রক্তজবা বারবারা ও কালো ফুলদানি

নাহিদা আশরাফী


- কী করছো জুইফুল ?

- গল্প লেখার চেষ্টা করছি৷

- চেষ্টা করো না। চেষ্টায় বরাবরই কিছুটা জোর মেশানো থাকে। তাতে আর যাই হোক গল্প হয় না।

- হু, তাহলে তুমিই একটা লিখে দাও ।

- মোটেই না, গল্প আমি লিখি বটে, তবে তা দেখা যায় না।

- অদৃশ্য খাতা-কলম?

- যা দৃশ্যমান তার সবটা দেখতে পাও? যেমন ধরো রঙ। সব রঙ সবাই একরকম দেখতে পায়? এই যে সামনের পাকুড় গাছটার পাতা। তুমি আমি দুজনেই জানি সবুজ, কিন্তু সেই সবুজ তোমার চোখে একরকম আমার চোখে আরেকরকম। রঙের যে দেহতত্ত্ব সেটা ফাইন্ড আউট করতেই তো কত মনিষীর কত যুগ কেটে গেল ।

- একাকীত্বেরও নিজস্ব একটা রঙ আছে, ভাষা আছে জানো ?

- ও… গল্প বুঝি একাকীত্ব নিয়ে?

- মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো ? একাকীত্বটা মেঘের মত। অথবা বলা যায় পাহাড়ের মত। অথবা বারবারা ম্যাকলিনটক এর মত । লাজুক, নিভৃতচারী অথচ কী ভীষণ দৃঢ়চেতা ।

- তুমিও কী তাই নও ?

চমকে উঠে ওর দিকে তাকালাম। যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো আমার দিকে তাতে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। অনেকটা কাকের মত। নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিলাম যেন আমি ওর ধারালো দৃষ্টি দেখতে পাইনি। আমাকে বাঁচাতেই কিনা কে জানে, হেসে উঠলো।

- আরে ! এত সিরয়াস হয়ে যাচ্ছো কেন? তোমার পোশাকি নামের মানে জানো তো ? কোমলতা । এই শব্দটিও এক নিবিড় একাকীত্ব বহন করে। অনেকটা নয়নতারার মত।

- শব্দ একা! তাও আবার নয়নতারার মত !

- হ্যাঁ। নয়নতারা ফুলটা কখনো লক্ষ্য করেছো? পাঁচটি পাপড়ি একটা বোঁটায় আটকে থাকে যেন এক বৃন্তে পাঁচটি বোন কিন্তু আত্মার দরজায় টোকা দিলেই বুঝবে অপর প্রান্তের মত তারা কতই না দূরবর্তী। কতই না বিচ্ছিন্ন। অনেকটা আমাদের চোখের মত । একই দেহে কত কাছাকাছি থেকেও তারা কত একা। কেউই কাউকে স্পর্শ করতে পারবে না কোনদিন। আমরা প্রত্যেকেই এমন করেই একা নয়নতারা । গুচ্ছে থেকেও একা, পাশাপাশি থেকেও একা, এক ছাদের নীচে একা। কোটি কোটি মানুষের ভিড়েও একা। আবার এই একাকীত্বের ঔজ্জ্বল্যেই তারা কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে থাকে । দিস ইস কল্ড ’আ ক্যাপাসিটি টু রিমেইন এলোন’। বারবারার নিজের জিনেই এটা ছিলো।





এটুকু বলেই কী এক অদ্ভুত শুন্যতা মাখানো দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো বারান্দার গ্রিল গলিয়ে পশ্চিম আকাশে। মনে হল কিছুটা ক্লান্ত ও । আমাকে নয় নিজেকে শোনাবার জন্যেই কথাগুলো বলে যাচ্ছিলো। পশ্চিমের সূর্য তখনও পৃথিবীর গায়ে সোনালী রঙের শেষ প্রলেপটুকু মাখাতে ব্যস্ত। প্রকৃতির অংশ ভেবেই গ্রিলে রাখা ওর কনুই, থুতনি, নাক, কপোল আর কপালের কিছু অংশেও তুলির সেই পোঁচ লাগিয়ে গেলো যেন। আমি স্থির তাকিয়ে আছি সেই ক্যানভাসের দিকে। কী নিরাসক্ত সুন্দর! কিছুই নয় তবু চোখ ফেরাতে পারছি না। লকডাউন শুরুর পর আজ দ্বিতীয় বারের মত গহন এলো আমার ফ্ল্যাটে ।



