হোর্হে লু্‌ইস বোর্হেসের কবিতা :

জুয়েল মাজহার

।।

সীমানা

।।

ভেরলেনের একটা চরণ আছে যা আমার মনে পড়ছে না,
বাড়ির পাশে একটা সড়ক আছে যাতে আমার পা-ফেলা নিষেধ,
একটা আয়না আছে যা আমায় দেখে ফেলেছে শেষবারের মতো,
একটা দরজা আছে, যা আমি বন্ধ করে দিয়েছি রোজ-কেয়ামত পর্যন্ত,
আমার পাঠাগারের বইগুলোর মধ্যে (আমি তাকিয়ে রয়েছি এগুলির দিকে)
একটি বই আছে যা আমি কখনো খুলবো না।
এই গ্রীষ্মে পঞ্চাশ পার করেছি আমি;
মৃত্যু অবিরত ক্ষীণতর করে চলেছে আমায়।

#-[Limits by Jorge Luis Borges; Eng. Trans. by Anthony Kerrigan]




।।

দুই ভাইয়ের মিলোঙ্গা

।।

গিটার আমাদের গল্প এনে দিক সেদিনকার
যখন ঝিলকিয়ে উঠতো চাকুগুলি,
গল্প যতোসব জুয়া ও পাশা নিয়ে,
ঘোড়ার দৌড় আর অমিত পান নিয়ে
কোস্তা ব্রাভা আর গরুর সে-ব্যাপারি
বুড়োর চলাপথ---- কাহিনী তাই নিয়ে।


যারাই আসে বটে সবারই ভালো লাগে
গল্প একখানা গতকালের;


নিয়তি নিয়ে কোনো চলে না দরাদরি,
এবং ওর দোষ খোঁজাও অনুচিত—


এখন আসে জানি আজকে রাত্রে
কতো না স্মৃতিরাশি দক্ষিণের।


শুনুন জনাবেরা, ইবেরা ভাইদের
নিয়েই গল্পটা—--
প্রেমিক মর্দ এবং যোদ্ধা,
সবার আগেভাগে বিপদে দিতো ঝাঁপ,
চাকুর খেলা যতো ছিলো না জুড়ি কোনো


আজকে সেই তারা নিথর আছে শুয়ে ছ’ফুট জলতলে।




লালসা অহমিকা এমত যতো কিছু
গভীর রসাতলে সতত নেয় টেনে;
সাহস সে-ও জেনো ধরায় ঘেন্না
করলে বাড়াবাড়ি দিবস, রাত্রি


দুইটি ভাই তারা; ---ওদেরই ছোটোটির
অনেক ভারী ছিল খুনের পাল্লা।


হুয়ান ইবেরাও যখনই দেখল
ছোটোটি তাকে ঠিক দিয়েছে টেক্কা,
তখন আর তার পরানে সইল না,
পাতলো ফাঁদ এক, যাতে ও দ্যায় ধরা ।




কোস্তা ব্রাভাতীরে মারলো ওকে সে
একটি বুলেটেই।


তাই তো আজ আমি সত্যনিষ্ঠায়
বলেছি এ-কাহিনি আদ্যোপান্ত;


কাবিল তাকে নিয়ে রচিত এ-কাহিনী
সতত কাবিলেরে খুন যে করে চলে ।
#---
[Milonga of Two Brothers by Jorge Luis Borges;
Eng. Trans. Norman Thomas di giovanny]





।।

ব্রাউনিং কবি হতে চাইলেন

।।

লন্ডনের এইসব লাল গোলকধাঁধার ভেতর
আমি দেখলাম, সব আহ্বানের মধ্য থেকে
অদ্ভুততমটিকেই বেছে নিয়েছি আমি
ওটা ছাড়া, যে-কোনও আহ্বানই অদ্ভুত তার নিজের মতো।
প্রতিদিনের শব্দগুলোকে আমি তৈরি করে নেবো
আদি সেই রসায়নবিদের মতো
যিনি পারদের মধ্যে খুঁজে ফিরতেন দার্শনিকের সমাধিপাথর—
জুয়ারির মার্কামারা তাসেরা, অভিন্ন সেই মুদ্রা—
মেলে ধরে সেই জাদু, যা ছিল তাদেরই নিজস্ব
যখন থর ছিল একই সঙ্গে ঈশ্বর আর হট্টকোলাহল,
প্রার্থনা আর বজ্রকরতালি।


