এক আশ্চর্য মানুষের গল্প

দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য


এইমাত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন আশ্চর্য এক মানুষ! আশ্চর্য, আর অনুচ্চারিত এক মানুষ। এখনো নদীর ঘোর লাগা জলে তাঁর শিথিল হাসিমুখ, তাঁর সমস্ত জীবন! এই ধুলোপৃথিবীর ব্যথা পেরিয়ে তিনি চলে গেছেন দূরে কোথাও। শৈশবে যে দেবশিশুর সঙ্গে কখনো সবার দেখা হয়ে যায়, এখন সেই মুখখানি ধরা আছে তাঁর। শ্মশানচাঁপা গাছটা কত ফুল ঝরাচ্ছে আজ! কেমন এক সুগন্ধের ঘোর লাগা হাওয়ার চরাচর! যেন জোছনায় ঘোড়ার দল আঙুরের খেতের দিকে ঝিমঝিম করে হেঁটে চলেছে। কোনো কিছু ছোঁয়া যায় না এইসময়। এমনকী সেই ব্যথাও এখন অস্পর্শ।

এই কথাগুলো কি বলতে চাওয়া কথাই, না কি নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া? --- কে শোনে, কেউ তো নেই কোথাও! কে বলে, কেউ তো নেই কোথাও --- শুধু সেই জলের, পাক খেয়ে, নদীপাড়ের গলা অবধি উছলে ওঠা ! কত তন্ময় নির্জনতা গভীর রাতের বানের জলের মতো ভরিয়ে দিয়েছে! --- এ জগৎ তোমার আমার কারুরই নয়! কাল ছিল নিয়তির সেই কড়া-নাড়া রাত --- অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে চেনা রাস্তাকে অচেনা করে হাসপাতালের দিকে তির বেগে ছুটে চলা। কিছু আগেই চুঁচুড়া হাসপাতালের ডাক্তারবাবু হাসতে হাসতে রেফার করে দিয়েছেন, কল্যাণী হাসপাতালে -- ও কিছু না, আমাদের এখানে যন্ত্রটাই নেই, তাই। আসলে, ব্রেনে কার্বন ডাই-অক্সাইড স্টোর হয়ে যাচ্ছে। ওরা সেটা বের করে দিলেই, হি উইল বি অলরাইট এগেন। কল্যাণী হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারকে অবশ্য সারা রাত পাওয়াই গেল না। দিনটা যে রবিবার! একটা ন্যাবুলাইজার মেশিন অবধি নেই কাছাকাছি, বাড়িতেও যা সর্বক্ষণ রাখা থাকে। ডাক্তারবাবু নাকি ফোনে সব কর্তব্য বলে দিচ্ছেন নার্সকে! বুকের ঘড়ঘড় আওয়াজ এদিকে বেড়েই চলেছে। একটা বাঁধা ঘোড়া বেরিয়ে আসবে কি এইবার! এ কি সেই চেতক? একবার মজা করে বলেছিলেন, কবে নাকি ছাত্ররা অধ্যাপকের কাছে একশো নম্বরের একটি মাত্র প্রশ্ন রেখেছিল --- যুদ্ধক্ষেত্রে রাণাপ্রতাপের ঘোড়া চেতকের মনোভাব বিশ্লেষণ করুন! বুকের ঘড়ঘড় আওয়াজটা কি সেই চেতকের! কোথাও কেউ নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডার চাকাওলা ছোটো ট্রলিতে ঘড়র ঘড়র করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। দুএকজন আত্মীয় সঙ্গে এসেছিল। এর মধ্যেই কীভাবে যেন দেয়ালে হেলান দিয়ে তারা ঘুমে ঢলে পড়ছে! আর সেই শেষ রাতের অনন্ত দমকলের এঞ্জিন -- আওয়াজ তার বেড়েই চলেছে, ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়।

ছাইটুকু গঙ্গায় ফেলে, কলসি ভেঙে, পিছনে না তাকিয়ে ফিরে আসতে হয়, জীবনে ফিরে আসতে হয়। এইভাবে পুরুষানুক্রমে কলসি ভাঙা আর ফিরে আসা, আবারও কলসি ভাঙতে যাওয়া, তারপর সেই একদিন...

--- জেঠু, তুমি তো বিদেশে গিয়ে চাকরি করার অত বড়ো সুযোগ দু-দুবার পেয়েছিলে! স প রি বা রে বিদেশে যাবার! গেলেনা কেন? তাহলে তো আরো বড়োলোক হয়ে যেতে তুমি!
--- ওদের 'সপরিবার' মানে কী জানিস তো? আমি আর তোর মানি (জেঠিমা) ।
--- তাতে কী হয়েছে!
--- সে তুই বুঝবি না ! আরো বড়ো হ...

