নৈঃশব্দের ডায়েরী

ম্যারিনা নাসরীন



‘রিপোর্ট পজেটিভ । দোয়া চাই।’
এটুকু লেখাতেই দোয়াদরুদ শুভকামনা আর হাহাকার বাণীতে নিউজফিড, ইনবক্স সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ শুনাচ্ছেন আশার বাণী। ফয়সালের কোন পোস্ট বা ছবিতে নিদেন পক্ষে ত্রিশ চল্লিশটা লাইক আর সাকুল্যে পাঁচ ছয়জন মন্তব্য করেন সেও পরিচিত ভাই ব্রাদার বন্ধু। কিন্তু পাব্লিক করা এই পোস্টে লাইক ঘন্টায় সাঁতত্রিশশ, কমেন্ট দুশোর ওপরে, শেয়ার হয়েছে শতিনেকবার। হু হু করে বাড়ছে ফলোয়ার। নোটিফিকেশনের ঠেলায় মোবাইল হ্যাং হবার জোগাড়। ফয়সালের নতুন একটা কাজ হয়েছে । লাইক গোণা আর মন্তব্য পড়া। কারো মন্তব্যের কোন জবাব দেয় না। তবে মন্তব্য পড়লে বুঝা যায় মানুষ কত কিসিমের হতে পারে। টুয়েন্টি ওয়ান সেঞ্চুরিতে এসে এর মত বিনোদন কোথায়?
কোন কোন আইডি থেকে হারবালের বিজ্ঞাপণও দেওয়া হচ্ছে। রুমাকে লিংকটা পাঠানো যেতে পারে। বলবে, আহা! আজ যদি আমার পাশে থাকতে। হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ফয়সাল।
কতদিন ধরে একঘরে বসে। কি করা যায়? ডায়েরী লেখা যেতে পারে। হেডিং হবে, ‘করোনাকালের দিনগুলো’ বা ‘যখন আমার করোনা হয়েছিল।’ নাহ, নামে তেমন কাব্যিক ভাব আসছে না। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নামকরণের প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। আজকাল কবি সাহিত্যিকেরা যেটি করেন, ‘বন্ধুরা, সামনের বইমেলায় আমার কবিতা/উপন্যাস আসছে। একটি নাম বলুন প্লিজ।’ ‘বন্ধুগণ বলে যান কোন প্রচ্ছদটি সুন্দর?’ আরে কি কবিতা উপন্যাস লিখেছ কজন বন্ধু জানে? নিজে কবিতা লিখতে পারো, নাম দিতে পারো না?
ধুর! ফয়সাল আজকাল কেমন জানি ভিংডিক্টিভ মাইন্ডের হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু কি সমাগত? নাহ সেটা হবে কেন? সারাজীবন মা দুধ ঘি খাইয়েছে। নিজেও খাবার দাবারের ব্যাপারে সৌখিন । রুমা তো বলতে গেলে প্রতিবেলার খাবারের মেনু ঠিক করে ক্যালোরি হিসেব করে। এত সহজে কি মৃত্যুর কাছে নিজেক সঁপে দেবে? অসম্ভব!
ঘরে থার্মোমিটার নেই। থাকলেও খুঁজতে ইচ্ছে করছে না। হাত দিয়ে জ্বর মাপে ফয়সাল। ১০১ হবে হয়ত। শরীরের গিঁটে গিঁটে ব্যথা। লম্বা করে শ্বাস টেনে দেখে কষ্ট হচ্ছে কি না। বুকের কোথাও চাপ পড়ছে না। সিম্পটম না থাকলেও মানুষ মরতে পারে। রাজুর কোন সিম্পটম ছিল না। দুবার লুজ মোশন হলো। সামান্য বুকে ব্যাথা, হাসপাতালে নিতে নিতে শেষ। হাসপাতাল লাশ আটকে দিল। কোভিড-১৯ টেস্ট করা হবে। ফয়সাল আর আরো কয়েকজন অফিসার তায় তদবির করেছিল যাতে ঝামেলা না করে ফ্যামিলির কাছে লাশ হস্তান্তর করে দেয়। নিশ্চিত ছিল, করোনা নেই। কিন্তু রিপোর্ট এলো পজেটিভ। ভাগ্যিস তদবিরে কাজ হয়নি। নইলে সাথে আরো কতজন যে মরতো!
