প্রস্তর যুগ আসছে

চিত্রালী ভট্টাচার্য

হ্যালো-----, হ্যালো----মাইক টেস্টিং-----হ্যালো---ওয়ান- --টু---থ্রি----হ্যালো—হ্যা লো----মাইক টে--
-ঠিক আছে বস? কিলিয়ার তো? তিরঙ্গা মাইকের সাউণ্ড ঠিক করতে করতে চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল।
-একদম ফিট। মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে পরেশ বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল। হাতটা ওপরে তুলতেই পাঞ্জাবীর বগলের তলার হাফ সার্কেল মার্কা ঘামের দাগটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। পিঠে, ঘামের চোটে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবীটা চিটে গিয়ে ততক্ষণে একেবারে ট্রেসিং পেপার। সেখান থেকে ট্রেস হয়ে বেরিয়ে এসেছে কালো গোবদা পিঠ। সামনের দিকটারও একই অবস্থা, শুধু একস্ট্রা বলতে বুকের থোকা থোকা লোমের ডিজিটাল ডিসপ্লে। তবু এসব গরম ফরম ইগনোর করেই তো পার্টির কাজ করে যেতে হয় ওদের, এটাই দস্তুর- জানে পরেশ, কিন্তু সবসময় পারে কই! শরীর কেবলই আরাম চায়। এই যেমন এখন চাইছে। মনেহচ্ছে এসব মঞ্চ তদারকির কাজ ফাজ গুলি মেরে কেটে পড়তে। পার্টি অফিসের এসির তলাটা ,- আহা,যেন হিলস্টেশন।
কপালের বড় বড় ঘামের ফোঁটা কানের পাশে বাদশাহী ঝুলফি বেয়ে গড়িয়ে পড়তেই পরেশের বিরক্তি চরমে পৌঁছলো। পাঞ্জাবীর হাতায় মুখটা মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে বলল- এই তিরঙ্গা, পেডিষ্টালগুলো কোথায়?
-ওই তো দাঁড়িয়ে আছে, বলে মঞ্চের ওপর থেকেই বাঁ দিকটা দেখাল ও।
বাঁদিক ঘুরতেই পরেশ দেখল বাধ্য ছেলের মত সার সার দাঁড়িয়ে আছে খান আটেক একঠ্যাঙে ঢাউস পাখা। দেখেই আরামের কথাটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠল। মেজাজ গেল বিগড়ে। এসব পাখা টাখা দিয়ে হয় নাকি আজকাল? কোথায় এসি হল বুক করে মিটিং করবে তা না, যতসব রাস্তার ধারে –আদাড়ে- বাদাড়ে। এইজন্যেই কেউ এসব আর সিরিয়াসলি নেয় না। যতই চেঁচাও,জনগন এখন খুব সেয়ানা। কমফ্রোট দাও শুনব, নাহলে কেটে পড়ব। তা সেসব নেতারা শুনলে তো! বলেন- জনতা জর্নাদল বুঝলি , ওরা আমাদের কাছে আসবে না, আমাদেরই ওদের কাছে পৌঁছতে হবে। নাও, পৌঁছও এবার! পরেশ বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে তিরঙ্গাকে হাতের কাছে পেয়ে রাগে ফেটে পড়ল।
-কি করছিস কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? মালগুলো ফিট কর তাড়াতাড়ি, ঘামের চোটে তো বন্যা হওয়ার জোগাড় ।
-একমিনিট বস। তেরঙ্গা মাইক টেস্টিং বন্ধ রেখে মঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমে ব্যস্ত হাতে খান দুয়েক ফ্যান জায়গামত রেখে, তার টেনে টেম্পোরারি বোর্ডের থ্রি পিনে ঢোকাতেই সাঁই সাঁই। দু-চারবার টাল খেয়ে পাখাদুটো স্থির হয়ে চলতে লাগল । টাল খাওয়া দেখে পরেশ বিরক্তিসূচক শব্দ করল- কিরে, পড়ে-টোরে যাবে নাতো!
-না ,না ,কিচ্ছু হবে না । তুমি ঝুটমুটকা টেনশন নিয়ো না তো। সব পারফেক্ট চলবে। এত এত মিটিং এটেন্ড করতে করতে ওগুলো একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এই যা, বলে তিরঙ্গা ফিচেল হাসল।
পরেশ ওসব ইয়ার্কিতে কান না দিয়ে বুক –পিঠ শুকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মিনিট খানেকের মধ্যে ঘাম শুকিয়ে পাঞ্জাবী ফুর ফুর করে উড়তে উড়তে একেবারে ফানুস। এতক্ষণে স্বস্তি। পরেশ শ্রান্ত শ্বাস টেনে অর্ডার করল – চেয়ারগুলো কে পাতবে? তুই না আমি ? লোক কই তোর? তোদের দিয়ে যদি একটা কাজও ঠিকমত হয়!
-ওই তো চেয়ার পাতার লোক, তুমি না ফালতু চেল্লামেল্লি করো।
পরেশ দেখল একটা প্যাংলা মতন ছোঁড়া, জড়ো করা চেয়ারের টিলায় বসে দাঁত বার করে হাসছে।
-এ ! পারবে? আর লোক পাসনি তুই?
