প্যাকেট

অমিত সরকার

“But life is loneliness, despite all the opiates, despite the shrill tinsel gaiety of "parties" with no purpose, despite the false grinning faces we all wear. And when at last you find someone to whom you feel you can pour out your soul, you stop in shock at the words you utter - they are so rusty, so ugly, so meaningless and feeble from being kept in the small cramped dark inside you so long. Yes, there is joy, fulfillment and companionship - but the loneliness of the soul in its appalling self- consciousness is horrible and overpowering.”
Sylvia Plath, The Unabridged Journals of Sylvia Plath


আমি
অনেকদিন আমাদের বাড়িতে কলিংবেল বাজে না। খুব প্রয়োজন ছাড়া আজকাল আমি বা বউ কেউ আর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলি না। এই ষাট, সত্তর বা আশি, কত দিন ঠিক জানি না, লকডাউন পেরোনোর পরে আমরা দুজনেই ইদানীং টিভি দেখি না, ভয় করে। প্রিন্টেড নিউজপেপার অনেকদিন বন্ধ। ই- পেপারের প্রথম পাতায় শুধু মৃত্যুর সংখ্যা। পড়ি না। ডেলিভারি বয় গেটের সামনে মাঝে মাঝে অনলাইনে অর্ডার করা প্যাকেটগুলো রেখে যায়। এই ব্লকের প্রতিটা অ্যাভেনিউ জুড়ে প্রাচীন মেপল গাছেরা, অনেক গভীর তুষার, বসন্ত, হ্যারিকেন, সুনামির সাক্ষী। তবু তাদের অভিজ্ঞতাতেও ধরা পড়ে কী যেন একটা পাল্টে যাচ্ছে প্রতিদিন। তারাও আর আমাদের সঙ্গে আর কথা বলে না। অল্পদিন পরেই ফল সিজন। পাতারা অসম্ভব রঙিন হয়ে আছে। সামনের রাস্তাতেই একটা প্রকাণ্ড হসপিটালের এনট্রান্স। জানলা দিয়ে তাকালে দেখা যায় সারাক্ষণ মর্চারী ট্রাকে সাদা প্যাকেট লোড হচ্ছে। এই প্যাকেটগুলো একদিন আমাদের ভাই, বোন বন্ধু বা প্রতিবেশী ছিল। প্রতিটা ট্রাকের অভিমুখ লং আইল্যান্ডের গণকবরের দিকে। আমরা নিউইয়র্কে থাকি। এ দেশে মৃত্যুর সংখ্যা অনেকদিন এক লাখ ছাড়িয়েছে।
বউ সারাক্ষণ সিটিং রুমের জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আমাদের কোন বন্ধু নেই। আমরা রোজ একটা খেলা খেলি। খেলাটা আমাদেরই আবিষ্কার। ঠিক রাত আটটায় ডিনার টেবিলে বসে আমরা ঘোষণা করি আজ কে কটা প্যাকেট গুনেছে। যার সংখ্যাটা কম হয়, ডাইনিং টেবিলের হতবাক আলো পেরিয়ে তার মুখ সামান্য একটু ছায়াময় হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমি বউকে জিতিয়ে দিই, কিম্বা বউ আমাকে, জানি না। জয়ী সংখ্যারা আমাদের একাকীত্বের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
গতকাল একটা ছবি দেখছিলাম, ‘নাইটহকস’। ১৯৪২ সালে এঁকেছিল এডওয়ার্ড হপার। ঠিক পার্ল হারবার আক্রমণের আগে। একটা সবুজ কাচের বুদবুদের মধ্যে আটকে পড়া চারজন। আমরা সবাই এখন এরকম। রঙেরা নিখোঁজ। শব্দেরাও, শুধু জয়ী সংখ্যারা আজ সেরিবেলামের মধ্যে ঢুকে পড়ছে তীব্র গতিতে। স্যালাইন বোতল থেকে ড্রিপ ড্রিপ শব্দে শিরার মধ্যে ঝরে পড়ছে সংখ্যা।

