কালাবর্ত

বেবী সাউ

জুয়ান, চোখ বন্ধ করলেই অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হতো এবং সে হারিয়ে যেতে চাইতো। তেমনভাবে এই পৃথিবীর কাছে জুয়ান বিশেষ কিছুই চাইত না শুধু কয়েকটি বিষয় ছাড়া। সে আরও বেশি বেশি করে উইয়ের ঢিবি এবং বেশ কিছু ভেন্টিলেটর চাইত। এইযে বিরাট বিরাট সব কমপ্লেক্স, সে স্বপ্ন দেখত, সবগুলো ভেন্টিলেটরে ছেয়ে গেছে এবং সবমানুষ ভেন্টিলেটরের মধ্যে ঢুকে বসে আছে।

জুয়ানের পালিত মা এবং তার সৎ বোন যখন একেকটি কাজের দিকে তাকিয়ে থাকতো এবং জুয়ানকে এক অসামাজিক এবং স্বার্থপর হিসেবে দেখাতে চাইত এই আলোময় পৃথিবীর কাছে এবং ঘটনার তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ স্বরূপ তারা প্রায় জুয়ানকে কোণঠাসা করে ফেলত, জুয়ান চোখ বন্ধ করত এবং নিঃসঙ্গ ভেন্টিলেটরের মধ্যে ঢুকে পড়তো। এই ভেন্টিলেটরের মধ্যে আশ্চর্য এক গন্ধ তাকে বেহুঁশ করে তুলতে পেরেছিল সহজেই এবং সে গন্ধের ভেতর সে তার অতীত জীবনের দৃশ্য খুঁজে পেত।

ছোট্ট এই উপত্যকার অনেকটা অংশ শান্ত এবং নির্জন ছিল। চারপাশে চরে বেড়ানোর মতো ঘোড়া, বেশ কিছু ভেড়া আর অসংখ্য উইয়ের ঢিবিকে জুয়ান তার ছোটবেলার অনেকটা সময় দিয়ে দিতে পেরেছিল এবং তাতে তার বাবা, যিনি জুয়ানকে গাছের কথা বলতেন এবং রাতের নক্ষত্রদের সঙ্গে পরিচয় করে চিনিয়ে দিতে পেরেছিলেন লুকিয়ে পড়ার একটা অসামান্য পথ, জুয়ানকে উইয়ের ঢিবির মধ্যেও সেই ভেন্টিলেটরের খোঁজ দিতে পেরেছিলেন। জুয়ান নিজে বুঝতে পেরেছিল এই বোন এবং পালিত মা তাকে সেই শৈশব অবস্থায় গলা টিপে মেরে ফেলতে চাইছিল। তারা তখন থেকে একটা চারিত মৃত্যুর মতো জুয়ানের ভেতর ঢুকে পড়তে পেরেছিল। জুয়ানও মৃত্যুর আস্বাদ পেতে আরম্ভ করেছিল কিন্তু তার ছোটবেলার সঙ্গী কিছু কাঠবিড়ালি সেই মৃত্যুকে থামিয়েছিল। আর তখনই বিরাট এক ঝড় এসে পালিত মা এবং জুয়ানের ভেতর বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। ফলস্বরূপ, জুয়ানকে তখনই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়নি কিন্তু জুয়ান অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অদ্ভুত এক রাস্তার খোঁজ পেয়েছিল। আর সে বেশ আনন্দিত ছিল।

হঠাৎ করে কয়েকটি বাদুড়, যারা খুব নিঃসঙ্গ ছিল এবং কবরখানা থেকে উড়ে এসেছিল এই শহরের জনবহুল এলাকার দিকে, তারা নিশ্চয়ই ভেবেছিল কোলাহল তাদের একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। জুয়ান এসব খবর নিয়মিত পড়ছিল এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী এসব অভিজাত বাদুড়দের কোনরকম পরীক্ষা না করে বিশ্বাস করেছিলেন। তাদের জন্য উপযুক্ত ভিসা এবং পাসপোর্ট দিয়ে মানুষের সঙ্গে এক করে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। আর যেহেতু জুয়ানের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত, সবার সমান অধিকার ভেবে দেশের কমিউনিস্ট দলগুলোও এই বাদুড়ের অধিকার প্রাপ্তির সংবাদে খুশি হয়েছিল।