--- শোনো, বড়োরাও ভুল করেন। বড়োরাও ভুল করতে পারেন। আমিও ভুল করতে পারি। তোমার কখনো যদি মনে হয়, আমাকে বলবে তুমি। কেন মনে হচ্ছে সেটা জানাবে, কেমন?...

--- কী করবে, এখন?
-- সবাই তো টাইপ স্কুলে ভর্তি হবে বলছে।
--- তুমি কি কেরানিগিরি করবে ভেবেছ!
--- না তো!
--- তাহলে!... দেখো, অনেক বড়ো হতে হবে তোমায়। তোমার ডিক্টেশন যেন অন্যেরা নেয়।

সি এ পরীক্ষার আগে কখনো কোনো বন্ধু হয়তো আমার ঘরে আসছে। জেঠু তো বারান্দার একেবারে কোণের ওই ঘরটায় কাজ করছেন, জেঠু দেখতে পাবেন না নিশ্চয়ই, সে ভেবে নেয় । পা টিপে টিপে, সারসের মতো লম্বা হাওয়া ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে বারান্দাটা শুধু পার হয়ে যাওয়া... তখনি, শৈবাল -- ভারী গলার একটা ডাক। --- যাই জেঠু। শৈবালের আর ঢোকা হয় না বন্ধুর পড়ার ঘরে। --- বলো, কী করছ এখন? কী করবে ভাবছ? কাকা কাকিমা ভালো আছেন তো? -- কত কথা জেঠুর, শৈবালের সঙ্গে। গল্পই জুড়ে দিয়েছেন, নিজের কাজ ফেলে। এমনকী ফেরার সময়, নিজে পৌঁছেও দিয়ে গেট নিজে হাতে বন্ধ করে দিয়ে এলেন --- আহা রে, মা-বাপ মরা ছেলে!

-- কী হয়েছে তোমার?
-- কিছু না তো।
-- কিছু তো হয়েছেই। কেউ কিছু বলেছে বুঝি? কী বলেছে?
--- কিছু না, সেলুনে... সিধুদা বলছিল, ওর বন্ধু নাকি ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, এম কম-এ র‍্যাঙ্ক করেছিল। সে-ও সি এ পাস করতে পারে নি। এদিকে অন্য কিছুই করার সুযোগ না পাওয়ায়...
-- হ্যাঁ, বুঝেছি। শোনো, প্রত্যেকে তার মেধা আর পরিশ্রম, তার নিজের ভাগ্য অনুযায়ী পথ করে নেয়। তোমার সিধুদার বন্ধু, আর তুমি এক নও। কার কী হয়েছে, কত ক্ষতি হয়েছে, তোমার ভাবার দরকার নেই...

-- কী ব্যাপার বলো তো? মনমরা হয়ে আছ? কী ব্যাপার?
-- ও কিছু না।
--- পার্থকে দুপুরে একবার ঢুকতে দেখেছি তোমার ঘরে। পার্থ কিছু বলে গেল?
--- ও হ্যাঁ, পার্থ বলছিল, সুহা তোর জন্য খুব চিন্তা করে। এখনো চাকরিবাকরি নেই তোর, কী হবে, এইসব মাঝেমধ্যেই বলে সুহা।
--- ও আচ্ছা। তা, আমি কি বলেছি তোমাকে চাকরি করতে হবে? তোমার বাবা বা মা বলেছে? মানি বলেছে? বলেনি তো? অন্যে কী বলছে, কানে না তুললেও হবে।

এরপর পার্থ আর একদিন যথারীতি পা টিপে টিপে বারান্দায় উঠতেই, আবার সেই স্নেহময় ভারী গলা --- পার্থ... --- যাই জেঠু... আবার কত গল্প। খোঁজখবর নেওয়া। চা খাবে কি না জানতে চাওয়া, আর তারপর হঠাৎই --- আচ্ছা, ব্যাঙবাজি খেলে বাচ্চারা, জানো তো? -- হ্যাঁ জেঠু, একটা খোলামকুঁচি জলের ওপর দিয়ে সাঁ করে ছুঁড়ে দিতে হয়। সেটা জলের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ব্যাঙের মতো চলে যায়। --- আরে, ঠিক বলেছ। তুমি খেলতে পারো? -- হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছোটোবেলায় খেলেছি তো কত্ত! --- ধরো তোমার হাতে যতটা জোর, তার থেকেও যদি জোর বেশি হত, তাহলে কী হত? -- তাহলে তো ওটা লাফাতে লাফাতে ওই পাড়ে চলে যেত জেঠু। --- দেখো, ওই জোরটাই বাড়িয়ে নিচ্ছে তোমার বন্ধু। তারপর দেখবে, ও অনেক দূর অবধি যেতে পারবে। তুমি বা সুহা ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে এত চিন্তা করো না। আর করলেও, ওকে সেটা বলতেও যেও না। তোমার বন্ধুটিকে তো জানো, পুরো একটা বেলা মন খারাপ করে বসে থেকেছে। পড়াশোনা সব জলাঞ্জলি...

