বদ্বীপ

সাদিয়া সুলতানা

লাশটি দেখে আমরা চমকে যাই।

নিরেট অন্ধকারে আমরা যখন লাশটিকে আবিষ্কার করি তখন চারদিকে শব্দহীন এক বিচিত্র হাওয়া বইছে। নিঃসঙ্গ লাশ আর প্রতিকূল হাওয়ার উচ্ছ্বাস ভয়ের গমগমে এক অনুভবের সৃষ্টি করছে।

আমরা এক পা দুপা করে সামনে এগোই। আমাদের দেখে হাড় জিরজিরে কয়েকটি কুকুর দূরে সরে দাঁড়ায়। অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য নিয়ে ওরা আমাদের দেখতে থাকে।

হাওয়ার স্রােত কেটে আমরা লাশের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াই। লাশটির অবয়ব স্পষ্ট এখন। এর শয়নভঙ্গি আমাদের খুব চেনা মনে হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিত হই যে লাশের স্বত্বাধিকারীকে আমরা কেউ-ই চিনি না। এবার আমরা বদ্বীপ ভঙ্গিতে পড়ে থাকা লাশের পরিচয় জানতে উৎসুক হয়ে উঠি।

ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে কণ্ঠে একজন বলে, ‘আম্পান সাইক্লোনে ভাইসা আসছে এই লাশ’- ‘উহু, এ নতুন মড়া না, আগেই মরছে, গন্ধ ছুটছে দ্যাখেন না?’ বলতে বলতে সে পিছু হটে। থুতনির মাস্ক নাকে তুলতে তুলতে বয়স্ক একজন বলেন, ‘সাবধান...সাবধান...এ করোনার মড়া, কেউ ধইরো না।’

আমাদের মনে পড়ে যায়, দামপাড়ার এক বৃদ্ধ ও তার পুত্র করোনায় আক্রান্ত হবার পর প্রশাসনের লোকজন এসে পাড়ার ছয়টি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছিল। সতর্কতা হিসেবে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর সদস্য আর পুলিশের উপস্থিতিতে বৃদ্ধের বাড়ির সামনে লাল পতাকা ও ব্যানার লাগানো হয়েছিল। গত রবিবার ভোর থেকে সেই বৃদ্ধের পুত্রকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই লাশটি হয়তো ঐ পুত্রেরই। যাকে মৃত্যু ছাড়া কেউ বিশ্বাস করেনি।

বেঁধে দেওয়া পারস্পরিক দূরত্বের কথা ভুলে উদ্বিগ্ন আমরা লাশ দেখি। আমাদের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, চোখে অবিশ্বাস।

লাশটি নারী না পুরুষের, তা নিয়ে কেউ কেউ কলহে লিপ্ত হয়ে যায়। কেউ বলে, ‘এ কোনো ধর্ষিতার লাশ। লকডাউনেও খবিশগুলা আকাম-কুকামে ব্যস্ত। পেপার-পত্রিকায় দ্যাখেন নাই?’ একজন বলে, ‘আরে না, এ কারখানার শ্রমিক...এ না খাইয়া মরছে, দ্যাখেন না কেমন চিমসা প্যাট! শরীরে ত্যাল-মবিলের গন্ধ।’ আরেকজন তেড়ে ওঠে, ‘না খাইয়া কেউ মরে নাকি! খাইয়া মরছে। খাইয়া...গরীবের তেরান খাইয়া পেট ঠাসছে কেমন দ্যাখো! চামড়া তেলে চপচপ করতেছে!’

আমাদের অবাক করে হঠাৎ বড় রাস্তায় সাইরেন বাজাতে বাজাতে পুলিশের গাড়ি এসে পড়ে। পুলিশ দেখে আমরা আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে পড়ি। আমাদের মধ্য থেকে নেতাগোছের সাহসী একজন পুলিশের গাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকে। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গাড়িটি সাঁই করে পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

গাড়ির চিহ্ন বিন্দুতে মিলিয়ে যেতেই আমরা যে যার জায়গায় ফিরে আসি।

আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমাদের কারোই জামাতে যাবার তাড়া নেই। দেশের সকল মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আজানের শব্দে তবু ভিড় পাতলা হতে শুরু করে।

এবার আমরা কয়েকজন লাশটি ভালো করে দেখার সুযোগ পাই। লাশটির দগ্ধ চেহারা দেখে আমরা আন্দাজ করি এ পরম বাউলের লাশ। তার অগ্নিদগ্ধ গানঘর, গানের খাতার ছাইয়ের স্তূপে সেদিন এভাবেই তাকে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

কেউ একজন হৈ হৈ করে ওঠে, ‘আরে না, সে মরে নাই। কই মাছের জান। সকালেও বাউলের গান ভাইরাল হইছে,
পুড়লো দেহ পুড়লো মাটি
পুইড়া হইল অন্তর খাঁটি
কীসের আর ঝনঝা-ঝাটি...।’

লাশের পাশে গান গাওয়া নিষিদ্ধ বলে আমরা তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিই। ম্লান মুখে সে দূরে সরে দাঁড়ায়। তক্ষুনি ‘লাশের পরিচয় জানতে চাই’ বলতে বলতে একজন লাশের টুঁটি চেপে ধরে। তাকে আমরা সরানোর আগেই সে বিদ্যুতের গতিতে ছিটকে যায়। কাঁপতে কাঁপতে জানায়, এ যে সে লাশ নয়! হিমাগারে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ মাছ-মাংসের মতো লাশটি হিম শীতল। ফাঙ্গাস পড়া। এর হৃদপিণ্ডে অবিশ্বাসের ক্ষত, প্রবঞ্চনার ভার।

হাওয়ার গতি মন্থর হয়ে গেছে। কুকুরগুলো আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ার্ত আমরা দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটতে থাকি। হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের একজন বলে, ‘লাশটি দেখতে একেবারে দেশের মানচিত্রের মতো।’

আমরা ছুটতে থাকি। লাশটি পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ, একা।