আজকের দিনের ভাষায় চিরায়তকে বলবো আমি আমার আপন রীতিতে:
বায়রনের মহা-প্রতিধ্বনির যোগ্য হয়ে ওঠার
চেষ্টা করবো আমি
যে-আমি ধুলোমাত্র, সে আমিই হ’য়ে উঠবো অভেদ্য
যদি আমার প্রেমকে ভাগাভাগি করে নেয় কোনো নারী
স্বর্গের ঘনীভূত দশম গোলকটিকে স্পর্শ করবে আমার কবিতা;
আর যদি কোনো নারী আমার প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করে হেলায়
আমি তবে আমার বিষাদকে ক’রে তুলবো সঙ্গীত,
সময়ের মধ্যে এক পূর্ণতোয়া কলস্বরা নদী বয়ে যাবে।
নিজেকে ভুলে থাকার মধ্যেই বেঁচে রইবো আমি।


হবো সেই মুখশ্রী যাকে চকিতে দেখি আর ভুলে যাই,
হবো সেই জুডাস, যে বেছে নেয়
বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠবার পরমব্রতকে,
আমি হবো সেই ক্যালিবান, যে বন্দি
তার নিজেরই পাঁকে ,
হবো এক ভাড়াটে সেনা, যে কোনোরূপ ভয় আর
বিশ্বাস ব্যতিরেকেই ঢলে পড়ে মৃত্যুতে;
পলিক্রেতাস হবো আমি, ভয়ার্ত-বিমূঢ় চোখে যে তাকায়
ভাগ্যদেবীর ফিরিয়ে দেওয়া মোহরের দিকে।
আমি হবো সেই বন্ধু, যে ঘৃণা করে আমাকে
পারস্যবাসীরা আমাকে দেবে বুলবুল, আর রোম দেবে তরবারি
মুখোশ, তীব্র যাতনা, পুনরুত্থান
বুনবে আর খুলে দেবে এ-আমার জীবনের তাঁত,
আর এভাবেই একদিন আমি হ’য়ে উঠবো রবার্ট ব্রাউনিং

#-[Browning Decides to Be a Poet by Jorge Luis Borges; Eng. Trans. Norman Thomas di giovanny]




।।

বেনারস

।।

মুকুরে প্রতিফলিত এক উদ্যানের মতো
অলীক আর অগম্য
কল্পনার শহর
আমার চোখেরা যাকে দ্যাখেনি কখনো
যে-শহর দূরত্ব বুনে চলে আর বারবার
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায় তার অগম্য বাড়িঘর।
হঠাৎ-সূর্যটি এসে
মন্দির, গোবরগাদা, কারাগার আর আঙিনার
জটিল রহস্যজাল ছিঁড়েফুঁড়ে যায়
আর সে বেয়ে উঠবে এর সব দেয়াল-পাঁচিল
আর সে ঝলমলাবে পবিত্র এক নদীর ওপরে।
আর নক্ষত্র-পল্লবের পীড়নক্লিষ্ট
শহরটি হাঁপাচ্ছে-তড়পাচ্ছে আর
দিগন্তের ওপর ঝরে পড়ছে অকাতরে


আর ঘুমঠাসা আর পদশব্দময়
কোনো এক ভোরবেলায়
সূর্যকিরণ এসে রাস্তাগুলোকে খুলে দিচ্ছে ডালপালার মতো ।
সেসময় পূর্বমুখি সবক'টি দরোজার
ঝাঁপিতে ঝাঁপিতে হচ্ছে ঊষার উদয়
আর এর সুউচ্চ মিনার থেকে
মুয়াজ্জিনের স্বর
বিষাদে ভারী করে তোলে দিনের বাতাস, আর
বহুল-দেবতাময় শহরের কানে
সে স্বর ঘোষণা করে একত্ব খোদার


(সেইসঙ্গে মনে আসে এ-ভাবনা , আমি যখন মেতে উঠি
সমূহ সংশয়ঘেরা এইসব প্রতিমা ও চিত্রমালা নিয়ে
আমার শংসাঘেরা এ-শহর তখনও বিরাজ করে
দৈবনির্দিষ্ট কোনো স্থানে----ধরাধামে;
স্বপ্নের মতোন ঠাসা
লোকারণ্যময় তার নিজের ভূগোল নিয়ে থাকে,
সে থাকে আরোগ্যশালা নিয়ে আর রাশি রাশি সেনাছাউনি নিয়ে,
আর তার পপলারকুঞ্জঘেরা অলস-মন্থর পথ নিয়ে
আর তার ঘেয়ো-ঠোঁট লোকেদের নিয়ে


-----দাঁতে দাঁতে হু-হু শীত যারা টের পায়)