শুধু জুয়ান খবর পেয়েছিল সমস্তটাই একটা গভীর ষড়যন্ত্র এবং তাদের ছোট্ট এই দেশ গভীর এক অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। কয়েকটি উইপোকা তাকে এই খবর দিলেও জুয়ানের হাতে কোনও উপায় ছিল না কেননা এই রাষ্ট্র জনমতের উপর নির্ভর করে। নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও বেশ কিছু মতের প্রয়োজন। কয়েকটি উইপোকা এবং জুয়ান ইচ্ছে করলেও, তাদের কাছে বিরাট জনমত না থাকার ফলে তারা এর বিরোধিতা করতে পারেনি। জুয়ানও ততদিনে অন্ধকারকে ভালোবাসতে আরম্ভ করেছে। তার কাছে এসব ষড়যন্ত্র মূল্যহীন মনে হয়েছে। আর যেহেতু প্রতিটি বাদুড় রাতের বেলায় ঘুরে বেড়ায়, সেক্ষেত্রে জুয়ানের জন্য রাতগুলো নির্ঘুম এবং রহস্যময় হয়ে উঠলো। সারারাত বাদুড়দের কার্যকলাপ লক্ষ্য রাখায় নিযুক্ত রাখত সে এবং দিনের বেলা ঘুমাত। তাতে তার পালিত মা এবং বোনের হাত থেকে বেশ মুক্তিও পাওয়া যেত!

শুধু মাঝেমধ্যে সে ঘুমের মধ্যে আশ্চর্য ঠান্ডা অনুভব কর‍তে লাগলো। জুয়ানের বাবা বহুদিন আগেই কিছু বেদুইনদের সঙ্গে বেরিয়ে গেছিলেন আর পথ তাকে ফিরতে দেয় নি। তাই ঘুমের মধ্যে অনুভূত এই ঠান্ডাকে কাবু করার মতো উষ্ণ হাত জুয়ানের কাছে ছিল না। কয়েকটি উইপোকা মাঝেমধ্যে তার শরীরে ঘুরে বেড়াতো আর জুয়ান শিউরে শিউরে উঠতো। তাছাড়া জুয়ানের অন্য কোনও শীতবস্ত্রও ছিল না। কুঁকড়ে ওঠা শরীর নিয়ে জুয়ান বাদুড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতো। একদিন সে লক্ষ্য করলো বাদুড়ের সংখ্যা কমছে। গত তিন চার দিনে সে প্রায় ছয়টি বাদুড়ের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করলো। দশ -বারো দিনে তা দাঁড়ালো একটিতে। শেষ বাদুড়টি, একদিন জুয়ানের ভেন্টিলেটর থেকে আর বেরোল না। পচা একটা দুর্গন্ধ জুয়ানের নাকে এসে লাগলো। এবং জুয়ান এবং তাদের উপত্যকা আরেকবার শিউরে উঠলো...

অবশেষে জুয়ান ঢুকে গেল তার নিজস্ব ভেন্টিলেটরে। তার পালিত মা এবং বোনের জন্যও সংগ্রহে ছিল দুটো ভেন্টিলেটর। সারা উপত্যকা নির্জন হয়ে গেল।

ঘোড়াটি জুয়ানের উঠোনে একলা দাঁড়িয়ে থাকা আপেলের গাছটির কাছে এলো। চুপচাপ কিছু বোঝার চেষ্টা করলো এবং মিলিয়ে গেল!

জুয়ানের পোষা উইপোকা এবং কাঠবিড়ালি প্রথমে দেখে নিল দেওয়াল এবং আপেল গাছটির শেকড়...

জুয়ান আবার সেই পচা গন্ধটি পেল এবং এবার কিন্তু সে আর শিউরে উঠলো না...