আগুনের পরশমণি অথবা নাইট-ওয়াচম্যান

পার্থজিৎ চন্দ


প্রথমটি একটি ‘মজার গল্প’, অনেকেই এই গল্পটি সামান্য অদলবদল করে ব্যবহার করেছেন। মোটের ওপর ঘটনাটি রয়ে গেছে একই, স্থান-কাল-পাত্র বদলে বদলে গেছে শুধু। ঘটনাটি এরকম – তখন সোভিয়েত-যুগ… কম্যুনিস্ট পার্টির কঠোর শাসনে বাঁধা রয়েছে দেশের মানুষ। একজন রুশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
বিমানবন্দরে এক নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন সেই দেশ-ছেড়ে চলে যেতে চাওয়া মানুষটি। কথায় কথায় নিরাপত্তারক্ষী জিজ্ঞেস করেন, ‘তা আপনার এই দেশ ছেড়ে দেশান্তরিত হবার কারণ কী?
এদিক-ওদিক তাকিয়ে সেই রুশ বললেন, ‘আসলে কী জানেন, আমার ঠিক পাশেই এক ইহুদী পরিবার থাকে, তারা বারবার শাসিয়ে চলেছে। বলছে, কম্যুনিস্ট যুগ শেষ হলেই তারা আমাদের আক্রমণ করে মেরে ফেলবে।’
কথাটা শুনে নিরাপত্তারক্ষী হেসে ওঠে, বলে, ‘এই কারণে কেউ বোকার মতো দেশ ছাড়ে! আরে কম্যুনিস্ট শাসন তো এ দেশে শেষই হবে না…’
কথাটা শুনে দেশ দেশ ছাড়তে চাওয়া মানুষটি বলে, ‘সেই কারণেই তো দেশ ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি…’
দ্বিতীয় রূপকথাটি আরও মারাত্মক। পেয়েছিলাম শ্বেতলানা বয়েমের দ্য ফিউচার অফ নস্টালজিয়া বইটিতে। কাজাখ এই রূপকথায় এক দুর্ধর্ষ জা্তির কথা বলে আছে, যারা তাদের হাতে বন্দি সৈন্যদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাত। বন্দি সৈন্যদের পরিণত করত দাসে, সুখী দাসের দল। কারণ ততদিনে বন্দি সৈন্যদের সব স্মৃতি এক জাদুবলে উপড়ে ফেলা গেছে।
প্রথম ঘটনাটি নিশ্চয় কোনও একদিন সামান্য হেরফেরে ঘটেছিল। কম্যুনিস্ট শাসনের জাঁতাকলে পিষে যেতে যেতে মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়া রুশের ভাগ্য বেশ কিছুটা ভালই বলতে হবে। কারণ উদ্বাস্তু বা দেশান্তরিত হবার মুহূর্তে বেশিরভাগ মানুষের হাতে এই সামান্য ‘চয়েস’টুকুও থাকে না।
দ্বিতীয় রূপকথাটির সামনে দাঁড়িয়ে আনখশির কেঁপে ওঠে, শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। স্মৃতি…স্মৃতিই মানুষের সব থেকে বড় ও শেষতম অবলম্বন। সে সব হারিয়ে বাঁচতে পারে, কিন্তু স্মৃতি হারালে সে হয়ে পড়ে সুখী কৃতদাস। তাই যে কোনও শক্তি সব থেকে প্রথম চায় মানুষের স্মৃতিকে ভুলিয়ে দিতে। এবং এই স্মৃতির কাছেই ‘শক্তি’ সব থেকে অসহায়।
মানুষ আসলে স্মৃতির মধ্যে বাঁচে, সেখানেই মরে। স্মৃতির নির্মাণ-বিনির্মাণ যেমন ঘটে, তেমনই ঘটে স্মৃতির ভেতর এক সুড়ঙ্গপথ ধরে আরেক স্মৃতির নির্মাণ। বাস্তবতা ও অবাস্তবের সীমারেখা সেখানে অবান্তর, কারণ ঘটনার ‘স্মৃতি’ হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্তই হল এই সীমারেখাকে অতিক্রম করে যাওয়া। তার মানে এই নয় যে স্মৃতি মাত্রই ‘অবান্তর’ ‘অবাস্তব’ কিছু। আসলে স্মৃতি এই স্প্যানকে অতিক্রম করে এক পৃথক মহাদেশ।

