একলামি একলামি

অপরাহ্ণ সুসমিতো

ঘুম থেকে উঠলাম মাত্র আর মনে হচ্ছে এখনো ঘুমাচ্ছি । প্রতিদিন রাত জাগি। রাত যত বাড়ে ঘুম তত পালায়। সজীব হতে থাকি একলা হবার ঘোরে। আজকে শরীর ভালো লাগছে না। মানুষ কেন ঘুমাবে এই নিয়ে ভাবছি।

আমার একটা ছোট চিত্রল হরিণ আছে নাম কুম্ভকর্ণ।
খাটের তলা থেকে তার নাক ডাকার শব্দ আসছে ; ঠিক নাক ডাকার শব্দ নয়। তবে মনে হলো ঘড়ঘড় একটা শব্দ। আমি প্রাণী অনেক ভালোবাসতাম, হরিণটাকে প্রতিদিন সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে শাওয়ার করাতাম। করাতাম বলছি কারণ এখন করাই না। অনেকটা অতীত কিম্বা কিছুটা নিকট অতীত।
হরিণটার জন্যে মায়া লাগছে। ওর গা থেকে বোটকা একটা গন্ধ আসছে। আজকাল হরিণটা কিছু খাচ্ছে না, তার প্রচন্ড কাশি। হরিণের কি কাশি হয়? সে কি মানুষের মতো শব্দ করে কাশি দেয়?

আমি একা মানুষ নিরিবিলি থাকি বন্ধু বান্ধব আছে কালেভাদ্রে তাদের কাছে যাই। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার কোন বন্ধু নাই। নাহ এটা মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে আসলে বন্ধু আছে পরে বলছি। এই গুহাবন্দি থাকতে থাকতে সূর্যের আলো ভয় করে, মানুষের শব্দ ডর করে। পৃথিবীর সবাই এখন দূরত্ব রেখে কথা বলে। বিনিময় করে উষ্ণতা।

লেখালেখিময় সুন্দর একটা বাড়ি আমার। আজকাল প্রাণী নিয়ে চিন্তা করছি কিন্তু আমার চিন্তার বিষয়বস্তু মানুষ মানব জাতি ও একলামি। একলামি নিয়ে চিন্তার অন্যতম কারণ আমি এই গুহাবন্দি কয়েক মাস লিখতে পারছি না। মা এসেছিলেন ফেব্রুয়ারিতে, গ্রাম থেকে শহরে এলে উনি দুদিনের বেশি থাকেন না। হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায়। গ্রামে ওনার ভালো লাগে এখানে দম বন্ধ লাগে। আমি মা’র সাথে গল্প করতে পারি না, খানিকটা অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড।

হরিণটা কিছু খাচ্ছে না এটা নিয়ে খুব ভাবছি। গনি মিয়াকে এই লকডাউনে মাইনেসহ ছুটি দিয়েছিলাম। উপায় না দেখে গনি মিয়াকে ফোন করে বলেছি ওর জন্যে কাঁঠাল পাতা জোগাড় করতে। গনি মিয়া রাজি হয়নি। ধারণা অনেক দূর থেকে আনতে হবে তাই হয়ত... কিন্তু গনি মিয়ার ভাষ্য হরিণটা সহসা মারা যাবে। তাই সে আনবে না। আমি রাগী মানুষ নই, শান্ত । রাগ লাগছে যে হরিণ নিয়ে অতি মাত্রায় ভাবছি কেন? হরিণটাকে বাইরের বারান্দায় রেখে আসলাম। সোয়েটারটা পরে জানালার পাশে ঝিম দাঁড়িয়ে আছি। মার্চের শেষ তারপরও ঠাণ্ডা যাচ্ছে না। বাইরে কুয়াশার কারণে কিছু দেখা যাচ্ছে না।

লেখালেখি আমার চোখের মতো, চোখ কেন ছেড়ে চলে গেলো! চোখ কেন ছেড়ে চলে গেলো এই ভাবনাটা আঁকিবুকি করছে আনমনে জানালার কাচে। মুছে ফেলি। একটা নাম লিখতে ইচ্ছা করে, ঘষা কাচে নাম লিখলে কি সেটা ওপার থেকে পড়া যাবে?

