কালান্দার

রুখসানা কাজল



জেলা শহররের একটি হিন্দু পাড়া। গেল দু সপ্তাহ জুড়ে ফিসফাস চলছে, গুড়ের ব্যবসায়ি জিতেন সাহা মনে হয় আর বাঁচবেনানে। আয়ু শেষ। যাই একবার দেখে আসি।
বাড়ির গেট ঠেলে হিন্দু মুসলমান কেউ কেউ বড় জানালার শিকে মুখ রেখে জেনে আসে, কি অবস্থা এখন ? কেমন ঠ্যাকছে ও কাকিমা ? বরিশাল বা ঢাকা কি নেওয়া যাবেনে ?
বিছানায় পড়ে যাওয়া মরণাপন্ন জিতেন সাহাকে নিয়ে ওর বউ একাই থাকে বাড়িতে। চার ছেলেমেয়ের সবাই থাকে ওপারে মানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়। পূজো পার্বণে মাঝে মাঝে তারা বেড়াতে আসে। তখন নিজেদের পাড়া ছাড়িয়ে মিয়াপাড়ার মরা খাল ধরে গোরস্তান রোডের অস্থায়ী চায়ের দোকানে বসে চা ফা খায়। কোন কোন দিন আবার মিশন পর্যন্ত ঘুরে ফিরে ঘরে এসে হাসাহাসি করে।
জায়গাটা নামেই শহর। আগে ছিল ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত একটি সাবডিভিশন। স্বাধীনতার পর জেলার মর্যাদা লাভ করেছে। তবে লঞ্চ আর নৌকা ছাড়া আর কোন যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি তখনও। সবচে কাছের শহর হচ্ছে খুলনা। যে কোন কাজে সবাই খুলনাতেই বেশি যাতায়াত করে। কিন্তু খুলনায় সে সময় কোন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল না। তাই বড় অসুখবিসুখে এ শহরের লোকদের ভরসা বলতে ছিল বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তাছাড়া ঢাকায় আসতে দেড় দুদিন কেটে যেত লঞ্চে। একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পর অই শহরের অনেকেই এসেছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে উন্নয়নের দাবি নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হেসে বলেছিলেন, নিজের জেলার উন্নয়ন সবার আগে করতে পারব নারে। সবাই ভাববেনে আমি স্বজনপ্রীতি করছি। আমার দায়িত্ব ত সমস্ত বাংলাদেশকে দেখা। তবে নিশ্চয় করব। পরে করব।
একেবারে জুবুথুবু পরিবেশ। মুক্তিযুদ্ধের আগের সেই গমগমে সাংস্কৃতিক পরিবেশ আর নেই। একটা মাত্র সিনেমা হল হয়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে চলতি সিনেমার সব ডায়লগ, একশন, গান শোনা যায়। নাটক, অনুষ্ঠান বলতে কোন কিছুই হয় না। শহরের লোকরা বাজার করে, খায় , টয়লেট করে, আবার খেয়ে টয়লেট করে ঘুমায়। ব্যতিক্রম বলতে দু একটা ধূমধাড়াক্কা প্রেমের খবর। আর হাতে গোণা কয়েকজন তরুণের লিটল ম্যাগ বের করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। এগুলো নিয়ে কদিন বেশ চর্চা হয়। পরে সেগুলোও দ্রুত থিতিয়ে যায়।
