ধুতুরাগোধূলি
এখন সকাল খুব লাল। তবু
হৃদয়ে গোধূলি
আমি সদ্য বানানো নৌকার
খোলের ভেতর শুয়ে; নৌকার
একা-কারিগর। গাবের আঠার
গন্ধে, তারপিনের গন্ধে
নাক ভরে আছে। আমি
ছুতোরের ছদ্মবেশে ঢুকে
পড়েছিলাম এই
জেলেপাড়ায়। তারপর থেকে
তৈরি করে চলেছি নৌকা।
উত্তল অবতল নৌকা।
সমুদ্রের ছোবলে
জেলেপাড়ার মরদেরা সব
একে একে ঢেউয়ের অতলে।
এখন নৌকার মতো কাত হয়ে
আছে জেলেপাড়া।
সদ্যবিধবাদের সারি
সারি ঝুপড়িঘর
বিষণ্নতায় ঠাসা। এখানে
ভোর আর বিকেলের একটাই
নাম ------গোধূলি!
একা এক ঘেয়ো কুকুরের
কান্নায় ভরে আছে আমার
দু'কান। যে ঝুপড়িতেই
আমি ঢুকতে চেয়েছি, বাধা
হ'য়ে দাঁড়িয়েছে
প্রকাণ্ড এক মাকড়জাল।
মাকড়েরা আমাকে না
দিয়েছে একাকিত্ব
ঘোচাতে, না দিয়েছে
জেলেপাড়ার নম্র
বিধবাদের বিষণ্নতার
গাদ সরাতে। প্রতিবারই
নিষেধের লাল তর্জনী।
এবার নিজের ভেতরের
মাকড়জাল ছিঁড়ে ফেলতে
চাইছি আমি রাগী বেড়ালের
মতো । ফরসা হয়ে উঠছে
আমার চোখ। বিধবাদের
কামনাতুর দেহে জ্বলে
উঠছে ফসফরাস। সমুদ্র
ঝিলকে উঠছে মাছের পেটির
মতো। ওই তো মরীচিকার
ভেতরে পেখম তুলছে
বিধবাদের ময়ূর।
আমার পা টলছে ধুতুরার
নেশায়। একটি একক
মুহূর্তকে আমি সকাল ও
গোধূলি বানিয়ে ধরে আছি
দু'হাতের মুঠোতে।
এ-খেলা আমি অসংখ্য
একা-আমিকে দেখাই
বারবার। একটা সরু দড়ির
উপর দিয়ে একা-পিঁপড়ে
হয়ে হেঁটে চলেছি ধোঁয়ায়
মোড়ানো কোনো আবছায়া
বাড়ির দিকে।
আমার পাশাপাশি হেঁটে
চলেছে পেনিলোপিহীন
নৈশাঘাতে বিবর্ণ
ইউলিসিস। ছিন্নবস্ত্র
ভিখিরির বেশে।
হাঁসপালক আর মেষপালকের
অবজ্ঞার ভেতর দিয়ে।
একবার সে আমার ছায়ার
ভেতর ঢুকে পড়ছে।
পরক্ষণে আমি তার ছায়ার
ভেতরে। লাল সকালের ভেতর
দিয়ে আমরা বয়ে নিয়ে
চলেছি গোধূলি। সব লাল
সকালই সব একা-মানুষের
গোধূলি।
সামান্য ভাতপচানো মদ আর
ধুতুরার ভেতর থেকে উঁকি
দিচ্ছে সদ্যবিধবাদের
স্পর্শ ও চুম্বন।
ধূসরতার ভেতর রাংতার
ঝিলিক।
হঠাৎই হেসে উঠছে,গান
গেয়ে উঠছে একা-একা
মানুষেরা। তাদের তীব্র
স্বমেহনের ভেতর ফেটে
পড়ছে শত-শত অসহ্য
কামারশালা।
মাকড়জাল সরিয়ে
কামনাতুর বিধবারা
আমাকে ডাকছে। তারা ময়ূর
ছেড়ে দিয়েছে বৃষ্টিতে
..
.
একা-মাছ লাফিয়ে উঠছে
শূন্যে
একা-মাছ ঝিলকে উঠছে
শূন্যে
একা-মাছ পার হচ্ছে
মরীচিকা
একা-মাছ সওয়ার হচ্ছে
ঢেউয়ের ওপর
অরণ্য-পাঁচালি
বনভূমি সাঁতরে এসে একটি
কিশোরী মৃগ
নোঙ্গর করেছে
গোধূলি-বৃক্ষের ছায়ায়
মুখে তার লেগে আছে ঘাস,
বিশল্য উদ্ভিদ
শূন্যতায় খেলা করে
একাকার হাওয়া;
হাওয়ায় সে দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে পূর্ণিমার আয়ু
চাখে
--শুক্লপক্ষ গহনতা
চাখে।
চাঁদ এক সুগোল পাথর
যেন
স্থির হয় মেঘের
তালুতে;
ক্ষণ পরে চাঁদ যায় চলে
চাঁদ চলে গেলে
সে-হরিণী,
বুকের ’পরে চাঁদিম
ব্রিজ,
তাতে একা দম্ভ ভরে
হাঁটে
--স্বপ্নগ্রস্ততায়
অলৌকিক
সিল্ক-পাহাড়ের গায়ে
গ’লে পড়ে ভোরের বরফ।
মায়াকাজলের
সরোবর
কুজ্ঝটিকা পার হয়ে
বিকলাঙ্গ অন্ধ এক মাছ
স্রোতোস্বিনীর দিকে
ব্যস্ত রাখে নিজের
কম্পাস;
অন্ধ কোটরে তার
প্ররোচনা
ভ্রমণের, অ-পরাজয়ের
নজরে এসেছে তার
মায়াকাজলের সরোবর;
পরিদের স্তনধোয়া জলে
নেমে সে ঘুমাল
নিজের ভেতর ডুব দিল
----অযৌন প্রহারে তার
সারা গায়ে জন্ম নিল
কাঁটা
তারপর কানকো ফুলিয়ে সেই
মাছ
বরফ, ঘুমের কুচি একা
ঝেড়ে, একা গেল চলে
প্রতিসাম্যে জ্বলমান
সরোবরে সেই মাছ
এখন আসে না;
রুপোলি উৎসব তার
স্বপ্নে তবু অবিকল
আছে...