# --[Benares by Jorge Luis Borges; Eng. Trans. by Charles Tomlinson]




হোর্হে লুইস বোর্হেস



বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখকদের একজন। লেখকদের লেখক। জন্ম আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেসে, ১৮৯৯ সালে। পুরো নাম হোর্হে ফ্রানসিস্কো ইসিদোরো লুইস বোর্হেস আচেবেদো (Jorge Francisco Isidoro Luis Borges Acevedo)। পড়াশুনা করেছেন সুইজারল্যান্ডে ও ইংল্যান্ডে। বোর্হেস একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ ও সাহিত্যসমালোচনা লিখে গেছেন। সফল অনুবাদকও ছিলেন। যদিও ছোটগল্পের জন্যই বেশি আলোচিত। সমগ্র লাতিন আমেরিকায় তাঁর উত্তরসূরি প্রায় সব দিকপাল লেখকই কোনও না কোনওভাবে বোর্হেস-প্রভাবিত; যে কোনও মানদণ্ডে এসপানিওল (স্প্যানিশ ভাষা বললে শুধু স্পেনের ভাষা--এমন একটা ভাব চলে আসে বলে 'স্প্যানিশ শব্দটির বদলে 'এসপানিওল' শব্দটি ব্যবহারই আমি করে থাকি) ভাষার সবেচেয়ে প্রভাবশালী লেখক; যিনি নিজেই এক জগতের নির্মাতা, যাকে বলে বোর্হেসের জগৎ।

নিজের ভেতর দেখেছেন সকলের উপস্থিতি; আর, প্রকারান্তরে সকলেই তিনি আর তিনিই সকল:
''I am all the writers that I have read, all the people that I have met, all the women that I have loved; all the cities that I have visited, all my ancestors''.

লাতিন আমেরিকার আরেক গুরু-লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস একদা বলেছিলেন: “তাঁর (বোর্হেসের) গদ্য ছাড়া বর্তমান সময়ের লাতিন আমেরিকার উপন্যাস লেখা সম্ভব হয়ে উঠতো না।”

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও মারিয়ো ভার্গাস য়োসাসহ দক্ষিণ আমেরিকার লেখকদের প্রায় সবাই-ই কোনও-না-কোনও সময়ে বোর্হেসের কাছে তাঁদের ঋণস্বীকার করেছেন।

তাঁর মতো বহুবৈচিত্র্যপ্রেমী, সদা অন্বেষক, ব্যতিক্রমী লেখক গোটা বিশ্বসাহিত্যে একজনও আছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। গত শতাব্দীতে বিশ্ব-গদ্যসাহিত্যের প্রধান প্রবণতা যদি হয়ে থাকে কাফকার দিকে ঝুঁকে পড়া, তবে কাফকা-পরবর্তী বিশ্বগদ্যের প্রধান কুললক্ষণ হচ্ছে বোর্হেসের দিকে ঝুঁকে পড়া। যাঁরা তাঁর মতো লেখেন না বা ভাবেন না, এমনকি যাঁরা তাঁর কট্টর সমালোচক, বোধ করি তাঁরাও (পোলিশ লেখক স্তানিসোয়াভ লেম (Stanislav Lem) যেমন) তাঁর গল্পগুলোর অভিনবত্ব, শিল্পকৌশল, জাদুগুণ তীব্র আকর্ষকশক্তি আর রূপকার্থকে পাশ কাটাতে পারেন না।এই কারণে ফরাসি, ইতালীয়, ইংরেজি ও জার্মান সাহিত্যসহ অপরাপর ইউরোপীয় সাহিত্যে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এতো বিপুল।বর্তমান সময়ে লাতিন আমেরিকায়, স্পেনে ও বিশ্বের অপরাপর সব অঞ্চলে বোর্হেস হয়ে উঠেছেন এক জাদুনাম।

উপন্যাসের জয়জয়াকারের যুগে বসেও বোর্হেস একদমই উপন্যাসবিমুখ। কোনও উপন্যাস লেখেননি; চানও নি কখনো লিখতে। কেনইবা উপন্যাস লেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখলেন, সে-ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় বোর্হেসের নিজের লেখায়। সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক-আলোচিত এক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে এর ব্যাখ্যা। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত নিজের এক গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন বোর্হেস: “যার মৌখিক প্রকাশ কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব, সেজন্য পাঁচশ পৃষ্ঠা জায়গা দখলে নেওয়ার কী দরকার?”

