আয়নামানুষ ও কিছু আঠালো বিয়োগ

অরণ্যা সরকার


‘জীবন’ ও ‘লক্ষ্য’ শব্দ দুটোই পৃথিবীর সৃষ্টি মুহূর্তের মত তুলতুলে। তৈরি হয় না বোধের কেলাস । ঠিক তখনই ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনাটি লিখে ফেলতে হয়। না দেখা বধুঁয়ার রুপকল্পনার মত সে নির্মাণ। বই পড়ে, বড়দের কাছ থেকে শুনে লিখেও ফেলে সবাই। বিনির্মাণও লিখেছিল। একটু অন্যরকম কিছু লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যায়। ভালো নম্বর পেয়েও বিনির্মাণ কিন্তু অন্য কিছু রেখেছিল তার প্যালেটে। খুব নিঝুম কিছু।
প্রথমত, রচনাটি লিখতে লিখতে তার মনের মধ্যে একটা খচখচে অনুভূতি হতে লাগলো যার কারণ সে বুঝতে পারলো না। দ্বিতীয়ত, অঙ্কেও সে ভালোই নম্বর পেয়ে প্রমাণ করে দিল, অঙ্কে ও সাহিত্যে সে সমান পারদর্শী। তবে সে বুঝতে পারলো বিয়োগ করতে তার বেশী ভালো লাগে। দীর্ঘ দীর্ঘ যোগ শেষে সে হাঁপিয়ে ওঠে। ত্রাণ খোঁজে বিয়োগের কাছে। যতবার সংখ্যা কমে আসে ততবার এক একটা আবছা রঙ দিয়ে ঢেকে দেয় ক্লান্তি।
এ পর্যন্ত গল্পটা একটা ‘ছেলেমানুষি’ বিশেষণ পেয়েছিল। বিনির্মাণ আয়না দেখতে শুরু করলো। আয়নাটা মেধাবী তারুণ্যই ফিরিয়ে দিচ্ছিল। বিনির্মাণ দেখতে শুরু করলো তার ভেতর থেকে ঝুপ ঝুপ করে খসে পড়ছে নোংরা আবর্জনা। কি এসব ? কিসের অবশেষ ? শুরুটা হল বাড়ির ওয়েস্ট-বিন বাইরে ফেলে আসা দিয়ে। কাজের লোকের কাজ কমিয়ে, মা বাবাকে অবাক করে সে রোজ রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলে আসতো বাড়ির জমানো আবর্জনা। ঠিক তার পরেই আয়নার সামনে দাঁড়াতো। চকচক করতো তার চোখ। গা থেকে খসে পড়া জঞ্জাল অদৃশ্য হলেও শব্দটা থেকে গেল। এরপর সে বাড়ির অপ্রয়োজনীয়, অব্যবহৃত এমনকি অতিরিক্ত জিনিষপত্র ফেলতে শুরু করলো। প্রথমে বাবা মা বিরক্ত, শেষে বেশ চিন্তিত হলেন। সফল ও কৃতী বাবামা’রা সমাজে বেশ মান পেয়ে থাকেন। ছেলের এইসব কাজকর্মে পাড়াপড়শির কাছে তাঁরা বেশ হেঁট হতে শুরু করলেন। কাজেই এলেন নামকরা মনোবিদ। এবার ছেলে তার কাজকর্ম লুকিয়ে করতে শুরু করলো। কর্মক্ষেত্রও বদলে গেল। বিস্তৃত হল। পাশাপাশি কলেজর পড়াশোনা চললো। ডিগ্রি বাড়তে থাকলো। সঙ্গে আয়না দেখা এবং বিয়োগের নেশা।
বিনির্মাণ এরপর অধ্যাপক ও সাংসদ বাবা, এবং মহিলাসমিতির নেত্রী মায়ের দিকে তাকালেই দেখতে পেতো, তাঁদের গায়ে মরামাসের মত সেঁটে আছে পোকা খাওয়া আলোর টুকরো। বাড়িতে সারাক্ষণ সভা সমিতি, মিছিল, মিটিংয়ের আলোচনা। কত যোজনা, কত যোগের অংক, উচ্চতার নামতা কত কথা, কত কথাকে আড়াল করার কথা। পচা, টক গন্ধে ভরে উঠলো বাড়িটা। অস্থিরতা বেড়ে গেল বিনির্মাণের। সময় কম। অনেক বেশী কাজ করে যেতে হবে, এমন একটা ভাবনা তাকে ছুটিয়ে বেড়াতে শুরু করলো।
