তুমি ঘুমিয়ে পড়ো না

মুম রহমান

(অন্ধকার ছিলো)
১ : তাহলে এখন কী হবে?
২ : হবে। একটা কিছু তো হবেই।
১ : যদি না হয়?
২ : যদি হয়?
১ : তাহলে তুমি আমাকে আশাবাদী হতে বলছো?
২ : আশাই তো শেষ ভরসা।
(আলো জ্বললো)
১ : জানি। তবু ভয় করে। তবু মন মানে না?
২ : শুধু কি ভয়? দ্বিধাও আছে কিছুটা। তাই নয়?
১ : কার? তোমার, না আমার?
২ : দু’জনেরই।
১ : তবে তুমি স্বীকার করছো খানিকটা ভয় দ্বিধা তোমারও আছে। ভয় ও দ্বিধায় আমরা ঘুরপাক খাই?
২: ঠিক তাই। খানিকটা নয়, অনেকটাই।
১ : তবুও তুমি আশাবাদী?
২ : ওই বললাম আশাটাই যে শেষ ভরসা। তাই আশায় বুক বাঁধি।
১: তবে একটা গান শোনাও?
২ : তাতে কী লাভ?
১ : লাভ বলতে তুমি কী বোঝাচ্ছ?
২ : এই মানে গানের কী প্রয়োজন, সেটাই জানতে চাচ্ছি।
১ : না ধর, সময়টা অন্তত ভালো কাটতো।
২ : তুমি কি নিশ্চিত গান গাইলে সময় ভালো কাটে?
১ : কাটে না?
২ : (হেড়ে গলায় গান গায়) জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজো আমি সব কিছু ভুলে যেন করি লেনদেন...
১ : আহ থামো।
২ : তুমি গান শুনতে চেয়েছিলে।
১ : এখন চাই না।
২ : কেন?
১ : গান ছাড়াই সময় ভালো কাটবে।
২ : এখন তুমি এ কথা বলছো!
১ : তুমি আসলে গানটা শিখে উঠতে পারোনি।
২ : তারমানে তুমি বলছো আমি ভালো গাইতে পারি না।
১ : কাউকে মুখের উপর খারাপ বলতে নেই।
২ : কে বলেছে?
১ : না, কেউ বলে নি, তবে এটাই নিয়ম।
২ : কোথায় লেখা আছে?
১ : অনেক জায়গাতেই আছে তবে আমার মনে পড়ছে না।
২ : কেউ যদি না বলে থাকে তবে লেখা হল কী করে?
১ : বাহ, তোমার যুক্তি তো বেশ ভালো!
২ : কাউকে মুখের উপর ভালো বলতে নেই।
১ : কেন?
২ : কেন আবার কী, এটাই নিয়ম।
১ : কোথায় লেখা আছে?
২ : কোথাও লেখা নেই। আমার এক স্যার বলেছেন।
১ : কোথাও লেখা না-থাকলে তিনি কী করে জানলেন?
২ : সেটা তাকেই জিজ্ঞেস করা যায়।
১ : তাকে কোথায় পাব?
২ : তাকে পাওয়া যাবে না।
১ : তিনি কি হারিয়ে গেছেন?
২ : তিনি মৃত।
১: তাহলে তাকে কোথায় পাবো?
২ : আমি জানি না।
১ : তুমি গান গাইতে জানো?
২ : তোমার কী মনে হয়?
১ : এখনও সবটা জেনে ওঠোনি।
২ : তাহলে সময় কাটবে কী করে?
১ : চলো ফুটবল খেলি।
২ : দুজনে ফুটবল খেলা যায়?
১ : কেন যাবে না?
২ : তা-ও ঠিক। কিন্তু ফুটবল পাচ্ছো কোথায়?
১ : চলো মনে মনে খেলি।
২ : নাহ!
১ : চলো, তবে ক্রিকেট খেলি। এইসব খেলাধূলা আনন্দময়। সময়ও কাটে।
২ : ব্যাট-বল নেই আমাদের।
১: এই দেখো, তুই এইভাবে হাত ঘুরিয়ে বল করবে। আর আমি এইভাবে ধুম করে ছক্কা মারবো। ছক্কা!
