একা একা লেখা

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

একা একটি একলা বাংলা শব্দ। কোথায় হারিয়ে গেল আইশোলেশনে। বাড়ির যে লোকগুলো অনেক দিন একা একা
কাটাচ্ছিল নিজস্ব জগতে সময়
কুড়িয়ে। তারা ফিরে এসে দেখল বন্দী ঘর না ঘরবন্দী শ্বাস নিচ্ছে একা অনেক ভীড়ের ভেতরে। জ্বর এলে যার ভালো লাগত, কারো স্পর্শ পাবে বলে। সে একা জলপটি
নেয়। মা, বউ , মেয়ে সুখের ভরা সংসারে সে যেন হঠাৎ ব্রাত্যজন।
যে শব্দগুলো তার চারপাশে খেলা করছে সেগুলো হল সোয়াব, কিট, পিপি, কোয়ারেন্টাইন, গ্রাফ আক্রান্ত ও মৃত্যুর। শ্মশান কিভাবে একলা ঘরের ভিতর ঢুকে প্রেতনৃত্য
শুরু করে দিল সে জানে না। তার জোনে লালবাতি জ্বলে গেছে। একটা ট্রমা ক্রমশ বিষন্ন করে তুলেছে। ভালো লাগছে না এতো যত্ন, খাবার। বিছানার দূরত্ব বেড়ে গেছে কতকাল! গতকাল থেকে সে দেয়াল ঘড়ির লক্ষ্য করেছে। ওর কাঁটাগুলো বজায় রাখছে দূরত্ব। ভাগ করা যাচ্ছে না কিছুই। হারানো
ছেলেবেলা, দুর্বিনীত তারুণ্য, ভালবাসা সব নিজের ভিতর, বেরিয়ে আসার জন্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, পারছে কই!
"মাল্যবান যখন বিয়ে করে নি, নিন্মের অফিসের বিবাহিত কেরানির হপ্তাকাবারি অভিযান দেখে মনে গুমরে উঠত তার। উৎপলাকে নিজের ঘরে আনার থেকে আজ পর্যন্ত যখনই কোনো মানুষের স্ত্রী বিয়োগের কথা শুনেছে, সে মানুষটিকে জাদুঘরের কুলকিনারায় দেখা অতীব মৃত মানুষের মত অতীতের আনন্ত্যের কুয়াশা-ঘরে লীন হয়ে থাকতে দেখেছে সে - অনুভব করেছে, ও মানুষের কোনো ভবিষ্যৎ নেই ; সে জীবনের শূন্যতা কল্পনা করে, অস্বস্তি বেদনার অভিজ্ঞতায় কেমন যেন অন্য আর এক রকম ধার শানিয়ে উঠেছে তার। নিজের স্ত্রী যে বেঁচে আছে, এ সান্ত্বনা ভেতরে-ভেতরে গুছিয়ে নিয়ে সারাদিন অফিসের ডেস্কে, সারারাত নীচের ঘরের বিছানায় কম্বলের নীচে, নিশ্চুপ শান্তির ভেতর একটার-পর - একটা বিদায়
দিয়েছে - গ্রহণ করেছে।
এইসব হচ্ছে মাল্যবানের জীবনের ভিতরের কথা, ভিত্তিচিত্রের কথাও।
সে একা থাকতে পারে না, মার সঙ্গে থাকে তাই ; কিন্তু তবুও মায়ের ভালবাসার সান্নিধ্য তার কাছে কালক্রমে একা থাকার সামিল বলে মনে হয়, বিয়ে না করলে তার চলে না ; স্ত্রীকে ঘুচিয়ে দিয়ে একা পথ চলবার কোনো শক্তিই তার নেই। "
মুখোশটা মাস্ক নামে এঁটে বসেছে মুখে। কথা হারিয়ে যাচ্ছে। হাত ধুতে ধুতে নিজেকে লেডি ম্যাকবেথ মনে হচ্ছে। একা পায়চারি করতে করতে জানালার ওপারের পৃথিবীটা পরিস্কার ধরা দেয়। পাখি
হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী উঠোন। রঙ পাল্টে সরোদ নিয়ে বসে আছে ভোর। সমস্ত নেতিবাচকের ভিতর
এইটুকুই যেন পরম পাওয়া।
ভোরবেলা একটা ছাদ গল্প করে আরেক ছাদের সঙ্গে। তারে তারে শাড়ি নামের মেয়েরা সমবেত সেতার বাদন অভ্যাস করে। ছাদ হেসে উঠলে পাখি দুপুরের ঘুম ভেঙে যায়। এসব ছাদের গত জন্মের কথা। এখন ছাদ একা রাত্রিতে পা টিপে টিপে আসে। দেখে অন্ধকারে নক্ষত্রের মৃত্যু দৃশ্য।
"সকল লোকের মাঝে ব'সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? "

বন্ধ ঘরের ভেতর আরো বন্ধ ঘর।
ঘরোয়া হচ্ছে না নীরবতায় ও আতঙ্কে কমে আসছে বাঁচার ইচ্ছা।
ছাতাগুলো কেমন মনমরা ভাঁজে
যেন হঠাৎ অলসতা এসে বসেছে গায়েগায়ে কেউ নেই এখন বিচ্ছিন্নতা তাকে প্রশ্রয় দি তাকে প্রশ্রয় দি দিনের রাতের ঘোর ঘোর ভাব বলছে অনেক কিছুই বুঝছি নানামগুলো হারিয়ে যাবার পর
রকমারি গাছগুলো বিলুপ্তির খাতায় খাতায় কবিতা কেন যে নেতিবাচক চক চক করে না উৎসাহে হেরে বসে আছে যেন কারো কাছে।
"We are the hollow men
We are the stuffed men
Leaning together
Headpiece filled with straw. Alas!
Our dried voices, when
We whisper together
Are quiet and meaningless
As wind in dry grass
or rats' feet over broken glass
In our dry cellar "
একটা ঋতু শেষ হয়ে যাচ্ছে কোনো কথা না লিখেই । শুধু চারপাশে ভাইরাস মাস্ক আইশোলেশন কোয়ারেন্টাইন সংক্রমণের কথাগুলো উড়তে ঘিরে ধরেছে।
পালাবার কোনো রাস্তা নেই। রাস্তা জুড়ে চলেছে অনন্ত পথিক, রেলগাড়ি, ট্রাক, বাস, ক্ষুধা, তৃষ্ণা তাদের থেঁতলে দিতে চাইছে। তবুও
তারা থামছে না। একাকী প্রহরে তাদের বাঁচার অদম্য ইচ্ছা আমাকেও কি আমি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বলছে না। না আমি শূন্য মানুষ নই। শুকনো মানুষ নই। অর্থহীন মানুষ নই। তিমির থেকে সাতটি তারা তুলে আনব আমি থেকে বেরিয়ে আসা আমরা।
"You do not need to leave your room. Remain sitting at your table and listen. Do not even listen, simply wait, be quiet, still and solitary. The world will freely offer itself to you to be unmasked, it has no choice, it will roll in ecstasy at your feet."

( ঋণ - জীবনানন্দ দাশ, T. S. Eliot and Franz Kafka)