বউ
আমি প্যাকেট গুনি, খাবার গরম করি, প্যাকেট গুনি, টেবিলে সাজাই, প্যাকেট গুনি। ওকে ডাকতে হয় না। ওর ঘরের দরজায় দাঁড়ালেই আমার ছায়া পড়ে। ও সিগারটা অ্যাশট্রেতে রেখে জানালার ধার থেকে টেবিলে উঠে আসে। আমি জানি ও প্যাকেট গুনছিল। একসময় আমাদের কটেজে একাকীত্ব ছিল একটা নিষিদ্ধ রাজ্য। আমরা প্রতি সপ্তাহে সুপার মার্কেট যেতাম। পার্কে হাঁটতাম প্রতিদিন বিকেলে। ও সকালে বাগান করতো। রাস্তার দুপাশে প্রিমরোজেরা আমাদের অভ্যর্থনা করতো। একটা মোচড়ানো ডানার মত পাতা, একটা অদ্ভুত গোলাপি মেঘ, একটা সবুজ প্রজাপতি আমরা পরস্পরকে ডেকে দেখাতাম। পরস্পরকে চুমু খেতে খেতে আমরা শুনতে পেতাম অ্যাড্রিনালিনের ছুটে যাওয়া। আমরা বন্ধুদের ফোন করতাম। ওরাও আমাদের কখনো কখনো। আজকাল কোন ফোন আসে না। আমরাও কাউকে আর ফোন করি না। শুধু কিছু অটো জেনারেটেড সতর্কতা আসে। প্রতিবেশী জেরার্ডেরা কখনো কখনো বউ নিয়ে কফি খেতে আসতো। দারুণ সিজন ফ্লাওয়ার ফুটত ওদের বাগানে। ওরা দুজনেই আজ সাদা প্যাকেট হয়ে গেছে। বাগানটাও একা একাই…। ছোটবেলায় আমি দর্শনের ছাত্রী ছিলাম মেরিল্যান্ডে। আমি জানি, ‘It’s not just a negative state to be vanquished. There’s magic in it too.’ তাই আমরা কথা বলি না। তাই আমরা সকাল থেকে প্যাকেটের মধ্যে ঢুকে থাকি। ঠাণ্ডা আবছা আলো আমাকে ঘিরে ধরে। মোবাইলের নিঃশব্দ স্ক্রিনে এক অন্ধকার আলো জ্বলছে।
ব্রেড পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আমরা রোজ শুধু আলো খাই। আলো খেতে খেতে আজকাল মাঝে মাঝে আমার বমি পায়। কিন্তু বমি হয় না। স্মৃতি থেকে উঠে আসে বমি, অরুচি, বমি, চাপ, পেটের কষ্ট, দুর্বলতা। ওকে কিছু বলি না। বললে হয়তো খেলাটা হেরে যাব আমি। হয়তো আবার কিছুর জন্ম দেব বলে তৈরি হচ্ছে আমার শরীর। হয়তো কিছুদিন পরে একের পর এক সাদা প্যাকেট বেরিয়ে আসবে আমার যোনি থেকে। অবাক হয়ে দেখব, আমাদের চারপাশে স্তূপ করে সাজানো আছে সাদা প্যাকেটের পর সাদা প্যাকেট। আর গম্ভীর জিপারেরা শুধু বন্ধ করে চলেছে তাদের। একের পর এক, একের পর এক।

আমরা দুজনেই জানি



এভাবেই, এভাবেই, এভাবেই আমরা দুজনে অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করছি কখন খেলাটা শেষ হবে ? কখন একটা সাদা প্যাকেট আমাদের গিলে নেবে ? জিপার টানার শব্দ শেষবার ঢুকে যাবে কখলিয়ার গভীরে। আমরা দুজনে দুটো প্যাকেট হয়ে মর্চারী ট্রাকে চড়ে রওনা হব লং আইল্যান্ডের দিকে। অন্য কোন জানলায় কেউ একজন গুনে ফেলবে আরও দুটো প্যাকেট।