উনিশ-শো চল্লিশের আশেপাশে প্রায় আট-দশ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতিকে এভাবেই উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। সব থেকে বড় কথা, এই চেষ্টা নিজে হাতে করতে বাধ্য হয়েছিলেন ব্যক্তিমানুষ। না-হলে তাঁরা হয়তো বেঁচে থাকতেই পারত না।
আমার ‘স্মৃতির’ মধ্যে জেগে থাকা নট-আউট মানুষটির কোনও প্রত্যক্ষ্ স্মৃতি নেই আমার কাছে। ক্রমাগত এক শালবৃক্ষের ‘গল্প’ শুনতে শুনতে তাঁকে আবিষ্কার করি আমি। দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে হস্তান্তরিত হওয়া এই নস্টালজিয়ার ধারা গবেষণার বিষয় হতে পারে। উঠে আসতে পারে কীভাবে ছিন্নমূল হয়ে পড়া এক বিরাট পরিবারের কাছে একজন মানুষ হয়ে ওঠেন শিকড়ের সন্ধান বা অমোঘ অ্যঙ্কর। ব্যক্তিমানুষের ক্যারিসমা নিশ্চয় খুব বড় ভূমিকা পালন করে এসব ক্ষেত্রে। সে সময়ের ‘বাঙাল কলোনি’গুলির কাহিনীতে চোখ রাখলেই দেখা যাবে এ ধরণের এক একজন মানুষ, যাঁরা নিজেরাই এক একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছেন। অতিমানবীয় গুণ যে তাঁদের মধ্যে আরোপিত হয়েছিল সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও ঠিক, তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত অর্থে অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন। মূল-সংলগ্ন হয়ে থাকলে হয়তো তাঁদের এ ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ হত না, এদিক থেকে বলা যায় দাঙ্গা ও দেশভাগ তাঁদের অনেককেই পূর্ণ বিকাশের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁরা যা হতে পারতেন তার থেকেই বেশি ‘হয়ে উঠেছিলেন’। লাইটহাউস নির্মাণের পিছনে যে সমুদ্রের ঢেউয়েরও এক বিরাট ভূমিকা থেকে যায় সেটা এই সব অতিমানবদের জীবন না-দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত।
নোয়াখালি-অমরপুর-খিলপা ড়া-গ্রাম…এই তিনটি শব্দ ছাড়া আমার, মানে আমাদের মতো যারা উদ্বাস্তু পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তান তাদের অনেকের কাছে ‘দেশের মাটি’ বলতে এর থেকে বেশি কিছু বোঝায় না। সেই ‘অপ্রত্যক্ষ’ স্মৃতির শুঁড়িপথ বেয়ে নির্মিত হয় বাড়ির পাশে এক বড় খাল। সেখানে নিশ্চয় জলের বুকে ঝুঁকে পড়া গাছের ডাল থেকে পা-ঝুলিয়ে দোল খাচ্ছে পাঁচ-ভাই। সব থেকে বড়জন যিনি তিনি বেশকিছুটা চিন্তিত। কারণ দিনকাল যে সুবিধার হতে যাচ্ছে না সেটা সব থেকে আগে সে’ই বুঝতে পেরেছে্ন। মা হয়তো কানে কানে বলছেন, দিনকাল যা পড়েছে হয়তো আমাদের এই ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হবে…ভাল করে পড়াশোনা কর খোকা…ওটুকুই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাজে লাগবে…’
