জনৈক সন্ত্রাসবাদীর সঙ্গে কথোপকথন

পার্থজিৎ চন্দ

: অপহরণকারীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর অপহরণকারী ও হোস্টেজের মধ্যে এক আশ্চর্য সম্পর্ক জন্ম নেয়... যেমন সাপের চোখের দিকে তাকিয়ে, শোনা কথা যদিও, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে শিকার। স্টকহোম সিনড্রোম নামের এই জটিল খেলাটিকে প্রথমেই আমাদের মাথা থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছিল বহু বছর আগে। ফলে আপনার প্রতি আমার সহানুভূতি যে মাঝে মাঝে শুশুকের মতো উঁকি মারেনি তা নয়, কিন্তু আমি জানি এই মায়া পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে ফুটে থাকা ফুলের মতো... আমি তাকে উপড়ে ফেলে দিয়েছি প্রথমেই। না হলে এই মুহূর্তের ভুল আমায় গভীর খাদের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। যাই হোক, এতক্ষণে নিশ্চয় আপনি জেনে গেছেন যে কেন এই রাবার-অরণ্যে ঘেরা এক গোপন দূর্গের ভিতর আপনাকে আনা হয়েছে...
: সম্পূর্ণটা আমার জানার কথা নয়, জানিও না। এবং জানলেও আমার প্রতি আনা অভিযোগ আমি মানি না
: আপনার জানা বা না-জানার সঙ্গে আমাদের কিছুই যায় আসে না। আমার কাজ এখন আপনাকে অবিরত জেরা করে যাওয়া। তথ্যের পর তথ্য আহরণ করা।
: আমার মতো তুচ্ছ ও সাধারণ এক মানুষের কাছ থেকে তথ্য আহরণ করবার জন্য এই বিশাল রাষ্ট্র যে এত লোকলস্কর পুষে রেখে দিয়েছে এটি ভাবতেই বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছে। অথচ দেবার মতো তথ্য সত্যিই হয়তো আমার কাছে কিছু নেই…
: আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ একটিই এবং সেটি সুস্পষ্ট। আপনি এক গোপন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর প্রধাণ… আপনি সমস্ত সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে ক্রমাগত ‘একা’ থাকার কথা প্রিচ করে চলেছেন…
: আমার বিরুদ্ধে আনা একমাত্র অভিযোগটিকেই আমি অস্বীকার করলাম… আমি কোনও গোষ্ঠীর প্রধাণ নই… কোনও গোপন অ্যজেন্ডা নেই আমার। আমার অ্যজেন্ডা প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত।
: আপনি নিশ্চয় জানেন আমাদের এই দ্বীপ-রাষ্ট্রে রাবার-বিপ্লব সার্থক হয়েছে। এখন আমাদের রাষ্ট্রে প্রায় সব্ কিছুই রাবার নিয়ন্ত্রিত। এই রাবার বিপ্লবের পথ ধরেই আমাদের রাষ্ট্রে শিল্পবিপ্লব ও শিল্পবিরোধী বিপ্লব, কৃষিবিপ্লব ও কৃষিবিরোধী বিপ্লব, যৌনবিপ্লব ও যৌনতাবিরোধী বিপ্লব-সহ একাধিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমর্থকদের নিয়ে তৃপ্ত; বিরোধীদের নিয়ে তার থেকেও বেশি তৃপ্ত। কিন্তু আপনাদের মতো কয়েকজন মানুষ আমাদের মাথা ব্যথার কারণ। আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, এটিই আমার প্রথম ও প্রধাণ কাজ – আপনাদের মতো গুটিকয়েক মানুষের এই ‘একা’ ও একাকিত্বকে রাষ্ট্র ঘৃণা করে…
: ‘আপনাদের’ শব্দটিকে আমি স্বীকার করলাম না। আমিও শান্তভাবে আপনাকে জানিয়ে রাখি, আপনাদের ওই সরাইখানার সমবেত উল্লাসকে আমি অস্বীকার করি। যূথবদ্ধ উল্লাসের মতো একাকিত্বের নির্জন পরিসরটুকুও আমার সম্পদ।
: একটি কালেকটিভ সিস্টেমের মধ্যে দাঁড়িয়ে, তার সব সুফল ভোগ করে বেঁচে থেকে সেটিকেই অস্বীকার করবার মধ্যে এক ধরণের দ্বিচারিতা যে আছে তা আপনি নিশ্চয় মানেন…