’আ ক্যাপাসিটি টু রিমেইন এলোন’- বাক্যটি কিছুক্ষণ পরপর মার্চের অস্থির বাতাসের মত আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। চায়ের কাপটা টইটম্বুর পড়ে আছে পাশে । হাতে খোলা ’লোনলি সিটি- এডভেঞ্চারাস ইন দ্যা আর্ট অফ বিয়িং এলোন’ এর পাতা স্বাধীন স্বভাবে ফরফর করে এপাশ-ওপাশ করছে। নিঃশব্দে কত কথার সেতু তৈরি হচ্ছে আমাদের মধ্যে। ’নৈঃশব্দের ভাষা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভাষা’ - কে যেন বলেছিলো কথাটা? কেউ কী বলেছিলো নাকি আমার নিজেরই এমন মনে হচ্ছে। বিগত একমাস বিশ দিন আমি ঘরবন্দী জীবনে একটা জলহীন মৃত মাছের মত ফ্যকাসে হয়ে বেঁচে আছি । মাস তিনেক আগে আমি আর গহন হাতিরপুল বাজারে গিয়েছিলাম । মাছ কেনার যে খুব একটা ইচ্ছে ছিলো তা নয়। তবু ‘এলাম যখন একটু ঢু মেরে যাই’ টাইপ ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে মাছের ওদিকটায় উঁকি দিয়েছিলাম। মাছ দেখতে দেখতে এগুচ্ছি হঠাত পিছন ফিরে দেখি গহন প্রায় চার কেজি ওজনের একটা রুই মাছের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রথমটায় খটকা লেগেছিল। পরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি দুলে উঠলাম। ওর চোখ দুটো আটকে আছে আধমরা মাছটার কানকোর দিকে। কী প্রাণান্তকর চেষ্টায় দু’একবার নড়ে উঠলো কানকোটা। একবার লেজটাও সামান্য নাড়াবার চেষ্টা। তারপর একদম চুপ। গহন এক ঘোরলাগা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ফুসফুস বাতাস না পেলে আমরাও এমন করেই কষ্ট পেয়ে মরে যাবো, তাই না শিউলি? আমি ওর হাত ধরে অনেকটা টেনেই বের করে আনলাম মাছের বাজার থেকে।

শোবার ঘর থেকে স্লো ভিলিউমে বাজছে-

‘Did you ever see a robin weep

When leaves begin to die

That means he's lost the will to live

I'm so lonesome I could cry...’



আগে এই গানটা শুনলেই আমার কান্না পেত। ইদানীং পায় না । লকডাউনের তৃতীয় রাতে খুব ঝড় হচ্ছিলো যখন তখন এক মাথা বৃষ্টি নিয়ে হাজির। এসেই খুব স্বাভাবিক কন্ঠে তোয়ালে চাইলো। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠতেই স্বভাব মতে ধমক লাগালো, “একদিন বলেছি না , এতটা হুড়োহুড়ি করে কাজ করবে না। “

- অনেকটা ভিজে গেছো তো।

- তো? এতটা ভিজে ,এতটা ঝড়বাদল মাথায় নিয়ে তোমায় যদি দেখতে আসতে পারি আরো দু’মিনিট ভেজা অবস্থায় থাকতে পারবো। ধীর স্থির হয়ে কাজ করো প্লিজ ।

- এখন ঠাণ্ডা লাগাটা কত রিস্কি বুঝতে পারছো ?

- জ্বি ম্যাম পারছি। বিয়ের এখনো ছ’সাত মাস বাকী। এত শাসন শুরু করলে প্রেমিক বেচারার জানটা দেহ ছেড়ে পালাবে মিসেস রক্তজবা।

একেকবার একেকটি ফুলের নামে ডাকতো আমায়। আমাদের দিনগুলো সোনালু ফুলের মত এমনই আলো হয়ে উঠেছিলো শুধু ওর জন্যে । সেদিনের পর, আজ প্রায় একমাস পার করে এলো।



- রাতের মেনু কী করবো? এসো না, কিচেনে একসাথে রান্নাটা সেরে ফেলি।



গহন কোন উত্তর না দিয়েই লিভিং রুমের সোফায় গা এলিয়ে রিমোটটা হাতে নিলো। চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে হঠাৎই বিবিসি নিউজে এসে থামল । আমি আড় চোখে তাকিয়ে টের পাই গহনের মুখটায় কষ্টের কালো ছায়া।