তবে এটা মানতেই হবে, এ শহরের ছেলেমেয়েরা প্রেমের ব্যাপারে সুপার এক্সপার্ট। প্রেমের ক্ষেত্রে ওসব হিন্দু মুসলিম খ্রিষ্টান বলতে কোন বাছ বিচার থাকে না। কারণ প্রেম ত জাত, ধর্ম, বর্ণ, টাকাপয়সা মানে না। লাগেও না এসব। এমনিতেই হয়ে যায়। এমনও হয় দু চার দশ পনের দিন পালিয়ে থেকে টাকাপয়সা ফুরোলে প্রেমিক প্রেমিকারা আবার ফিরে আসে। বাপ মার হাতে আচ্ছাসে মারধর খেয়ে কদিন ঘরে থাকে। কিন্তু বন্ধুরা কি আর বসে থাকে ! উঁকিঝুঁকি, ইশারা, ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। ব্যস আবার হেসে খেলে ঘুরে বেড়ায় সবাই। এসব বাছুরে প্রেমে তেমন জোর থাকে না বলে কদিন পরে সবাই ভুলে যায়। কিন্তু সমস্যা হয়, কঠিন প্রেমগুলোতে। পালিয়ে গিয়েও রক্ষা নেই। দিকে দিকে লোক পাঠিয়ে পলাতকদের ধরে আনা হয় ।
এরম ক্ষেত্রে মুসলিম মেয়ে হলে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। আর হিন্দুর ছেলে বা মেয়ে হলে পার করে দেওয়া হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে । জাতপাত, দেনাপাওনার হ্যাপা থাকে বলে সহসা হিন্দুদের মেয়ে বিয়ে দেওয়া যায় না। কয়েক বছর পর, বনগাঁ, বিরাটি, মধ্যমগ্রাম, বারাসাত, হাবড়া বা কলকাতা থেকে এরা হঠাত একদিন বেড়াতে আসে। মেয়ে হলে বিবাহিতা আর ছেলে হলে টুকটাক ব্যবসা ট্যাবসা করে। পড়াশুনার দিকে কেউ খুব এগোয় না।
জিতেন সাহার বড় মেয়ে রাধুকে এভাবেই পার করে দেওয়া হয়েছিল। রাধু ছিল প্রতিমার মত সুন্দরি। ভয়াবহ বড় চুল। চুলের ভারে মাথা কাত হয়ে থাকত। শুধু যে শ্যাম্পু করত তা নয়। রাধুর বিধবা পিসিমা মধুমতি নদির সাদা আঠালো মাটি তুলে আনত। সেই মাটি লেই করে প্রতি মাসে একবার রাধুর অই বড় চুল ধুয়ে দেবেই দেবে। সেদিন কল পাড় জুড়ে বিশাল চেঁচামেচি ঝগড়াঝাঁটির বান বয়ে যেত। রাধু গালাগালি করত যাচ্ছেতাই বলে। তাতে পাত্তা না দিয়ে পিসিমার স্বৈরাচারী ধমকধামকের মধ্যেই চুল ধোয়াপর্বের সমাপ্তি ঘটত।
এই রাধু ক্লাশ নাইনে উঠেই জড়িয়ে গেল প্রেমে। স্থানীয় এক মুসলিম জুতা ব্যবসায়ি ছেলের সাথে। দু দুবার পালিয়ে গিয়েছিল। প্রতিবার ওই মুসলিম ব্যবসায়ী ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। একবার বড়দে লঞ্চঘাট থেকে। শেষবার লঞ্চ থেকে টেকেরহাট ঘাটে নামার সাথে সাথে ওদের পাকড়াও করে ফেরত আনা হয়েছিল যার যার বাড়িতে ।
সেবার কলেজে পড়া প্রেমিক ছেলেকে মেরে হাঁটু ভেঙ্গে দিয়েছিল ওর জুতা ব্যবসায়ি আব্বা। রাধুকে নিয়ে পালিয়ে গেছিল সেজন্যে নয়। ক্যাশবাক্সো ভেঙ্গে মোটা অঙ্কের চালানের টাকা নিয়ে গেছিল সে কারণে।
তো ছেলেকে হাসপাতালে রেখে অই জুতা ব্যবসায়ি বাজারের পেছনে জিতেনের গুড়ের আড়তে চলে এসেছিল। তখন গুড় কিনছিল কয়েকজন খুচরো দোকানদার। তাদের সামনে বলে গেছিল, দ্যাখ জিতেন, আর কিন্তু পারা যাতিছে না। আমার হইছে ছেলে। জানিস ত, ছেলের গায়ে কলঙ্ক ফলঙ্গ লাগবি নানে। তুই তোর মেয়ে সামলা। বিয়ে ফিয়ে করে ফেললি তোরাই আবার সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের কথা কয়ি মিছিল টিছিল শুরু করে দিবিনি। মনে রাখিস কোন লাভ হবিনানে তাতে। আমি কিন্তুক কাশেম ডাক্তারের মত ভদ্রলোক নই।
