আমার রিয়াল হিরো

সমরজিৎ সিংহ

পাকুতি । কেন এই নাম রেখেছিল বাবা-মা, জানি না । এর অর্থ কি ? জিগ্যেস করলে, বলতে পারব না । কালো চেহারা, নাদুসনুদুস বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাও নয় । আবার, বডি বিল্ডারের মত চেহারাও নয় তার । চোখ দু'টি ড্যাবড্যাবে । তারপরও মুখশ্রী ছিল তাকিয়ে দেখার মত । মায়াময় এক মুখ । সারল্য ছড়ানো মুখ ।
আমার থেকে বয়সে দু’তিন বছরের বড় । দাদা, বলে, ডাকা উচিত, ডাকিনি কখনও । অথচ গ্রামে, তার বয়সী সকলকে ডাকতাম দাদা, কাউকে খুড়ো বা মামা । তাকে ডাকতাম পাকুতি ।
আমাদের চার বাড়ি পরেই তাদের বাড়ি । পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে এক আমবাগান, সঙ্গে কাঁঠাল বাগান ছিল তার । সেই আমবাগানে আশ্চর্য এক আমগাছ ছিল, যে গাছে ধরত কুমড়ো আম । অবিকল কুমড়োর মত দেখতে । খেতেও ভারি মিষ্টি । কাঁঠাল গাছে যেসব কাঁঠাল ধরত, সে কাঁঠাল এতটাই বড়, যে, একজন মানুষের পক্ষে একা তোলা অসম্ভব ছিল, দু'জন মিলে বয়ে নিত বাজারে ।
গ্রামে, ছেলেবেলায়, দেখেছি, চুরি করে আম-কাঁঠাল খাওয়া ছিল এক মজার রীতি । আমি নিজেও দু'একবার চুরি করিনি, তা নয় । সাধারণত, এসব চুরিতে পাকুতি ছিল লিডার ।
একবার, আমাদের পাশের বাড়ির কাঁঠাল গাছ থেকে চুরি করে খাওয়ার পরিকল্পনা করল পাকুতিরা । পাশের বাড়ি মানে সুভাষদের বাড়ি । সুভাষের দিদি সবিতা ছিল আমার ক্লাসমেট । একে প্রতিবেশী, দুইয়ে ক্লাসমেটের বাড়ি, ফলে, এই অভিযান থেকে নিজেকে নিয়েছিলাম সরিয়ে । মন সায় দেয়নি ।
যে কাঁঠাল গাছ থেকে চুরি করা হবে, সে গাছটি ছিল আমাদের ঘরের খুব কাছে । একেবারে বর্ডার লাইনে । আমাদের ঘুলঘুলির মত জানালা দিয়ে দেখা যায় । ঐ গাছের কাঁঠাল অমৃতের চেয়েও অমৃত, আজ অবধি এমন স্বাদের কাঁঠাল খাইনি আমি ।
এক কৃষ্ণপক্ষে, সন্ধ্যার পরে, পাকুতিরা সাত-আটজন এল আমাদের ঘরে । চুরি করতে হলে কৃষ্ণপক্ষ সেরা । দশটা বেজে গেলে, চুপি চুপি, বেরিয়ে গেল তারা । গ্রামে দশটা মানে গভীর রাত । অন্তত সে সময় । ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তখন শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, দেশের হিরোও । জয় জোয়ান জয় কিষাণ, এই শ্লোগান তখন সকলের মুখে মুখে ।
আমাদের ঘুলঘুলি সম জানালা দিয়ে চুরির লাইভ অনুষ্ঠান, রুদ্ধশ্বাসে, দেখছি আমরা । গাছ বেয়ে উঠে গেল পাকুতি, নিচে বাকি ছেলেরা । একটা শুকনো ডালে, বোধ হয়, পা পড়েছিল, মড়মড় করে ভেঙে গেল ডাল । পাকুতি, দেখলাম, দ্রুত, আর একটা ডাল ধরে, ভল্ট খেয়ে চলে গেল উপরের ডালে ।
ডাল ভাঙার শব্দে, না কি নিচে যারা ছিল, তাদের ইশ ইশ শব্দে, সুভাষদের ঘুম ভেঙে গেল । কেগুবে অনঅ ? কিতা করছ ? বলতে বলতে, টর্চ হাতে বেরিয়ে এল তারা । নিমেষে, নিচে যারা ছিল, সবাই উধাও ।
বিশুদ্ধ সিলেটি ডায়ালেক্টে সুভাষের বাবা, তখনও, বলে যাচ্ছেন, পুঙ্গির পুত । উবা অ, তরে আইজ দেখিলামু । বলে, কাঁঠাল গাছের নিচে এসে টর্চ মারলেন, টর্চের আলো ঘুরে যাচ্ছে গাছের সবদিকে । আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম । এই বুঝি ধরা পড়ল পাকুতি !
