কূজনহীন কাননভূমি

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

একাকিত্ব আমার সহবাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, যার সঙ্গে রমণে ব্যর্থ হইনি একবারও। আমি তার ভিতর প্রবেশ করলে গুহাগাত্রে জলঝর্ণার ধ্বনি শুনতে পাই। অন্ধকার হাতড়ে আরও বেশি অন্ধকারে দ্রুত হয় আমার চলন যতক্ষণ না তীব্র শীৎকারের মুখ বালিশে গুঁজে আমি গাল, ঠোঁট, জিভ, গলা লোনাজলে ভিজিয়ে ফেলি। একার জন্যে একটি স্বাধীন মৃত্যুর স্বপ্ন দেখি আমি, একাকী হয়ে বাঁচি... কিন্তু কতক্ষণ? যতক্ষণ আমি অন্ধকারের, রাত্রির, তামসের বশবর্তী। নিজের সঙ্গে নিজের শৃঙ্গার উদযাপনের দাগ নিতে নিতে ক্ষরণগুলির নিচে আমি কাঁপা হাতে কতবার শাদা পাতা বিছিয়েছি ! দোমড়ানো, কোঁচকানো, চূড়া থেকে খাদে গড়িয়ে পড়া অস্তিত্বের ফিনিকে ভেজা সেইসব রাত্রির কেন অবসান হয়! কেন আমাকে ফিরতে হয় কোলাহলে, পরতে হয় মুখোশ , বারবার ময়লা হাত ধুয়ে ফেলতে হয় !
মিলনের জন্য যেমন অপেক্ষা উদ্দীপক, রাত্রিগুলির জন্যে তেমন দিন। সারাদিন ধরে নিজেকে খোসা ভেঙে বাদামের মতো ছড়াতে ছড়াতে শুধুই ঘুম পায় এখন। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শেষবেলায় কাজগুলি সারি। দগদগে ক্ষতগুলিতে সন্ধে লাগে, টনটন করে নালি ঘা। যন্ত্রণাকে টের পেতে পেতে উজাগর, ঘুম ভেঙে যায়। রাত্রিজলে সাঁতারের জন্যে প্রস্তুত হয়ে নিই। আমার শরীর উড়ালের জন্য, হ্যাঁ এইতো সম্পূর্ণ প্রস্তুত !
"তুমি আমার আত্মা ", প্রেমিককে বলা এই মিথ্যে কথাটি এবার স্নান সেরে স্বস্থানে ফিরেছে (জল ময়লা হয়ে গেছে খুব)। "তুমি আমার অস্তিত্ব", সংসারকে বলা এই মিথ্যে কথাটিও, স্নান সেরে তার গা ঘেঁষে বসলো ( না, কোথাও আন্দোলন নেই )। "তুমিই আমার রতিশক্তি,আমার সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়বাসনা", মৃত্যুকে বলা এই সদ্যস্নাত কথাটি তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। যাই, এবার নিজে জলঝারির নিচে দাঁড়াই। ধারাস্নানশিহরিত ভিজে গায়ে বেরিয়ে আসি। কয়েকটা ধুপ জ্বেলে দিই ফাঁকা ঘরে। চোখ বন্ধ করে ডুবে থাকি। এই তো ঘরের সব দেয়াল খুলে দিয়েছি । সাতফোঁটা অলীক আলো এবার আকাশ থেকে নেমে শরীর ফুঁড়ে আরতি শেখাবে আমায়...

★★★

কেমনে পাইনু মোহনে?
জলে স্থির হল যেই ছায়াটি
আমি দুচোখ ডুবানো আঁধারে
দেখি শতবার ডোবে বাঁশরি
জাগে বরফে জাগে আগুনে...
জাগে চূড়ায় চূড়ায় মোহিনী
মেশে মোহনায় মোর মোহনে...
সখি মোহনে... মোর মোহনে...


মোহন আমার চূড়ার নাম। রতিচূড়া। একাকী। তীব্র। শুদ্ধ কিন্তু সকাম। মাঝেমাঝে ভয় পাই, জলে তার মুখ দেখতে ঝুঁকে যদি থৈ না পাই আর...না, আত্মঘাতী বোলো না। দীর্ঘশ্বাস খুঁজো না। জেনো স্নানের সাধ হয়েছিল,তাই মোহন আমায় নিয়েছেন।