যদিও তাঁর উপন্যাসবিরোধী কট্টর অবস্থান সত্ত্বেও দুনিয়াজোড়া উপন্যাসের রাজত্ব এখন প্রশ্নাতীত। একদা বোর্হেস বলেছিলেন, প্রত্যেক লেখকই তাঁর নিজের পূর্বসূরি তৈরি করেন। এ নিয়ে তাঁর ''কাফকা এবং তাঁর পূর্বসূরীগণ'' (Kafka And His Precursors) নামে একটি লেখাও রয়েছে। শুধু এসপানিওল(স্প্যানিশ) ভাষা-সাহিত্যেই নন, গোটা বিশ্বসাহিত্যেই অনন্যসাধারণ, বিপুল প্রভাববিস্তারক এক আইকন বোর্হেস; এক অধিবিদ্যক জগৎনির্মাতা। অবিরাম গোলকধাঁধাময়, হেঁয়ালিময় আর সদা প্রশ্নশীল সে-জগৎ; নতুন মিথ আর নতুন মিথের জগৎ রচনা করে গেছেন, যা একান্তই বোর্হেসীয়। জগতের নানা বিষয়, নানা প্রপ্রঞ্চ, নানা সংস্কৃতি আর সময়-ইতিহাস-পুরাণের নানা স্মৃতি ও আলোড়ন, ঢেউ ও অভিঘাত সতত আছড়ে পড়ে সেখানে; ইতিহাসের নানা প্রক্ষিপ্ত ঘটনাখণ্ডের ওপর এমনই আলো ফেলেন বোর্হেস, তেমন আর কেউ ফেলেন না।

কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, অনুগল্প আর সাক্ষাৎকার----সবখানেই তিনি অনন্য ও নির্বিকল্প; একমেবাদ্বিতীয়ম! অসাধারণ, অভিনব অচিন্ত্যপূর্ব আর চিরপরিহাসময় তাঁর ছোটগল্প আর অনুগল্প(প্যারাবল); তাঁর বইয়ের জগৎ আর তাঁর অন্ধত্ব--- এই দুইয়ের সহাবস্থান পরিহাসময়। তাঁর জন্য একইসঙ্গে উপহার ও দুর্ভাগ্যও বটে। তাঁর অন্ধত্ব বংশানুক্রমে পাওয়া এক রোগ, যা ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টির আলো নিবিয়ে দিয়েছিল চিরতরে। অথচ বুয়েনোস আইরেসে আর্হেন্তিনার ন্যাশনাল লাইব্রেরির কিউরেটর বোর্হেসের চারপাশে ছিল শুধু সংখ্যাহীন বই; অথচ ততদিনে তিনি অন্ধ! ...He became completely blind by the age of 55; as he never earned braille, he became unable to read.

এ নিয়ে তাঁর হাহাকারও শুনি আমরা :
O God, who with such splendid irony
Granted me books and blindness with one touch.
[Trans. by Alastair Reid]

এসপানিওল সাহিত্যে ‘দোন কিহোতে’-র (Don Quixote) লেখক মিগেল সের্বান্তেসের- এর পর কেউই বোধ হয় বোর্হেসের মতো এমন বিপুল মৌলিকতা ও নবতর অনুধ্যান নিয়ে হাজির হননি। সাম্প্রতিক এসপানিওল ভাষা ও সাহিত্যের সব তারকা কবি-লেখকই কমবেশি বোর্হেস-প্রভাবিত। মূলত যাদের মধ্য দিয়ে আধুনিক এসপানিওল সাহিত্য সত্যিকার অর্থে হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক, তাঁদের মধ্যে সবার আগে উচ্চারিত হয় লুইস বোর্হেসের নামটি।

দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক জে. এম. কোয়েটজি(J. M. Coetzee) একদা বোর্হেস সম্পর্কে বলেছিলেন: ''He, more than anyone, renovated the language of fiction and thus opened the way to a remarkable generation of Spanish American novelists.''

এক নবভাষা, নব রুচি ও নব অভিনিবেশের নির্মাতা বোর্হেস। সেইসঙ্গে বিশ্বসাহিত্যে গোলকধাঁধাময় নতুন এক অধিবিদ্যক জগতেরও নির্মাতা। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ছিলেন অজ্ঞেয়বাদী। আর রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে কালেভদ্রে হয়ে উঠতেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল; ভাষ্যে-বিবৃতিতে সমরজান্তার প্রকাশ্য সমথর্ক। কোনও কোনও বিশ্লেষকের ধারণা, বোর্হেসের নোবেল পুরস্কার না-পাওয়ার পেছনে অনেকাংশে দায়ী তাঁর অতিরক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থান; চিলির স্বৈরশাসক, জননিপীড়ক অগুস্তো পিনোচেত-এর হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণকে মুক্তবিশ্ব ভালো চোখে নেয়নি।

নোবেল পুরস্কার কমিটি কেবল বোর্হেসকে নয়, পুরস্কার থেকে বাদ রেখেছে তলস্তয়, প্রুস্ত, আচেবে, আদুনিসদের মতো কবি-লেখকদের। এ এক বিস্ময়! বোর্হেস নিজেও এ নিয়ে মন:পীড়ায় ভুগতেন। একবার এ নিয়ে সখেদে বলেওছিলেন: ''Since I was born they have not been granting it to me.''