যাক, যা হবার হবে। ডায়েরীতে অন্তত লেখা থাকুক। ভার্সিটি লাইফে ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল। বিশেষ করে উদ্দাম প্রেমের অনেক রোমান্টিক স্মৃতিই লিখে রেখেছিল। প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলো। ঝুঁকি না নিয়ে সেই ডায়েরীর পাতা ছিঁড়ে পুড়িয়ে উড়িয়ে দিল সব স্মৃতি। আজ কত তারিখ? ঘরের চারদিকে চোখ বুলায় ফয়সাল। একটা ক্যালেন্ডার নেই কোথাও। এমন কি ঘড়ি পর্যন্ত হাওয়া। আরে ছিল তো সব। গেলো কোথায়? মোবারক নিয়ে গেলো নাকি ?
অন্তত ডায়েরী পেলে হয়। ফয়সাল তিনটে ঘর তোলপাড় করে ফেলে। কোথাও একটা ডায়রী, ক্যালেন্ডার বা ঘড়ি নেই। এমনকি হাতের ঘড়ি পর্যন্ত উধাও। বছরের শুরুতে অন্তত গোটা ছয় ডায়েরী পেয়েছিল। যাকগে, একটা খাতা পাওয়া গেছে। ডায়েরীর মত রুলটানা কিন্তু কোন তারিখ লেখা নেই। আজ কত তারিখ কি বার কিছুতেই মনে করতে পারছে না। সবই যেনো একই তারিখ একইবারে মধ্যরাতে এসে সময় থমকে গেছে। ভেংগেচুরে বুঁদ হয়ে ঘুমুচ্ছে পৃথিবীর সবগুলো ঘড়ি। সংগনিরোধে বটে!
মোবাইলে সময় তারিখ সবই থাকার কথা । কিন্তু অদ্ভুত! মোবাইলে কোন তারিখ সময় শো করছে না। হচ্ছে কি এসব? চিৎকার করে ফয়সাল। ঘরগুলোর মধ্যে নিজের কন্ঠের ইকো হয়ে ফিরে আসে নিজের কাছে। তিনরুমের ফ্যামিলি বাসার দরকার ছিল না ফয়সালের। কিন্তু রুমা বাচ্চাদের স্কুল আর নিজের ছুটিছাটায় আসে। এখানে কিছুদিন থেকে যায়। অন্যসময় পাশের রুমে পিওন মোবারক থাকতো। ফয়সালের রান্নাবান্না কাপড় ধোয়ার সব কাজ সেই করে। বিনিময়ে নিজে খায়, থাকে। ফয়সালের শরীরে কোভিড-১৯ পজেটিভ আসার পর বাড়িতে চলে গেছে । দুবেলা খাবার রেঁধে দিয়ে যেতো বাড়ি থেকে । বাজারের টাকা ফয়সালই দেয়। কদিন হলো মোবারকের শরিরে এই জীবাণু হানা দিয়েছে। ফলত এই কদিন আলু আর ডিম সেদ্ধ ছাড়া কিছু খাওয়া নেই।
আজকের তারিখটা অবশ্য কাউকে ফোন করেও জানা যায়। কিন্তু বাজে কটা? ঠিক হবে কাউকে ফোন করা? ফয়সাল কিছুই করে না বরং রুলটানা খাতার ওপরে গোটা গোটা করে লেখে ‘মৃত্যুর কদিন আগে’। নাহ নেগেটিভ কথা লেখা ঠিক হবে না। একটানে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে। আবার শুরু করে ‘করোনা কালের দিনগুলো’। আবার ছেঁড়ে। এভাবে ছিঁড়তে ছিঁড়তে খাতার অর্ধেক প্রায় ছিঁড়ে ফেলে ফয়সাল। তারপর একসময় খাতাটাকে ঘরে কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কি হবে ঘোড়ার আন্ডা লিখে।
সিলিং ফ্যান ঘুরছে বোঁ বোঁ করে। ফয়সাল চিৎ হয়ে শুয়ে সেই আওয়াজ শুনতে থাকে। বহুক্ষণ পর মনে হয় আওয়াজ আসছে ফ্যান নয়, মোবাইল ফোন থেকে । দুইপাশের দুই মোবাইল ক্রমাগত ভাইব্রেট করে যাচ্ছে। চেনা অচেনা সকলের মুখে আহাউহু চুকচুক শব্দ শুনতে শুনতে ক্লান্ত। ঘিনঘিন লাগে শালাদের মায়াকান্না দেখলে। সন্তান মাকে জংগলে ফেলে যাচ্ছে। বাবার সৎকারে কেউ নেই। মুখে সব মায়া মারাতে আসে! দিয়ে যাওনা দুবেলার খাবার! এই কদিনেই কত চেনা হলো তোমাদেরকে!
