রোদের দাগ

শিমন রায়হান



ঠিক আমার মতোই ছোট্ট টিনের বাকশোটি। হাতল ধরে হাঁটার সময় অদ্ভুত একটি আওয়াজ হয়। ভেতরে সীতানাথ বসাকের আদর্শলিপি আর ম্যাজিকস্লেট। ম্যাজিকস্লেটের নামকরণের নেপথ্যে ছিল খড়িমাটিস্বরুপ প্লাস্টিকের কাঠি আর ওপরে দেওয়া দাগগুলোর নিমেষেই উবে যাওয়ার স্বভাব। ইতস্তত দাগ, বর্ণমালা, পাখি- পর্দাটি টেনে দিলেই অদৃশ্য। সত্যিই তো ম্যাজিক!

আব্বার কোর্তা কেঁটে বানানো জামা-পাজামা আর টুপি পরে মক্তব যাই। মক্তব মানেই বাড়ি থেকে বহুদূর। সব থেকে দূর। দূরের প্রথম ধারণা। দীঘিটির পিছল ধার দিয়ে, ভাটফুলের গন্ধ নিয়ে, বড় গাছগুলোর আবছায়ায় শুকনো পাতা মাড়িয়ে, রাগী কালো কুকুরটির ভয় জয় করে বাড়ি ফিরে আসি মায়ের উদ্বেগ আর শঙ্কার তাবিচ বুকে নিয়ে। মাঝেমধ্যে মা এগিয়ে আসেন। আমি হাত-পা ধুলোয় ছড়িয়ে কাঁদি, একাই বাড়ি ফিরতে পারি- এই বীরত্ব জাহিরের মওকা বিফলে যাওয়ায়। ঈদসকালে নতুন জামা আসে। আব্বা বলেন, একটি পাখি এসে দিয়ে গেছে। আর ঐ জামাটির নাম হয়ে যায় ‘পাখির জামা’। আনকোরা জামাটির গন্ধ নিয়ে দেখি পাখিটির মায়াবী চোখ আর ওর করুণ ওড়াউড়ি।

প্রথম ভয় আর অপছন্দের ধারণা হয়ে মায়ের হাতের জুনিয়র গেলাসটি রাজ্যের তেতো ওষুধ খাইয়ে দেয়। মাঝেমধ্যেই ঠোঁট কেটে যায়। নিস্তার নেই। নিস্তার করে দেয় ডানপিটে দুপুর, কচিকাঁচা ব্রিগেড। অপ্রতিরোধ্য রোদের ডাক কে সামলায়! কাঠালপাতার টাকায় ধুন্দুমার সওদা চলে। পাশেই কাঠচেরাই কল, ছুতোরবাড়ি। করাতের ক্যালিওগ্রাফিক গ্রীবায় হিম উৎকণ্ঠা। চুপচাপ হাতের তালু ঘেমে যায়। কাঠচেরাইয়ের গুড়ো আর গাছের ছালের আঠা- চলে আসে ফড়িং ধরার দিন। ফড়িং ধরতে মন সায় দেয় না। ওদের খেলা শেষে কুড়িয়ে আনি নিহতদের ডানা। সযত্নে তুলে রাখি আমার জাদুঘরে। চকমকে রোদচশমা চোখে অচেনা মোটরবাইকের পিছে ছুটে যাই পোড়া পেট্রোলের নেশায়। দূর কালভার্টের বাক হয়ে ফিরে আসি বিবিধ কৌতূহলের উস্কানি পায়ে দলে। ফিরে আসতে মন চায় না। বোধহয় গ্রামগুলোর ওপারেই নেমে গেছে আকাশ, এগুলেই ধরা যেত মেঘমাশরুম।

টেপরেকর্ডারে হেমন্ত বেজে চলে, গাছতলায় বিজয় সরকার। ঘড়ির পাঠ ফুরোচ্ছে না আমার। সবগুলো কাঁটাই নাকি ঘুরছে অথচ আমার চোখে পড়ছে না। নির্মেদ কাগজফুলের গোলাপি ডাক আমায় খুঁজে পাচ্ছে ধীরে ধীরে

খ.
বাহারী উলের ওম পেচিয়ে হেঁটে যাচ্ছি ক্রিমের মতন কোমল রোদ মাথায় নিয়ে। হাতের টিফিনক্যারিতে আব্বার জন্য রুটি ও গুড়। কোমরে গোজা টকটকে লাল মাউথঅর্গান, বিবিধ আওয়াজের রঙিণ শহর। আমাদের বাড়ি বদল হচ্ছে। আরো অন্য দূরেরা কাছে চলে এলো কিংবা আমরা দূরের কাছে। বাকশোবন্দী কাপড়ের নির্জন গন্ধ নিই। নেশা হয়। দূর সময়ের নেশা। নামতা পড়ার মুশকিল আর কদ্দিন!