রাত সোয়া তিনটে, দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জেঠু গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো এবার। তুমি তো অনেক সকাল সকাল ওঠো।

বাড়ির সীমানা থেকে ৮ ফুট দূরেই গঙ্গার ধারে যাবার সিঁড়ি। এই সিঁড়িটাই আগে নাকি গঙ্গায় নামার মূল সিঁড়ি ছিল, এখন একটু দূরে সরে গেছে। মাঝখানে একটা ফুট তিরিশের চত্বর আর তারপর সাত আট ফুটের একটা রাস্তা পেরিয়ে তবে এখনকার গঙ্গা। অন্ধকার চারিদিকে, জলের ওপরেও অন্ধকার। সেই অন্ধকারে আরও এক গাঢ়তর অন্ধকার বোঝাই একটি নৌকো চলে যাচ্ছে। কেউ কোত্থাও নেই সেই হাওয়ায় রাতে। সিঁড়ির প্রথম ধাপে বসে বাবুলাল দরাজ গলায় আবৃত্তি করছে,
'এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়

যেতে পারি
যে-কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাব? '

জেঠুর গলা বৈঠকখানার দরজা থেকেই শোনা যায় কিছুটা ভাসা ভাসা, যেন কতটা উড়ে তবে সেটা আমাদের ছোঁয়া দেবে, তা তাঁর ভালোমতোই জানা --- শোনো, পৌনে দুটো বাজে। বাবুলালকে এবার বাড়ি যেতে বলো। ওর দিদিমা চিন্তা করবেন। --- জেঠুর কথায় আমরা ফিরে আসি। বাবুলাল বাড়ি ফিরে যায়। ওকে চার পাঁচ মিনিটের সাইকেল চালাতে হবে। সে তো ওর জলভাত। বলতে গেলে রোজই তো যায় এইসময়।

রাত দেড়টা বা পৌনে দুটো হবে বোধহয় সেদিন। সেটা তো এমন কিছু ব্যাপার নয়। রাতের খাবার সেইমাত্র খেয়ে, এসে বসেছি বৈঠকখানার বাইরের রোয়াকে। হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে মনে হয় আজ। জেঠু বললেন, কী করবে এবার? হায়ার সেকেন্ডারি মিটেছে সবে তখন। -- দাঁড়াও, রেসাল্ট বেরোক, আমি জাত অলসের হাই তুলে বলি। -- পরীক্ষার ফলের কথা থাক, তুমি কী করবে ভেবেছ ? --- কিছু ভাবিনি তো! বি কম পড়তে হবে তো এইবার? ... বি কম ( রটনায়, বুদ্ধি কম) তো পড়ার দরকারই হয় না শুনেছি... জেঠু কিছুটা তড়িঘড়ি বলে ওঠেন -- না, তোমাকে সি এ পড়তে হবে। বিবেকটার তো হল না, মমতাও পড়তে চাইল না। তুমি পারবে। --- সব্বোনাশ, সে তো ধুরন্ধর শক্ত ! তাছাড়া আমার ভালোও লাগেনা ওইসব ডেটার-ক্রেডিটর- মিসেলেনিয়াস শব্দগুলো --- ছোটো থেকেই তো শুনে আসছি। কোনো আগ্রহই হয় না। আমার আগ্রহ বরং মিসট্রি-তে, কিন্তু জেঠুকে তো সে-সব বলা যাবে না!