টর্চের আলো যেদিকে পড়ছে, চকিতে, তার উল্টোদিকে সরে গেল পাকুতি । তারপর, নিমেষে, এক বড় ডালের উপর এমন ভাবে শুয়ে পড়ল, সেখানে টর্চের আলো যায় না ।
সুভাষ, তার বাবা, মা, সবিতা আর ছোটবোন ঘুরে ঘুরে দেখল অনেকক্ষণ, কাউকে কোথাও দেখতে পেল না তারা, না গাছে, না অন্যত্র । প্রায় ঘন্টাখানেক থেকে চলে গেল ঘরের ভেতরে ।
আমার চোখে ঘুম নেই । গাছ থেকে নামল না পাকুতি । আরও ঘণ্টাখানেক পরে, চুপিসারে, নেমে এল সে । তার কাঁধে, গামছার দু'দিকে বাঁধা দু'টো কাঁঠাল । তাকে তখন মনে হচ্ছিল এক বিজয়ী বীর, যে পরাজয় কাকে বলে জানে না ।
তখন থেকেই পাকুতি আমার কাছে হিরো । তা আরও দৃঢ় হল এর দু’মাস পরে, বন্যার সময় । শ্রাবণ-ভাদ্রে তখন মনু নদী হয়ে উঠত ভয়ঙ্করী, সর্বনাশী । দু'কূল. ছাপিয়ে নদীর জল ঢুকে পড়ত গ্রামের ভেতর । বন্যার সেই করাল রূপ ভুলতে পারি না এখনও । নদীর পাড়ে যেসব ঘরবাড়ি, একে একে, জলের তোড়ে যেত ভেসে । চারদিকে তখন ত্রাহি ত্রাহি রব । পাকুতি তখন সকলের ভরসা । খেয়া ঘাটের নৌকো নিয়ে, সঙ্গে দলবল, সে, মাঝরাতেই, বেরিয়ে পড়ত উদ্ধারকার্যে । নৌকোয় তুলে আনত বিপদগ্রস্তদের । পাশে সোনামুখী চাবাগান, সেখানে, স্কুলঘরে রাখা হত তাদের ।
একটু বড় হয়ে, এসব উদ্ধারকার্যে, পাকুতির সঙ্গী হয়েছি আমিও । তাকে তখন দেখেছি, নাওয়া-খাওয়া ভুলে, আর্তের সেবায় নিজেকে সমর্পণ করে দিতে । এই পাকুতি তখন অন্য পাকুতি ।
সম্ভবত, এসব কারণে, গ্রামে জনপ্রিয় ছিল সে । লোকের বিপদে, এক ডাকে, হাজির হত সে । পড়াশোনা করতে পারেনি, ঐ ক্লাস ফোর অবধি তার বিদ্যের দৌড় । হলে কি হবে, পাকুতির অন্তর্জ্ঞান গভীর গভীরতর ।
না, তার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে না । তবে, আমার মনের ইতিহাসে পাকুতির স্থান অক্ষয় । পরে, শুনেছি, বিয়ে করেছিল সে । বিয়ে এক প্রহেলিকা, পাকুতির ভাগ্যেও তাই ছিল বোধ হয় । এই বিয়ের পর সে চলে গেল লোকচক্ষুর আড়ালে । থেকেও নেই হয়ে তার বেঁচে থাকার দিনগুলিতে আমি চলে এসেছি অনেক দূরে ।