একদিন সকালে দাদী আর উঠলেন না। অনেক লোক এলো। একটা মনখারাপের উৎসব। বহুরঙা কাঠপেন্সিলে এঁকে যাই ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর দুঃখ, রুপকথার লালকমল-নীলকমল। ঝিনুককন্যার জন্যে আমার মন পোড়ে। ব্যক্তিগত জাদুঘরে বিস্তর জমে গেল ডাকটিকিটেরা। অথচ মধ্যগ্রীষ্মে চিঠিগুলো কান ধরে দাঁড়িয়ে। চিঠি পাঠানো হয় না। প্রাপকের ঠিকানা থাকে না কিংবা প্রাপক’ই।

পুজোর মেলা থেকে পিস্তল তো নয় যেন অনেক অনেক সাহস কিনবো। কিন্তু আমার কাছে ষোলো টাকা নেই। খুলনা বেতারে নামছে লোককাহিনির প্রত্নরাত। স্কুলে যাচ্ছি। বন্ধু জমছে। আরো আরো কথা জমছে। স্কুলের পাশেই নদী। ভোরের সাঁকো পেরোলেই গাঙশালিকের ডেরা, শিশির চোয়ানো ঊর্ণাজাল। পিঠাগাছ খুঁজে বেড়াই। এই নদী দিয়েই নানাবাড়ি যাওয়া। নানাবাড়ি মানেই সেই মস্তবড় দেবদারুটা, ইঞ্জিনের নৌকা। নৌকা থেকে নদীর জল ছুই। একদিন দেবদারু জয়ের অভিযানে বেরোই। ফসল কেঁটে কামিয়ে ফেলা মাঠ, ধোয়াশা। এইতো ভুতের লাঠি, গোরস্থানের মোড়। পথ ভুলে যাচ্ছি। কাগুজে নৌকায় কয়েকটি পিপড়া ভাসিয়ে দিই

গ.
রোজনামচা লিখি, অবিন্যস্ত অভিমান। আমার দিনযাপন আর কিশোরসংঘ থিয়েটার, ব্র্যাকেটে অগুন্তি আগমন-প্রস্থান। মধ্যবিত্তের আহ্লাদ বেঁয়ে উঠে পড়ছে রোদ আবার। অনবরত ফিরে আসছে পূর্ণদৈর্ঘ বিকেল আর ক্রিকেট বল হারিয়ে বাড়ি ফিরছি আমি। লোডশেডিং এর রাতে জ্বলছে বিষণ্ণ হারিকেন কাঁচ। ইংরেজি গ্র্যামারের প্রচ্ছদে ছোট্ট দুটি ছেলেমেয়ে জানালা দিয়ে তারা গুনছে। আপা বলে, ওরা নাকি আমরা। সত্যি করেই অতিরঞ্জিত চাঁদ ওঠে, বিষক্ষয়ী জোছনা। অনুভব করি রুপালী ধুলোর মিহিন নিরবতা। জোছনাকে চাঁদরোদ ডাকি।

ক্লাসের পড়ায় মন নেই। আপার বাংলা টেক্সটবুক আর সহপাঠ লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। ‘রাজা’ নামের কোনো একটি গল্প আমাকে কাঁদায়। মাধব সেনের দোকান থেকে লেখক রাজার জন্যে নুপূর কিনে আনেন। খাটাশে ধরে নিয়ে যায় রাজাকে, নুপূর পরানো হয় না। রাজা তার পোষা পায়রার নাম। এরপর রবীঠাকুর, জানালায় অসুস্থ অমল বাইরে দইওয়ালা হাঁক দিয়ে যায়। হিরোশিমার নারকীয়তা পড়ি। শেকসপিয়ার পড়ি। বৃদ্ধ উন্মাদ কিঙ লিয়ার, প্রেতপিতার প্রতি রাজপুত্র হ্যামলেটের আর্তনাদ, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। শরৎ, সুকান্তসমগ্র। পড়ি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আবদুল্লাহ আল-মুতী আর বিক্রির জন্যে রাখা পরিত্যক্ত কাগজের স্তুপ থেকে বের হওয়া ‘ভারতবিচিত্রা’।

আমি কি মেলানকোলিয়া পেশেন্ট?

