে বলল,- ওপারে বহুদূরে নন্দপুর। সে এক কাছিমের পিঠের মতো গ্রাম, ওখানে নদী ভাসে না, কোনো প্লাবন হয় না, জল দাঁড়িয়ে মানুষের ঘর বাড়ি ডুবোয় না, ওইদিক থেকেই ভগ্যহীন একটি কাটাঘুড়ি বগ্গা খেয়ে যাচ্ছে চৈতন্যপুরের দিকে।
কোনদিকে কি, কি গ্রাম এতশত জানি না। শুধু বললাম,- মানুষ এখন জল বন্যা নিয়ে নাজেহাল আর তুমি সব হারিয়ে দেখছ কাটা ঘুড়ির বগ্গা।
দেখ শুধু জল আর জল, থৈ থৈ হাহাকার আর মেঘ দেখ জমাট, আবার ভারি বৃষ্টি নামবে, একবার নামলে থামতে চায় না। রাত থেকে বৃষ্টি আর নেই, তাই কাটা ঘুড়ি বগ্গা খেতে খেতে দিব্য। তবে তোমায় একটা কথা বলে রাখি, আমার মনে একটা কথা আছে। তোমায় বলব কি বলব না ভাবছি। আমার মনের গোপন কথা।
তা বলেই ফেল, কি তোমার মনের কথা।
শুনলে তুমি হাসবে না তো?
সে কি !!! হাসব কেন?
এ মনের খেয়ালের কথা।
হাসির কথা হলে হাসব।
আকাশে ঘুড়ি উড়লে, বৃষ্টি চলে যায়। মেঘ আর আসে না। তাই দেখছি নন্দপুরের কাটা ঘুড়ি বগ্গা খাচ্ছে, এরপরে আরও ঘুড়ি উড়লেই দেখবে বৃষ্টি থেমে যাবে, মেঘ পালিয়ে যাবে।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলাম। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু বলতে যাব তখনই ও আমাকে বলল,- দেখেছ তো আমি কেন যে তোমাকে বললাম?
আকাশে মেঘ আর বৃষ্টি না থাকলেই আকাশে ঘুড়ি ওড়ে।
সে তোমাদের শহরে, আমাদের গ্রামে বন্যার সময় আকাশে ঘুড়ি উড়লে অন্য বার্তা আনে।
তার মানে তুমি বলতে চাইছ ঘুড়ি বগ্গা খাচ্ছে বলেই এই গভীর কালো মেঘ সরে যাবে? বৃষ্টি আর হবে না? এ তোমার সরল ভাবনা। এই হেঁয়ালি ভাবনার মধ্যে কোনো যুক্তি নেই।
সব কিছু ভেসে গেল, আর সবাই কোথায় আছে, কিছুই জানি না। একা এই ভাঙ্গা বাঁধের ওপরে বসে আছি, চারদিকে তাকিয়ে দেখছি জলের প্লাবন আর কোথাও কিছু নেই সব হাহাকার। একটা কিছু তো ভেবে নিয়ে আঁকড়ে ধরতে হবে তো। তাই কাটা ঘুড়ির বগ্গা দেখে দেখে নিজের মনের এই ভাবনাকেই সত্য মনে হল। নিজের মনের এই ভাবনাকে কোনোদিন স্পর্শ করি নাই। তাই তোমাকে বললাম।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু বিস্মিত হলাম না। কারণ মাঠকর্মীদের এই ভাবের কথা আমার জানা আছে। এই চরাচর, জল প্লাবন, ক্ষেতের ফসল, মুছে যাওয়া সব গ্রামচিহ্নর নাম, জীবনের এপার থেকে ওপারে যাওয়া, ওর মনের এই অবস্থান, আমার জীবন আমার নামেই লজ্জা পায়। মাঠকর্মী টুকে নেয় বগ্গা ঘুড়ি ও চরাচরের ভাষা। সেই ভাষা আমি জানব কি করে? আঙ্গুলের ডগা থেকে সুতো ছিঁড়ে আর কেটে যাওয়া ভোকাট্টা ঘুড়ির সাথে এক ভয়ানক বিপন্নতার মধ্যেও আশার আলোর সন্ধান আছে। অনেক কিছুই হাস্যকর হলেও, তবুও খুঁটিনাটি কিছু অপাংক্তেয় ভাবনা ও ধারণা সব কিছুই ফেলে দেওয়ার নয়।
দেখ কেমন শির শির বাতাস বইছে। কেমন শীতল আর শুকনো খড়ের গন্ধ। এই বাতাসেও একটা খবর আছে।
আমি বললাম,- এই ভাদ্র ও আশ্বিনের পরে হেমন্তের খবর আছে। নাম কি তোমার?
সামান্য ক্ষেত মজুরের নাম নিয়ে কি করবে?
এতক্ষণ যখন কথা বললাম, তোমার নাম জানলে ভালো লাগবে। একদিন তো ভাবতে পারব তুমি বগ্গা ঘুড়ি নিয়ে ভাবের কথা বলেছিলে।
বাগান... বাগান আলি।
জল নেমে গেলে এইবার নিজের কুটিরের সামনে খাসা একটি বাগান করবে। তোমার নাম কি গো?
হেমন্ত... হেমন্ত।
জল নেমে গেলে আমার বাগানে এসো। গ্রামের সব কুটিরের সামনেই হেমন্ত আসে।