: যদিও এই গড়ে তোলা পিরামিডের প্রতিটি পাথর আমার চেনা ও কোন নিখুঁত জাদুবলে সেটিকে নির্মান করা হয় তাও আমার নখদর্পণে তবুও আমি বলি, এই সিস্টেমটি গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্তই হল ব্যক্তির ভূমিকাকে অস্বীকার করা ও তাকে সমষ্টির আকর্ষ দিয়ে গিলে ফেলা। এই সিস্টেমটিকে স্বীকার করা বা না-করার বিষয়ে আমার অন্য একটি মত আছে, সেটি আপনার সঙ্গে এই মুহূর্তে আলোচনা করতে ইচ্ছা করছে না।
: অর্থাৎ আপনি মেনে নিচ্ছেন যে আমাদের এই কালেকটিভ সিস্টেমের মধ্যে আপনি ঢুকে পড়েছিলেন… তারপর ক্যানসার-আক্রান্ত কোষের মতো চুপ করে বসে ছিলেন। আমাদের সিস্টেমের কাছে আপনি একটা থ্রেট, এবার আপনিই বলুন আপনাকে কেন শাস্তি ও নির্বাসন দেওয়া হবে না…
: আপনাদের এই সিস্টেমের মধ্যে আমার প্রবেশ ইচ্ছাকৃত নয়… কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম আমারই মুদ্রা দোষে আমি ক্রমাগত একা হয়ে পড়ছি। আপনাদের ফুর্তির জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না আমার, কারণ আপনাদের গ্রাইন্ডিং মেশিনে আমি একটি বালির কণা। যতবার ঘূর্ণন ততবার আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠেছে, ছিটকে উঠেছে আমার চিৎকার। আমি আপনাদের নশো নিরানব্বইটি ফুর্তির পাশে এক কোণে রাখতে চেয়েছিলাম আমার নির্জনতা ও একাকিত্বকে। আপনারা আপনাদের নশো নিরানব্বইটি ফুর্তি দিয়ে গলা টিপে ধরে ছিলেন আমার নির্জনতা ও একা থাকার অধিকারকে।
: আমাদের রেকর্ড বলছে, আমাদের এই রাষ্ট্রে আপনি খুব বেশি দিন আসেননি। আপনাকে আমরা আবিষ্কার করি এক রাবার-মোড়া উপকূলে… অর্ধমৃত... একটি ভাঙা ডিঙি... এ ছাড়া আর কিছুই প্রায় ছিল না আপনার সঙ্গে। আপনার পূর্ব নিবাস?
: মানুষই সব থেকে বেশি পরিযায়ী। ঠিক কোথা থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল মনে নেই। শুধু মনে আছে দিনের পর দিন মোচার খোলার মতো ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে আমি তাকিয়ে ছিলাম আমার যাত্রাপথের দিকে
: অর্থাৎ আপনার কোনও দেশ ছিল না!
: আপনাদের মতো ওরাও আমাকে বারবার বিতাড়িত করেছে। একলা মানুষের কোনও দেশ থাকে না…
: আমাদের তথ্য বলছে, আপনার কাছে ঘড়ি বা কম্পাসও পাওয়া যায়নি!
: বাহুল্য মনে হয়েছিল বলে আমি সেগুলিকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলাম। যদিও তার আগেই ঘড়ির কাঁটা দুটি স্তব্ধ হয়ে যায় এবং স্তব্ধ-কাঁটার সেই ঘড়িটিকে গিলে ফেলেছিল একটি অক্টোপাস। আমার ব্যক্তিগত সময় ও হাতঘড়ি এখন একটি অক্টোপাসের পেটের ভিতর।
: পূর্ব কোনও স্মৃতি…
: খুব আবছা মনে পড়ে এক জেলি-সমুদ্রের ধারে আমাদের জেলেবস্তির কথা।
: নারী বা সন্তান?
: জেলি-সমুদ্র থেকে জেলি-বাষ্প উড়ে যেতে দেখতাম প্রতিদিন… একদিন সেই জেলি-বাষ্প ঘিরে ধরেছিল আমাদের শরীর… ঠিক যেমন পাহাড়ি বাংলোয় ঢুকে আসে মেঘ। তারপর আমরা আর কেউ কারোকে দেখতে পাইনি, অথচ তারা আছে বা ছিল। সেই জেলি-বাষ্পের মধ্যেই প্রথম ও শেষবারের মতো থমকে যায় আমার ঘড়ির কাঁটা।
: অর্থাৎ বলতে চাইছেন, থমকে যায় আপনার সময়!
: এক্সজ্যাক্টলি… সেই জেলিসমুদ্র আসলে জমাট বাঁধা এক সময়-সমুদ্র… কনডেন্সন্ড টাইম। সেখান থেকে বাষ্পের মতো উবে যাচ্ছে সময়… উবে যাচ্ছে এবং আবার শীতল হয়ে জমাট বাঁধছে, টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে অন্য এক সমুদ্রের বুকে।
: আপনি আমায় বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। এবার বলুন, আর কোনও স্মৃতি!