জিতেনের বুক কেঁপে ওঠেছিল যতটা লজ্জা ও অপমানে, তারচে বেশি কর্মফলের অভিশাপে। মাত্র ত দু বছর আগের ঘটনা। কি যড়যন্ত্র করেই না অমন লোকটাকে পাগল করে দিয়েছিল এ শহরের নব্য রাজনীতিকদের সাথে এক ঝানু রাজনীতিবিদ মিলে ! সে নিজেও ছিল অই যড়যন্ত্রের বড় অংশীদার। তার কাজ ছিল, পাড়ায় পাড়ার হিন্দুদের একাট্টা করে নির্যাতনের কথা বলে মিছিল করে প্রশাসন দপ্তরে ধর্ণা দেওয়া। কথা হয়েছিল, ওরা যাওয়ার খানিক পরেই মুসলমানদের আরেকটি মিছিল চলে আসবে নান্নু নীলু সরু খাঁর নেত্বৃত্বে । এসেও ছিল। দুটো মিছিলই তখন মুখোমুখি। প্রচন্ড মারমুখী। দাঙ্গা প্রায় লাগে লাগে অবস্থা। অবশ্য যড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দু সম্প্রদায়ের দুজন নেতার উপর নির্দেশ ছিল এর বেশি কিছু যেন না হয়। এরমধ্যে চামচাসহ অই নেতা চলে এসেছিল মধ্যস্ততা করতে। তখনই সিদ্ধান্ত হয় কাশেম রেজাকে সামাজিকভাবে বয়কট করার। বঙ্গবন্ধু হত্যার নীলনক্সার মত সবকিছু একদম ঠিকঠাক মত হয়েছিল।
কাশেম রেজা এখন একা একা শহরে ঘুরে বেড়ান। ময়লাটে রঙের খদ্দরের পাজামা পাঞ্জাবী। কাঁধে খদ্দরের চাদর। মহাত্মা গান্ধীর আজীবনের চেলা। হাতে মা মনসার আশির্ব্বাদী লাঠি। মধ্য পঞ্চাশে বুড়োটে ভাব এসে গেছে তার শরীরে। তবু শিরদাঁড়াটা এখনও বড্ড শক্ত। কারও কথা বা দলের নির্দেশে চলেন না। সত্যসুন্দরের অর্চক ছিলেন। এখনও আছেন। আগের মতই মন্দিরে নমো করে্ন। গির্জার প্রার্থনা সভায় দু একটা কথা বলেন। কিন্তু মসজিদে ঢুকেন না। মসজিদে গেলে অনেকেই এগিয়ে এসে সালাম দেয়। কিন্তু কেউ কেউ ঠারে ঠুরে কথাও শোনায়।
তিনি ছলনা পছন্দ করার মানুষ নন। পরমেশ্বর আল্লাহ ত সর্বত্র বিরাজমান। জলে স্থলে, মসজিদে মন্দিরে, ভান্ডারে ভাগাড়ে, সুখে অসুখে, অপমানে অভিরামে সব জায়গায় তার সবল বিচরণ। তাই নামাজ পড়ে্ন একা একা। মাঝে মাঝে তার পেছনে এসে কয়েকজন জামাত বাঁধে। তিনি ভ্রুক্ষেপ করেন না। নিজের নামাজ শেষে উঠে পড়েন। হরেক রঙের পাথরে গাঁথা তাসবীহ গুণতে গুণতে হেঁটে যান অবহেলে, নেতৃত্ব তিনি চান না।
একাত্তরের যুদ্ধে নেতার নির্দেশে শহরে থেকে তিনি চিকিৎসার ছলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার মেয়ে দুটি মুক্তিযুদ্ধে যাবে বলে ট্রেনিং করেছিল। এ শহরের বুদ্ধিজীবী হত্যা লিস্টের সর্বাগ্রে ছিল তার নাম। ধরাও পড়েছিলেন। পাকিস্তানী আর্মির হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন। সেই তিনি ঈর্ষাপরায়ণ যড়যন্ত্রকারী সেই নেতা আর একদল যুদ্ধ ফেরত উচ্ছৃংখল তরুণদের হাতে অপমানিত হলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে। কি করে ভুলে যাবেন এ যন্ত্রণা !
তার অর্জিত সমস্ত সন্মানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে তার সবচে সুন্দরি মেয়েটিকে তুলে নেওয়ার একাধিক হুমকি আসতে থাকে। ততোদিনে অনেক তরুণীকেই তুলে নিয়ে যে যার পছন্দ মত বিয়ে করে নিয়েছে ওই তরুণরা। তিনি সংস্কৃতির সেবক। ছেলেমেয়েরাও তার অনুগামী। পারিবারিক পরিবেশে লক্ষ্মীর চেয়ে সরস্বতীকে অগ্রগামী ভেবেছেন সারাজীবন। সেই তিনি কি করে এই জবরদস্তি আর স্বেচ্ছাচারের অপসংস্কৃতিকে মেনে নিবেন !