ছুটন্ত শহর। চারদিকে নিপুন প্যাকেজিং। বিয়াল্লিশ ডিগ্রিতে ঝলসে যাচ্ছে বাতাস। হলুদ পাতায় প্রযুক্তির কালো গুঁড়ো। বিনির্মাণ হাঁটছে। রোদেপোড়া টানটান শরীর। অগোছালো দাড়িতে আটকে আছে শুকনো পাতা। লম্বা ঝোলায় তুলে নিচ্ছে প্লাস্টিক, চিপস ও দুধের ফাঁকা প্যাকেট, কলার খোসা, শুকনো ফুল। বিনির্মাণের ঝোলা ভরে উঠছে। ওর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কিছু ফিসফাস -’আহারে’, ‘ইস কি অবস্থা’, ’নেতার ছেলে কি করে বেড়াচ্ছে’ । ফর্সা, কালো, শিথিল, দৃঢ়, মেধাবী হাতগুলো কিন্তু ক্রমাগত ছুঁড়ে যাচ্ছে যা কিছু বাতিল।
বিনির্মাণ তার রচনায় লিখেছিল, ‘আমি একজন মানুষ হব। স্বচ্ছ মানুষ, যাকে সবাই দেখতে পাবে।’ বাবা লিখে দিয়েছিল। আজ বাবা , মা দুজনকেই দেখতে পায়না বিনির্মাণ। শুধু দুটো আলোর বিন্দু নড়ে চড়ে বলে ‘আমাকে দ্যাখ, আমাকে দ্যাখ।’। তাই নিজেকে অন্ধকারে রাখে বিনির্মাণ। এই অবস্থান ওকে সবকিছু দেখতে সাহায্য করে। দেখে বলেই মিথ্যে, ভান, কৌশল সব বিয়োগ করে মুছে দিতে চায়। নিজেকেই ওর আবর্জনার স্তুপ মনে হয়। আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। ব্যবহৃত কনডোমের মত ঘোলাটে মনে হয় নিজেকে। যেন হাত, পা, চোখ, মুখ সব খসে গেছে। রাস্তাতেও গোটা মানুষ সে কম দেখতে পায়। মানুষের টুকরোগুলোও সে কুড়িয়ে নেয়। ঝোলা ভর্তি হয়ে গেলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। মনোবিদ পাল্টে যায়। তাদের চার্জ বাড়ে। বাবামার হেঁট মাথা সিদ্ধান্ত নেয় ছেলেকে অন্য শহরে রেখে টানটান দাঁড়াবে আদর্শের ছাতার তলায়। ছাতা রঙ বদলায়। বিনির্মাণের বিয়োগের রঙও বাড়ে। টকটকে আশ্লেষ দেয়।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মনকে কলুষমুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছেন বিনির্মাণের বাবা। সস্ত্রীক সম্বর্ধনা নিচ্ছেন সমাজকে স্বচ্ছ চেতনার বার্তা দেবার জন্য, জনকল্যাণকারী কাজের জন্য। দূরে দাঁড়িয়ে বিনির্মাণ দেখছে দুজন সফল মানুষ কেমন যোগের পৃথিবীতে নিজেদের জুড়ে দিচ্ছে। মঞ্চ থেকে তীব্র পচা গন্ধটা ওকে তাড়া করছে। পালিয়ে যাচ্ছে বিনির্মাণ। অন্ধকার কুড়োচ্ছে, ভরে উঠছে ওর ঝোলা।
বিকেলের মায়া আলো কমে এসেছে। বিনির্মাণ ওর ঝোলা উপুড় করে নামিয়ে রাখছে শহরের একমাত্র কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়। আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। দাউদাউ জ্বলছে জীবনের বর্জ্য। সে হো হো হাসছে। হাততালি দিচ্ছে। অ্যাসাইলাম অপেক্ষা করছে ওর জন্য। কোথাও নিজেকে জুড়তে না পারা একজন অসফল মানুষ নিজেই একটা আয়না হয়ে উঠছে। যদি আমাদের সবার সামনে এসে দাঁড়ায় ? তবে ?