: খুব ফিকে হয়ে আসা কয়েকটি খণ্ডচিত্র। একদিন এক শুশুকের কাটা পেটের ভিতর আবিষ্কার করেছিলাম আরেকটি কাটা দাগ… সেখান থেকে শুরু হয়েছিল একটি পথ। শুশুকটিই ধাক্কা দিয়ে দিয়ে আমাকে তুলে দিয়েছিল একটি ডিঙিতে, আমি ভাসছিলাম। অথচ একই সঙ্গে আমি হাঁটছিলাম… দেখতে পাচ্ছিলাম একটা বুড়ো গাছ একটা থুত্থুরে প্যাঁচা ও অঘ্রাণের কুয়াশার মধ্যে ক্রমাগত এগিয়ে আসা একটি নীল ট্রাম। জলীয় স্মৃতির মধ্যে জেগে থাকা একটি ট্রাইলাইন ও তার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জোব্বা পরা মানুষ…
: জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথকে একই ফ্রেমে আবিষ্কার করা স্নায়বিক দুর্বলতার লক্ষণ
: অথচ সেটিই আমি দেখতে পেয়েছিলাম…দেখছিলাম একজন সারাজীবন একা দাঁড়িয়ে মাথার উপর জন্ম-মৃত্যুর খেলা দেখে গেলেন। আর একজন সারাজীবন একা জন্ম ও মৃত্যুর উপর ট্র্যাপিজের খেলা দেখিয়ে গেলেন।
: আমাদের তথ্য বলছে এদের মধ্যে একজন ‘সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে’ লিখেছিলেন। আপনি কি সেটিকে অস্বীকার করছেন?
: অস্বীকার না করলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনাদের তথ্য অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। সবার রঙে বারবার রঙ মিলিয়ে তিনি একলা হয়ে গেছেন সুকৌশলে। একলা হয়ে যাবার মহাযজ্ঞে সব থেকে বড় ঋত্বিক তিনিই… তিনিই একাকিত্বের মহারাজা
: আমাদের রাষ্ট্রের অভিমত, আপনারা ঠিক ‘মানুষ’ নন… জন্মমুহূর্তেই আপনাদের স্নায়ুতে এঁকে দেওয়া হয় ধাতুর রুক্ষতা
: হয়তো ঠিক উলটো… আমাদের স্নায়ুর নমনীয়তাকে আপনারা স্পর্শই করতে পারলেন না কোনও দিন
: ছাড়ুন, আমাদের রাষ্ট্র জানতে চায় এই দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দেবার কারণ
: আমি শুধু আমার যাত্রাপথটিকে দেখতে চেয়েছিলাম চোখ মেলে… একা একা
: কী দেখলেন?
: দেখলাম বণিকের মানদণ্ড ড্রাকুলার হাসি তেল ও কাগজের খনি প্রেম ও পারদের নিবিড় সংগম সময়হীনতার কাছে বসে থাকা পেঁচা হেমন্তের কুয়াশা ও নেবুলার হাতছানি… আরও কিছু আছে – যেমন লালনের গান গ্যালিলিওর দূরবীন সমুদ্রের ধারে সস্তা-হোটেলে বসে থাকা হেমিংওয়ে ও রিভলভারের ট্রিগার টানার আওয়াজ
: আপনাকে দ্বীপান্তর দেওয়া ছাড়া আমার কাছে আর কোনও বিকল্প উপায় রইল না। কিন্তু আপনার প্রতি আমার একটু মায়া জন্মেছে… আপনা্রা ভয়ংকর একা। এই পৃথিবীর রণরক্তসফলতার মধ্যে একটা সহজ আনন্দ আছে। আপনারা কোনও দিন তার স্বাদ পেলেন না। যাবার আগে কী নিয়ে যেতে চান সঙ্গে?
: ঠিক যেমন একলা হয়ে যাবার মধ্যে যে ছায়াপথের ইশারা আছে তার স্পর্শ আপনার কোনও দিন পেলেন না।
: সঙ্গে কী নিয়ে যেতে চান বলুন…
: কিছুই না… একটি গান নিয়ে যাব শুধু, ‘একা মোর গানের তরী ভাসিয়ে ছিলাম নয়ন জলে…’
: যদিও গান... আমার বলার কিছু বলার কথা নয়, তবু সেখানেও কিন্তু আরেকজন এসেছেন, অবেলায় হলেও এসেছেন তরী বাইতে
: আমিও ভাবছিলাম কখন আপনি এই ভুলটি করবেন… আসলে কেউই আসে না… ‘তার’ করুণ গান ‘তার’ই প্রাণে ব্যাথা হয়ে বাজে… দুকূল থেকে একজনই ছুটে আসে অকূলে কূল মেলাতে
: আপনার নির্বাসনপত্র সাক্ষরিত হল
: একার সঙ্গে একার দেখা… সারা জীবন এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে কাটিয়ে দিয়েছি। আপনি আমাকে সেই সুযোগ করে দিলেন… আসলে রাষ্ট্র আর শক্তি এভাবেই ‘একা’ মানুষকে আরও একা করে দিয়ে তাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে… আপনাকে অভিনন্দন… বিদায়…
আমার জন্য প্রস্তুত করুন জলযান।