লক্ষ্মীপুজোর দিন নন্দিনী, কাকিমাকে নিয়ে এসেছে আমাদের বাড়িতে। বাইরের ঘরে বসার জায়গা হয়েছে ওদের। আমি আড্ডা মারতেই সম্ভবত সমরেশদের বাড়িতে এক পাক ঘুরে আসতে গিয়েছিলাম সেদিন। সন্ধেবেলা ফেরার সময় দেখি দু'জনে হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। আরে, কী ব্যাপার, কী হল, চলে যাচ্ছেন কেন! কাকিমা মুখ ভার করে বললেন --- আমাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না তোমার মায়েরা, পুজোর জোগাড়ে ব্যস্ত তো। --- বুঝেছি, ফিরে চলুন এবার! --- না গো, আজ আর যাব না, আজ বাড়ি যাই --- নন্দিনীরা সেদিন আর ফিরে আসেনি। এইভাবে ওরা অপমানিত হওয়াতে আমিও চলে গেছি সমরেশের বাড়ি তক্ষুনি, তিন দিন ফেরার নামও করিনি। পরের দিন সন্ধেবেলা নন্দিনীর একটা চিরকুট পেয়েছি --- দীপক, রাগ কমিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। এত কাণ্ড, আমি তো জানতামই না! আজ অফিস থেকে ফেরার পথে জেঠু এসেছিলেন। কত গল্প করে গেলেন। আমার গান শুনতে চাইলেন। তুমি দেরি কোরো না, প্লিজ! ফিরে যাও। ---দেখো, বলাই তো হয়নি তোমাদের, গায়িকা হিসেবে নন্দিনীর বেশ একটা টগবগে খ্যাতি ছিল। প্রোগ্রাম করার ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রফেশনাল ছিল সে।

প্রথম দিকে জেঠু সেতার বাজাতেন। লাভলক লিউইস-এ প্রথম দিকটায় চাকরি করেছেন। অফিসের কাজে এত বাইরে থাকতে হত, ফিরে এসে বাজাতে বসলে হাতের কড়া কেটে রক্ত পড়ত। তাই পরে তবলা বেছে নেন। নিয়ম করে শাস্ত্রীয় গানবাজনার আসরেও যেতেন। বাড়িতে দাদুর সময় থেকেই সারা রাতের গানবাজনার আসর চালু হয়ে গিয়েছিল। আমার চোখে এখনো ভাসে, ইয়া বড়ো এক কানা-উঁচু এলুমিনিয়ামের থালায় সিঁড়ির মুখে বসে দাদু মাংস ছাড়াচ্ছেন -- তখন আমার তিন-চার বছর বয়েস হবে হয়তো। শুনলাম, আজ রাতে গানের আসর বসবে --- আমাদের বাড়িসুদ্ধ লোকজন গানবাজনার ক্ষেত্রে কিছুটা হুজুগেই বলা যায়! ছোট্ দাদু তো গান ছাড়া আর কিছু শেখেনইনি জীবনে। খুব অল্প বয়সেই মারা যান তিনি। কোথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর কোথায় কলকাতা! দাদুর কাছে চিকিৎসার জন্যই এসেছিলেন, তবে শেষরক্ষা হয়নি। যে-কথা বলছিলাম, গানবাজনার ওই আসরের খেই ধরেই একদিন আমাদের এলাকার নামি তবলা-বাদক পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে জেঠুর আলাপ হয়ে যায় --- জেঠুদের পাঁকুদা। তাঁর কাছেই তবলা শিক্ষার শুরু। তবলার স্বর যতক্ষণ না একেবারে মিলে যায়, জেঠু টুংটাং করে তবলা মিলিয়েই যাবেন। বড়দি সা ধরে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে গজগজ করত --- বাবার যে কখন বাজানোর সময় হবে! এই রাতবিরেতে গান গাইতে ভালো লাগে! ফলে, ঠেকনো দিতে আমাকে সা ধরতে হত, নাগমা বাজাতেও হত মাঝেমধ্যে , প্রক্সি দেওয়া আরকী। তবলা বাঁধা তো হয়ে গেছে, তারপর জেঠু, হয়তো রাত সাড়ে এগারোটা তখন --- মমতা, একটু গাইবি না কি, বলে এক সহাস্য ডাক ছাড়তেন। তার উত্তরে বেশিরভাগ দিনই আমার কিন্নরকণ্ঠী বড়দি বাধ্য মেয়ের মতো এসে গাইতে বসত। আর যেদিন, রাগ হয়ে যাওয়াতে বড়দি আর এলই না, আমাকে তখন আর দেখে কে! আমার ভুলভাল নাগমা শোধরাতে শোধরাতে জেঠুর তবলা একক চলল বেশ কিছুক্ষণ, ধরো অন্তত আরো ৪৫ মিনিট, কিংবা এক ঘণ্টা। বাবা হয়তো একবার মৃদু সমর্থনের হাসি মুখে ঝুলিয়ে মাথা গলিয়েছে দরজা দিয়ে, অমনি --- খোকা, কিছু বলবি --- জেঠু বাজাতে বাজাতেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন। বাবা ঝুরঝুর করা এক তন্ময় হাসিতে মুখ ভরিয়ে, ' না, আমাদের বুড়ো, মালকোষ বাজাচ্ছে ভারি সুন্দর!' --- সমস্ত কথার শেষেই বাবার খানিক চুইয়ে পড়া হাসি থেকে যেত। এই রাতবিরেতের গানবাজনা নিয়ে একটা মজার গল্প বলি। একবার পিশেমশায় এসেছেন টাটানগর থেকে। জেঠুর আসরে তার শ্রোতা হবার আমন্ত্রণ এসেছে --- তাপস, আরে এসো, এই ঘরে চলে এসো, ওখানে বসে থেকে কী করবে। অগত্যা, পিশেমশায় আসন নিয়েছেন। ওই তে-রাত্তিরে, সংস্কৃতির মিঠে হাওয়াতেই হয়তো, ঢুলে ঢুলে পড়ছেন মাঝেমধ্যে, বিশাল চেয়ারের হাতলে মাথা রেখে। পিশেমশায় তো ছোটোদের নাটক করাতেন, হয়তো অভিনয় অভ্যাসই করছিলেন, বলা যায় না! তাতে বিশেষ কাজ হচ্ছে না দেখে, শেষে এক মাস্টার স্ট্রোক দিলেন। ছোট্ দিকে হাঁক দিয়ে ডেকে, বেশ একটু সবার শোনার মতো করে গলা তুলে জানতে চাইলেন, হ্যাঁরে, ক্যালপল-ট্যালপল কিছু আছে না কি তোদের --- দেখ তো দেখি। সঙ্গে এক গ্লাস জলও আনবি কিন্তু। ব্যাস, যায় কোথায়, জেঠু বলে উঠেছেন, হ্যাঁ, তোমার জ্বর হয়েছে বলোনি তো? যাও যাও, খেয়ে শুয়ে পড়ো। পিশেমশায়, উঠে গেলেন নিঃশব্দে। কিন্তু নিতান্ত অসময়ে আসর ভেঙে চলে যেতে হওয়ায়, তাঁর চোখেমুখে কী এক হতাশা সেদিন!

