অন্তর্বাহী

নুরেন দূর্দানী

আজকের গল্প’টা একদমই আমার গল্প, আমার না ঠিক আমাদের গল্প। তার আগে বলে নেই, প্রকাশক তো অনেক প্লট ধরিয়ে দিবেন, বহুদিন হলো লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি। শুরু করাটা কঠিন এবং বিপদজনক। যদি ব্যাখা চাওয়া হয় তাহলে ভনিতা বাদেই সোজাসুজি বলি, একা হয়ে ওঠা হচ্ছে না। লোকে যতোই বলুক দিন শেষে মানুষ মূলত একা। ‘একা’ শব্দটা কে ইদানীং ডাহা মিথ্যা মনে হয়। বাস্তবিক চাহিদায় একা কেউ নয়, ওটা আসলে মানব মনঃসৃষ্ট ভান। মানুষ নিঃসঙ্গ হতে পারে কিন্তু একা কখনোই নয়। ‘নিঃসঙ্গ’ আর ‘একা’ এই শব্দের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে।
বলছিলাম গল্পটা…
স্বল্প পরিসরে সবকিছু খুলে যাওয়ায়, অফিস পাড়ায় যাতায়াত শুরু হয়েছে। ইদানীং আমার বন্ধু সতত অফিস যাচ্ছে, বাড়িতে ব্যস্ত আমি হোম অফিসে। সততের সাথে আমার প্রায় উনিশ বছরের প্রণয়। আমাদের শুরু’টা পাড়ায় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে। সতত খুব ভালো ক্রিকেট খেলতো, আমিও মাঝে মধ্যে উঁকি দিতাম, আসলে উঁকি দিলে যে ঝুঁকি হয়ে যেতে পারে তাই হয়েছিলো। আমরা মুখের কথার চাইতে চোখের কথা বেশ ভালোই বুঝতাম। মুখোমুখি বাড়িতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গানের কলি আর দুপুরে আমার ক্লাস থেকে ফেরা আর সতত এর ক্লাসে যাবার আগে কাগজের এরোপ্লেন ছুড়োছুড়ি। আমাদের মধ্যে বয়সের ফারাক হলেও ছেলে মানুষী ছিলো। অবসরে সতত স্কেচবুকে আঁকিবুঁকি করতো আর এভাবেই চারাগাছ আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছিলো। তারপর হঠাৎ ঐ যে নাটক-সিনেমায় যা হয়, বিরাট একটা পরিবর্তন! আমার বাপির আবাস ছেড়ে যাওয়া। প্রজাপতির ডানায় দু’জনের নির্ভাবনার সু-সময় ফুরালো।
যোগাযোগ-হীনতায় দীর্ঘ সময়। আমাদের অনেক অমিলের মাঝে খুব ঘনিষ্ট মিল ছিল, তাহল সতত আর আমার, আমাদের রাতের ঘুম’টা খুব গভীর। যার যার বিছানা-বালিশে সহজেই ঘুমিয়ে যেতাম। গোটা উনিশ বছরে সতত আর আমার, বহুবার আমাদের বাড়ি বদল হয়েছে কিন্তু আমাদের নিঃসঙ্গতার ঠিকানার কোন বদল হয়নি।

উৎপলকুমারের অগ্রন্থিত লাইন নিজের বোধের ভেতর প্রবাহিত হলো, ‘নিজের ছায়ার চেয়ে তুমি বাস্তবিক বড়ো নও’!
অথচ বাস্তবিক সং নামক সারাংশে সতত আর আমি অনেক হাসি-আনন্দ-সুখ-দুঃখ ঘিরে যার যার মতো, ঘূর্ণিপাকে শূন্যে ভেসেছি। ভগ্নাংশের বসন্তের রেখায় দাঁড়িয়ে অন্যের চোখে তাকিয়ে নিজেদের খুঁজে না পেলে পালিয়ে গেছি। অনেকগুলো বছর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি নিজের অস্ত্বিতে। জীবন কখনও সরলরৈখিক হয়ে ওঠেনি। আমাদের আরও একটা মিল ছিলো, সতত আর আমি ভীষণ অন্তর্বাহী।
পাড় ভাঙ্গার আওয়াজ হয়, চর জেগে ওঠে খুব গোপনে তবুও বহমান। আমাদের গল্প প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। স্বল্প পরিসরে লকডাউন খুলে গেলো, ভীষণ ব্যস্ত এই নগরী। প্রচন্ড ট্যাফিক, অফিস শেষে সবার বাড়ি ফেরার তাড়া। নিসর্গ ঝড়ে চিরচেনা এই শহরে খুব বৃষ্টি। পরিবহন সংকট আর এক অজানা মহামারির ভয়। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে পারসোনাল প্রটেকিটিভ ইকুইপমেন্ট জড়িয়ে অনেক’টা পথ হেটে হেটে সতত বাড়ি ফিরছে, আর পকেটে ক্রমাগত ভাইব্রেট হচ্ছে মুঠোফোন। ওদিকে আমি হোম অফিস কে পাশ কাটিয়ে ঝুম-ঝুম বৃষ্টির শব্দে চিন্তিত হয়ে পড়ছি, জ্বর-মুখে অবসাদে মুঠোফোন হাতে নিয়ে ভেবে যাচ্ছি এক অন্য গল্প। আমাদের উনিশ বছরের প্রণয়ে বিশ ছুঁ’তে গিয়ে, অন্তর্বতী চার’শ বছরের অধিক এই পুরোন শহরে বৃষ্টির শব্দে ডুবে যাচ্ছে একক নিঃসঙ্গতা।