- কি করব বলো, সবে ব্যাবসায় নেমেছি, হাতে মালকড়ি যা ছিল সবই তো জিনিসপত্র কিনতে কিনতে ফুস। অগত্যা একে দিয়েই কাজ চালাচ্ছি । পয়সাকড়ি যা পারি দি। এছাড়া বার দুয়েক চা সিঙাড়া ।
এসব শুনে ছেলেটা অযথা হাসতেই পরেশ ধমকে উঠল – আর হে হে করতে হবে না, নাম নিচে, চেয়ারগুলো পেতে ফেল তাড়াতাড়ি। সামনে কাপড় আঁটা চেয়েরগুলো রাখবি। ওগুলো গেষ্টদের জন্য।
ধমক খেয়ে ছেলেটা তর তর করে নেমে এসে চেয়ার তুলতে তুলতে বলল- এই জামা পড়া চেয়ারগুনো সামনে তো? বলে ফের খুক খুক করে হাসল।
- হাসির রোগ আছে নাকি তোর ? পরেশ রাগি চোখে তাকাতেই ছেলেটা ব্যস্ত হয়ে পড়ল চেয়ার সাজাতে। সামনের দিকে কাপড় আঁটা তারপর লাল আর শেষে অল্প খুঁতওয়ালা খয়রি চেয়ারগুলো পেতে বেশ তৃপ্তির চোখে পরেশের দিকে তাকাল।
পরেশ অবশ্য এ কাজের বিন্দুমাত্র তারিফ না করে গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ার পাতা দেখে মন দিল মঞ্চে। মঞ্চের পেছনটা নানা রঙের কুচি দেওয়া পর্দা দিয়ে সাজানো। লালের পরে নীল,তারপর গেরুয়া, সবুজ, সাদা ,-ডোরা কাটা কাটা। দেখে খানিকটা পর হাসল মনে মনে। তেরঙ্গাটা মহা ফেরেববাজ , সবাইকে খুশি করতে চায় , তাই বোধহয় এই কিত্তি করেছে। মরুক গে , যে যা খুশি করুক। ও নিজেও তো মনে মনে আখেরই গোছাতে চায়, সেদিক থেকে ভাবলে তিরঙ্গা আর ওতে তফাৎ কোথায়? তাই ওসব নিয়ে মিছিমিছি ঝামেলা না বাড়িয়ে কাজে মন দিল ফের। আলোগুলো ঠিক আছে কিনা দেখে, জোরে হাঁক দিয়ে দলের ছেলে শিবাকে জিগ্যেস করল- জলের বোতলগুলো কোথায়?
-ঠিক আছে সব, পারফেক্ট সময়ে পৌঁছে যাবে।
-আর ফুলের তোড়া? বলেই নাক দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শ্বাস ছাড়ল পরেশ। এই তোড়ায় ওর প্রবল আপত্তি। কেন যে দেওয়া হয় কে জানে? কর্মকর্তারা বলেন এতে নাকি সম্মান দেখানো হয়। সে নাহয় বোঝা গেল,কিন্তু ওনারা তার কি সমাদর করেন তা কি কোনদিন চেয়ে দেখেছেন কেউ? বক্তৃতা দিতে যাওয়ার সময় সেই যে চেয়ারে ফেলে রেখে যান ,আর ফিরেও তাকান না! তিরঙ্গাও মোওকায় থাকে। ওরকম দেখলেই ধাঁ করে তুলে নিয়ে হাফ দামে বেচে দিয়ে আসে যথাস্থানে। একদিন এক বক্তা তো সেটুকু সুযোগও দেননি তিরঙাকে। ওনার বক্তৃতা ছিল সবার শেষে । উনি সেই বিরক্তিকর সময়টুকু ঘাড় কাত করে বসে না থেকে তোড়া থেকে একটা একটা করে ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে পায়ের কাছে জড়ো করেছিলেন। শেষে উনি যখন বক্তব্য রাখতে উঠলেন তখন চেয়ারের ওপর পড়ে ছিল একটা ছাল ছাড়ানো মুরগীর অবয়ব। তাই দেখে ক্ষোভে তিরঙ্গা সেদিন খিস্তি দিতে যেতেই পরেশ ধমকে উঠেছিল।

তিরঙ্গা আবার ফুঁ দিল মাউথপিসে, অমনি সেটা দশগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে, সঙ্গে একটা কান ফুঁটো করা কু-উ--উ--শব্দও।রাস্তার মানুষজন সেই শব্দে চমকে উঠে গাল দিল যে যার মত ।
আঃ, পরেশ ঘুরে তাকাতেই তিরঙ্গা দৌড়ে এসে ওর যন্ত্রপাতির নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শব্দকে জব্দ করার চেষ্টা করল খানিকক্ষণ তারপর আবার ছুটে গিয়ে আবার ফুঁ দিল মাউথপিসে। হ্যা, এবার পারফেক্ট। শব্দ পৌঁছে গেল রাস্তার খুঁটিতে লাগান চোঙে চোঙে। তিরঙ্গা খুশি হয়ে প্লাস, স্ক্রু ড্রাইভার, টেষ্টার সব পকেটে গুঁজতে গুঁজতে মঞ্চ থেকে নেমে এই খুশির মওকায় কোন কিছু না ভেবে মেশিনে পেনড্রাইভটা গুঁজে গান চালিয়ে দিল। অমনি ঝম ঝম করে শুরু হয়ে গেল -মোরা পিয়া ঘর আয়া- ও রামজি---। মোরা পিয়া ঘর---। রাস্তার মাইকে মাইকে সে গান নিমেষে দশগুণ হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল ঝিন চ্যাক উন্মাদনা।