তাঁর গল্পগুলোর কিছু কমন থিম হচ্ছে স্বপ্ন, গোলকধাঁধা, পাঠাগার, আয়না, অলীক, কল্পিত লেখককুল, দর্শন, ধর্ম আর অধিবিদ্যা। অনুবাদকে তিনি সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য কাজ বলে মনে করতেন।

পণ্ডিতদের ধারণা, তিনি যে ক্রমশ অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন, সেটা তাঁর জন্য কল্পনার ভেতর দিয়ে উদ্ভাবনী সাহিত্যপ্রতীক নির্মাণে সহায়ক হয়ে উঠেছিল: ''...helped him to create innovative literary symbols through imagination.''

১৯৬১ সালে বিশ্বসাহিত্যমঞ্চে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে এলেন বোর্হেস, যখন স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে পেলেন জেরোসালেম পুরস্কার(Jerusalem Prize)| তাঁর জন্য , বোধ করি , তা হয়ে উঠেছিল '' ভিনি, ভিদি, ভিসি''। তাঁর সাহিত্যকর্ম যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপজুড়ে অনূদিত ও প্রকাশিত হতে থাকে অবিরলধারে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে।

প্রাচ্যদেশীয় সংস্কৃতির বিশেষ অনুরাগী ছিলেন বোর্হেস। জানতেন বেশ কিছু ভাষাও। ব্যতিক্রমী চিন্তা, লেখালেখি ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অভিন্ন মানবসংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত, সাঙ্গীকৃত, যুক্ত ও সক্রিয় ছিলেন। নানান প্রচল ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে বোর্হেস জন্ম দিয়ে গেছেন নতুন ধারণা, চিন্তা ও নতুন বিশ্লেষণপদ্ধতির।বোর্ হেসের পরিচয় তাঁর সামগ্রিকতায়। খণ্ডিত উদ্ভাসের মধ্যে নয়।

প্রাচ্যের মিথ, ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, লোকাচার নানা বৈচিত্র্য ও বিভায়-বিশ্লেষণে ধরা দিয়েছে তাঁর লেখায়। এসবের তাৎপর্য উঠে এসেছে নতুনভাবে, নবব্যাখ্যাসূত্রসহ; পারস্য, ভারত, চীন, জাপান আর আরবের সংস্কৃতিসহ সকল সংস্কৃতির ব্যাপারেই ছিলেন সমান আগ্রহী। প্রাচ্য-প্রতীচ্য --এ দুয়ের বিষয়েই ছিল তাঁর আগ্রহ ও অভিনিবেশ। তবে প্রাচ্য ছিল তাঁর অসীম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছিল তাঁর প্রিয় প্রাণী; প্রিয় ছিল বাঘের হলদে-কালো ডোরা:
Until the hour of the yellow sunset
how many times have I looked at
the powerful Bengal Tiger
come and go on that predestined way
behind the iron bars
without suspecting that they were his jail.

বাঘের মধ্যে চেস্টারটনবর্ণিত ভয়াল গরিমা দেখতে পেতেন বোর্হেস (Chesterton's definition, "an emblem of terrible elegance." )

''My last tiger'' নামের এক গদ্যে সেই বাঘের কথা স্মরণ করেছেন বোর্হেস:
In my life I always had tigers. So interwoven is reading with the other habits of my days that really I do not know if my first tiger was the tiger in a print or the one, now dead, whose stubborn come and go in its cage I followed as if in a spell on the other side of the iron bars. My father enjoyed encyclopedias; I judged them, I am certain, by the images of tigers they offered me.

তবে একদমই পছন্দ করতেন না সিংহকে।

লেখক সমালোচক আলবার্তো মাঙ্গুয়েল (Alberto Manguel) একদা বলেছিলেন, “হায়রে, যা-ই পড়ি তা-ই দেখি ভানে ভরা, শুধু বোর্হেসেই নেই কোনো ভান; আর যে-দেশের যত বড় লেখকের লেখাই পড়ি না কেন, দেখি শুধু ‘লোকাল কালার’-এর ছড়াছড়ি; ...সবাই কোনো না কোনো জাতির বা দেশের লেখক; আর ''গোটা পৃথিবীর'' লেখক বলতে একজনই ----বোর্হেস।”//