মশারি আর থিসিয়াসের জাহাজ

শতাব্দী দাশ

-আমাদের ছোটবেলায় একটা ধাঁধা ছিল। 'ঘরের মধ্যে ঘর।' বল্ তো কী?

-মশারি।

- ছোটবেলায় মশারির ভিতর একলা হতে পারতাম। কুচো রবীন্দ্রনাথ যেমন ভাঙা পালকির মধ্যে একলা । পড়িসনি 'ছেলেবেলা'- তে?

-ওটা সাবজেক্টিভ। না হলে একলা হতে সবার নিজের খাট, নিজের বিছানা আর নিজের মশারি দরকার হত। কিংবা ভাঙা পালকি। আমাকে আবার শুতে হত বোনের সঙ্গে। একই খাটে। তার বেলা?

-আহ্! ধাঁধাটা রূপক।

বলতে চাইছিলাম, 'নিঃসঙ্গতা' হল বাইরের ঘর৷ 'নিঃসঙ্গতা', মানে সঙ্গ বা সঙ্গীর অ-ভাব। আর 'একাকিত্ব' হল ভিতরঘর। একাকী হওয়ার ভাব। কোনো অ-ভাব সেখানে নেই।

-আমি দেওয়ালের দিকে শুতাম, জানিস? দেওয়ালের দিকে মুখ ফেরালেই একলা। নিজস্ব ম্যাজিক! পাশে বোন। হয়ত সারাদিনই হয়েছে খুনসুটি। কিন্তু ওই সময় ওর অস্তিত্ব আমাকে স্পর্শ করত না।

সবাই বলত, আমি চুপচাপ। কিন্তু নিরন্তর কথা বলতাম। মুখে নয়, মগজে। অথচ দ্যাখ, দেওয়াল মানে তো বদ্ধতা। দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে আমি কী করে স্পেস খুঁজতাম কে জানে!

-ওই 'স্পেস', ওটাই...মানে ভিতরঘর। বাহিরঘরটা নির্বান্ধব। তাই ভয়ের, হতাশার। ভিতরেরটা মুক্তির।

যেমন ধর্, একটা ব্রেক-আপের পর সব ফাঁকা,খাঁ খাঁ...ওটা নিঃসঙ্গতা। লোনলিনেস। বাহিরঘর। কিন্তু ভিতরঘরের সন্ধান যদি একবার পাওয়া যায়, সেখানে আমির সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমি৷ একা ও উন্মুক্ত। অসহনীয় সে নগ্নতা। সইয়ে নিলে মুক্তি।

কোয়ারেন্টিনেও বাহিরঘরে সোশ্যাল বা ফিজিকাল -নানা রকম ডিস্ট্যান্সিং। স্কাইপ, ভিডিও চ্যাট, ওয়েবিনার। মৃত্যুভয়। হতাশা।

কিন্তু যদি ভিতরঘরে সেঁধিয়ে যাওয়া যায়,তাহলে? রুশোর কোয়ারেন্টিন-কথা পড়েছিস?

-হ্যাঁ। 'কনফেশনস'-এ আছে। প্যারিস থেকে ভেনিস যাচ্ছিলেন। নামতে হল জেনোয়া-তে। কারণ জাহাজ মেসিনায় ঠেকেছিল। মেসিনায় তখন প্লেগ। তাই ভেনিসে জাহাজ ভেড়ার আগে জেনোয়ায় কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে একুশ দিন। অন্যরা জাহাজেই থাকতে চাইল। সঙ্গীবিহীন হতে চাইল না কেউ। রুশো গেলেন একাকী এক আসবাব-হীন, ফাঁকা 'ল্যাজারেটো'-তে। সেখানে রবিনসন ক্রুশোর তুল্য সংসারপাতি। আর বইপত্র-লেখালেখি সহ নিজস্ব ভিতরঘর।

-হুঁ৷ দূরে জাহাজের অলস আনাগোনা। উঠোন বলতে প্রোটেস্ট্যান্টদের গোরস্থান। 'ল্যাজেরেটো' আসলে সংক্রামিতদের হাসপাতাল। যদিও তখন হাসপাতালটি বিলকুল খালি। বিছানা বালিশ বলতে নিজের তোয়ালে, জামাকাপড়৷ লেখার টেবিল বলতে ট্রাঙ্ক।

-অথচ রুশোর ভালোই লাগছিল। বলছেন-'I was shut in by great doors with huge locks, and remained at full liberty to walk at my ease from chamber to chamber and story to story, everywhere finding the same solitude and nakedness'. 'লকস' এর পাশেই 'লিবার্টি'। অক্সিমোরোনিক নয়?

-সেই তো ভিতরঘরের স্বাধীনতা! সেবার সান্দাকফুতে ভোরবেলায় তুই ঘুমোচ্ছিলি। জানলার পাশে আমি একা হয়ে গেলাম। সাদা পাহাড়চূড়ায় লাল ছড়িয়ে পড়ছে। তারপর লালটা সোনালি হল। কি অসীম রহস্য! কী অসীম আনন্দ! আনন্দের কণা একলা আমির গায়েও এসে পড়ছে। সেই মুহূর্তটা একারই। ভাগ দিতে পারিনি৷ কিন্তু একটা বিরাট প্যাটার্নের আভাস। বিস্তৃত নকশি কাঁথা। উষ্ণ। আনন্দময়। আমি তার একটা সুতোর ফোঁড়। তুই আরেকটা।

-আনন্দ? রাবীন্দ্রিক। একাকীত্বে প্রগাঢ় বিষাদও তো থাকে। 'সকল লোকের মাঝে ব’সে

আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?'