বঙ্গবন্ধুর কাছেও সাহায্য চেয়েছিলেন। ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠান নিয়ে খুব ব্যস্ত তখন সবাই। তবু আশ্বাস দিয়েছিলেন।
চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় বেকায়দায় পড়ে যান মানুষটি। অলক্ষ্যে মদত দিতে থাকে আত্মীয়সম সেই নেতা। ধনসম্পদ অর্থ সন্মান অনেককিছু থাকা সত্ত্বেও এরা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না তার মেয়েদের আধুনিকতার সাথে মিলিত মার্জিত সৌন্দর্য, আড়ষ্টতাহীন স্মার্টনেস, পড়াশুনায় অগ্রণী হয়ে ওঠা এবং শিল্পসংস্কৃতি জগতের তুখোড় ভূমিকাকে।
বড় মেয়েটি ঢাকার ইডেন কলেজে চান্স পেয়ে চলে গেছে পড়তে। কিন্তু সবচে সুন্দরী কিছুটা অবুঝ, বোকা আর সরল মেয়েটি এত চাপ নিতে না পেরে পালিয়ে যায় বাল্যকালের বন্ধু্র সাথে। একেবারে ফরিদপুর জজকোর্টে গিয়ে বিয়ে করে ফেলে অন্য বন্ধুদের উৎসাহে। ছেলেটি ছিল সনাতন হিন্দু ধর্ম সম্প্রদায়ের। একই পাড়ার। চেনাজানা। দু পরিবারের ছিল বন্ধুতার পরিবেশ। তিনি কোন অসুবিধা বোধ করলেন না। এ শহরে এ ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ ক্ষেপে ওঠল। শুরু হয় সামাজিক পীড়ন। বাড়ির গেটে কেউ তুলসিগাছ রেখে যায় ত কেউ জায়নামাজ কোরআন শরীফসহ পাঁচশ দানার তসবিহ নিয়ে আসে।
আশ্চর্য হয়ে তিনি দেখলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে কিভাবে বেরিয়ে এসেছে ধার্মিক পশুরা। সেখানে মুসলিম আছে, হিন্দু আছে, রাজিনৈতিক বিপ্লবী আছে, তার ভাইয়েরা আছে, বোনের শ্বশুরকূল, এমনকি শিল্প ও সংস্কৃতির ধারক, বাহক সেবক বন্ধুরাও রয়েছে। শুধু একজন মানুষ নেই তার পাশে। একজনও ! কি রইল আর তার জীবনে ?
এ ঘটনার পর সামাজিক হেনস্থা থেকে রক্ষা করতে স্ত্রী আর সন্তানদের ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। একটি বাড়ি ও জমি বিক্রির টাকা দিয়ে বলে দিয়েছিলেন, এ শহরে কখনও ফিরে এসো না। কিন্তু ভুলে যেওনা। ব্যঙ্কের সুদ আর ট্যুইশনি করে ওদের চলে যাবে অতি সাধারণভাবে। তার সন্তানরা পড়াশুনায় ভাল। মেধাবী। প্রত্যেকেই পড়ুয়া। কিন্তু তাদের প্রচন্ড রাগ আর অভিমান জন্মেছে তার উপর।
দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু ডেকেছিলেন, তোর ত ঘরবাড়ি পুড়ে ছারখার। ঢাকা চলে আয়। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
বোকা মানুষটা নিম্নস্তরের নির্বোধের মত তখন বলেছিলেন, না ভাইজান। পাকিস্তানিরা আমার কেবল ঘরবাড়ি সম্পদ লুটে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলো আবার করা যাবে। ওরা ত আমার কোন সন্তানের ক্ষতি করতে পারেনি। আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের আগে দেখুন।
নিজেকে মহান আত্মত্যাগী ভেবে মহাতৃপ্তি অনুভব করতে করতে তিনি দেখেন, অনেকেই আড়ালে তাকে বোকা ডাক্তার বলছে। তাকে বোকা ভেবে তার চোখের সামনে রেডক্রিসেন্টের সব সাহায্য চলে যাচ্ছে নেতা আর তার চাটুকারদের ঘরে।
তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। শক্ত প্রতিবাদ। তার লেখায় ও কথায়।
কেন করলেন ? ওদের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল তার উপর। একজন অচেনা গুন্ডামত গ্রাম্য তরুণ রাজনৈতিক পোষ্যকে শিখন্ডি করে তার ফার্মেসিতে পাঠিয়ে দিলেন হুমকি ধামকি ভয় দেখাতে। সে এসে বেয়াদবি করে গেল, আপনার ছেলে যে নকশাল করে তা কি আমরা জানিনা। দেব আপনার নাম রাজাকার লিস্টে তুলে ? থামেন কিন্তুক। বেশি বাড়াবাড়ি করলি রাজাকার বানায়ে দিবানি। তখন কি করতি পারবেন নে আপনি ? কিডা বাঁচাবেনে আপনেরে ?