- I can’t breathe... I can’t breathe...আহা কালো বাছা বেঁচে থাকতে কতটাই একা ছিলো! জর্জ ফ্লয়েড - কে নাম রেখেছিলো ওর ? মা না বাবা? বিরবির করতে করতেই গহনের হাত দুটো মাথার নিচে চলে যায়। সাদা সিলিং এ দৃষ্টি মেলে দেয়। ‘ ভেবে দেখো কাঠগোলাপ , সাদা সিলিং এর নিচে তুমি আমি কালো মানুষ যেমন আকাশ দেখতে পাই না, সাদা হাটুর নিচে কালো ফ্লয়েডের মা মা কন্ঠস্বরও তাই কারো কান অবধি পৌঁছায়নি। বেঁচে থেকে কতই না একা ছিলো। আর আজ মরে গিয়ে কত মানুষের ভিড়ে।‘



আমি বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া গহনের ঠোঁট দেখি। আমার রক্তচলাচল থেমে যায়, আমার হাতে ধরা গ্যাস বার্নার হাতেই থেকে যায়। অন করতে ভুলে যাই। খুব করে চেয়েছিলাম গহন টিভিটা অন না করুক। গহনের ঠোঁটে মৃত হাসি দেখতে বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে আমার। ওর পাশে গিয়ে বসতে পারলে ভালো হত। ওর হাতদুটো কিছুটা সময় নিজের হাতের মধ্যে ধরে থাকতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু কী এক অজানা কারনে ওর কাছে যাচ্ছি না। সে কারনের নাম কি? রাগ, অভিমান, ক্ষোভ, কষ্ট নাকি অন্য কিছু? নিজেই বুঝতে পারি না।



- তুমি দেখো বকুল , এলেক্স হেলির কুন্ত একা, টনি মরিসনের পিকালো একা, তুমি একা, আমি একা। একটা ছোট্ট ভাইরাস কী নির্মমভাবে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আমরা সিবাই মিলে কত একা! এই জুনেই তো কানাডিয়ান এম্বাসিতে জয়েন করার কথা ছিলো আমার। তাই না?

দীর্ঘশ্বাসটা ছাড়তে গিয়েও বুকের মধ্যে আটকে ফেলি। কলেজজীবন থেকেই ওর সফলতার সাক্ষী আমি। সেই বাধভাঙা জোয়ার, সে প্রেমেই হোক কিংবা পড়াশুনোয় কে আঁটকায় ওকে? প্রেমে পড়ে ছেলে উচ্ছন্নে গেছে এই দুঃখ যেন বাবা-মাকে পেতে না হয়, আবার পরিবার আর পড়াশুনার চাপে তার ভালোবাসার নয়নতারাও যেন অবহেলার বাতাসে দুরে সরে না যায়। সবটাতেই কী দারুণ মনোযোগী ছিলো। চাকরি পাবার খবরটা যেদিন পেলো , বলতে গেলে পুরোটা দিন আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম। কত কত প্ল্যান, কত কত শেয়ারিং। সব মনে আছে গহন। প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট সব। ওকে বলতে গিয়ে গলায় দলা পাকিয়ে আসে আমার।

- যেই পরিবার আমার এত দামী চাকরিতে খুশি হয়ে কেক কেঁটে সেলিব্রেট করলো, ভাই-বোনেরা আমায় মাথায় তুলে নাঁচতে লাগলো সেই মানুষগুলো যখন জানলো আমার করোনা পজিটিভ, এত বছরের চেনা চেহারাগুলো কী নিমিষেই বদলে গেলো। আমি আর তখন কারো সন্তান নই, ভাই নই। আমি স্রেফ একটা অচ্ছুৎ পেসেন্ট। আচ্ছা আমাদের বিয়ের তারিখটা যেন কবে ছিলো বেলি? ও হ্যাঁ বারোই নভেম্বর।



নিজেকে তখন আর ধরে রাখতে পারিনি । পাগলের মত চিৎকার করতে করতে হাতের কাছে যা পেয়েছি সব ছুড়ে মেরেছি।

