ন্যাতা

পীযূষকান্তি বিশ্বাস

নানান ফ্যাঁকড়ার ফালি ন্যাতা হয়ে যায় । অর্থাৎ ঘুরঘুর অনবরত ঘুরপাকে যে অমোঘ ধ্বনিটির জন্য বিকেল হারিয়েছে, তুমি তাকে অর্থ বলো । পুনঃঅর্থাৎ যে স্থাবর ও অস্থাবর যাপনের পরিবর্তে কবিতার সমস্ত বিষয় বিবেচনা করেছো, তার থেকে জীবনের অর্থ হারিয়েছে । মুদ্রা মুখর হিরণ্ময় শব্দহাটে সে অন্ত্যমিল একলা হয়ে গিয়েছে । দোসরবিহীন ছন্দকে ছন্দ, চাদর কে চাদর আর মুদ্রা কে মুদ্রা বলার জন্য কোন কবিতা বিরাজমান নাই ।


এভাবে বাজতে থাকার নাম নূপুর হতে পারে না । বিষয় থেক বিষয়ান্তরে ভুলে ভাঁটকে তছরুপ হয়ে আছি । খড়কুটোর মত যা কিছু আশ্রয় নজরে আসে, তাকে দাদা মনে হয় । আমাদের মাথার একটি ছাদ হয়ে উঠবেন , এই ভরসায় তাকে প্রণাম করি । রাত্রিযাপনের শেষে একটি উজ্জ্বল ঊষা দেখার অভিপ্রায় যেখানে, এইটুকুই বুঝি সেইখানে আমি সমগ্রের মুক্তদলের আমি একটি অক্ষর, আমি সেখানে এক একক । আমার পরিপার্শ্বে গড়ে উঠেছে জনপদ, চকমকি শহর । সুউচ্চ অট্টালিকার পদপ্রান্তে এসে , নিজের ছায়াকে মেপে দেখি । ছায়ারও নিজের একটি সিঁড়ি আছে । একটা তলাশ্রেনী আছে । ভূমিতলকে আমি প্রণাম করে বেড়ে উঠি । স্মৃতির পদচিহ্ন আছে । সভ্যতার ইতিহাস পাঠ আছে । বিদ্যালয়, গ্রন্থপাঠ আমকে সুজলা সুফলা করে । যৌবন আমাকে শ্যামলিমার প্রেমিক হিসাবে উপস্থাপন করে । এই যে হাইওয়ে, বিমানবন্দর, দ্রুত পিছনে ফেলে যাওয়া মারুতি হোন্ডাই আমাকে শস্যভূমির পাশে এনে দাঁড় করায় । রূপসী বাংলা আর অনন্য তিলোত্তমা সেজে ওঠে সুনীলবরণ পরিধানে । এই সব বর্ণ গন্ধ সহসা হারিয়ে যাবার কথায় ভয় পাই । বিশেষণ কখন যে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে । আমার একটি প্রাচীর চাই । কে দেবে সেই দেওয়াল । কে গাঁথবে সেই ইট । হাতে পাটকেল নিয়ে কে রুখে দেবে শানিত বহিঃআক্রমণ । আমার বাসভূমিকে আপন রঙে বিবর্ণ না হতে দেবার জন্য চাই এই মুষ্ঠিবদ্ধতা । চাই একটি সামগ্রিক উপস্থিতি । একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন । একজন নেতার প্রয়োজন। ভাবি কিছু অধিকার নিয়েও, ব্যাস ঐটুকুই আমার বিষয় ভাবনা , ঐ টুকুই আমার অন্তরা, ঔটুকুই মুখড়া । কোন অন্ত্যমিল নাই । কবিতার দিনখাতার হিসাবে নিয়ে একদিন সেখানে আসেন এক পক্ষিরাজ । আকাশ আলো করে এই পক্ষিরাজের পদার্পণ দেখি । দেখি পক্ষিরাজের উপরে অধিষ্ঠিত রাজাধিরাজের অবয়ব । রাজবস্ত্রে মুক্তার ঝিলিক, শানিত তরবারি, স্বর্ণ মুকুট, কণ্ঠে গজহার, একখানি প্রসন্ন মুখের বিজ্ঞাপন নিয়ে পক্ষীরাজের পিঠ থেকে নেমে আসেন রাস্ট্রনেতা ।