নদী আর খালের জালক দিয়ে ঘেরা সজলবাংলার থেকে পুরুলিয়ার রুক্ষমাটির দূরত্ব কতটা? কয়েক আলোকবর্ষ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
তখনও পরিবারের সকলে ‘দেশের ভিটে’ ছেড়ে এপার বাংলায় চলে আসেনি। বাড়ির বড় ছেলে কিছুটা ভাগ্য অন্বেষণেই চলে এসেছিলেন কলকাতায়। ‘স্বাধীনতা’ দরজায় কড়া নাড়ছে, আর বেজে উঠছে অমোঘ ঘন্টা…যে ঘন্টার ধ্বনীর সঙ্গে সঙ্গে উপড়ে ফেলতে হয় একের পর এক স্মৃতির স্তম্ভ।
সে সময়েই ঘটনাচক্রে পুরুলিয়া শহর থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরের এক ছোট জনপদের জমিদারের সঙ্গে পরিচয়। রুক্ষ প্রান্তরে তখন তেমন কেউই প্রায় শিক্ষকতা করতে যেতে চান না। কিন্তু ভাগ্য অন্বেষণে আসা যুবক গ্রহণ করলেন জমিদারের প্রস্তাব, তাঁর গ্রামে একটি জুনিয়র স্কুল আছে। নোয়াখালির যুবক চললেন পুরুলিয়ার ঊষরপ্রান্তরে শিক্ষকতা করতে।
এবার স্মৃতির নির্মাণের দিকে একটু ফেরা যাক। সজল বাংলার যুবকটি নিশ্চয় ততদিনে বুঝতে পেরেছেন গ্রীষ্মে ফুটিফাটা হয়ে উঠবে লালমাটি। গ্রামের মানুষ প্রতিদিন চেয়ে থাকবেন তাঁর ডায়ালেক্টের দিকে। এই চাঁদের আলোমাখা শালবন এই দূর পাহাড়ের চূড়া এই মহুয়ার ছায়া…সব, সবই তাঁকে গ্রহণ করতে হবে একটু একটু করে। যেভাবে গাছ শুষে নেয় মাটির রস আর সূর্যের আলো সেভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে এই সব গ্রহণ করতে হবে তাঁকে। কারণ, গ্রামের মানুষের কাছে প্রতিদিন গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠাই তাঁর কাছে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু শুধু নিজের গ্রাসচ্ছাদন করলেই তো তাঁর দায়িত্ব ফুরিয়ে যাবার নয়, এতদূরে খবরের কাগজ এসে পৌঁছায় না। কিন্তু কানে আসে, প্রতিদিন দলে দলে লাখে লাখে মানুষ এসে আছড়ে পড়ছে কলকাতায়।
একটা-দুটো পোস্টকার্ড এসে পৌঁছাত মাঝেমাঝে। ভাইদের মধ্যে কেউ লেখে, ‘প্রণাম জানিবেন ঠাকুরভাই…মায়ের চিন্তার অন্ত নাই। আমাদের এদিকে অবস্থা ক্রমশ খারাপ হইতেছে, আপনার কাছে কোনও উপায় থাকিলে জানাইবেন। আর কতদিন এখানে থাকিতে পারিব জানা নাই…দ্রুত কলকাতায় চলিয়ে যাইতে হইবে। কিন্তু যাইব কোথায়? চিন্তায় চিন্তায় মায়ের শরীর ক্রমশ খারাপ হইতেছে…’
যুবক একাকী শালের বনে বনে ঘোরেন, মাথার প্রতিটি শিরা যেন চিন্তায় ছিঁড়ে যেতে চায়। কিছু একটা করতে হবে, কিছু একটা করতেই হবে।
তাঁকে প্রায় কিছুই করতে হয় না, দাঙ্গায় দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত আত্মীয়স্বজন সবাই একে একে চলে আসে তাঁর কাছেই, সেই পুরুলিয়ার গ্রামটিতে। ততদিনে গ্রামের শিক্ষিত শিক্ষক হিসাবে তাঁর বেশ নামডাক হতে শুরু করেছে। স্বল্পভাষী মানুষ, মাথায় বরফ বসানো যেন। কথা বলেন কম, সব সময় যেন কী এক চিন্তায় ডুবে থাকেন। সংসার ক্রমে বড় হচ্ছে, গ্রামের লোকের কাছে তিনি ততদিনে সংসারে সন্ন্যাসী মানুষ। স্কুলের প্রতিটি ইঁট তিনি চেনেন। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তাঁকে ক্রমশ ভরিয়ে দিচ্ছেন গ্রামের মানুষ।