যে ছেলেটা এতক্ষণ চেয়ার পাতছিল, এমন গান শুনে সে দৌড়ে এসে কোমরে জড়ানো গামছাখানা খুলে দু হাত দিয়ে ওড়নার মত তুলে , কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করল। কে একজন সিটিও দিয়ে ফেলল ঝোঁকের মাথায়।
ব্যাপার দেখে পরেশ নাচনদারকে টেনে একটা চড় কষাতেই পরিস্থিতি আণ্ডার কনট্ট্রোল। - মুজরো পেয়েছিস নাকি অ্যাঁ ? পরেশ চেঁচিয়ে উঠল। ওসব নৌটঙ্কি করলে মেরে দাঁত খুলে নেব একেবারে। যা, ভাগ এখান থেকে।
ছেলেটা কানে হাত বুলোতে বুলোতে দৌড়ে ঢুকে গেল গলির মধ্যে। তিরঙ্গাও ঝটতি বন্ধ করে দিল গান। সব যে যার মত ফের সিরিয়াস হয়ে পড়ল কাজে, কিন্তু তিরঙ্গা কিছুতেই বুঝতে পারল না পরেশদা কেন গান শুনে হঠাৎ এত ক্ষেপে গেল! শিবাকে জিগ্যেস করতেই বলল- ওসব হচ্ছে ইমেজ বুঝলি? পরেশের ওই ক্ষেপচুরিয়াস ইমেজটা আছে বলেই তো পার্টিতে ওর এত কদর। অমিতাভ বচ্চন যেমন এংরি ইমেজের জন্য বিখ্যাত ,পরেশও তেমন প্রতিবাদী এমেজের জন্য। ওই করতে করতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে এখন কথায় কথায় রেগে যায়। ও নিয়ে তুই ঘাবড়াস না। ও দু মিনিটেই গলে জল হয়ে যাবে।
-কিন্তু আমার ছোঁড়াটা তো ভাগলো?
-ভাগবে কোথায় ? ওই তো দিবার পান দোকানে বসে আছে। তোর চা সিঙ্গারা না খেয়ে ও যাবে ভেবেছিস?

রাস্তার একধার বন্ধ করে এই মঞ্চ, তার চোটে অন্যপাশে দারুণ যানজট। সেদিকে তাকিয়ে তিরঙ্গা পরেশদাকে অল্প মাখন লাগানোর জন্য বলল- অবস্থা দেখেছ পরেশদা! লোকেদের আজকাল জ্ঞান –কাণ্ড যদি মোটে থাকে ! দেখছিস এখানে একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে সভা হবে আর তোরা বাস,অটো,ট্যাক্সী, বাইক সব একসঙ্গে হর্ণ বাজাচ্ছিস!
পরেশ দেখেও না দেখার ভান করে বলল- বাদ দে ওসব, জনস্বার্থে এটুকু কষ্ট সহ্য করতেই হয় কিছু মানুষকে। আমাদের সংগ্রাম-
কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ সামনের কাপড় আঁটা চেয়ার থেকে কে যেন চিল্লিয়ে উঠল- এ লড়াই বাঁচার লড়াই, লড়াই করে বাঁচতে চাই---।
-এই চোপ চোপ তিরঙ্গাও চেঁচিয়ে উঠল।
-কে রে ? পরেশদা ভ্রূ কোঁচকালো।
- কে আবার, আমাদের বিবেকদা। তিরঙ্গা হেসে উঠল হো হো করে।
-ও বাবা, ও এসে পড়েছে! পরেশের চোখে বিস্ময়।
-আবার কি। ওকে ছাড়া কোনো মিটিং মিছিল আজ পর্যন্ত হয়েছে কখনও ? ও হচ্ছে সব মিটিং-এর চিফ গেষ্ট।
-বিবেক অমায়িক হাসল, তারপর খুব গম্ভীর হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতখানা আকাশের দিকে তুলে গর্জে উঠল- বন্ধুগন জনস্বার্থে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত। সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে----বলতে বলতে সোজা একেবারে মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়ানো তেরঙ্গাকে সরিয়ে মাইক্রোফোনে দুবার টোকা একবার ফুঁ দিয়ে বলে উঠল – বন্ধুগন এই যে এত দূষণ চারিদিকে,এই যে এত শব্দ---, এই যে প্লাস্টিক নিয়ে নির্বিকার মানুষ--- এই যে জল ফুরিয়ে আসছে----এইযে-----
- এই বিবেক—শোন ---শোন – পরেশের গলায় অনুনয়। কি হচ্ছেটা কি! বিশিষ্ট অতিথিরা এসে পড়বে এক্ষুনি । আজ আর পাগলামো করিস না, প্লিজ, নেমে আয় ভাইটি।