২ : হি, হি। এইটা বেশ। হাত ঘুরিয়ে বল করি।
১ : মনে মনে আমরা ক্রিকেট খেলি। আউট!
২ : না, মোটেই আউট না। এটা নো বল।
১ : ইয়েস। তুমি আউট।
২: এমন করলে খেলবো না।
১ : আচ্ছা। এটা নো বল। এইবার ঠিক বল করবো দেখো।
২ : আস্তে আস্তে বল করো। সহজ বল। যেন আমি ছক্কা মারতে পারি।
১ : এই যে, ছক্কা!
২ : ভাগ্যিস, এদিকে কোনো কাচের জানালা নেই।
১ : হুম। কাচের জানালা খুব ভঙ্গুর।
২ : একটা জিনিস কি জানো! কাচের জানালা সহজে ভেঙে যায়। কিন্তু কী সুন্দর আলো আসে।
১ : এইবার কিন্তু তুমি আউট হয়ে যাবে। প্লিজ। হ্যাঁ। হাউজ দ্যাট!
২ : (খেলা শেষ। তারা করমর্দন করে। দুজনেই ক্লান্ত) বাহ, বেশ আনন্দ হলো।
১: তুমি বল করবে না?
২ : নাহ, খেলা শেষ।
১ : জিতলো কে?
২ : তুমি?
১ : না, তুমি?
২: আমি?
১ : না, আমি।
২ : কী আসে যায়!
১ : তা ঠিক, তা ঠিক, কী আসে যায় হায়। এ খেলায় কে হারে কে জিতে যায়? কী আসে যায়?
২ : আচ্ছা, ক’টা বাজে বলো তো?
১ : সেই বারোটাই।
২ : বারোটাই বেজে আছে এখনও?
১ : নিশ্চিত জেনো।
২ : সে কি! তবে আমাদের সময় কাটবে কীভাবে? কী হবে আমাদের? আরো কিছু একটা করতে হয়। সময় কাটছে না আজ।
১: আমি তো আর কিছুই জানি না।
২ : এর জন্যই মানুষকে অনেক কিছুই শিখতে হয়।
১ : কিন্তু আমি তেমন কিছুই শিখি নি।
২ : তাহলে এখন কী হবে?
১ : দেখি, কিছু তো একটা হবেই।
২ : তুমি বলছো হবে?
১ : না, মানে, আশাবাদী হতে ক্ষতি কী?
২ : প্রশ্নটা লাভ-ক্ষতির নয়, প্রশ্নটা হলো... ইয়ে... প্রশ্নটা যেন কী!
১ : তুমি এরমধ্যেই ভুলে গেছ?
২ : হ্যাঁ।
১ : না, না, লজ্জ্বা পেয়ো না, ভুলে যাওয়ার মধ্যে কোনো ক্ষতি নেই।
২ : প্রশ্ন লাভ-ক্ষতির নয়ম প্রশ্নটা হলো... বলো না প্রশ্নটা কী?
১ : আমি ভুলে গেছি।
২ : বাহ, তুমিও ভুলে গেছো! ‘ভুলে যাওয়া গন্ধের মতো কখনো তোমাকে মনে পড়ে’Ñ কার যেন লাইনটা? কার যেন কবিতাটা? কী যেন...ধুর... এও এক খেলা... ভুলে যাওয়া খেলা... (খুব হাসে)
১: যা বলো, বেশ মজা হলো!
২ : হ্যাঁ, ভুলতে ভুলতে সময়টা বেশ কাটলো আমাদের।
১ : ভালো কথা, ক’টা বাজে বলতে পারো।
২ : বাজে না, সব ভালো।
১: ধুর, আমি তা বলিনি। আমি বলতে চেয়েছি কটা বাজে। মানে ঘড়িতে কটা বাজলো। সময় এখন কতো?
২ : তুমিই না বলেছিলে, বারোটা বাজে।
১ : বলেছিলাম?
