অনৈতিহাসিক : একটি অ্যাবসার্ড গদ্য

শানু চৌধুরী

" মানুষের ভিতরকার রহস্য বিধাতা বাইরের কোথাও না কোথাও লিখে রেখে দেন; আমার অন্তরের কথা আছে ঐ মুক্তধারার মধ্যে "- মুক্তধারা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমাদের ইতিহাসে কঠিন গৌরব নেই। কিন্তু; মূল্য আছে মধুর? ফসল ওঠার আগে চাষীদের শত্রু হয় কি কেউ? একটা আয়না, আড়ষ্ট হয়ে যেতে যেতে...বিদীর্ণ হয়। আর যন্ত্র থেকে নিষ্কৃতি পায় ফসলের হিমঘর। যেখানে পড়ে আছে কারো কঙ্কাল।
- তুমি কঠোর হয়ে দ্যাখো?
এই যে রহস্যের ভেতর মূল্য না পেয়ে সূর্যাস্তের পরে ঘরে ফিরে আসে জমি নিড়ানোর সামগ্রী, রক্ত ঢেলে দিয়ে জাল থেকে বেরিয়ে যায় শিশুর পড়া! তাদের গান ভৈরবী হয় না। আমাদের সিংহাসনই আমাদের জীবনের বাঁধ। জীবনের স্রোতে যারা পা ফেলেছি, ধীরে ধীরে তারা পেল ধিক্কার।

- মানুষ কি আঘাত পেলেই হতাশ হয়?
ঘুম ভাঙতে ভাঙতে পৃথিবী একাকার হয়, আনাজের ছোঁয়ায়। শিরা দিয়ে বেয়ে ওঠে হিমঘরের আঁতাত।
মানুষ গান ভাঙে। আর সেই গান থেকে উঠে আসে না সহযোদ্ধার স্বর।
- আমরা ভুল হই
প্রতিটা গ্রামের কোলে ঘুমিয়ে আছে শহর। নিয়তির দীপ সবকিছুকে পেছনে ফেলে অনুকূল করেছে আদিম পরিস্থিতি।
- তুমি কী জানো?
- জানো, আমাদের ভাববীজ টলে যাওয়ার কথা!
আসলে বিরাট শোরগোল চিন্তাকে ক্ষণস্থায়ী করে দেয়। চিন্তার পঙ্গুত্বই মুছে দিতে চায় জালিম পৃথিবীর স্বতন্ত্র উপাদান।
- শোকেন ফেরলাগ! অব্যাহতি!
-কে, কাকে দেয়?
নিউমোনিয়ার মতো জমাট বাঁধছে শোনা...
ক্ষুদ্রের আকারে বসে হাঁটু মুড়ে তৃষ্ণারাক্ষসের মতো প্রণাম সারছে মিথ্যের কাকলি। এই যে গুঞ্জন ভেঙে মধ্যমা নাম নিচ্ছে না কারও, এ কি বেখাপ্পা নয়?
স্বপ্নের ভেতর ছিটকিনি দিয়ে কেউ লেদ মেশিন চালায় বা কেউ কলম। শুধু কি নামের আশায়?

জয় ভৈরব, জয় শংকর,
জয় জয় প্রলয়ংকর,
শংকর শংকর।

জয় সংশয়ভেদন,
জয় বন্ধন-ছেদন,
জয় সংকট-সংহর
শংকর শংকর।

এই স্তবগানে আছে উপোসীর দোলা। যে উপোসী তাঁর আরাধনায় ছড়িয়ে দেবে নিজের প্রপঞ্চে অন্নের ফোঁটা। সফল ও সুযোগ্য মানুষের ধাঁচে গড়তে পারেনি নিজেদের যারা, তাদের আঙুল কথা বলে। চুল্লির দহনে যাদের ধোঁয়া উড়ে যায়, আকাশের নলে তাকিয়েছিল তাদের যাত্রাসঙ্গী। সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশ কথা বলে তাদের আঙুলে। যে মৎসচাষে তুমি মিটিয়েছ ভুক, সেই মাছের খাবারের দানায় লেখা আছে যতিচিহ্নের আশকারা। যে শিক্ষার দাম দিয়ে তুমি লিখছ, শিক্ষকের অক্ষর, তার নাম জানবে না কেউ। লুকিয়ে যাও। এতটা অন্ধকারের ভিতর হাতড়ে হাতড়ে কেউ খুঁজবে না তোমার তথাকথিত পরাজয়ের লিপি। হাওয়া -বাতাস ঢুকলে আজকাল মানুষ অস্বীকার করে। বাজিকর শব্দে কখনই বহুল মানুষ এসে বসে না।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার পর যে বৃক্ষরোপণ দাগকে সূচিত করে তার লোকশ্রুতি নেই। যে মানুষ নিরালায় পুঁতেছিল বীজ, আহারকাল পরবর্তী সময় খুঁজিনি তার প্রতিক্রিয়া।

লেখার জিন। ক্রোমোজমের ভিতর বসে DNA -দ্বারা গঠন করছে না-গান। অর্থাৎ, এক ও একাধিক কাজ ভেঙে দিয়ে তুমি নাম পেলে না। ইতিহাস থেকে লুটিয়ে দিলে না-পাওয়ার পরিব্যক্তি বা মিউটেশন। হে, হেটারো ইতিহাস ছিটকে বেরোক অপারগ মানুষের আর্কিটেক্ট। যার কার্যগত একক থেকে ডামির গায়ে লাগিয়ে দাও খয়েরি প্যাস্টেল কাগজ। ধুলোয় লুটিয়ে যায় যাদের ক্যামোফ্লেজ, তারা তো উন্মাদ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় কত মানুষ! যাদের সময় অতিবাহিত হয় ধুলোর কিনারে। একটা মোটা পর্দা ঘিরে আছে দেহের ওপরে। টেনে নিলে কী দেখতে পাবে! শ্রেষ্ঠ মন্তাজ!

বহু দীর্ঘ ঘরে টিপটিপ করে আলো জ্বলছে। হেঁটে হেঁটে খোয়াবি নগর পার হচ্ছে টিকে থাকার খতিয়ান। হাসছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। মুখ নড়ার আঙ্গিক দেখি। যাঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে দুলালি হাসি, যাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে খলবলে মৃত্তিকা, তাঁদের বিশেষ রচনাভার এখন প্রশ্নকর্তাকে খুঁজছে। আসলে প্রশ্নকর্তা নেই। সে... হারিয়ে গেছে...বেলায়। উত্তরের সন্ধানে গেছে মুদি দোকানে, বাজারে বা ধ্বনির আকরিক খুঁজতে, যাতে টের না পেতে পারি আমরা, সে কোথায় থামল!

*( উল্লিখিত স্তবগানটি মুক্তধারা নাটক থেকে নেওয়া)