-তোর চোখে ওরকম বিষণ্ণতা থাকে মাঝে মাঝে। যেন এ জগতের কেউ নোস। যেন আমার চুমু ঠোঁটের উপরিতল ভেদ করে কোথাও পৌঁছচ্ছে না৷

- কাব্যোপম বিষণ্ণতা নেই। বিরাট আনন্দও নেই। তার চেয়ে বড় কথা, ভিতরঘর নেই। হারিয়ে গেছে!

-হারিয়ে গেছে?

- এই যে কোয়ারেন্টিন, তাও কি পালটে যায় না মানচিত্রে তোর স্থানাঙ্কের সাথে? রুশোর কোয়ারেন্টিন সৃজনের, ধ্যানের। আর ভূমধ্যসাগরের নাবিকদের, সৈন্যদের, চাষী আর জেলেদের কোয়ারেন্টিন? এক ঘরে ঠাসাঠাসি করে ঢুকিয়ে দেওয়া তিনশ মানুষের কোয়ারেন্টিন? বা ধর অধুনা স্কুলঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া পরিযায়ী শ্রমিকের কোয়ারেন্টিন?

-স্পেস-টেস তবে বিলাসিতা? মার্ক্স সাহেব অবশ্য রুশোর কোয়ারেন্টিন নিয়ে একচোট হেসেইছেন।

-সেদিন এক গৃহবধূকে জিগ্যেস করলাম, লকডাউন কেমন কাটছে? বলল, ওরা বাড়ি থেকে বেরোলে তাও নিজস্ব সময় পেতাম। এখন তা নেই। তিনি শিল্পী টিল্পী নন, সাধারণ৷ সাধারণও তাহলে একাকিত্ব চায়?


-তাঁর কাছে স্পেস মানে হয়ত শুধুই 'এইট আওয়ার্স ফর হোয়াট ইউ উইশ'।


-সেইটুকু আগে পেলে, তারপর তো ঘরের ভিতরের ঘর…ভার্জিনিয়া উল্ফের ওই নিজস্ব ঘরের আকুতি...ওইটুকু দরকার হয় নিজেতে ডুব দিতে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও লেখার জন্য পৃথক ঘর নিয়েছিলেন, না? যে মানিকের লেখার উপাদান ভিড়ের মধ্যেই ছিল, তাঁরও নিরিবিলি লাগে লেখার জন্য।

-ভিতরঘর এইভাবে হারায়?

-হারায়। আরও নানা ভাবে৷ ধর একফালি বারান্দা, এলোমেলো বইপত্র,ভাঙা ট্রানজিস্টার - এইসব নিয়ে জীবন কেটে যেতে পারত। এই একান্ত পাঠ, একান্ত সুর -এসবের মধ্যে দিয়েই তো তুই তোর ‘আমি’-কে খুঁজতিস। ক্রমশ বুঝলি, তোর সমগ্র সত্তার মধ্যে যেটুকু ভাগ ছিল 'প্রান্তিক', ছিল 'অপর', সেটাই গ্রাস করল বাকিটুকু। বুঝলি, তোর চারপাশ তোকে প্রান্তিকতা দিয়েই মাপবে। তোর অস্তিত্বের এই সরলীকরণেও তোর অবাক লাগল,বিরক্তি জাগল। তুই কী করবি? প্রতিবাদ জরুরি, প্রতিরোধ জায়েজ। কিন্তু সংগ্রামের ডামাডোলে তোর একান্ত মুখটি হারিয়েও যেতে পারে। অথচ সংগ্রামের পথ না পেরিয়ে তুই একান্ত আমি-তে পৌঁছতেও পারবি না। প্যারাডক্স, না?

-খুঁজে পাওয়া যায় শেষপর্যন্ত? নিজেকে? নিজের ঘর? ঘরের মধ্যে ঘর?

-থিসিয়াসের জাহাজের প্যারাডক্স মনে পড়ে? এক জাহাজ ছিল। জীর্ণ-দীর্ণ। তার পুরোনো অংশগুলিকে, একসঙ্গে নয়, একটি একটি করে নতুন অংশ দিয়ে বদল করা হল। বর্তমান জাহাজটিকে কি বলা যায় থিসিয়াসের জাহাজ? আবার ধরা যাক, গুদামঘরে ডাঁই করে রাখা জাহাজের সেই পুরোনো অংশগুলিকে কোনো আশ্চর্য মেকানিজমে নতুন করে ফেলা হল। তারপর সেগুলি দিয়ে আরেকটি দ্বিতীয় জাহাজ তৈরি করা হল। দ্বিতীয় জাহাজটিকে কি তবে বলা চলে থিসিয়াসের জাহাজ? কোনটি আসলে থিসিয়াসের জাহাজ? নাকি কোনোটিই নয়?

ভাঙা জাহাজের, বদলে যাওয়া জাহাজের ভিতর-ঘর থাকে? সে ভিতরঘর কি আসলে তারই ভিতরঘর?