বিবেক গম্ভীর। দেখ্‌ ,আমাকে আজ বলতে দে পরেশ, আজ যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না হতে পারি তো খুব সর্বনাশ হয়ে যাবে।
-ঠিক আছে, ঠিক আছে ।আমরা এই বিষয়টা নিয়ে নাহয় পরে একটা মিটিং ডেকে---
- না পরে নয়,আজ এই মুহূর্তে, বলে আবার মাইকে ফুঁ দিয়ে বলে উঠল- বন্ধুগন, আজ থেকেই আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদে নেমে পড়তে হবে। এই যে দিকে দিকে---
পরেশ নিরুপায় হয়ে তাকাল তিরঙ্গার দিকে। ব্যস্ত গলায় বলল-মাইক বন্ধ কর তাড়াতাড়ি নইলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! এ পাগল কি বলতে কি বলে বসবে কেউ জানেনা! বন্ধ কর – বন্ধ কর—বলতে বলতে পরেশ দিয়ে সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনতে পেল বিবেক চেঁচিয়ে বলছে- বন্ধুগন, এই সব সমস্যা তো আছেই কিন্তু এসব ছাপিয়ে যে সমস্যাটা ইদানিং আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছে তা হল- আমরা ক্রমশ প্রস্তর যুগে ফিরে যাচ্ছি ---। সাবধান--!- সাবধান---!
খয়রি চেয়ারে বসা কয়েকজন হকার ওর বক্তৃতা শুনে হেসে উঠল জোরে জোরে। একজন চেঁচিয়ে বলল- পরেশদা ,পাগল খেপেছে—হে—হে—এবার সামলাও ! কিসব প্রস্তর ফ্রস্তর বলে চেঁচাচ্ছে হে--- হে---
কোলের ওপর ঝুড়িভর্তি ভেজা ছোলা আর লেবু নিয়ে এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল একবাল। এবার রগড় দেখতে উঠে তাড়াতাড়ি সামনে চলে এল। বলল- হ্যা, হ্যা, প্রস্তর তো হল, তারপর?
দর্শক বলতে তখন সাকুল্যে জনা দশেক। সকলেই আশপাশের সাধারণ মানুষ, কেউ হকার তো কেউ পান দোকান চালায়। এরা এসেছে পরেশের ডাকে। গন্যমান্যেরা একটু পরেই আসবে। তার মধ্যে এই বিপত্তি।
পরেশ আরো দু-চারজনকে নিয়ে মঞ্চে অতিথিদের জন্য চেয়ার পাততে পাততে নরম গলায় বলল- তোর বক্তব্য এখনকার মত শেষ কর বিবেক, এবার পরের বক্তাকে সুযোগ করে দে ।
বিবেক ঘাড় ঘুরিয়ে পরেশের দিকে তাকিয়ে দু- আঙুলে একটা ছোট্ট মুদ্রা এঁকে জানাল- লাষ্ট দু মিনিট সুযোগ দে ,বলেই ফের গুরুগম্ভীর গলার শুরু করল- মনে রাখবেন বন্ধুগন, এই প্রস্তরযুগের সূচনায়----
হকাররা ততক্ষণে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিতে শুরু করেছে ওকে। জোরে জোরে হাসছে সকলে, তারমধ্যে পরেশ দেখল রাস্তার ওপারে গাড়ি থেকে নামছেন এক বিশিষ্ট অতিথি। সব্বনাশ! বেগতিক দেখে পরেশ ঝপ্‌ করে সদ্য আনা একটা ফুলের তোড়া বিবেকের দিকে বাড়িয়ে ধরে বন্ধ মাউথপিসে কোনমতে মুখ রেখে বলে উঠল- আজকে আমাদের প্রধান অতিথি মাননীয় বিবেক চট্টরাজ মহাশয়কে আমরা ফুলের তোড়া দিয়ে সম্মানিত করছি এবং তাকে নির্দিষ্ট আসনে বসার অনুরোধ জানাচ্ছি। শিবা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল- কি হচ্ছেটা কি পরেশ ! ওকে তোড়া দিয়ে দিলি যে বড়? ওর জন্যে এনেছি নাকি?! কম পড়ে যাবে না!
পরেশ হিস হিস করে উঠল – দাঁড়া দাঁড়া , আগে এ মালটাকে সামলাই তারপর দেখা যাবে। তুই বরং আর একটা তোড়া আনানোর ব্যবস্থা কর ।
-পারব না, সাফ বলে দিলাম।
-তবে যে কোন একটা তোড়া ছিঁড়ে দুটো বানা তাড়াতাড়ি। একে না সামলালে এখন উপায় নেই। মনে নেই ,আগের বার ওকে তাড়াতে গিয়ে কি কান্ড হয়েছিল! এবারও কি তোরা চাস, ও মঞ্চ লণ্ডভণ্ড করে একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটাক?
