ডোম

বেবী সাউ

ওইযে আমাদের খামার, ঝকঝক তকতক করছে, সন্ধ্যাপিসি গোবর দিয়ে নিকিয়ে রেখেছে, মাঠ থেকে ধান আসবে আর কিছুদিন পরে। তার ওপাশে ঠাকুমার সাধের লেবুবাগান। তারপরের জায়গাটি খানিকটা ফাঁকা, ইতস্ততভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি আতাগাছ, লাল পেয়ারার গাছ... তার পরেই শতাব্দীর আলো আঁধার, ছায়া- কায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের বাঁশবাগান। শনশন শব্দে নড়ে ওঠে তাদের মাথা, ঝড়ে এখানে এসে পড়ে বাজ। নরদাদা বলেছিল, শকুনের ডিম যদি কোথাও পাওয়া যায়, তবে এই বাঁশবাগান! যদি পাঁচমাথা সাপের 'মণি' চাও, তবেও কিন্তু এই বাঁশবাগান। নীচে, শতাব্দী প্রাচীন, বাঁশের শুকনো পাতা পড়ে আছে। হাঁটলেই যুগ পেরিয়ে আসা টাইম মেশিনের শব্দ। উঁইয়ের ঢিবি। সেখানে ফোসফোস করছে কালনাগিনীর ছানা। আর এই দুর্গম, রহস্যময় প্রান্ত থেকে যখন শিবানী ডোম বাঁশ কেটে বের করে আনত, আমার শিশুমন আনন্দে আত্মহারা হয়ে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে বসতাম আরেকটি জন্ম, অভয়া অবতার শিবানী ডোমনীর কাছে, আমার 'ডোম জন্ম'।

"ওদের ছুঁবি না। ওরা গোরু খায়"- ঠাকুমা বলতেন। আমিও দেখেছি, পশ্চিমের 'পুরনাডিহি' তে যখন কোনও বুড়ো, মরা গোরু ফেলা হত, রাজ ডোম এসে চামড়া আর মাংস কেটে নিয়ে যেত। চামড়া দিয়ে ঢোল বানানো হয়, জানি। কিন্তু, মাংস!নিশ্চয়ই খায়! আর আমাদের গ্রামের উত্তরদিকে ডোমবস্তি। শুধু মা রটন্তী কালি কিংবা কালিমুহির কিংবা কোনও বিয়েবাড়ি,শুভ অনুষ্ঠানের আয়োজন হলেই, ঢোলক বাজানোর বায়না করতে, গ্রামের লোক এই ডোমবস্তির দিকে পা মাড়ায়। নাহলে, নৈব নৈব চ। আর সারা গ্রামের রহস্য যেন এই ডোমবস্তি। এঁদের ছাড়া কোনও শুভকাজ সম্পন্ন হয় না, আবার এঁরাই সেই, যাঁরা জন্ম -জন্মান্তরের অছ্যুৎ!

যাইহোক, যে কথা বলছিলাম, আমাদের বাঁশ বাগানে তখন উৎসব লেগে গেছে। আমাদের গ্রামের উত্তরদিকের খালপাড় থেকে বাচ্চা কাচ্চা, বৌ নিয়ে ডোমেদের একটা দল এসেছে। নতুন বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা হবে বিরাট মাপের 'ডোল'( ধান জমিয়ে রাখার বিরাট ঝুড়ি)। আয়তনে এবং প্রস্থে প্রায় একটা বড় রুমের সমান। বেশ রোমাঞ্চকর অবস্থায় আমার দিন কাটছে। আমার প্রায় সারাদিন কাটিছে তাদের সঙ্গেই। ঘুরঘুর করছি। ইতিমধ্যে তাঁরা আমার জন্য বানিয়ে দিয়েছে একটা বাঁশি, ছোট কুলো আর একটি 'ফিরফিরি'। কিন্তু আমি সব দেখছি, শুনছি কিন্তু তাদের ছুঁচ্ছি না। কেননা, 'তারা গোরু খায়।'

আমরা তাঁকে ডাকি শিবানী পিসি। রাজ ডোমের বোন। কালো। বড় বড় চোখ। মাথা ভর্তি চুল। আর মাথা ভর্তি সিঁদুর আর এত বড় টিপ। হাসত যখন ঝকঝকে করে উঠত তার দাঁতের সারি। গজদন্ত। সে কিছু বললেই, আমার স্বর্গ পাওয়া হত যেন। তো দুপুরের দিকে বলল, "খুকি! তোমার মা'কে বলো গিয়া, অন্ন ব্যঞ্জন পাঠিয়ে দিতে"। অন্ন-ব্যঞ্জন? এর আগে তো এই শব্দ ছিল একমাত্র, ততক্ষণে আমি ঢুকে পড়েছি মায়ের লক্ষ্মী পাঁচালির সেই পর্বটিতে। যেখানে ছদ্মবেশী লক্ষ্মীদেবী ডোমদের গৃহে থেকে 'অন্ন-ব্যঞ্জন' তুলে দিচ্ছেন নারায়ণকে। শিবানী কী তবে সেই লক্ষ্মীদেবী!? স্বামী পরিত্যক্তা! হ্যাঁ হ্যাঁ এই-ই। মা, ঠাকুমা চিনতে পারেনি, তাই এই ছোঁয়া ছুঁই। এত না না! জানলে নিশ্চয়ই শিবানীপিসিকে ঠাকুরঘরে নিয়ে বসাত! এই-ই সেই। আমি যখন তার দিকে তাকিয়ে এতকিছু ভেবে যাচ্ছি, তখনই সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আর মিলে গেল আমার সন্দেহ। শিবানীপিসি কী তবে অন্তর্যামীও! আমাকে আর পায় কে! ছুটতে ছুটতে মা'কে গিয়ে বললাম কথাটা। বিশ্বাস করে না, কেউ মানতেই চায় না। কান্না পাচ্ছে, কষ্ট। এইযে আমাদের ঠাকুরঘরে গোপাল, মায়ের লক্ষ্মী এরা তো কই কখনও 'অন্ন-ব্যঞ্জন' চায়নি। আমরাও তো কখনও 'অন্ন-ব্যঞ্জন' বলিনা। 'ভাত-তরকারি' বলি। লক্ষ্মীর পাঁচালীর ভাষা তো একমাত্র লক্ষ্মী ঠাকুরই জানবেন! তাই না! ঠাকুরের ভাষা! অভিমানে আমার দু'চোখ ভরে জল। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি...

কিছুক্ষণ পরে, ঠাকুমা কাছে ডেকে বললেন, "আসলে, এই যুগে সবাই আমরা ছদ্মবেশে আছি তো! তাই কেউ কাউকে না চেনার ভান করেই এই জীবন কাটাতে হয়... কেমন? মনখারাপ করে না..."