ঘ.
বিপদ বুঝেই উড়ে যাই, সাথে পোষা বেড়ালটিও। কে যেন আঁকড়ে ধরে আমার প্রাণপণ দৌঁড়! আব্বার মৃত্যুস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়। হারানো কাঁচপাথরের দুঃখে জ্বর আসে। সেগুনের ডালে গুলিবিদ্ধ পাখিটির সারারাত, কাতর কান্নায় কেঁপে কেঁপে ওঠে সে। মা আমায় জলপট্টি দেয়। ঘুমোতে পারি না।

বর্ষাকাল ফুরিয়ে এলো টিনের চালে। অকারণ পার হচ্ছি ডুবন্ত রাস্তা-ঘাট। পাতাবাহারটি বেড়ে উঠছে ওর নিরীহ-বর্ণীল আভায়। হঠাৎ সুপ্রিয়ার ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার খবর! জানি ও যেতে চায়নি। বিবিসি, জার্মান বেতার তরঙ্গ শুনে আব্বাকে শুধু হতাশ হতেই দেখি। আঁতুরঘর থেকেই আব্বা আমার সর্বশেষ বিন্দু, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর, সমস্ত রোদের ছায়া। চিরতরুণ আব্বা একটি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফ্রেমে নিজেকে যেন চিরদিনের জন্যে জারি রাখবেন আমার পথের দিকেই।

আমার বিষাদ মিশলো আকাশ-জলে আর বিকেলটার নাম হলো মেলানকলিক। ওরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আর আমি খালপাড়ে বসে থাকছি বেকার। ধূসর আকুন্দের বৃত্তে তবু ভেসে আসে ছাতিমপথের মেদুরতা। জোনাকির ছায়াপথে পথ খুঁজে নিচ্ছি

ঙ.
আমার বামহাতের মধ্যমায় একটি পোড়াদাগ আছে। ছেলেবেলায় উঠোনে রাখা জ্বলন্ত কয়লায় হাত রেখেছিলাম। কিছু কিছু ভুল কেমন সনাক্তকরণ চিহ্নের মতো আপন হয়ে যায়। আমার সাথে পোড়াদাগটিও বড় হচ্ছে। পরম প্রেমে ওকে দেখি, আদর করি। অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতির দূর্গের দরোজা হয়ে ও ইশারা করে। কিছু ভুল অমোঘ অবলম্বন হয়ে ওঠে প্রেমে-অপ্রেমে।

‘অনিঃশেষ’ সত্যিই এক মাতাল শব্দ। ফুরোনোর পরেও দাগ থেকে যাওয়াটা কোমল সান্ত্বনা। রোদের দাগের সমান্তরালে শুয়ে থাকে বিবর্ণ বৃত্তান্ত, ভৌতিক হাসি নিয়ে কথা না রাখা চিরকালের কঠোর অতীত। আকরিক সময়বেলুনের ক্রমশ চুপসে ওঠা জাদুর ফাকে এইসব দাগ এক অশরীরি স্যুভেনির। তবু সেসব রোদেলা বৃত্তান্ত হয়ে যায় পথের পাঁচালী। আর ফিরে ফিরে আসেন ‘সিনেমা প্যারাদিসো’র আলফ্রেদো। আমি সালভাতর হয়ে যাই। অস্ফুট শুনতে পাই- ‘ডোন্ট কাম ব্যাক, ডোন্ট লুক ব্যাক, ডোন্ট গিভ ইন টু নস্টালজিয়া’।

কী বিষ তুলে নিচ্ছি হররোজ, জানো কি আলফ্রেদো?

স্ন্যাপশট :সিনেমা প্যারাদিসো, ১৯৮৮
গিসেপ্পে তর্নাতোরে
ইতালি