কোনোদিন কারুকে জেঠু উঁচুনীচু কথা বলেছেন বলে শুনিনি। তেমন কেউ জেঠুর সঙ্গে দেখা করতে এলে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বাড়ির সকলের, অফিসঘরে ডাক পড়ত। বাড়ির কাজে সাহায্য করত নমিতাদি। সে হয়তো যায়নি। জেঠু খোঁজ নেবেন তখন, নমিতা কোথায়? তারপর একগাল হাসি মুখে ভিড়ের এক কোণ থেকে নমিতাদি উদয় হতেই, জেঠু বলবেন, ওই হল নমিতা, আমার ছোটো বোন।

প্রবলভাবে আড্ডাবাজ ছিলেন জেঠু। গল্প করতে শুরু করলে আর শেষ হত না। সকালবেলার আড্ডার সেশান শুরু হত ডাক্তারজেঠুর সঙ্গে। তিনিও আর এক বটগাছ! তিনশো পা হেঁটে মোড় ঘুরলেই তাঁর বাড়ি। খোদ ইউ এন ব্রহ্মচারীর শিষ্য ছিলেন। অসাধারণ ডায়াগনোসিস ছিল তাঁর। গীতা আর ভাগবত এত ভালো পাঠ করতেন, প্রায় রোজই তাঁকে কেউ না কেউ ব্যস্ত করে রাখত। সেই ডাক্তারজেঠুর সকালবেলার অস্থায়ী চেম্বার কাম আড্ডাটা ছিল আমাদের বৈঠকখানায়। পুজোপাঠ করেই চলে আসতেন তো, পরনে তখনও গরদের ধুতি, কপালে চন্দনের তিলক, গায়ে একটি উত্তরীয়। সঙ্গে স্টেথো আর প্যাড। কোনোদিন কোনো রোগী দেখে ফিরলে নীল ঢলা ট্রাউজারের সঙ্গে হাতা গোটানো শার্ট। ডাক্তার জেঠুকে রোগা বলা যাবে না। অপূর্ব এক সহজ আভিজাত্য তাঁকে ঘিরে রাখত। স্টেথো আনতে কোনোদিন ভুলে গেলে ভাইকে বলতেন, যা তো রাজু, প্যাডটা দৌড়ে নিয়ে চলে আয়। তারপরের ব্যাপারটাই হল মজার। ডাক্তার দেখানো হয়ে গেলে রোগীর আত্মীয়ের মুখ কাচুমাচু, আজ্ঞে, ওষুধ কেনারই পয়সা নেই, তাই... এইভাবেই চলত তাঁর পেশা। তা সেই 'সত্যদা' (ডাক্তার জেঠু) তো বটেই, অন্য ঘনিষ্ঠ কেউ দেখা করতে এলেও গল্প গড়িয়ে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর ঘনঘন আসত চায়ের দাবি। এই চা ব্যাপারটাই আমাদের পরিবারকে পুরুষানুক্রমে সময়হীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে --- এখানে রাত্রি হয় দিনের বেলা, আর দিবস রাত্রিতে। পাশের বাড়ির গোপা দি বলত --- আমাদের চোরের কোনো ভয় নেই গো--- তোমাদের পাহারাদার বাড়িটা আছে তো!