এ কথায় সবাই চুপ করে গেল একেবারে। আর বিবেক পরেশের হাত থেকে ফুলের তোড়া নিয়ে খুব সম্মানিত চোখে উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে নমস্কার জানিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করল।
-যাক বাবা,পরেশ স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। কোনমতে ম্যানেজ করা গেছে । গতবারের কথা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় । পরেশ বিবেককে এড়িয়ে প্রায় ফিস ফিস করে জিগ্যেস করল- তোর মনে আছে শিবা , কিসের যেন মিটিং ছিল সেবার?
-জিনিসের দাম বাড়া নিয়ে প্রতিবাদ সভা ছিল- মনে আবার নেই! সেই বিকাশ মাঝি যখন বক্তৃতা করছিল তখনই তো—হে—হে শিবু হাসল।
-ও, হ্যা, হ্যা, ঠিক ঠিক। তুই হাসছিস ! ওঃ , সে কি র্দুভোগ। বিকাশ মাঝিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বিবেক মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে পাক্কা পনের মিনিট ধরে বকে যাচ্ছিল! বিকাশ মাঝি তো অবাক! অত বড় একজন নেতা ! তাকে কিনা ধাক্কা মেরে--- ! শেষে এ অনাচার সহ্য করতে না পেরে ওনার বডিগার্ড রাজা এসে বিবেককে হাত ধরে টানতেই মারপিট লেগে গেল একেবারে! বিবেকও কম যায় না , মাউথপিস ছুঁড়ে মেরেছিল রাজাকে মনে আছে? ওই তো প্যাংলা শরীর , মার খেয়ে রাজা যেভাবে তেড়ে আসছিল, আমরা সেদিন না ঠেকালে বিবেককে আর খুঁজে পাওয়া যেত !
-তবে যাই বলিস কথাগুলো কিন্তু ঠিকই বলছিল ও,-শিবা হাসতে হাসতে বলল- একদম টু দা পয়েন্ট। বিকাশ মাঝিই বরং--
- বলবে না কেন, বিদ্যে বুদ্ধি তো কিছু কম নেই ওর! একসময়ের স্কলার। তখন পাড়ায় কত মান ছিল ওর ! তারপর একসময় থেকে হঠাৎ দেশ দেশ করে কি যে বাড়াবাড়ি শুরু করল কে জানে, সোজা জেল। তখন ওকে নিয়ে কত গসিপ! কেউ বলত আরবান নকশাল, কেউ বলত মাওবাদী। মিথ্যে মার্ডার কেসে ফেঁসে পাঁচ বছরের জন্য একদম শ্রীঘরে। বেরলো যখন তখন একেবারে অন্যমানুষ। মরো মরো অবস্থা। মাসিমা মারা গেছেন, বাবা তো অনেক আগেই গেছিলেন। কে দেখবে ওকে! জেলের চাপ ঠিক মত নিতে পারেনি হয়ত, মাথা টাথাও ঠিক মত কাজ করত না। শেষে আমরাই পাড়ার অজয়দাকে ধরে করে এসাইলামে কিছুদিন রেখে কাজ চালানোর মত করলাম। এখন এমনি সব ঠিক ঠাক। বাবার বাড়িটা আছে। পয়সা কড়ি, মাসিমা যা রেখে গেছেন চলে যায়। দুটো কোচিং এ অংকও শেখায়। কিন্তু ওই এক রোগ ধরে গেল , যেখানে যত মিটিং মিছিল হবে, হাজির। ওর বক্তব্য ও রাখবেই । সেদিনের কথাই ধর না, ওকে তো কেউ ডাকেনি ওখানে!আর বিকাশ মাঝি যাই বলুন, উনি তো একজন বড় দরের নেতা নাকি? তাঁকে ওরকম হাত ধরে টেনে সরিয়ে দিলে মার তো খেতেই হবে।
এতক্ষণ ধরে বিবেক উপাখ্যান শোনার পর উপস্থিত সকলেই তাকাল ওর দিকে। দেখল- ও বেশ চিন্তিত মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে আকাশ দেখছে।
শিবু বলল-দেখেছিস পরেশ কিরকম সিরিয়াস মুখ করে আছে! আজও কিছুর মতলবে নেই তো!