আসন্ন তারকা ঝড় দেখেও তিনি আপোষ মানলেন না। নক্ষত্রের মত দুটি চোখে আলোর দ্যুতি জ্বলে উঠেছিল। দুটি ভিটামিন সি ট্যাবলেট সেই পোষ্যকে দিয়ে বলেছিলেন, তুমি ? কে তুমি ? ও আচ্ছা। তা দেবে ? সে তোমরা পার। বেশ ত তুলে দাও আমার নাম।
ছেলেমেয়ে স্ত্রী রাগে ভয়ে ফেটে পড়েছিল। বাস্তব বুদ্ধিহীন দু পয়সার তুল্যমূল্য এমন মানুষের এত জিদ কেন ! স্ত্রী ছিলেন ধনী পরিবারের। বরাবরের অসুখি যাপনে এমনিতেই ক্ষুব্ধ ছিলেন অন্তরে। এবার ক্রুদ্ধ ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন, কি দরকার ছিল তোমার সংসার করার ! করলেই যখন এত ভালোমানুষি দেখানো কেন শুনি ! সংসারও পাঁকপঙ্কে ভরা। সবাই দল করছে। নইলে তাল মিলিয়ে চলছে। তোমার আত্মীয়রাও এভাবে চলছে। কি আছে তোমার ? স্বার্থপর নিষ্ঠুর মানুষ। সারাজীবন শুধু নিজেকে, নিজের মতামত আর আদর্শকে ভালোবাসে গেলে !
বিশেষ করে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা ছোট মেয়েটার খুব রাগ তার উপর। স্ত্রীর কাছে শুনেছেন, শহর ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট পেয়েছে মেয়েটি। সারারাত বন্ধ কেবিনের লোহার ফ্লোরে শুয়ে নীরবে কেঁদেছে। পঁয়ষট্টি সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের আঁচে দাঙ্গা হয়েছিল এ ছোট শহরে। মেয়েটি সেই আগুন নিয়েই জন্মেছে। কাশেম রেজা তখন দিন নেই রাত নেই দাঙ্গা থামাতে ব্যস্ত। মেয়েটির শৈশবও চুরি হয়ে গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। মারকুটে, চঞ্চল, মুখর, ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে নদি পেরুতে, সাঁতার কাটতে, গাছে উঠতে, গুলতি ছুঁড়তে ওস্তাদ মেয়েটি একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ বই মুখে। মাঝে মাঝে কড়া চোখে তাকায়। যেটুকু কথা বলে, যেন গরম তরল সীসা ঢেলে দেয় অক্ষর শব্দ বাক্যে।
কাশেম রেজা সুতো ছিঁড়ে ফেলেন আত্মীয়স্বজনদের সাথে। স্বজনদের পীড়ন সে বড় অহর্নিশ শূল ফোটানো যন্ত্রণা আর কষ্টের। বিপদে কেউ বন্ধু নয়। অথচ তিনি ছুটে গেছেন। জাত, পাত, ধনী গরিব, আত্মীয় অনাত্মীয়দের বিপদে। কিচ্ছু দেখেননি। কিচ্ছু মানেননি কখনও। নিতান্ত অচ্ছুতদের পর্যন্ত তুলে এনে নিজের ফার্মেসিতে রেখে চিকিৎসা করেছেন। সবাই কত ভালবাসত। কত যত্ন করত। তার লেখা কবিতা, গান, নাটক ছাড়া কোন অনুষ্ঠান হত না এ শহরে। তিনিই ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মহাপুরুষ। সেই তিনি আজ অপাঙতেও। পরাজিত এবং অবাঞ্ছিত।
আর এরকম অবস্থার ভেতরেই সংঘটিত হয়ে যায় ১৫ আগস্ট , বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড।