২ : হ্যাঁ।
১ : ও। (একটা কিছু খোঁজে)
২ : কী খুঁজছো?
১ : একটা কিছু? (আরো ব্যস্ত হয়ে খুঁজতে থাকে)
২ : একটা কিছু। কিছু একটা খুঁজে পেলেই হবে। (খুঁজতে থাকে)
১ : একটা কিছু... একটা কিছু... (খুঁজতে থাকে)
২ : পেলে?
১ : নাহ।
২ : তাহলে এখন কী হবে?
১ : হবে... একটা কিছু তো হবেই। হবে হয়তোবা...
২ : কিন্তু... কিছু তো খুঁজে পাওয়া গেলো না... ‘কী আশায় বাঁধি খেলা ঘর...’
১ : আহ্, চেচিও না। চলো যতোক্ষণ সময় আছে খুঁজি।
২ : আমার ঘুম পাচ্ছে।
১ : তুমি ঘুমাওনি?
২ : ঘুমিয়েছিলাম, একদিন।
১ : একদিন, নাকি এক রাত?
২ : ঠিক মনে নেই।
১ : দুঃখ করো না, দেখো একদিন... মানে একদিন সব কিছু ঠিকঠাক মনে পড়বে। সব ভুলে যাওয়া কথারা একদিন ভিড় করে এসে দাঁড়াবে। আমরা একদিন...
২ : তুমি কি আমাকে আশাবাদী হতে বলছো?
১ : আমারও ঘুম পাচ্ছে।
২ : বাহ, বেশ মজা হবে। আহা ঘুম!
Oh, Sleep! It is a gentle thing
Beloved from pole to pole!
১ : তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার ভয় করবে।
২ : শুধুই কি ভয়, অবিশ্বাসও আছে কিছুটা। ঘুম অনেক সময় বিশ্বাসঘাতক। বলো, অবিম্বাস কি দানা বাঁধে না?
১ : কার, তোমার, না আমার?
২ : দুজনেরই।
১ : তবে তুমি স্বিকার করছো, খানিকটা অবিশ্বাস করো আমাকে?
২ : স্বিকার করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, খানিকটা নয়, অনেকটাই অবিশ্বাস করি তোমাকে?
১: তবুও তুমি আশাবাদী।
২ : দারূণভাবে। অবিশ্বাস থাকবে, ভয় থাকবে, দ্বিধা-দ্বন্দ, মায়া ও বিভ্রমে ভরে থাকবে সব... তবু উত্ত মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু...‘ from pole to pole!’ আশা রয়ে যাবে।
১ : তবে ঘুমিয়ে কাজ নেই এসো জেগে থাকি।
(তারা তাকায়। তারা পরস্পরের হাত ধরে।)
২ : তুমি কিন্তু ঘুমিও না বন্ধু।
১ : না। আমি ঘুমাবো না। তুমিও কিন্তু ঘুমিয়ো না।
১ ঘুমিয়ে পড়ে।
২ : না, আমি ঘুমাবো না কখনোই।
১ ঘুমিয়ে পড়ে।
দশ সেকেন্ড পর নাক ডাকার শব্দ। অন্ধকার। নিরবতা। পাঁচ সেকেন্ড পর অন্ধকারে নড়াচড়ার শব্দ।
১ : এই ঘুমিয়ে পড়লে?
২ : আরে নাহ! কী বলো!
১ : আলোটা আবার নিভে গেছে।
২ : কে নেভালো বলতে পারো।
১ : না। এই তুমি কি ভয় পাচ্ছো?
২ : না। ভয়ের কিছু নেই। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো না।

প্রথমে ১ তারপর ২ এর নাক ডাকার শব্দ। দূরে কোন একটা সুর বাজতে থাকে, বাজতেই থাকে। অন্ধকারে সুর বাজতেই থাকে। দর্শক যার যার ইচ্ছা এক সময় উঠে চলে যাবে, যখন খুশি তখন। এর কোন শেষ নেই।