ফর্টি ফোর সানসেটস ....

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

হন্টিং, না? এই যে, জীবন। গুড ওল্ড লাইফ। বনেদিয়ানা থাকতে পারে। নিউক্লিয়ার হতে পারে। তবু, ওই একটা শব্দ, একা। ঘুমোতে দেবে না। সার্ত্রের আন্তোনিও রকেন্তিন নজিয়ায় ভুগত। বমিভাব। সেরে উঠত। আঃ বাঁচাল। তারপর আবার। শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছিল আন্তোনিও। অভ্যেস। রাস্তা, পার্কের বেঞ্চে, ঠান্ডায় আধমরা ভিখিরির গায়ে নজিয়া দেখতে পেত সে। আন্তোনিও নিজের শরীরের ভেতর নজিয়া ঢুকত না আর। নজিয়ার ভেতর আন্তোনিও, সার্ত্রে ঢুকে যেতেন। একা। বনেদিয়ানা ভেনেশীয় জানলা দেয়, দেয় জুলিয়েট বারান্দা। কার্নিশ। ছাদ থেকে নেমে কার্নিশে হাঁটা। একদিন হঠাৎ। ফেলু মিত্তির না। কাশী না, একটা ফরাসি কলোনি। ক্যাপ্টেন স্পার্ক না, স্বপনকুমার। দীপক রতন। আমার সঙ্গী। নস্টালজিক লাইফ। ক্রুড রিয়েল। কেমন লাগে নিচটা? এক পা দিয়েছি। দু পা। উচ্চতা। সেই নজিয়া। যেন কোনও কিছুর মাঝেই অকস্মাৎ আমি নেই। নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ - চারদিকে আদি বাড়িগুলোর কাঠামো। ভুতুড়ে পায়রা। একানড়ে। ছেলেধরা। দুপুরবেলার নিলামে ডাকা ফেরিওলা। হাতে প্রথম নোংরা বই। আর চুল থেকে নখ অবধি প্রতিটি পুরুষাঙ্গ বজ্রকঠিন হয়ে যাওয়া সেই শরীর আমায় প্রথমবার লোনলিনেস চিনিয়েছিল। তারপর থামেনি। উচ্চতাবোধের জন্ম দিয়েছিল। সিরিয়াল হত। সিনেমা হত। আত্মহত্যা কেন করে মানুষ? আর করলই যখন, ওইভাবে সিলিং থেকে লকলক করতে করতে বিভৎসভাবে কেন? আমি বনেদি টেলিভিশন পর্বে সবার সামনেই উঠে যেতাম। একটা জানলার ফাঁক দিয়ে দেখতাম। বেশরমের এ. কে. হাঙ্গাল। খাতার রাফ পেজ। মলাটের ভেতর। এঁকে যেতাম। স্কেচের পর স্কেচ। একটা মুখ। দড়ি। শূন্যতা। একা। মরা মানুষ দেখেছি। একা মানুষ কেমন দেখতে হয়? কেমন? একটা দড়ি। মুখ। সিলিং। ভেড়া কেমন দেখতে? একটা বাক্স এঁকে দিলাম। ওর ভেতর ভেড়াটা। জড়োসড়ো। লিটল প্রিন্স বলেছিল এক্স্যাক্টলি ওটাই চেয়েছিল সে। সাপটাকে মনে আছে। ছোটবেলায় মুখ খারাপ করতাম। শাস্তি। বাড়ির পেছনের একটা জলা জঙ্গল। ওখানে একবেলা। কান্না। কিন্তু কতক্ষণ? হাঁটতে বেরিয়েছিলাম জায়গাটা। লেবু গাছের পেছনে। সাপটা। মরা। আশেপাশে কেউ নেই? একা লাগছে? অদ্ভুত একটা মরুভূমির মতো লাগছে না? সাপটা নড়ে উঠল। নির্বিষ। কী যেন বলল। 'ইট ইজ লোনলি হোয়েন ইউ আর অ্যামোং পিপল টু।' মানুষের মধ্যেও একা লাগতে পারে। অনন্ত মরুভূমি মনে হতে পারে। আর তখনই দরজাটা খোলে মা। আমি বেরোতে ভয় পেয়েছিলাম। ভয়ের ভেতরও একটা একাবোধ থাকে। খেলে ফেরার সময় মাঝে মাঝে একটা শর্ট রুট ধরতাম। সরু রাস্তা। দুদিকে দুটো পুকুর। জল নেই। খাঁ খাঁ করত। ওখানেই একা বোধ। জল আমার কোনও না কোনও ব্যথা বোঝে। শূন্যতার কোনও দায় নেই। পেরিয়ে আসতে গিয়ে পায়ে কেটে গেল। কে দেবে টিংচার আয়োডিন? কে মোরে ফিরাবে অনাদরে? কে মোরে ডাকিবে কাছে? একটা মেয়ে। চশমা পরা। তিন চারটে বাড়ি টপকে। শরীরে চটক। কেন? আমি তো নেই। কার জন্য? কোলের ছেলে। কথা বলতে শিখেছে। জানলা দিয়ে দেখলাম জড়িয়ে ধরছে। আঃ। মা, লাগছে। মেয়েটা তখনও নির্বিকার। স্ট্যাটিক। ও মা, মা, লাগছে। শ্বাসের