ভাইদের পড়াশোনার দিকে তাঁর সতর্ক নজর। নিজের স্কুলেই ভর্তি করিয়ে নিচ্ছেন তাদের। ছোটভাই মাতৃগর্ভে থাকার সময়েই বাবা মারা যান। ফলে ভাইদের কাছে বড়দাদাই পিতৃসম। শাসনের সঙ্গে অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছিনিয়ে নেবার অমোঘ ক্ষমতা তাঁর। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এই শিক্ষকের নামডাক। গ্রামের অনেকেই তাঁকে সাক্ষাৎ দেবতা জ্ঞান করেন। তিনি ‘মিথ’এর নির্মাণকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু মিথ-তো তাঁর পিছনে ছুটবেই। এ পথ ধরেই তিনি গ্রামের মানুষজনের কাছে হয়ে উঠছেন ‘গুরুভাই’। পুরুলিয়ার জেলাশাসক জেলায় শিক্ষা প্রসারে তাঁর মতামত মন দিয়ে শোনেন। শিক্ষক হিসাবে রাজ্যস্তরে তিনি সম্মনিত হবেন কিছু বছরের মধ্যেই।
এ পথ ধরেই তাঁর দেহান্তর হবে, গ্রাম থেকে গ্রাম…মানুষের দল ছুটে আসবে তাঁদের গুরুভাইকে একবার দেখার জন্য। গ্রামের অনেক পরিবারে আরাধ্য দেবতার ছবির পাশে জ্বলজ্বল করবে তাঁর ছবি।
কিন্তু এসব দিয়েও তাঁকে মাপা যাবে না। তাঁকে মাপতে গেলে দরকার একটি শালের বন ও শীতদুপুরের নির্জনতা।
দুপুরের নির্জনতা খানখান করে দিয়ে ভেসে আসছে একটি কুড়ুলের আওয়াজ। শালজঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে এক কাঠুরে বসে এই লেখাটি যে-লিখছে তার সামনে, পুরুলিয়ার আদি-অকৃত্রিম উচ্চারণে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই কাদের বাড়ির ছেলে?’
‘আমার জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি ও…ই…ই…ই গ্রামে…’
‘কাদের বাড়ি?’
‘চন্দ-দের’
‘ওহ…তোর জ্যাঠা বেজায় ভাল মানুষ ছিলেন…আমাদের এ-গ্রামে ওনার মতো মানুষ আর ছিল না রে…’
তারপর আরও কয়েকটি কথা হয়। শীতের রোদ ঢলে পড়ে, সূর্য ঢলে। ঠাণ্ডা রুক্ষ বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরুলিয়ার শালবনে।
বারবার বাউন্সার খেতে খেতে ক্রিজে তখন আবার উঠে দাঁড়ান এক নট-আউট মানুষ। সমুদ্রপ্রান্ত থেকে প্রায়-অন্ধকারে লাল বল হাতে ছুটে আসছেন লারউড। বল সুইং করবে, অফস্টাম্পের ইঞ্চি-তিনেক বাইরে পড়ে সাঁ সাঁ করে বেরিয়ে যাবে।
জীবন তুমি বারবার ধোঁকা দিতে পেরেছ…স্কোরবোর্ডে তেমন চোখ-ধাঁধানো রান’ও নেই। কিন্তু মনে রেখ, আমারও একজন নট-আউট ব্যাটসম্যান আছেন, যিনি সেই কখন নাইট-ওয়াচম্যান হিসাবে ক্রিজে নেমেছিলেন। দিনের শেষে ব্যাট উঁচু করে ফিরে আসছেন, সারা গায়ে বিষাক্ত বাউন্সারের ছোবল।
পুরুলিয়ার শালবনে তখন বয়ে যাচ্ছে রুক্ষ শীতের বাতাস।