কাশেম রেজা একা গোরস্তানে গিয়ে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে সুললিত উচ্চারণে সুরা পড়েন। নাটক, আবৃত্তিতে দু দুবার সোনার মেডেল পাওয়া মানুষটি উদাত্ত উচ্চারণে কবরের মাটি, ঘাস, গাছ পাখিদের শুনিয়ে সুরা পড়েন, ফাবি আইয়ে আলাহি রাব্বুকুমা তুকাজ্জিবন। কখনও গোরস্তানের পেছনে কালচে সবুজ দীর্ঘ গাছের মাথায় সন্ধ্যার আকাশ নেমে এলে আবৃত্তি করেন, ‘অত চুপি চুপি কেন কথা কও ওগো মরণ হে মোর মরণ----’
কাছে এসে হাজামাজা হাত পা দেখিয়ে ওষুধ চায় গোরখোদক। বিশাল বুক, সুন্দর দাড়ি, টকটকে রঙের এক দীর্ঘ মানুষ। বাঙালী নয়। তবু বাংলায় থেকে গেল আজীবন। ওষুধের নাম বলে দিলে দাম শুনে হতাশ হয়ে ফিরে আসে । পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তিনি মনে মনে হাসেন , দিও কিঞ্চিৎ না করে বঞ্চিত।
সে কোন যুগ থেকে এ শিক্ষা তার পরিবারের চলে এসেছে ! হয়ত এখানেই শেষ হয়ে যাবে এ পরম্পরা। কিঞ্চিৎ থাকলে ত কিছু দেওয়া যাবে ! তিনি কিছুই রেখে যাবেন না। তার সন্তানরা বাবা আদমের সন্তানদের মত লড়ে যে পারবে সে টিকে থাকতে শিখে নিবে এ পৃথিবীতে। গোরখোদকের হাতে টাকা দিয়ে তিনি হাসেন।
তার হাসিতে কোন ক্রুরতা নেই। ব্যঙ্গ করতেও তিনি জানেন না। ক্ষমাশীল ব্রততী তিনি। পরমেশ্বরের শ্রেষ্ঠ আশির্ব্বাদে পুষ্ট মানবসন্তান। হাসলে পদ্মফুল দুলে ওঠে। আকাশ থমকে তাকায়। নদি ভেঙ্গে পড়ে জলজ আবেগে। আজকাল কেউ কেউ তার হাত ধরে কাছে টানে। মসজিদে জোর করে ধরে আনতে চায়। ঈদ পার্বণে দাওয়াত করে। দোয়া দিতেই হবে বলে ধরে নিয়ে আসে বিয়ে বাড়িতে। মৃদু হেসে তিনি বেরিয়ে আসেন সেখান থেকে।
তার সেই মেয়েটি এখন সরকারী প্রাইমারি ইশকুলের শিক্ষিকা। হিন্দু আত্মীয়রা বউমা, বউদি, কাকিমা ডাকে। মুসলিমরা পুরনো সুরে ঘুরে যায় বাড়িতে। যারা পেছনে লেগেছিল, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিশাল বাড়ি গাড়ি করেছে। তাকে দেখলেই ছুটে আসে। তিনি দোয়া আশির্ব্বাদ করেন, আরও আরও টাকা হোক তোমাদের। আরও ক্ষমতাবান হও তোমরা।
ভোরের নদির কাছে কাছে এসে বসে থাকেন রোজ। কি যেন খুঁজে পেতে চেষ্টা করেন। তিনি কি কোন বিদ্রোহী তরুণ ব্রাম্মণকে খোঁজেন ! শত শত বছর আগে স্বজনপীড়িত সেই তরুণের সাথে কি সম্পর্ক তার ? তিস্তার ত্রিধারার এক জলধিতে শণ শণ করে ছুটে আসা এক পানসী নাওয়ে কে ছিল সেই কালান্দার যে তার লাল চাদরের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছিল মৃত্যু ভয়ে পলায়ণপর থরথর এক তরুণ ব্রাম্মণকে ? বিশ্বআলোর উৎস সম্পর্কে কে তার পূর্বপুরুষ সেই তরুণকে জানিয়েছিল, দেখো, ‘প্রদীপগুলো আলাদা, আলো কিন্তু একই।’