- থাকতেই পারে, মেন্টালদের বিশ্বাস আছে ! তবে আজ কিন্তু সতর্ক থাকবি তোরা। তেমন কিছু দেখলেই সবাই মিলে ওকে ধরে পুলিশ ভ্যানে তুলে দেব । বলা আছে থানার ওসিকে। উনি সামলাবেন বলেছেন। সাময়িক আটকে রেখে, সভা শেষ হলে ছেড়ে দেবেন, কথা দিয়েছেন।

সন্ধ্যে ছটা। শুরু হল সভা। মঞ্চে তখন গন্যমান্যদের সাথে আছেন এলাকার কাউন্সিলার ভবেশ তালুকদারও। আজকের অনুষ্ঠান সর্বগ্রাসী দূষণ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য। তবে ঠিক কি কি বিষয় নিয়ে আজকের এই সভা তা পরেশ বা শিবু কেউই আগে থেকে তেমন করে খোলসা করেনি এলাকার মানুষের কাছে। যে যার মত করে প্রচার চালিয়েছে সভায় লোক ভরানোর জন্য, ওদের মনে হয়েছে শুধুমাত্র দূষণের কথা বললে এলাকার লোকজন পাত্তাই দেবে না তেমন।
দর্শকাসন এখন মোটামুটি পূর্ণ। সামনের সারিতে এলাকার বয়ষ্ক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক , সরকারি- বেসরকারি কর্মচারি আর বড় ব্যবসায়ীরা। লাল চেয়ার গুলোতে পাড়ার ছেলে-ছোকরা আর দু চারজন মহিলা। শেষের খয়রিগুলোতে আশপাশের ছোট খাটো দোকানদার আর হকাররা। ইতিমধ্যে পরেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে তোড়া সহ বিবেককে এনে বসাতে পেরেছে এই শেষের দিকের খয়রি চেয়ারের একটাতে আর কড়া নজর রাখছে ওর গতিবিধির ওপর।
শিবু মঞ্চে উপস্থিত সকলের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে সম্মানিত করেছে। এই কাজখানা পরেশেরই করার কথা ছিল কিন্তু সে বিবেককে সামলানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় শিবুকেই সারতে হল। এলাকার কাউন্সিলার আর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ অরিন্দম কর্মকারের তোড়া দুটো যে অন্যদের থেকে বেশ খানিকটা শীর্ণ তা ওনাদের নজরেই পড়ল না এটাই যা রক্ষে। এদিকে ওনাদের ভাগের তোড়াখানা নিয়ে বিবেক তখন বসেছিল সম্মানিত অতিথির মত।অবশ্য বার বারই সামনের দিকে গিয়ে বসার চেষ্টা করছিল কিন্তু পরেশ নানাভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের নাগালের রাখছিল, কারণ ওর যা ড্রেস কোড তাতে উপস্থিত গন্যমান্যেরা ঘাবড়ে যেতে পারে বলে মনেহয়েছিল পরেশের। দ্বিতীয়ত, অন্যদের বক্তব্য শুনতে শুনতে যে কোন সময় বিবেক ওর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলতে পারে, সে আশঙ্কাও ছিল।
সভা শুরু হওয়ার পর ঘন্টা খানেক কেটে গেল র্নিবিঘ্নে। এই এক ঘন্টা দুজন শিক্ষাবিদের বক্তব্যতেই খেয়ে গেছে । প্রথমজন বলেছেন শব্দ দূষণ নিয়ে, যদিও ওনার বক্তব্য বার বার ফিকে হয়ে যাচ্ছিল যানবাহনের শব্দে। ক্যা--, কু--, ভোঁ—ভার মাঝে ওনার বয়স্ক স্বর যতবার কেঁপে কেঁপে উঠছিল ততবারই বিবেক উত্তেজিত হয়ে মাথা নাড়ছিল আর পরেশ ভুগুং ভাগুং দিয়ে শান্ত করছিল। এরপর দ্বিতীয়জন জল দূষণ নিয়ে কিছু বলা শুরু করতেই বিবেক সোজা উঠে দাঁড়াল।
-কি হল! পরেশ ব্যস্ত সমস্ত হয়ে জিগ্যেস করতেই বিবেক ডান হাতের কড়ে আঙ্গুল দেখিয়ে হন হন করে ঢুকে গেল গলির মোড়ের সুলভ শৌচালয়ে। পরেশও একরাশ বিরক্তি নিয়ে ছুটল পেছন পেছন। পরেশেরও পেয়েছিল অল্প অল্প কিন্তু যদি বিবেকের থেকে বেশি সময় লাগে, কি হবে তখন ! –এই ভেবে চেপেই থাকল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই পরেশের আশঙ্কা সত্যি করে বিবেক বেরিয়ে হন্ত দন্ত হয়ে আবার এসে বসল নির্দিষ্ট চেয়ারে। পরেশও সেই মত এসে দাঁড়াল ওর পাশে।
এখনও অনেকেই বসে আছেন মঞ্চ আলো করে। উঃ, মাইক পেলে এনারা কেন যে এত বাজে বকেন কে জানে ! সবই যেন ওনাদের ক্লাশরুম । পরেশ ঘড়ি দেখল। ইতিমধ্যেই যে দূষণের নাড়িভুঁড়ি যে ভালই চচ্চড়ি হয়ে গেছে লোকেদের মধ্যে তা বেশ বুঝতে পারছিল অভিজ্ঞ পরেশ। উপস্থিত শ্রোতারা উস্‌খুশ শুরু করে দিয়েছে। কেউ ঘাম মুছছে তো কেউ আজকের খবরের কাগজটা দিয়ে পাখা করছে। সকলেই অস্থির অন্যকিছু শোনার জন্য। তিন নম্বর বক্তা উঠে মাইকের সামনে যেতেই দু-একজন হকার পরেশকে জিগ্যেস করল- কিরে সেই কেসটা নিয়ে কখন কথা বলবে?
