যব রাজু বুদ্ধ বন গায়া

তমাল রায়

রাজুকে আপনারা চিনবেন না। যেমন আমাকেও। রাজুর আর আমার মধ্যে তেমন যোগসূত্র নেই। আবার যদি বলেন আছে,তাহলে আছেও। কারণ আমি তাকে লক্ষ্য রাখি।
রাজু বলছিলো,Standing in a crowd is easy,it takes courage to stand alone.
- এতো গান্ধীর কথা।
-হুম।
রাজু যখন কথাটা বলছে,বাতাসের গতি হয়ে এসেছিলো ধীর। আকাশ এক পেট মেঘ নিয়ে নীচু হয়ে নেমেছে,সন্ধ্যে রঙের আলোয় অনেকটা আবছায়ার মতই,এবং একাই রাজু!
- তারপর? তারপর কি হল?
রাজু বলতে শুরু করলো,হতেই হবে এমন বাধ্যতা তো ছিলোনা। আর কিভাবে হয়ে উঠতে হয় আমি জানতাম ও না। কেবল দাঁতে দাঁত চেপে লড়তাম!
- আচ্ছা। কিন্তু একা হতে সত্যি তো সাহস লাগে। সেটা কেমন করে...?
- না না আমি মহৎ নই। জন্মেই জ্ঞানী ও নই। আমি শক্তিশালী হয়ে উঠি কারণ আমি দুর্বল ছিলাম। আমি সাহসী হয়ে উঠি কারণ আমি ভীতু ছিলাম। আমি জ্ঞানী হয়ে উঠি,কারণ আমি বোকা ছিলাম। আমি আলাদা করে কিছু করিনি। আমায় দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলো একটা গোটা পৃথিবীই। আর তারপর যখন আমি একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে গেলাম,পা তুলতে পারিনা,হাত তুলতে পারিনা,খাবার তুলেও আর খেতে পারিনা। মুখ দিয়ে খাবার পড়ে যায়,আর বাঁচবোও কিনা সে বিষয়েও কেউ আর নিশ্চিত নয়,আমার পাশ থেকে ভীড় কমতে শুরু করে! আত্মীয়-বন্ধু-প্রেমিকা. ..
একদিন দেখলাম আমি একা। তারপর দেখলাম আমার ঘরে যে চড়ুইটা আসে,সেও একা। অত ক্ষুদ্র  প্রাণ! ওর সংসারেই বা কে আছে? ও কি বেঁচে নেই? আমার ঘরে আগে ঢুকতে ও ভয় পেত। পরে যখন বুঝলো,আমার তেমন ক্ষমতা নেই,ওকে বিরক্ত করার,হয়তো অসহায় ভেবেই সে আমার বন্ধু হয়ে গেল!
- তারপর? 
- আমি দেখতাম ও একাই,কিন্তু দিব্যি নেচে নেচে আমার কাছে আসে,ঘোরে ফেরে,তারপর জানলার ফাঁক গলে ফের আকাশে...
আমাকেও পারতে হবে। কেন পারবো না?
- তারপর পারা সম্ভব হলো?
- হুম কেন পারবো না? পারবো,পারতে হবে বলেই তো এই দুনিয়ায় আসা!
জানেন,এই যে আমি বা আমরা কিছু বলি,বা করি তা আমাদের মধ্যে রিফ্লেকটেড ইমেজের এক্সপ্রেশন,কেবল যুক্তি আর কারণ দিয়ে লজিকালি আমরা তাকে এনালিসিস করে নিয়ে,পথ চলি৷ এরপর আসে কনটেমপ্লেট করা। এবং এক সময় প্রশান্তি। কবিতা লেখা বা বেঁচে থাকা,এই পথেই... এ বিষয়ের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বটা ডারউইনের বিবর্তনবাদ। আমার মনে হয় ডারউইন কবিই ছিলেন। ছোটবেলাটা জানেন তো ডারউইন এর! সেখান থেকে এই বোধে আসা,কম পথ...!
- বুঝলাম আবার বুঝলাম ও না!
- আবার বলি,যা কিছু দেখছেন বুঝছেন সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সমষ্টিই আপনি,হয়তো তেমন ভাবছেন। সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সিন্থেসিস হয় আপনার আমার ভেতরে,তারপর ইন্দ্রিয়াতীত চেতনার দিকে অগ্রসরমান হই আমরা। ওই সিন্থেসিস আপনাকে পথ দেখাচ্ছে...একটু দূরে আলো বা এবসলিউট। বোধ তখন বোধির দিকে,এরপর বুদ্ধ হয়ে যাওয়া।
তখন আর কাউকে প্রয়োজন হয় না।
- মানে রাজু বুদ্ধ হয়ে গেল?
- তা হয়তো নয়। আবার হয়তোও। সেই টু বি অর নট টু বি নিয়ে চলতে চলতেই একা হয়ে যাওয়া।
- তারপর? 
- কিছুই না। আমি তাকিয়ে দেখি ওই আকাশ,ওই গাছটা,ওই পাখিটা,সবাই একা। আর তারা প্রত্যেকেই সুন্দর,নিজ নিজ মত করেই৷ দোকা হবার আকাঙ্ক্ষাটাই একসময় নিভে যায়! ভাবুন একবার হিমালয়ের ওই পথে প্রান্তরে কত সাধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে,কত বছর ধরে তারা ওখানেই৷ ওই প্রবল শীত,দুর্যোগ কই তেমন স্পর্শ করে কই?  কতজন তো বছরের পর বছর মৌনব্রতে,তাহলে?
- তাহলে একা হওয়া অভিশাপ নয় আশীর্বাদ!
- শুরুতে ফিরি,একা মানুষ স্বেচ্ছায় কমই হয়। শুরুতে সেও কিন্তু মিশতেই চেয়েছে,ভীড়ের একজন হতে চেয়েছে,পরিবারের একজন,তাকে হতাশ করেছে পরিবেশ,সমাজ। তারপর সে একা চলতে শুরু করলো। যেমন ছোট শিশুর প্রথম লাগে ওয়াকার,বা মার হাত। তারপর সে চলতে শিখে গেল। ব্যস...
রাজু কে? হয়তো আমি বা আপনি...ঠোক্কর খেতে খেতে,তারপর একদিন চলার পথ বেছে নেয়...যে পথ একার,সুন্দরের...
রাজু শুয়ে। তাকিয়ে দেখছি,রাজুর ভেতর থেকে রাজু উঠে এলো,এবং পথ চলতে শুরু করলো! সে পথে অন্য এক আলো,ওই আলোই কি এবসলিউট...
জানা নেই। সংসারী মানুষের জানা বোঝা কম,আর তাই জেনে বুঝে নিতেই তো এই সংখ্যা প্রকাশ,অনেক একার ভাব ও অভাব সঙ্গী করে আমরাও পথ চলতে শুরু করলাম,হয়তো এরপর একে একে প্রকাশ পেতে থাকবে কোনো সমষ্টির একাকীত্ব,অথবা একাকী মানুষের সৌন্দর্য। চলুন পথ হাঁটা যাক...