আই এ এস-এর কথা আমার মাথায় আসেনি প্রথমটায়, কী এক যোগাযোগে বি সি এস-এর পেপারগুলোর কথা জানতে পারি --- বোধহয় বন্ধু তাপসী-সংঘমিত্রার কাছ থেকেই খবরটা এসে থাকবে। লুকিয়ে লুকিয়ে বি সি এস-এর দিকে এগোনো শুরু হল। পেপারগুলো বেছে নেবার স্বাধীনতাটাই ভালো লাগত আমার, গয়ংগচ্ছ কমার্স পড়ায় কোনো আগ্রহই পাইনি, সে তো বলেইছি। কিন্তু এখানে তুমি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আর কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট একই সঙ্গে বেছে নিতে পারো, আর এই নমনীয়তাটাই তো ভালো লাগার কারণ! কিন্তু দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য যাই হোক, প্রসপেকটাস কীভাবে যেন দেখে ফেললেন জেঠু, আমাকে ডেকেও পাঠালেন।

-- কেন বি সি এস পড়ার ইচ্ছা হল, বলো তো?
মনের কথাটা যতটা বলতে পারলাম, বললাম। আমাদের স্কুলের স্যারকে দেখেছিলাম বি সি এস অফিসার হয়ে যেতে। বন্ধুরা এসে গল্প করত, জানিস, আজ স্যারের সঙ্গে বাজারে দেখা হল। স্যার এগিয়ে যাচ্ছেন, সঙ্গে থলি হাতে চারজন বডিগার্ড। কেউ বলল হয়তো, সে কী, এই তো সেদিন স্যার ক্লাস টুয়েলভের ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলেন! -- এই গল্পটাও জেঠুকে বললাম। জেঠু মন দিয়ে শুনলেন পুরো কথাটা। তারপর বললেন --- বেশ, অধস্তনদের সম্মান পেলে না হয়। কিন্তু যদি অক্ষরজ্ঞানহীন কিংবা অগাবগা নেতারা তোমার ঘরে ঢোকে, উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার ঠেলে দিতে পারবে তো তাদের দিকে? ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে তো? স্যার স্যার করতে পারবে ?

জেঠুকে আলেকালে কখনো বিশ্রাম নিতে দেখেছি। তবে কখনো যদি দুপুরবেলা শুতে যাবেন ভেবেছেন, ছোটোদের গল্পবইয়ের খোঁজ পড়ত। কাজ না থাকলেও দুপুরে বসে ছাত্রদের অঙ্কগুলো ফিরে ফিরে সমাধান করতেন। জেঠু পড়াতে ভালোবাসতেন। কোম্পানি সেক্রেটারি বা কস্টিং অথবা সি এ-র দু-একজন ছাত্রকে পড়াতেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে, প্রথম দিনেই আমি তাদের ভবিষ্যৎ মোটামুটি আন্দাজ করে নিতাম --- ধুস্, হবে না, সিম্পলি হবে না! কিন্তু পরম মমতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেঠু পড়িয়ে চলতেন তাদেরকেই। তাদের যে অঙ্কগুলো করার কথা, জেঠু অবসর সময়ে নিজে বসে বসে খাতায় সেগুলো করে রাখতেন। আমি একদিন হাটে হাড়ি ভেঙে দিয়েছি --- জেঠু, ওই অঙ্কগুলো তো আগেও ক'জনকে পড়িয়েছ, তোমার খাতাটা ওলটালেই তো পেয়ে যাবে, আবার ওগুলো কষছ কেন --- তার থেকে বরং দুপুরে একটু বিশ্রাম নাও না! জেঠুর উত্তর -- আরে, দেখে করলে মাথাটা কাজ করতে চাইবে না শেষে। ভাবো তো একবার! একইভাবে মাথা নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে ক্যালকুলেটর বর্জন করাও চলত! আবার একইভাবে, ডাক্তারজেঠুর পরামর্শমতো ডক্টরস ব্র‍্যান্ডি কিনে আনা হলেও, শেষে নেশার দাস হয়ে যেতে পারেন এই ভয়ে, এক ছিপি করে রাতে শোয়ার সময় গরমজলে মিশিয়ে খাওয়া আর হল না জেঠুর --- ছিপিবন্ধ ব্র‍্যান্ডির বোতল তাকের এক কোণে ধুলোমেখে পড়েই থাকল!