-কোন কেসটা? পরেশ বুঝেও না-বোঝার ভান করল।
- যা বাবা! ভুলে গেলি নাকি? ওই যে আমাদের সিকুরিটি। কি হবে তার? রোজই বোম পড়ছে এলাকায়, গুলি চলছে, মাছয়ালা বদনকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল, সুবলকে গণ ধোলাই দিয়ে একেবারে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে দিল, সে নিয়ে কথা হবে না কিছু? তুই যে বলেছিলি সেসব নিয়েই নাকি---। তাই তো এলাম। এখন এসব দূষণ ফূষণ নিয়ে মেলা বকেই যাচ্ছে দেখি। কিসব এন্ডি- ভেন্ডিদের নিয়ে এসেছিস তোরা ---! আমরা দোকান ফোকান ,বেচা বুচি বন্ধ রেখে এলাম। ফালতু সময় বরবাদ। আমাদের কি সময়ের কোন দাম নেই নাকিরে?
-হবে, হবে, সব হবে। ব্যস্ত হচ্ছো কেন? বোসোনা শান্ত হয়ে। সে তো বলবেন আমাদের কাউন্সিলার।- পরেশ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল।
-তো তাকেই মাইকটা ধরানা বাপ। ওসব দূষণ টুষণ আমরা সামলে নেব এখন।
এসব তর্কা তর্কি কানে যেতেই বিবেক বিরক্ত গলায় বলে উঠল- আঃ, সাইলেন্স--- সাইলেন্স--
কিন্তু তাতে কি আর ঠেকানো যায়? দু-চারজন দূষণে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতেই ভলিন্টিয়াররা দৌড়ে এসে জোর করে বসিয়ে দিতে গেল চেয়ারে আর তাতেই আগুনে ঘি পড়ল। লেগে গেল ধাক্কা ধাক্কি।
-নিকুচি করেছে দূষণের । এক হকার গর্জে উঠল- আমরা কতদিন বেঁচে থাকব তার ঠিক নেই, এখানে দূষণ ফাটাচ্ছে? এই পরেশ এক্ষুনি আমাদের বিষয়টা নিয়ে কিছু ফয়সলা করতে বল , নয়ত কিন্তু---
পরেশ গণ্ডোগোলের আঁচ পেয়ে এক ভলিন্টিয়ারের হাতে বিবেকের ভার দিয়ে দৌড় লাগালো মঞ্চের দিকে। কাউন্সিলার মশাইকে ডেকে কিছু বলতে যেতেই জনতা উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে উঠল- এসব দূষণ টূষণ বন্ধ করো---। আমরা সিকুরিটি নিয়ে শুনতে চাই। এসব এখন চলবে না চলবে না ---।
বক্তা তখনও প্লাসটিক নিয়ে একটা প্রতিবেদন পাঠ করেই যাচ্ছিলেন। প্লাসটিক যে কিভাবে আমাদের পরিবেশ দূষিত করে তুলছে তা নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষনার মাত্র কয়েকপাতা নিয়ে এসেছেন আজকের জন্য। তিনিও তাই স্বাভাবিক ভাবেই অনড়। যতই বাধা আসুক এই উদাসীন সমাজকে সচেতন করার জন্য আজ তিনি বদ্ধপরিকর। তাই এসব গণ্ডোগলের মধ্যেই তিনি পাঠ চালিয়ে যেতেই হঠাৎ তার সামনে সজোরে এসে পড়ল আধলা ইট।
দর্শক শ্রোতারা রে রে করে উঠল - বন্ধ করো , বন্ধ করো--, চলবে না চলবে না---আমাদের নিরাপত্তার কি হবে? প্রশাসন কোথায়? পুলিশ আমাদের কথা শুনছে না। আপনারা সেই নিয়ে কিছু বলছেন না কেন?