শব্দ। পাশ থেকে বরটা এসে চড় কষাল। সম্বিৎ ফেরা। মেয়েটা দৌড়ে বাড়ির বাইরে। মুখোমুখি। আমার পা। ওষুধ? লাল ওষুধ? ও দৌড়ে একটা পুকুরের দিকে নেমে গেছিল। একা। এসব হত। আমার সঙ্গে হত। অনেকের সঙ্গেই। আমি কো-অ্যাক্টর। দেখে ফেলি জাস্ট। মেয়ার উইটনেস। ড্যান্সার ইন দ্য ডার্ক। লার্স ভন ট্রায়ার। একটা অন্ধ মেয়ের হাসি। ট্রেনলাইন। তাজমহল দেখেছ তুমি? গ্রেট ওয়াল? যদি ছাদ পড়ে যাওয়ার ভয় না থাকে, তাহলে সব দেওয়ালই মজবুত মনে হবে। এভরি ওয়াল উইল বি গ্রেট। ছাদ তৈরি হয়। দেওয়াল রং হয়। বাড়িটা একই থাকে। আনুষ্ঠানিক দেখাশুনোর পর, মেরামতির পর, একটা সময় মানুষ ঘরে ফিরবেই। রাত হবেই। শুধু একজন মানুষ আজ সমস্ত রাত খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে আলপিন হাওয়ায় দুলেছে সে একটা আঙুল হয়ে আবার দুলবে। বল, কটা আঙুল? কটা? একটা বেড়াল ছাদের পাঁচিল বরাবর আসে। আবার যায়। বেড়ালটা অনেকবার যাওয়া আসা করে। নাকি অনেকগুলো বেড়াল? নিচে তাকায় কিছুক্ষণ। লাফ দিয়ে পড়লে লাগবে পায়? যদি আত্মহনন হয়? অথবা দুর্ঘটনা? ব্যথা একইরকম? কাজ শেষ হলে চলে যেতে হয়। একাই। কাজ শেষ না হলেও। জর্জ ইস্টম্যান একটা ক্যামেরা তৈরি করে বললেন, মাই ওয়ার্ক ইজ ডান। সিলভিয়া প্লাথের তো বাচ্চাগুলো ছিল। কবিতা ছিল। নিকোলাস। ফ্রিদা। সাতচল্লিশ বছর পর আলাস্কার বাড়িতে ঝুলে পড়লেন নিকোলাস প্লাথ। লিনিয়েজ। এভাবেই আটকে যাই। জানি, ঘুমের বড়িগুলো শুধু একটা শরীরই খাবে না। শরীর থেকে, প্রজন্ম থেকে আরেকটা প্রজন্ম যাবে। তাই, একাবোধ, কাউকে বলি না। বলতে নেই। খুব উঁচুতে তাকালে দেখি একটা গ্যাসবেলুন আকাশের নিচে থেকে আরো উপরের দিকে উঠছে। ছাই ছাই। যে মেয়েটির প্রিয় রং গোলাপি বলেছিল, সে কখনও আমার বন্ধু হতে পারবে না। যে একটা বেড়ালকেও মরতে দেখেনি, তাকে আমি চিনি না। সে একটা চলন্ত বাসে আমার পাশে এসে বসলেও আমি কাঁটার মত স্থবির থাকব। জানলার হওয়ায় যেন তার চুল না নড়ে। যেন অঙ্গস্পর্শ না হয়। সে নিতে পারবে না আমায়। সারাটা জীবন পুড়বে। অনুশোচনায়। সূর্য ডুবে গেলে আমি তাকে চলে যাওয়ার আসল কারণটা বলে যাব। বলে যাব, আমি সেই বাতিওয়ালার দুঃখে চলে গেছিলাম যে তিরিশ সেকেন্ড অন্তর বাতি জ্বালাত, নেভাত, আবার জ্বালাত। ঠাকুমা এভাবেই পুজো করত। রোজ রান্নার কথা ভাবত। লম্বা ছুটিতে ছেলে বউরা বাড়ি এলে অলৌকিকতার কথা ভাবত। ভাবত ছুটি যেন না ফুরোয়। তিরিশ সেকেন্ড। তিরিশ বছর। ঠাকুমার ছবি। ঘরে আলো জ্বলে। নেভে। পুরনো কেবল টিভির চ্যানেল বদলের মতো। খট। খট। আমি চেয়ার বদলে নিই। সরু রাস্তার মতো। একটা লম্বা করিডর। একটা ফাঁকা চেয়ার রাখা। কেউ বসবে না? আমি কিছুক্ষণ ওয়েট করে চেয়ারটায় বসি। ছাদের ধারে নিয়ে যাই। সূর্য ডুবছে। ছোট একটা পৃথিবী। সময়কাল। মন ভালো না। সূর্য ডোবা দেখব। হোয়েন এ পার্সন ইজ ভেরি, ভেরি স্যাড, দে লাইক সানসেটস। আমি চেয়ার সরিয়ে বসি। সূর্য ডোবে। ছোটবেলায়। একটু বড় হলে। বিয়ের পর। বুড়ো হওয়ার আগে। যদি কোনও মানুষ চুয়াল্লিশটা সূর্যাস্ত দেখে? ফর্টি ফোর সানসেটস? সে মন খারাপ করবে?

বাট দ্য লিটল প্রিন্স ডিড নট রিপ্লাই ...


কৃতজ্ঞতা - অ্যান্টোনিও ডি সেন্ট এক্সুপেরি, ভাস্কর চক্রবর্তী