আমি সি এ পড়বোনা, যেদিন মানিকে (জেঠিমাকে) জানিয়ে দিই, মানি বলতে গেছেন ওপরের ঘরে। মানির শরীর তখন ভয়ানক খারাপ। টানা চিকিৎসাও চলছে। বাড়িতে চব্বিশ ঘণ্টা অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত। যাই হোক, মানির সঙ্গে আমিও তো গেছি ওপরে। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মানি এই কথাটা বলতেই, জেঠু এক ঠেলা দিলেন মানিকে, তোমরা সব প্রবঞ্চক! মানি ছিটকে গিয়ে খাটের ওপর পড়লেন। খাটে না পড়ে মেঝেতে পড়লে সেদিনই কিছু একটা ঘটে যেত। চোখের সামনে এটা দেখামাত্র আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, নিজেকে বলি --- জীবন তো ওয়ান-ওয়ে, আগে তোমাকে সি এ-টা পাশ করে নিতে হবে --- এখন তোমার সামনে একটাই পথ। কিন্তু এই নিয়ে আমার অভিযোগের তির ঘুরে ঘুরেই তাঁকে বিদ্ধ করেছে। কখনো হয়তো চোখ তাঁর চিকচিক করে উঠতেও দেখেছি। এই অবস্থায়, আমার এই প্রতিবাদের উত্তরে তিনি একটাই কথা বলতেন, বলতে পারতেন বোধহয় --- একদিন বুঝবে। সেদিন আমি থাকবো না হয়তো। --- ওই যে জেঠু শিখিয়েছিলেন, বড়োরাও ভুল করে, সেক্ষেত্রে বড়োদের ভুল ধরিয়ে দেওয়াটাতে অপরাধ কিছু নেই, ওটাই হল কাল।

জেঠুর কথা বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে, মাস কাবার হয়ে যাবে। কত কথা! জেঠুর ভালোমানুষি সুদে-আসলে উশুল করেছিল এমন দু'একজন, যাদের জেঠু নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন। কোথায় কোন কো-অপারেটিভে মাল ওজন করত একজন, পড়াশোনা বিশেষ করতে পারে নি, জেঠু তাকে তুলে নিয়ে এসেছেন। হায়ার সেকেন্ডারি প্রাইভেটে দিলেও বি কম পড়ার বয়স বা সুযোগ কোনোটাই নেই বলে ডিপ্লোমা গ্রাজুয়েশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আবার, কলকাতায় সেই ডি কম পরীক্ষার সিট পড়বেনা, কারণ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দশের নীচে, তাই মুম্বাইতে নিজের চেনাশুনা মানুষের কাছে পাঠিয়েও দিয়েছেন। সেখানে থেকেই পরীক্ষা দিয়েছে তারা। কমার্সের সমস্ত কাজ হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। আর জেঠুর পেশাগত জীবনের সমস্ত ক্ষীর তারাই খেয়ে চলে গেছে। জেঠু ছিলেন এগজিবিট --- দেখো,এইরকম একটা মানুষ আমাকে স্বীকার করে নিয়েছেন! আমি যতদিন না প্র‍্যাক্টিসে এসেছি, বিশ্বাসঘাতকতার নজির তুলে দিয়েছি হাতেনাতে, জেঠু বিশ্বাস করেন নি কারোর কথাই। অফিসঘরে জল পড়ছে দেখে খুব দুঃখ হত আমার। একদিন বলেওছিলাম, অমুকের বাড়ি দেখো আর আমাদের বাড়ি। তুমি ফাইলের ওপর প্লাস্টিক চাপা দিয়ে কাজ করছ, এ কি তোমায় মানায় --- তুমি চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টই শুধু না, লন্ডনের কোম্পানি সেক্রেটারি! জেঠু হেসে উত্তর দিয়েছেন, ঈর্ষা বড়ো খারাপ জিনিস। কেউ ভালো থাকলে তুমি নিশ্চিন্ত, সে অন্তত তোমার কাছে হাত পাততে আসবে না। তারপর বলেছেন, মিহি ধুতি পরার অভ্যেস করে ফেল যদি, নেমে আসতে হলে বড়ো ধাক্কা খাবে। উলটোটাই বরং ভালো, বুঝেছ। একদিন এই নিয়ে একটা মজার গল্পও বললেন, অমুকবাবুর পয়সা হয়েছে, বুঝলে তো। তিনি বেশ পাকা বাড়িটাড়ি হাঁকিয়েছেন। একদিন নাকি তমুকবাবু বসেছিলেন তার কুঁড়ে ঘরের দাওয়ায়, অমুকবাবু ছাতের আলসেতে কনুই রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে জিগেস করেছেন, কী মশাই, ভালো আছেন তো? এইবার কালের ফেরে তমুকবাবুর চড়চড় করে অবস্থা ফিরে গেল আর অমুকবাবু গেলেন তলিয়ে। তখন একদিন তেতলার ছাত থেকে ঝুঁকে তমুকবাবুও বললেন, আমি তো ভালোই আছি, আপনি এখন কেমন, অমুকবাবু?