বেজায় গণ্ডগোল তখন সভায়। হঠাৎ করে পাথর ছুড়তে শুরু করে দিয়েছে অনেকে। ভলিন্টিয়ার সব বেসামাল। সামনের সারির ভদ্রলোকেরা দিশেহারা হয়ে খুঁজছে পরেশ ,শিবুকে। ওরা তখন মহিলাদের সামলাতে ব্যস্ত। পুলিশ ভ্যানে থাকা দুজন কনষ্টেবল বিপদ বুঝে গণ ধোলাইয়ের ভয়ে পিঠটান দিয়েছে। একা ওসি আর কত পারবে ! তাও তিনি হাত তুলে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিতে যেতেই একখানা ষ্টোনচিপস্‌ সজোরে এসে ফাটিয়ে দিল ওনার একটা আঙ্গুল।
বিবেক এতক্ষণ ভদ্রলোকের মত বসেছিল ফুলের তোড়া হাতে ।জীবনে প্রথম পাওয়া পদকের মত ওটাকে আঁকড়ে ধরে ভাবছিল এবার থেকে ভদ্র হয়েই থাকতে হবে,বেকার গণ্ডগোল করে কি লাভ! কিন্তু যেই দেখল একটা পাথর সজোরে এক ছোলাওয়ালার হাত থেকে বেরিয়ে ধেয়ে যাচ্ছে মাইকের সামনে দাঁড়ানো সেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের দিকে তখন আর স্থির থাকতে পারল না । না আর নয়, আর নয়—বলতে বলতে ওকে আগলে থাকা ভলিন্টিয়ারটাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে ছুটে গেল মঞ্চের দিকে। মঞ্চে তখনও সেই প্লাসটিকবিদ কত মাইক্রোনের প্লাসটিক মোটামুটি ব্যবহার যোগ্য সেটুকু না বলে তিনি মঞ্চ ছাড়বেন না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছেন। আগত্যা বিবেকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হল ওনাকে আগলাতে। লাফিয়ে মঞ্চে উঠে শিক্ষাবিদকে জড়িয়ে ধরতেই ছুঁড়েদেওয়া সেই স্টোনচিপসটা সজোরে এসে লাগল ওর মাথার পেছনে । আঁক্‌ ,করে একটা শব্দ বেরলো শুধু বিবেকের মুখ দিয়ে কিন্তু তখনও ও জাপটে ধরে থাকল ওনাকে। এতখানি বোধহয় ভাবতে পারেননি সেই শিক্ষাবিদ। বিবেকের ওই ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখে ভয়ে থর থর করে কেঁপে উঠলেন।
বিবেক জাপটে ধরে বলে যাচ্ছিল- কোন চিন্তা করবেন না স্যার আমি তো আছি, কিচ্ছু হবে না আপনার। বলতে বলতে আরো দুটো স্টোনচিপস্‌ এসে লাগল ওর মাথায়, পিঠে। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল রক্ত।
এসেব দেখে পরেশ নিমেষের মধ্যে সেই শিক্ষাবিদ সহ বেশ কয়েকজনকে টেনে হিঁচড়ে বার করে নিয়ে গেল নিরাপদ দূরত্বে।
বিবেকের মাথা, পিঠ তখন রক্তাক্ত। গায়ের টি শার্ট ভিজে যাচ্ছে রক্তে। টি -শার্টের পিঠের দিকে আঁকা চে গুয়েভারার উদ্দীপ্ত মুখ। নিচে লেখা -আই ডিম্যাণ্ড ইকুয়ালিটি এণ্ড জাষ্টিস। সেই চে-র হাঁ করা মুখে তখন ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।
আবার একটা ইট সজোরে পিঠে লাগতেই বিবেক ঘুরে গেল সামনে। মুখের সামনে মাইক্রোফোনটা! এই তো সুযোগ ! বিবেক ডান হাতটা শূন্যে তুলে চেঁচিয়ে উঠল- বন্ধুগন , আমি জানতাম প্রস্তর যুগ এসে গেছে, মানুষ ফের ফিরে যেতে চাইছে আদিম যুগে। চারিদিকে দূষণ আর দূষণ--- জল নেই , খাদ্য নেই---, বাতাসে বিষ----, সামনে শধু যুদ্ধ আছে---, অনন্ত যুদ্ধ--- কখনো শেষ না হওয়া যুদ্ধ---মানুষ ফিরে যাচ্ছে গুহায়। পাথর ঘষে ঘষে দনাদ্দন তৈরি হচ্ছে অস্ত্র--। সেই অস্ত্রে লক্ষভেদ করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হচ্ছে ওয়ার্কশপ--, ইমারতি দোকানগুলোতে এখন শুধু পাথর বিক্রি হচ্ছে---। বন্ধুগন আপনারা কি---
কথা শেষ হল না, সজোরে এসে পড়ল আরো একজোড়া পাথর। একখানা তীরবেগে এসে বিঁধে গেল চোখের ওপরে, দ্বিতীয়খানা বুকে। টিশার্টের বুকে বিবেকের প্রিয় নেতাজির দৃপ্ত ছবি। নিচে লেখা -তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের--- । ঠিক সেখান থেকে এই মুহূর্তে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্ত। মাথা টলমল করছে বিবেকের, তবু ও চিৎকার করে যাচ্ছে - বন্ধুগন নেতাজি বলেছিলেন তোমরা আমাকে---। আবার পাথর । বিবেক দেখতে পেল কারা যেন নিচে চেয়ার ভাঙ্গছে আছাড় মেরে। মুখে ছুটছে অশ্রাব্য সব।
বিপদ বুঝে কর্মকর্তারা কেটে পড়েছে কখন। তিরঙ্গাও কোনমতে তার ছিঁড়ে কানেকশন কেটে ছুট মেরেছে প্রাণ বাঁচাতে।
বিবেক তবু অনড়। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে অর্নগল। চেঁচাতে চেঁচাতে হঠাৎ মনেহল মাইক কাজ করছে না ! দুবার ফুঁ দিল, তিনবার টোকা মারল বিবেক। ডানহাতে রক্তমাখা মুখ মুছে ঘষে দিল বুকের ওপর আঁটা নেতাজির দৃপ্ত ছবিতে। গম্ভীর স্বরে বলল- হ্যালো—--হ্যালো--- মাইক টেষ্টিং ওয়ান--- টু ---থ্রি ---—ফোর ,বলতে বলতে টলে পড়ল অজস্র পাথর ছড়ানো মঞ্চের ওপর।