“একটা মিথ্যেবাদী! মিথ্যে বলেছিলে আমায়। হাসপাতালে ভর্তি হয়েও বলেছো বাড়িতেই আছি। ভর্তির দ্বিতীয় দিন তোমাকে অজস্রবার ফোন করেছি। রিসিভ করোনি। ম্যাসেজ দিয়েছি ,উত্তর দাওনি। তৃতীয় দিন তোমার ফোন বন্ধ দেখে পাগলের মত তোমার সব বন্ধুকে ফোন করেছি। কেউ কিচ্ছু বলতে পারেনি। কেন গহন? আমার সাথে কেন এমন করলে ? অন্তত একটাবার দেখতে তো পেতাম তোমায়। আমাকে এত বড় শাস্তি দেবার অধিকার তোমায় কে দিয়েছিল?”

- ইচ্ছে করেই এটা করেছি মাধবীলতা। আমি সইতে পারতাম না। যে বিশ্বাস নিয়ে যাদের সাথে আজন্ম যাপন করেছি এই জীবন, তাদের মত তুমিও যদি সেই বিশ্বাসে চির ধরাও! যদি তুমিও না আসো সব জেনে! যদি তুমিও... অন্তত যাবার আগে এই সান্ত্বনাটুকু নিয়ে গেলাম আমার জলভরা দিঘি আর পদ্ম আমারই আছে। এক বন্ধুকে ম্যাসেজ দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম আমার শেষক্রিয়া সম্পাদন হলে তোমাকে যেন জানায়। শেষমুহুর্তটাতে যখন বুকের ভেতরে এক ফোঁটা বাতাসের জন্য দম আটকানো যন্ত্রণা হত তখন অই মাছটার কথা খুব মনে হত। আবার পরমুহুর্তেই মনে হত, আমি ভুল ভাবছি, যা কিছু ঘটছে সব ভুল । এখনি মা দৌড়ে এসে বলবে বাবা, ‘এই তো আমি। কিচ্ছু হয়নি তোর।একটু পরেই তোকে বাড়ি নিয়ে যাবো।‘ বাবা খুব হইচই করবে যেমন রোজ করে। বোনটা এসে হাত ধরে বলবে, ‘ভাইয়া পিংক কালারের ড্রেসটা কবে কিনে দিবি? আর তোর বিয়ের শপিং কিন্তু আমিই সব করবো।‘ তা হয়নি বেলি। আমার মৃতমুখটাও কেউ দেখতে আসেনি। বিশ্বাস করো কবরে যাবার আগ পর্যন্ত আমি কী অপার তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম, কী করে বোঝাই তোমাকে...



গহনের শূন্য দৃষ্টিতে তখন একটা জুনের সাফল্য আর একটা নভেম্বরের স্বপ্ন এপ্রিলের হাহাকার হয়ে নামতে থাকে।

- না বলে যদি চলেই যাবে তবে ফিরে এলে কেন?

আমার চোখ থেকে জলের ফোঁটা নিচে পড়তে দিলো না গহন। আলতো করে তর্জনীতে নিয়ে নিজের বা হাতের অনামিকায় খুব সাবধানে রেখে দিলো। আমার চিবুক ছুঁয়ে অভিমানে ফোলানো নাকে আদর করে বললো, “ এটুকুই নিতে এসেছিলাম মল্লিকা! আমি আসবো। আবারো আসবো। এমন করেই। তোমার কাছে। তোমার পাশে। তোমার আমার সাজানো স্বপ্নে। উঠে দাঁড়াও আমার হাসনাহেনা। তোমাকে বাঁচতে হবে। বারবারার মত , রক্তজবার মত ।‘



কতটা সময় এমন অচেতন ছিলাম আমি জানি না। আচমকা ঝোড়ো বাতাসের শনশন শব্দে নিজেকে লিভিংরুমের কার্পেটে আবিষ্কার করলাম। তাড়াহুড়ো করে জানালা বন্ধ করে পিছন ফিরতেই টের পেলাম ভাঙা কাচের টুকরোতে পা কেটেছে অনেকটা। বেশ খানিকটা রক্ত রিমোট আর ভাঙা কালো ফুলদানিতে লেগে আছে। আমি বিমুঢ় তাকিয়ে থাকলাম সেই কালো ফুলদানি লাল রক্ত আর সাদা রঙের রিমোটকন্ট্রোলারের দিকে।

ভুলে গেলাম আজ রাতে আমার একটি গল্প লেখার কথা ছিলো।