আমার দাদু ছিলেন ন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানির ম্যানেজার। বেলুড় থেকে দাদুর সঙ্গে কাশীদা আমাদের চুঁচুড়ার বাড়িতে চলে আসে। সে আসলে ছাপড়া জেলার লোক। আমাদের এই বাড়িতে সে গরু-ছাগলের যাবতীয় দেখাশোনা করত। পরে লক্ষ্মীভাণ্ডার বিক্রি করা শুরু করে। এই দুটো সময়ের মাঝখানে বড়ো একটা সময় ধরে কাশীদা রিকশা চালাত। আমি কাঁঠালতলায় রাখা রিকশাটার সিটে সুযোগ পেলেই চেপে বসতাম আর হ্যান্ডেলে বাঁধা নাইলনের দড়ি থেকে ব্রেকটা খুলে নিতেই গাড়িটা কেমন ডান দিকে কাত হয়ে একবগ্ গা এগোতে শুরু করত। ছোটো থেকেই একটা স্বপ্ন আমার ভিতরে দানা বেঁধেছিল --- খুব ছোটো যখন, তখন থেকেই। আমি সবাইকে বলতামও, বড়ো হয়ে আমি কাশীদার ওই রিকশাটা নিয়ে চুঁচুড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকব আর জেঠুবাবা কিংবা বাবা ট্রেন থেকে নামলেই, 'এই যে, আমার গাড়িতে, আমার গাড়িতে', বলে চেঁচিয়ে উঠে, সওয়ারির জন্য হাপিত্যেশ করে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সব রিকশাঅলার থেকে এক রকম ছিনিয়ে নিয়েই জোরসে প্যাডেল চালাব... আমরা কোথায় যাব সেটা জানা নেই, সমুখে নীল আকাশ বিহঙ্গের মতো মাঠের উপর ডানা মেলে দেবে, সমুখে টলটলে জল নদীর উপর খেলা করে যাবে, সমুখে দেবরাজের শ্বেত কপোতের মতো রুপোলি মেঘের দল, আমার হিরো জেঠুবাবা বসে আছেন আসনে, আমি কাশীদাদার সেই রিকশা চালিয়ে আরো দূরে, আরও দূ রে চলে যাচ্ছি...

জেঠু তো এখন নেই, আমাকে পাহারা দেবারও কেউ নেই, আমার পড়াশোনা জলাঞ্জলি যাচ্ছে ভেবে ভাবনা করারও কেউ নেই, তাই যত অকাজ, কম বয়সের যত মুলতবি রাখা ইচ্ছে এসে জুড়ে বসেছে আমার মধ্যে। কবিতা লিখতে চাইছি আমি, কত কত কত সময় নষ্ট করে ফেলছি এইভাবে। হয়তো তিনি রাগ করতে পারেন, হয়তো কেন, নিশ্চয়ই তিনি ওপরে বসে আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিউরে উঠছেন বেশ কিছুদিন ধরেই, তবু, আমার প্রথম বইয়ের প্রথম যে-দুটি লেখা তাঁর পায়ে মনে মনে রেখে দিয়েছিলাম, সেই দুটি বলে আজ সেই আশ্চর্য মানুষের গল্পের ডালা বন্ধ করব, আমার সেই একশোয়, এক লক্ষ পাওয়া হিরোর গল্পের ইতি টানব :

মণিকর্ণিকার স্মৃতি

তার সমস্ত জীবন, দিনশেষের দীর্ঘশ্বাস
তার লেবুফুলের গন্ধ
স্তব্ধ এখন

মেঘে ঘিরে আছে চরাচর
ওপারে নৌকো ঘুরে যায় স্রোতে
শেষে জল তাকে টেনে নিল গভীর চেনায়

(২)
আমাদের থেকে সে দূরে গিয়ে দাঁড়াল
দুটো হাত আকাশে তুলে তারা দেখাল
বৃষ্টিশেষের স্বচ্ছতা দেখাল