বন্দিশিবিরে দ্যাখো একা একা ঢুকে পড়ে পাখিরা

সুবীর সরকার


"এলুয়ার গোরে গোরে

কাশিয়ার তলে তলে

সোনা বন্ধু মোর আইসা যাওয়া করে"

#
এই করোনার দিন।এই অচেনা হয়ে যাওয়া পারিপার্শ্বিকতায় তীব্র এক একাকীত্ব জাগে।অদ্ভুত এক বিষাদ।আর বন্দিশিবিরে বসে স্মৃতির কোরাসের ভেতর ডুবে যেতে থাকি।কত দৃশ্য কত কত ছবিরা ছায়া ফেলে যায়।এভাবেই হয়তো একটা গদ্য লিখিত হয়েই যেতে থাকে,আর ভেতর একাকীত্বের মায়া ও ম্যাজিকল্যান্ড।
2।
সেই বিশ ফরেষ্ট কুড়ি নদীর পৃথিবীতে ভরসন্ধ্যেতে আমরা দেখি হেমকান্ত হেঁটে চলেছেন।হয়তো কোন নদীর খেয়া ধরতে বা ভাঙা হাটের দিকে।জনমভর এভাবেই হেমকান্তর হেঁটে চলা।সে হলো হাটাই।কেউ যদি তাকে প্রশ্ন করে তার হাঁটা নিয়ে,হেমকান্ত তখন একথাই বলে;এই হাঁটা কিংবা মাইল মাইল হেঁটে চলাটাই তার জীবন।নদী ফরেষ্ট গঞ্জ মানুষ নিয়ে এই যে দিনদুনিয়া এই ভেতরেই সে বেঁচে থাকে রোদ, বৃষ্টি আর মেঘের মতন।
একটি সরকারী কাজে শীলতোর্সার উজানে হাতিডোবার চরে এক জুন দুপুরে হেমকান্তর সাথে দেখা হয়ে যায় রতন মল্লিকের।অদ্ভুত এই মানুষটি রতনের নজর কেড়ে নিয়েছিল।হেমকান্ত রতনকে জানিয়েছিল সেই কত কত বছর আগে,তখন কোচবিহারের মহারাজা স্বয়ং শিকারে আসতেন এই কুড়ি নদী বিশ ফরেষ্টের পৃথিবীতে;মহারাজার হাতি ডুবে মরেছিল এখানে।সেই থেকে এটা হাতিডোবার চর।অনেক বছর বাদে হেমকান্তকে নিয়ে একটা গল্প লিখে পুরস্কার পেয়েছিলেন রতন মল্লিক।
3।
কবিতাজীবন বলে কিছু হয় কি।কবিতাভাবনা আবার কি।এই উত্তরহীন এই সমাধানহীন প্রশ্ন কেমন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
আসলে কবিতা লিখি।কবিতার সাথে লিপ্ত হয়ে থাকি।কবিতা আমার কাছে গভীর এক আশ্রয়।ভরসার জায়গা।
জীবন জীবনের মত।সে জীবনে কবিতা ঘন হয়ে বসে থাকে।কবিতা থেকে দূরে কখনোই আমার জীবন হতে পারে না।হয়তো এটাই কবিতা জীবন।
জনমভরের এক স্মৃতি থাকে মানুষের।তাড়িত দুঃখের মত সব স্মৃতিরা।স্মৃতি জড়িয়ে স্মৃতিকে গহীন গাঙের মত বুকের মধ্যে টেনে নিয়েই মানুষের আস্ত এক বাঁচা।এক জন্মের বাঁচা ফুরিয়ে গেলে বাঘবনে শীত নামে।পুরোন স্মৃতিদের সরিয়ে জায়গা দখল করে নুতন স্মৃতিরা।স্মৃতি তো মানুষের জীবনের সেরা সম্পদ।আমি সবসময় স্মৃতিকে নিজের সমগ্রতা দিয়েই অনুভব করি।কিন্তু কখনোই স্মৃতিকাতর হই না।হাতি মাহুতের পৃথিবীতে সেই কবেকার শোনা হস্তীকইন্যার গানগুলি আমার কাছে কখনো অতীত হয় না।সমকালের স্মৃতি হয়েই থেকে যায়।কিছু কিছু পুরোন ছবি,দৃশ্য কখনোই হারিয়ে যেতে দিই না।স্মৃতির প্রবহমানতা থেকে আমি আমার সমগ্রতায় বারবার টেনে আনতে থাকি ট্রান্সজড়ানো স্মৃতিদেরকেই।
আমি জানি,দু'চার বছর আগে আমি যাদের সঙ্গে ছবি তুলেছি কিংবা আজ যে ছবি তোলা হবে সেসবের অনেক কিছুই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে কালখণ্ডের মলিন ধুলোয় শুয়ে থাকবে।এটাই নিয়তি।পেরিপেতাইয়া।স্ মৃতি তো নদীবন্দরের হলুদবরণ পাখি।সমগ্র জীবন ধরে এই স্মৃতি মনমরা খেপলা জলের মত আমাদেরকে জড়িয়েই রাখে।
এই অনিবার্য স্মৃতির প্রহার,পীড়ন বয়ে নিয়ে যেতে যেতে বুঝে ফেলি,আমার কবিতাভাবনায় খুব ক্রিয়াশীল থাকে এই স্মৃতির প্রহর ও প্রহারগুলি।
4।
জীবন জুড়ে গল্পের পর গল্পের ঢেউ।সেই সব ঢেউয়ের ওপর ভাসতে থাকে সমস্ত দেখা ও না দেখাগুলি।আমার কবিতার জোতজমিতে খুব একার এক একাকীত্ব রয়েছে।আসলে কবিতা তো চিরকালীন এক আবহমান গান হয়েই ঘিরে রাখে একজন কবিকে।ইথার তরঙ্গের ম্যাজিক ক্যানভাস জুড়ে কবিতার ঘর ও বসতি।মিথের মতন।মিথবাহিত এক তাড়নার মত।মিথ তো আসলে ফেটে ফেটে ছড়িয়ে পড়া তুলোবীজের মতো।আমি তো কবিতায় মিথের নির্মাণ ও বিনির্মাণ নিয়েই জেগে থাকি।কবিতা লেখার জীবন আমাকে ঘুমোতে দেয় না।আমি ধরতে পারি না প্রকৃত শব্দ।চিত্রকল্প।একা একা ঢুকে পড়ি আন্ধারময় বাংকারের ভেতর নুতন কবিতা কুড়িয়ে আনবো বলেই।