ঘরের ভেতরে কখনো সোয়েটার পরি না। এবার মা দিলেন এক রকম জোর করে। আজ শীত লাগছে। আজ সোমবার। আজ কী টুনটুন আসবে লুকিয়ে! ও এলে খুব ভালো হতো আমার শীত লাগত না। ও সামাজিক দূরত্ব মানতে চায় না। বলে তুমি আমি ভিন গোলার্ধের এলিয়েন। আমাদের কোন ভাইরাস ছোঁবে না। আমাদের শরীরে প্রণয় স্যানিটাইজার মাখা আছে। মেঘের মতো এক টুনটুন। আমাদের দেখা হয়েছিল কোথাও। সেই থেকে আমরা খুব ভালো বন্ধু। ওর অবশ্য আসাই হয় না এখন, খুব খুব কম আসে। আমি আসতে বারণ করলে রাগ করে।

বলে তুমি মেধাবী কিন্ত কোন কাজের না। ও খুব ভালো ছবি আঁকে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে সমাজ নিয়ে দেশ নিয়ে মেয়েদের কষ্ট নিয়ে। ও আমার মতো লেখে। ওকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এই গুহাবন্দি সময় লিখতে পারছে কিনা; বলেছে এমন ওর হয় না। ও পারে। আর না পারলেও টেনশান করে না। বই পড়ে, মাস্ক পরে একলা একলা কোথাও ঘুরতে চলে যায়। যখন কথা বলে আমাকে বোঝায়; ওর সব কথা আমার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বের হয়ে যায়। ও মেঘলা আকাশের মতো শরতের মেঘের মতো গাছের সবুজ পাতার মতো। আমাদের যা কিছু প্রিয় ভীষণ, অপারগ আমরা সেখানেই তব প্রকাশে। ইচ্ছা দুনিয়াকে জানানোর ইচ্ছা গরাদ করে রাখি নিজের মাঝে। এই অপারগতা কখনো সুখের শুধু নিজের ও টুনটুনের জন্য। কখনো এই অপারগতাই কুড়ে কুড়ে খায়।

এই যেমন চাইলেই পারি না ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়তে। স্রোত যেমন সহজেই ছুঁয়ে যায় তীর। অন্ধের মতো ঘ্রাণ চেনে সঙ্গম, দেয়ালের এপাশ ওপাশ। ভিজি ভেজাই। অবদমনে নিস্তেজ করে চলি। স্পর্শ গরাদ। মাথায় মুখে মনে পপকর্ন ফোটে কিন্তু আঙ্গুলে অপারগতা ভর করে।
লিখতে গেলেই আঙ্গুল ফিরে ফিরে আসে। লেখারাও কি তবে অভিমানী? আটকে রাখে মগজ? কাঠ ঠোকরার মতো পেরেক বসিয়ে খুঁটে খুঁটে খায়। হাত ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো রক্তাক্ত অসাড় পড়ে থাকে।

ও বুঝতে পারে না আমি কত ভাবছি। ও ভাবছে আমি ওর সব কথা শুনছি। জানালার কাচের ওপাশটা ঝাপসা আমার বাগানটা দেখা যায় না দূরের ঝিলটা দেখা যায় না । কাচের গায়ে আঙ্গুল দিয়ে লিখলাম টুনটুন।

তবুও বিষণ্ণ লাগছে না ল্যাপটপ খুলে বসলাম লিখব আমি লিখব কিন্তু লিখতে পারছি না। টুনটুন রোদ রঙের একটা শাল জড়িয়ে বসে আছে ওকে ডেকে বলতে ইচ্ছা করছে মাস্ক খুলে বসো, তোমাকে পরিপূর্ণ দেখি। বন্দিদশায় তোমাকে কেমন দেখায় দেখি তো। চলো বারান্দায় বসি। লকডাউন উঠে গেলে সমুদ্রে যাব ডলফিন দেখতে। আমরা দুজন চীনের উহান শহর থেকে জুতো কিনব। সেই জুতো পায়ে মচমচ করে বাগানে বেড়াতে যাব। তার আগে আমাকে অনেক লিখতে হবে ।