ছোট কন্যাটি এসেছিল দুদিনের জন্যে। ইউনিভার্সিটি জুড়ে এরশাদ বিরোধী তীব্র আন্দোলনে মেয়েটিও নেমে পড়েছে। স্কলারশীপের টাকায় অনেকগুলো বই কিনে দিয়ে গেছে। কয়েকজন আত্মীয়, সেই নেতার বাড়ির দু একজন দেখা করতে এসে চমকে ফিরে গেছে। মেয়েটি বিষকন্যা। শৈশবের অপমান কিছুই ভোলেনি।
ফিরে যাওয়ার আগে বলে গেছে , বাপি আপন চেয়ে পর ভাল, পরের চেয়ে বন। তুমি শুদ্ধাচারী। ক্ষমা ও সততার দাস। তাই স্বজন বন্ধুদের মুখোশ চিনতে পারোনি। আমি পারি। দেখো ঠিক টিকে যাব।
অনেক অনেক দিন পর জিতেন সাহার বৌয়ের অনুরোধে তিনি জিতেনকে দেখতে এসেছেন। সাহা পাড়া ভেঙে পড়েছে তাকে দেখতে। ধোয়া চাদরের আসন, ঝকঝকে গ্লাসে পানি, নাড়ু তক্তির উপচার নিয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। জিতেনের জোড়হাত ছুঁয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। সেদিনের যড়যন্ত্রে জিতেনের ভূমিকা ছিল সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার। কাজটা ভালভাবেই করেছিল জিতেন।
এক মুষ্টি পানি খেয়ে, মাথায় ছুঁইয়ে তিনি পথে নামেন। জিতেনের নাক ঢলে পড়েছে। হয়ত যমদূত খুব কাছে কোথাও অপেক্ষা করছে। বন্ধু প্রফেসর মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের বাড়ির দিকে যেতে গিয়েও রাস্তা বদলে গোরস্তানের দিকে হেঁটে আসেন। ঢাকা থেকে স্নেহের নরেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক নরেন বিশ্বাস এসেছিল ঈদ পুনর্মিলন ও শুভ বিজয়ার আড্ডায়। সেদিন কেন যেন তিনি আবৃত্তি করেছিলেন, ‘মরণরে, তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান !
মেঘ বরণ তুঝ, মেঘ জটাজুট, রক্ত কমল কর, রক্ত অধর-পুট----’
তাকে জড়িয়ে ধরে নরেনও গলা মিলিয়েছিল , ‘তাপ-বিমোচন কৰুণ কোর তব, মৃত্যু অমৃত করে দান ! তুহু মম শ্যাম সমান !’--দাদারে এমন আনন্দের দিনে এ কবিতা কেন বাছলে তুমি !
অক্টোবরের হালকা শীত হাওয়ার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে গোরস্তানের গাছগুলোকে। নতুন কবরগুলোর বেড়া বেঁধে দিচ্ছে গোরখোদক। একটি পুরনো কবরের পাশে বসেছিলেন কাশেম রেজা। হঠাত তার অনুভূতি কেঁপে ওঠে। চিরন্তন মৃদু অভ্যাসে অলক্ষিত পদশব্দ বেজে ওঠে ঘাসে ঘাসে। সুগভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিলম্বিত সঙ্কোচে তার পাশে এসে বসেছে অদৃশ্য কেউ । তিনি অনুভব করেন, মৃত্যুদূত ফেরশতা এসেছেন। পরলোক যাত্রার পয়গাম তার হাতে।
দ্বিধা অন্বিত হিম ঠান্ডা দুটি হাত তার সামনে পেতে দেন আজরাঈল ফেরেশতা। অদৃশ্য হাতের তালুতে অদৃশ্য কালিতে লেখা অমোঘবানী, এসো মানব। তোমার সংগ্রাম শেষ।
প্রগাঢ় স্বস্তিতে অমলিন হেসে হাতদুটি বাড়িয়ে দেন তিনি, ওহে কালান্দার, বড় ভালোবাসি হে তোমাকে। জানি ত, ‘তুঁহুঁ ন ভইবি মোয় বাম!’ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ !