মেঘনাদবধ কাব্য অথবা অন্য ইতিহাস

তমাল রায়

মিনুদি গান গাইতে বসার আগেই হারমোনিয়ামটা ধুয়ে মুছে সাফ করে রাখত মিনুদির ছোট মাসি, যে বয়সে মিনুদির থেকে বছর দুয়েকের ছোট। আগের দিনে এমন হতো আর কী! মিনুদির মার বিয়ে হবার চার বছর পর মিনুদির দিদিমা আবার সন্তান প্রসব করেন। চাল, ডাল, খাঁটি তেল-দুধে তখন বঙ্গভূমি উর্বরা! কিন্তু মিনুদির দাদু বছর দশেক পরই পটল তোলেন। ব্যাস পারিবারিক অশান্তি, সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা, খাঁটি দুধ-তেল খাওয়া জোটাই প্রায় বন্ধ হল। অগত্যা ছোট মাসিকে তার পঁচিশ বছরের বড় দিদির বাড়িতে আশ্রয় নিতে হল। আশ্রয় মানে তো বোঝেনই। এঁটোকাঁটা খেয়েই বাঁচা। তা সে যাই হোক এ লেখা মিনুদির ছোটমাসি সুধারানী দাসকে নিয়ে নয়। কেবল যা বলতে চাওয়া হচ্ছে তা হল মিনুদি সেই যবে থেকে গান শেখা শুরু করে, ছায়াসঙ্গী ছোটমাসি সুধা। মিনু, লবঙ্গটা মুখে রাখ। গারগল কর বেটাডিন লোশন দিয়ে। তানপুরা নিয়ে হেঁটে যেতে হবে প্রায় দেড় মাইল। কুছ পরোয়া নেই। সুধা আছে। বলাবাহুল্য মিনুদি গানটা অসম্ভব ভালোই গাইতো। তাই মিনুদি একদিন টালিগঞ্জ পাড়া ঘুরে, বোম্বেতে পা রাখলো। মানে মিনুদি তারকা হয়ে গেল। বড় হওয়া যাকে বলে আর কী। মিনুদির ভালো নাম আবার জানতে চাইবেন না যেন! আর সুধারানী দাস, সেই ছোট হয়েই রয়ে গেল। শেষ জীবনে মিনুদিও তাকে ভুলে গেছিলো! অথচ সুধা মিনুর চেয়ে কম ভালো গাইতো না। একবার এক মিউজিক ডাইরেক্টর তো সুধাকে দিয়েই প্লেব্যাক করাবে স্থির করেছিলো। মিনুদির তা জেনে কী প্রবল রাগ!
তো যা বলতে চাইছিলাম আর কী, ওই যে গোঁসাই কবি বা গঙ্গোপাধ্যায় এদের সবার নেপথ্যেই এমন কারিগর থাকে। তারা আলো পাননা। ওই যে পণ্ডিতজি আর কায়েদে আজম মারামারি করে দেশ ভাগ করে যে যার সিংসাহনে বসলো, ওদের এই সিংসাসনে বসাও কত এমন সুধাদের মাড়িয়ে গিয়েই।
যেমন বীণাপাণি নেপ্রাম, মণিপুরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে নিহত মানুষদের বিধবা পত্নীদের নিয়ে একটি বিশাল সংগঠন গড়ে ফেললো। তাদের রুটি রুজির ব্যবস্থা করে দিলো, কজনই বা চেনেন তাকে? সুশীল ভৌমিক, বহরমপুরের হারিয়ে যাওয়া কবি? জামান নজরুল ইসলাম এস্ট্রো ফিজিসিস্ট,বা ব্যাঙ্গালোরেরঅটোওয়াল া বাবু,যে সব কাজ ফেলে গর্ভবতী দরিদ্র মাদের নিয়ে গিয়ে সুরক্ষিত সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা করিয়ে দেন হাসপাতালে। চেনেন তাদের?
চেনার কথা তো নয়। এরা কিন্তু আছেন। আছেন বলেই এই মুষলকালেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি আমি বা আপনি।
লিজ মিটনার, ইহুদী বিজ্ঞানী। জার্মানি থেকে বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় নেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ায়। ম্যাক্স প্ল্যাংকের সহযোগী। নোবেল কমিটির কাছে যখন রিসার্চ পেপার জমা পড়লো, মহামানব ম্যাক্স প্ল্যাংক তার নাম বাদ দিয়ে দিলেন সুচতুর ভাবে। ফল ১৯৪৪ তে ম্যাক্স প্ল্যাংক একাই নোবেল পেলেন! এমন হয়, চৌর্যবৃত্তি কলুষিত দুনিয়ার এটাই স্বভাব চরিত্তির আর কী! ফলে কেউ হীরে হয়, আর কেউ কয়লা বা গ্রাফাইট। সকলেই কার্বন পার্টিকেল। জগতে তবু উজ্জ্বল হীরেই মহামূল্যবান! কিন্তু জগতে চলার পথে গ্রাফাইট না থাকলে লিখতেন কি করে, বা ছবি আঁকা? কয়লা না থাকলে জ্বালানিই বা কই?
তবু আগুন বেণিমাধব আগুন জ্বলে কই? ইস্কুলের হাওয়াই চটি দিদিমণি কবিতায় সহানুভূতি কুড়োন, অথচ এই সমস্ত কয়লাই তো প্রকৃত অঙ্গার,তারা জ্বলেন, তাই আলো!
এই সকল অঙ্গার, আনসাংহিরোজদের নিয়ে এবার ঐহিক অনলাইন প্রকাশিত হল নট আউট। কারণ রাজা ও শাসকের ইতিহাসে এরা কেউই উল্লিখিত হবেন না কখনও,কারণ যা লেখা হয় তা জয়ীর ও জয়ের ইতিহাস। এরা কেবল নট আউট। অপরাজিত।
রাম নয় রাবণ, লক্ষণ নয়, ইন্দ্রজিৎ ওরফে ঐহিকের এই মেঘনাদবধ কাব্য নটআউটের মাধমে এ আমাদের স্মৃতি তর্পণ। অন্য ইতিহাস আপনার পাঠের অপেক্ষায় রইলো।