ভাষংক্রমণ

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

একা বললেই কি আর একা হওয়া যায়? একা শব্দটা কত একা বলুন তো পাঠক? একের সঙ্গে ঐ যে আ-কার যোগ করে তৈরী হয় 'একা' শব্দ, কি থাকে ঐ আ-কারে, আকারে? এক মানে এক। সংখ্যা এক। মানুষ এক। কিন্তু তার সঙ্গে আ-কার জোড়ার পর এক যখন এক একা হয়ে যায়, তখন সত্যিই কি সে একা? যোগ কি তবে বিয়োগ?

লোকটা এসব এলোমেলো চিন্তা করতে করতে হাতে একটা বই তুলে নিলো। যতদিন বই খুললে সাদা পাতায় কালো অক্ষরের কলকাকলি শোনা যাবে ততদিন একাকিত্ব থাকলেও বিচ্ছিন্নতা থাকবে না। অক্ষরের সঙ্গে জুড়ে থাকা যাবে। ও তো সারাজীবন তাই চেয়েছিল। আর জীবন? জীবনবাবু ওর থেকে ঠিক কি চেয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর নেই লোকটার কাছে। এসকল প্রশ্নই তো ওকে একা হতে দিচ্ছে না।

২০২০ সালটা যেন একা হয়ে যাবার বছর। সংক্রমণের ভয়ে সবাই গৃহবন্দী। আত্মনির্বাসন নির্বিকার হয়ে গেছে। লোকটাও গ্রহবন্দী, একা। নিরালা তো পছন্দ তার কিন্তু একাকিত্ব ব্যাপারটাই হয়তো বড় বেয়াড়া, নাছোড়বান্দা। যখন অজস্র কাজের চাপে কিছুটা একাকিত্ব চায় মানুষ, তখন পায় না আর অন্য কোন সময়ে যখন বিচ্ছিন্ন লাগে, জনসমাহিত হতে চায়, তখন একাকিত্বের আধিক্য দৃষ্টিকটু হয়ে ঘিরে থাকে চতুর্দিকে।

একদশক আগে উইলিয়াম বারোজের গল্পে একটা বাক্য পড়েছিল লোকটা। সাহিত্য মানে তো সঙ্গে থাকা, গলায় আটকে থাকা। ছিপে মাছ আটকে থাকার মত। অথবা ছোটবেলায় দেখা সেই ফেভি কুইকের বিজ্ঞাপন। লোকটা ছিপে আঠা লাগিয়ে মাছ ধরছে। মাছগুলো যদি শব্দ হত? কি আঠায় জোড়ে শব্দেরা?

যাক, যা বলছিলাম, বাক্যটা থেকে গেছে। শব্দতরল। শব্দগরল। রক্তবীজের সংক্রমণ। মাথায় আটকে রয়েছে বাক্যটা: "Language is a virus from outer space." ভাষা নিজেই এক সংক্রমণ। অন্যগ্রহের থেকে উড়ে এসে শরীরের ওপর জুড়ে বসা এক প্যারাসাইট। মানুষকে সে একা থাকতে দেয় কি? একদুদাগ লেখালিখি করতে গিয়ে, গল্প ভাঁজতে ভাঁজতে কেটে যাওয়া বছরগুলোর দিকে ফিরে তাকালে সত্যিই তো ভাষার সংক্রমণ চোখে পড়ে।

করোনা লকডাউনের জোরজবরদস্তি একাকিত্বে লোকটার মনে একটা অদ্ভূত ভয় দানা বাঁধছিল।মনে হচ্ছিল হয়ত বই খুললেও সে আর কোন শব্দ দেখতে পাবে না, অক্ষর দেখতে পাবে না। সাদা পাতার সেই কফন-ভয় গ্রাস করবে তাকে। লোকটা কি তবে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে? দুচোখের ওপর- নীচে নিষ্ঠুর কাজলের মতো সময় এসে বসেছে একান্ত নিজস্ব এক কালিমা নিয়ে। একে কি অন্ধত্ব বলা যায়? সাদা পাতা তো দিব্বি চোখে পড়ছে। বাকি সব দেখতে পাচ্ছে! অথচ বই খুললে তাতে পড়ার মত কোন শব্দ দেখতে পাচ্ছে না। পরিস্থিতি বলপূর্বক একাকী করে দিলে হয়ত দুঃস্বপ্নের মত ফ্যান্টাসি এসে গলায় চেপে বসে। কণ্ঠরোধ করে।