তিনি বলেন , "আমি তোমাদের লোক " । অর্থাৎ তোমরা আমাদের লোক । তোমরা আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । কেউ হাত, কেউ পা, কেউ চক্ষু কর্ণ নাসিকা । তোমরা প্রামাণিক, রায়, দত্ত, দাশ, মণ্ডল বা বিশ্বাস । বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর । রাস্ট্রনেতা বলছেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের দিল্লি দেবো । চাঁদনি চক দেবো, লালকিলা দেবো, জামা মসজিদ দেবো । আমরা সমষ্টি, আমরা অনেক । বিবিধতার কণ্ঠে রক্তিম ফুটে ওঠে । বসন্তবিহার, কারোলবাগ, সিআরপার্ক, কালকাজি, দ্বারকা, সরোজিনী নগর মার্কেট । ভাষাবিদের কণ্ঠে উঠে আসে প্রগলভতা । আমরা জানি বাজারে পসরার জোয়ার , জমে উঠেছে মনুষ্যমুখর হাট । বিকিকিনির শেরওয়ানি, পাঞ্জাবী, লেহেঙ্গা, কাঞ্জিভরম আর মাইসোর সিল্কের রেশম পিছিল । মুদ্রার ঝলকানিতে আলো জলে উঠেছে দোকানে দোকানে । আমি একখানি চাদর নিয়ে ফুটে দাঁড়িয়ে তবু খদ্দের ডেকে যাই । বাবু একটা চাদর কিনবেন, একটা গামছা কিনবেন ? ভাল গামছা হবে ।

সমগ্রতার মাঝখানে বাজার আমাকে একা করে দিয়ে যায় । মুদ্রা একটি বাহক মাত্র, ভাষা চরিত্রের এক কড়িকাঠ । আমার কান্না লেখার কোন ভাষা কই । হাট একটি ভাষা প্রকাশভঙ্গিমা, পোশাক তাকে দিয়েছে বিক্রিত মুদ্রা বোধ । তবে, এই যাত্রা কেন ? কেন কারো ডাক না শুনে একলা চলা ? ঘর যখন ছেড়েছি , চলাই একমাত্র কবিতা । আমি কবিতার অনন্ত একাকীত্বে আপন পঙক্তি সাজাই । ধ্বনিচিত্রের গতি খুঁজে চলি । কোথায় পৌছাতে চাই আমি ? জানিনা । আমার আপন হাতে বোনা এই চাদর, গামছা - নির্ভীক ও একক । আমার ইন্ধন ফুরিয়ে আসে । আসন্ন বিকেলের কবিতায় তুমি তাকে পড়েছো । তুমি তাকে দেখেছো নদীর পাড়ে, রেল লাইনে, সদ্য শুকিয়ে আসা আমনধানের মাঠে । এইতো কার্তিক চলে গেলো, হেমন্তের পোশাকপ্রিয়তা থেকে রাস্ট্রনেতার যে সুতো ছিঁড়ে যায়, তুমি তার ছন্দপতন দেখেছো । জীর্ণ ফালি সময়কালকুপে উল্লেখিত নেতার রাজবস্ত্র একটি ছিঁড়ে যাওয়া ন্যাতা ভিন্ন কিছু নয় । সেই সব ছেঁড়া, আমি জানি । সেই সুতো আমি চিনি । আমি জানি, সেই ন্যাতা আমার গামছা অপেক্ষা মলিন ।


সেই রাস্তা, সেই শব্দ-মিছিল, মিত্র-যোগ, মিত্র-বিয়োগ , বাতাসে গুমটে ওঠা বিষণ্ণতা নিয়ে এইতো হলো ধ্বনি-পথ । একটি অনন্ত পাইপ লাইন । সুড়ঙ্গ । যাত্রার মাঝে হটাৎ খেয়ালে আমার ভাবনাধবনি তানপুরা হয়ে ওঠে । রাস্তা বলছে, রাস্তা নেই । হারানোর পরিভাষায় এই তো শব্দ-বিমূর্ততা । বিষণ্ণতা কোন রাস্তা হতে পারে না । সুড়ঙ্গের একটি মাত্র সত্য হলো তার প্রবেশদ্বার । জাস্ট মুভ অন । যার কোন পুব নেই, পশ্চিম হয় না । এর একটাই গতিপথঃ অনন্ত ও সঙ্গী-বিহীন অন্ধকার । সুড়ঙ্গের বহির্দ্বার একটি মিথ মাত্র । কখন যে সেই পাইপলাইন শেষ হয়ে সু একটি প্রভাত আসে সেইটা হলো মুদ্রা । ভুবন ভরা আলো থেকে কবে যে তার ভারা নেমে যায় । আমার তো ঘর নাই, তাই ঘরে আলো নাই । তবুও দিবস শেষে আমার একটা চাদর বিক্রি হলে আমি একটি মৃত্তিকার প্রদীপ কিনে আনি । প্রদীপ বিক্রেতার ঘরে কিছু মুদ্রা আসে । ট্রিগার একটি সুতো মাত্র । দুইটি প্রান্তের মাঝে একটি কার্পাস সংযোগ মাত্র কিছু নয় । বৃহত্তমের অভিপ্রায়ে একটা ক্ষুদ্রতম ব্যাং নিয়ে যৌন দণ্ডে আর আমি একটি চাপ অনুভব করি । প্রদীপ জ্বালাবো আমি । স্মলেস্ট ব্যাং । চকমকি পাইপে ঠিকরে , প্রতিফলিত হয়ে ছুটে চলবে সেই চাঁদনি । এতো রোশনাই , এতো ফাগুন , যে আলো আমি কোনদিন দেখিনাই ।