তিনটি কবিতা

সোহেল হাসান গালিব

লাটিম
দড়িবাঁধা খেলনা গাড়িটিকে শুধু আজ ভালো লাগে,
শিশুদের পিছে তাই গাড়িটির বেগে ছুটে যাই।
যেতে যেতে চলে যাই আমতলা নদীর কিনারে,
ঝাঁপ দিয়ে পড়ি আর বটফল তুলে কামড়াই—

এত রঙ, তবু কেন পানিতে লাগে না! এত ঢঙ
পৃথিবীতে! তার কিছু হয়তোবা জানে শিশুরাই।
কত দিকে কত পথ চলে গেছে নির্জন দুপুরে—
এক-ঘরে ক’রে যেন ফেলে গেছে এই ধামরাই।

দেখি সুতো কেটে গেছে, ঘুড়ি তবু উড়ছে আকাশে—
দীর্ঘ হাত ছুঁয়ে যাচ্ছে ধান, ভুট্টাপাতার পরতে।
সরে যাচ্ছে দৃশ্য থেকে। তাকে আর টেনে ধরছে না
এসে কেউ। পারছি না আমিও ধরতে কোনো মতে।

এ লাটিম যে তুরীয়ানন্দে ঘূর্ণি খেয়ে নেচেছিল
একদিন, তার চেয়ে অবসন্ন পড়ে আছে পথে...


প্রিজম
মেঘ, তুমি জলকণা, প্রিজমের খেলা আমি বুঝি,
বুঝি, আলো তোমার ভিতর কেন রুধিরে হারায়—
অপসারণের বেলাকেও দেখি চোখ বন্ধ করে
যতদূর দেখা যায়। অ্যাকুরিয়ামের কোল-তলে
একটি রঙিন মাছ সাঁতার কেটেই যাচ্ছে, যাচ্ছে
তার কানকা খুলে রঙ খশাতে খশাতে। আমি ওই
মাছ আর মাছের বেদনা বহুদিন থেকে জানি।
সে আমার বেদনা কি জানে—বলি এই গোধূলির
বিকীর্ণ শিরায় হাত রেখে : ভুলে এসেছি এখানে
নিজেকেই ফেলে, একা। ধূলি-কফ-ধোয়া পৃথিবীর
অখণ্ড আকাশে একবার যদি তারা হয়ে ফুটি,
একটি নিমেষ মাত্র, যদি পারি ফেলতে আলো তার
বরফ-পিঞ্জরে! পানশি-নদীটির কোল ছেড়ে নেমে
ঢেউ ভেঙে জলে—শুধু জল—প্রিজমের তুল্যজ্ঞানে
হাতে তুলে নিতে গিয়ে, হায়, সব ফেলে দিয়েছি যে।
নদী থেকে, নদীবর্তী বিপণিসারির থেকে ক্রমে
ব্যর্থ হয়ে কোন প্রিজমের জন্য এইখানে আমি—
কন্যারাশি মেঘ ওহে, আজ তুমি কিছু বলবে কি?


পাখি
দলছুট একটি পাখিকে দেখি আমার ভিতর—
উড়ে উড়ে বিকেলের রাধাচূড়া-মেঘ পার হয়ে
চাইছে হারিয়ে যেতে, যেন কেউ চিনতে না পারে,
যেন কেউ ভালোবেসে না ডাকে পিঞ্জরে বসে আর।
মুহূর্তের দীর্ঘশ্বাসে এক স্মৃতিসিন্ধু ঢেউ তুলে
যা কিছু আছড়ে পড়ে, যা কিছুই এসে লাগে গায়—
অস্তরঙ পৃথিবীটা বড় অবসন্নতা ছড়ায়।
পদে পদে যেন ঘোর বিপদের মুখে ঘুরে ফিরে
ভিক্ষুর মতন এই দিন আর রাত্রি—ক্লান্তিহীন
বৃত্তরচনায় কোন এক স্থির বিন্দু লক্ষ করে।

অথচ সান্ত্বনা নয়, তেমন স্নেহার্ত স্মিতমুখ
কাউকে পাই নি আমি আয়ুর শিখাটি বয়ে নিতে।
আগুন পেরোতে গিয়ে তাই শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলি
বেয়ে উঠে হয়ে গেছি শূন্যচারী—তারও কিছু বেশি।
জেনে গেছি কেউ নয় এই বেদনার প্রতিবেশী।
মানুষের কাছে তবু ফিরে আসা ছাড়া কোথায়বা
অন্ত্যেষ্টির সুখ—দৃষ্টি সে উৎসুক নিভে যায় ক্রমে
ভাবনার ভিতর প্রসঙ্গ বদলের উপশমে…