বই অন্ধকার হয়ে গেলে, ধপধপে সাদা বনে গেলে পাছে ভাষা-অন্ধত্ব অন্তিমপথে নিয়ে যায়, সেই ভয়কে জয় করার জন্য এঘর ওঘর ঘুরে ঘুরে জোরে জোরে নতুন বই পড়তে লাগল লোকটা।জোরে পড়তে সে বরাবরই ভালোবাসে। এই ভালোবাসার কথা বলায় একবার একজন বলেছিল, 'তার মানে তুমি নিজের গলাটা শুনতে ভালোবাসো!' তাই তো! তাই কি? এই দেখুন পাঠক! আবার মনে আটকে থাকা এক বাক্য। তবে এবার সাহিত্য নয়। ব্যক্তিকথনের স্মৃতিবাক্য। অপরের কণ্ঠনিঃসৃত আপ্তবাক্য। এভাবেই কি ভাষা সংক্রমিত হয়? এই বাক্যেরা হয়ত লোকটার থেকেও একা। একা অথচ অনেক।

লোকটা কি তবে নিজের গলা শুনতে ভালোবাসে বলেই জোরে জোরে পড়তে পছন্দ করে? প্রশ্নটা কঠিন কারণ একেকটা বইয়ের পাতায় একেকটা আলাদা গল্প, কবিতা, আখ্যান, গদ্য। সকলে প্রত্যেকে একা শুধু তাই নয়, আলাদাও বটে। একটি বইয়ের অক্ষরপথ আরেকটি বইয়ের অক্ষরপথের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তাই একেকটা বই জোরে পড়ার সময় কি একই গলা শোনা সম্ভব? এক মানুষ পড়লেও গলা কি আর এক থাকে নাকি পাঠক হরবোলা হয়ে যায়? এইসব জ্যান্ত জান্তব প্রশ্নেরা একাকী লোকটাকে একা হতে দেয়না। লোকটা এঘর ওঘর ঘুরতে ঘুরতে জোরে জোরে বই পড়তে থাকে।

তখনই হঠাৎ খেয়াল হয় ওর। একটা ঘরে গেলে স্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এঘরে একলা পাঠের ধরতাইটাই যেন আলাদা। চতুষ্পার্শ্ব থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে স্বকর্ণে ফিরে আসছে কণ্ঠস্বর। নাটকীয় এই প্রতিধ্বনির কারণ একলা ঘর। লোকটার বাড়িতে এটাই একমাত্র ঘর যেখানে কোন আসবাব নেই। আজ প্রায় তিনবছর হল এবাড়িতে থাকে কিন্তু এই ছোটঘরটা একদম ফাঁকা। শুধু জানলার কাছে মাকড়শার জাল। এই যা ফার্নিচার। আর কিছু না। ঘরটা ছোট হলেও ফাঁকা বলেই এমন এক ইকো চেম্বার হয়ে উঠেছে। প্রতিধ্বনি-ঘর। হয়ত নিজের অজান্তেই এই প্রতিধ্বনি-ঘর তার বেশ প্রিয় হয়ে গেছে। তাই কি এতোদিনে এই ঘরে একটা চেয়ার টেবিলও আমদানি করেনি? এই ঘরের স্টাডি হয়ে ওঠার সমস্ত প্রমিস থাকা সত্ত্বেও? নাকি আত্মস্বরের অনুরণন শুনতে ভালোবাসে আমাদের নার্সিসাস। এই তো তার ইকো। ইকো চেম্বার।

পড়ন্ত আলোর অনুরণন কোণ থাকে। যেমন বাড়িদের থাকে অবগাহন কোণ। লোকটা দুটোই চায়। অনুরণন আর অবগাহন। একটা চেয়ার এনে প্রতিধ্বনি-ঘরের ঠিক মধ্যিমুহূর্তে রাখে। ঘরের পরিসর সময় হয়ে গেছে। মধ্যিখানকে তাই মুহূর্তের মত দেখায়। লোকটা ঘরের মধ্যবিন্দুর একলা চেয়ারের ওপর বসে গড়গড় করে মন্ত্রমুগ্ধের মত বই পড়ে যায়। চেয়ারের আমদানিতে কি অনুরণন কমে যায়? অনুরণন কমলেও অবগাহন বাড়ে। অক্ষরগুলো পাতার ওপর থেকে মিলিয়ে যেতে থাকে। লোকটার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। খোলা চোখের পাতা সাদা হয়ে এলেও বন্ধ চোখের পাতা অক্ষরময় হয়ে ওঠে। কণ্ঠস্বর অবগাহনে চলে যায় আর সহসা এক মুহূর্ত নেমে আসে প্রতিধ্বনি-ঘরের মধ্যিখানে যখন লোকটাকে আর দেখা যায়না। খালি চেয়ারে পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ে। চেয়ারের ওপর রাখা বইয়ের প্রচ্ছদ প্রজ্জ্বলিত হয়। ভাষা কণ্ঠস্বরে সংক্রমিত হয়েছে। পাঠের আর পাঠক প্রয়োজন নেই। ভাষারও সংক্রমিত হতে আর মানুষ লাগে না। নার্সিসাস ইকোয় মিলিয়ে গেছে।