কবিতাগুচ্ছ

হিন্দোল ভট্টাচার্য

বিষাদ
জল যত দুঃখ বহন করে, বারবার ডুব দিলেও তার মন শান্ত হয় না,-
মনের খেয়ালখুশি সব। মানুষ তোমার মতো পাথর হয়ে যেতে পারে না
এমনকী শূন্যতাও না, তার দিকদিগন্ত আছে, শহর, হাসপাতাল, বাজার-
তুমি তাকিয়ে থাক, আমার চোখের ভিতর দিয়ে তোমার চোখের দিকে;
এটুকুই তোমার কাজ। আমরা কেঁদে ভাসাই, গান বাঁধি, কষ্ট লিখি।
স্রোত ভাসে। কিছু কিছু নদীকেও টেনে নিয়ে যায়। ফুল, বেলপাতা সমেত।

মন বড় মেঘলা, তার শরীর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, জল জমে থাকা পাড়া যেন!

দরবেশ
কোনও ধ্বনিই কোথাও ফিরতে পারে না, কোনও সন্ধ্যাবেলা অন্য কোনও
সন্ধ্যাবেলার মতো নয়, নদী, তার আগের নদীর মতো নয়, এমনকী এ পৃথিবীও
একা সরে যাচ্ছে দেখো, যে কোনও শূন্যতাও সরে যাচ্ছে অনাথের মতো...
আমাদের বন্ধু নেই, আত্মীয়স্বজন নেই, সমাজ, ধর্ম বা দেশ
আসলে কিছুই নেই প্রিয়,- কোনও ধ্বনিই কখনও ফিরতে পারে না, জলের উপর
ওই যে তরঙ্গ, এক না-ফেরার দিকে চলে গেল, ওই যে দিগন্ত চিরে লোহার পাখি
সেও আসলে কোথাও যাচ্ছে না। অথচ সকলেই দূরে সরে যাচ্ছে একে অপরের থেকে—
নিয়তি, আশ্চর্য বন্ধু। যার মুখ বদলে যায়, শরীরে সময় ধরে, ভাঙে পেশী ও চোয়াল,
সেও সঙ্গীহীন, যেন ধূলিকণা, যেন গ্রহাণুর মতো ভাঙা এক সংসারের
চাল-ডাল- ময়দা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ...কোথাও ফেরার কোনও কথা নেই তার

বহু
পোশাক-আশাকের মতো, নিজেকেও ছেড়ে ফেলতে হয়
তুমি তো গাছের স্বভাব নও, মাথার ভিতর দিকে ডালপালা আছে
তাদের সঙ্গে বোস; একেকটি ছায়াকে তালুবন্দী করতে করতে
মনে কোর, তুমিও ছায়া, শুধু রক্তচলাচল করে, বুকের ভিতর পাখি ডাকে
এক আশ্চর্য জঙ্গলে ঘাসের আড়াল থেকে মুখ তোলে বাঘ
তুমি তো গাছের স্বভাব নও, শান্ত শিকড়বাকড়ের ভিতর ঘুমিয়ে পড়বে?
জ্যোৎস্নায় মানুষ পাগল হয়ে যায়, মহাকাশ শুঁকতে থাকে কুকুর
ঈশ্বর আদর করতে চায়, নিজের আত্মার দিকে তাকিয়ে থাকে মানুষ
একটি আত্মার থেকে আরেকটি আত্মার দিকে মানুষ ঝাঁপায়
একটিই জীবন, তাকে বহু আত্মা অধিকার করে

একতারা
দিকচক্রবাল একা, বিদেশি রাজার মতো থাকে
মানুষ প্রার্থনা করে একা
আশা করে, ঘনঘন বৃষ্টি হবে খরার মাটিতে
স্বপ্ন দেখে আর কোনও আকাশ গুটিয়ে দেওয়া মেঘে
বজ্রপাত হবে না কোথাও
দিকচক্রবাল একা, উদাসীন, যেন তার কেউ
ছিল না কখনও, আজও নেই।
একঝাঁক আশাবাদ উড়ে যায় ধূসর বিকেলে
জীবনানন্দের মতো,-
আসলে বাউল

মহাকাল
তোমার ছায়াও তোমার বন্ধু নয়, এমনকী ওই দেওয়াল
যার কাছে এসে তুমি নিরাপত্তা ভিক্ষা করেছ বারবার, এমনকী ওই ছাদ
যেকোনও সময় যে ভেঙে পড়তে পারে খেয়ালখুশিতে
কেউ নয় তোমার সঙ্গী, সঙ্গী ওই অন্ধকার, যাকে দেখলেই
মায়ের গর্ভের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে জলের ভিতর সে কী সাঁতার
কী বারুদ কী হরিণ কী আয়ু কী বিদ্যুৎ এই প্রাণ
প্রণাম করি তাঁকে, আর যে রাস্তা অতিক্রম করে এসেছি একাই
তাকে জানাই চিরকালের মতো বিদায়, তোমায় কখনও আর
দেখতে পাব না ভগবান, এক ক্ষণস্থায়ী সুতোর উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে খেলা
আমার প্রেম, যার কাছে আমি বলেছি, একটিই রাস্তা আছে
যার শুরু নেই শেষ নেই, সে কেবল আছে, আমরা
শুধু সেই রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে পারি
তোমার ছায়াও তোমার বন্ধু নয়, এমনকী তুমিও নও তুমি
একটি আশ্চর্য ঘোড়া রয়েছে কোথাও, যার ক্ষুরধ্বনি শোনা যায়