গনি মিয়া এসে দরজা নক করছে অথচ খুলতে ইচ্ছা করছে না। মনে হয় কাঁঠাল পাতা এনেছে। দরজা না খুলেই বললাম বাইরে হরিণটা আছে ওকে দাও। গনি মিয়ার আর সাড়া শব্দ পেলাম না।
লেখার চেষ্টা করছি। ভেতরটা ডাকছে বাবা তুমি কবে আসবে? আর আসবে না? আশ্চর্য আমি লেখাকে বাবা ডাকছি কেন? একবার টুনটুনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি কি লেখাকে কোন বিশেষ নামে ডাকো? ও নির্দ্বিধায় বলেছিল; হ্যাঁ ওকে বর্ণ বলে ডাকি। চমকে গিয়েছিলাম কারণ ও মাঝে মাঝে আমাকে বর্ণ সম্বোধন করত ।

ওকে কিছু বলিনি কিন্তু ভেতরে তীব্র ভালো লাগছিল। টুনটুনের দেয়া নতুন শার্টটা বের করেছি পরতে ইচ্ছা করছে না মনে হচ্ছে শার্টটা নতুন থাকুক। পুরানো জুতা আর মোজাটা বের করে পরিপাটি করে রেডি হলাম। মোজা জুতা পরে সোফায় চুপচাপ বসে আছি। এ রকম আমি প্রায় করি রেডি হয়ে বসে থাকি। কোথাও যাব না।

হরিণটাকে আনতে গেলাম। গনি মিয়া চলে গেছে কাঁঠাল পাতা আনেনি সে। হরিণটাকে কোলে করে খাটের তলায় শুইয়ে রেখে আসলাম শীতে কেমন যেন জমে গেছে মনে হলো। কাপড় দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিলাম। হরিণটা মনে হচ্ছে ঘুমু।

ঘরে আমার সাইকেলটা অনাদরে পড়ে আছে ভাবছি এটাকে কার্গো করব। সাইকেল ছাড়া কোথাও যাওয়া মানে নিজেকেই সাথে না নেয়া । কি-বোর্ড আর ল্যাপিটাকেও সাইকেলের সাথে কার্গো করব কিন্তু কোন দেশে যাব এখনো জানি না। হরিণটাকে পশু হাসপাতালে দিয়ে আসলে কেমন হয় ! গনি মিয়াকে কিছুক্ষণ ডাকলাম তার সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। বাসাটা ভীষণ নীরব লাগছে হরিণের কোন অস্তিত্ব নেই কাশছে না কেন? খাটের তলা থেকে বের করলাম জোরে জোরে ধাক্কা দিলাম। খুব ঠান্ডা শরীরের হরিণটা কি মারা গেলো ?

দ্রুত বাড়ির বাইরে চলে এলাম গনি মিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে কণ্ঠস্বর বসে আছে আওয়াজ বেরুচ্ছে না। দূরে দেখলাম গনি মিয়া বসা। আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। বললাম গনি মিয়া এসে একটু দেখো হরিণটার কি হয়েছে! গনি মিয়া এলো দেখে বলল কুম্ভ মারা গেছে। আমরা দুজন মিলে বাড়ির পেছনের আম গাছের তলায় ওকে কবর দিলাম । গনি মিয়া কাঁদছে অথচ আমার কোন ভাবান্তর হচ্ছে না। একটু থমকে গেছি কেবল। ল্যাপটপ খুলে আবার বসলাম, লিখলাম। বর্ণ শব্দ ভাষা লেখা। স্ক্রিনটা ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলাম।

মাথার ভেতরটা চিন চিন করছে দ্রুত নেটে ঢুকলাম। তিব্বতে যাব হিমালয়ের কাছে। যেখানে খোলা আকাশ মেঘেরা কাছাকাছি যেখানে অপার শান্তি সেখানে যাব। যেখানে একলামি নেই, যেখানে বন্দিদশা নেই।

আর ফিরব না।

খাটের নিচে হরিণটার স্বপ্নছায়া মুখ ও কাজল চোখটা দেখতে পাচ্ছি। ও তো নেই তবে কাকে দেখছি আমি? টুনটুন আবার এসে দূরের চেয়ারে চাপচুপ বসে থাকে নিরিবিলি। আলোময় এক পাশ। আরেক পাশ দেখা যাচ্ছে না। হরিণটার মতোই ছায়া ছায়া। বাতি নিভে গেলেও ঘরের দেয়ালে চাঁদের ছায়া পড়ে। অন্ধকার বলে কী কিছু আছে!

কার সাধ্য মানুষকে গুহাবন্দি করে রাখে!

হরিণটা পরাঙ্মুখ করে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আমি লিখতে পারছি।