দেড় বছর হলো ফয়সালের পোস্টিং এই জেলায় হয়েছে। রুমা দুই বাচ্চাকে নিয়ে রাজশাহীতেই থেকে গেলো। ওর কলেজের চাকরী। বাচ্চাদের স্কুল। এত দূরের রাস্তা । দেড়-দুমাস আগে যাওয়া হয় না ওদের কাছে। এই শহরে ফয়সালের ফরটিন জেনারেশনের কেউ নেই। সারাদিন অফিসে কেটে গেলেও রাত আর কাটতে চায় না। ছয় ভাইবোনের মধ্যে হইহুল্লোড় করে বড় হয়েছে। হলের জীবন ছিল আরো তুমুল কোলাহলের। আর বিয়ে সন্তানের পরে তো দুর্দান্ত ব্যস্তসমস্ত কলরবের দিন । এখানে এসে ফয়সাল একাকী হাঁপসে উঠেছিল। যার কারণে অফিসের সময়ের বাইরেও সে অফিসের নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এখন? উফ! কি নিঃশব্দের পৃথিবী। রাস্তায় রিকশার টুংট্যাং শব্দ নেই, হকারদের ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি নেই। মানুষের ছায়া দেখা হয়নি কতদিন ভুলে গেছে। দোতলা বিল্ডিংটি আরো তিন ফ্যামিলির মানুষে গমগমে ছিল। এখন সুনসান। ফয়সাল যেনো মধ্যযূগের শুদ্র থেকেও নিম্নজাতির অচ্ছুৎ কোন প্রাণী যার নিঃশ্বাসে বিষ। রিপোর্ট পাবার পর পুরো বিল্ডিং লকডডাউন ঘোষণা করার আগেই বাকী তিন ফ্যামিলি সরে পড়েছে।
নাহ! ক্ষুধাটা আবার মনে হচ্ছে চাগিয়ে উঠছে। শ্বাস নিতে কি কষ্ট হচ্ছে? ফয়সাল লম্বা করে শ্বাস নেয়। বাম বুকে চিনচিনে ব্যথা। কোয়ারেন্টিনে থাকার সময়ে হার্ড ইম্যুনিটি ডেভ্লপ করার জন্য প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞগণ। কিন্তু এক ডিম আলু সেদ্ধ ছাড়া ফয়সাল আর কিছু করতে পারে না। আজ সেটাও করা হয়নি। রুমা অবশ্য বিষয়টা জানে না। জানলে কোনভাবেই আটকে রাখা যেতো না। এমনিতেই সে আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে। ফয়সাল নিজেও উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে বলেছিল আমাকে পরিবারের কাছে যেতে দেওয়া হোক। তারা হয়ত রাজী হয়েও যেতেন কিন্তু ফয়সালই মত বদলেছে। বাসায় মা ডায়াবেটিসের রোগী। বাচ্চা দুটো ছোট। এই ভয়ানক শত্রু সাথে নিয়ে কোথাও যাবার মানে নেই।
রুমা ইজ কলিং… হোয়াটস এপে ভাসছে রুমার নাম। ভিডিও কল করেছে। এই মেয়েটির সারাদিন আর কোন কাজ নেই। ফয়সালকে ফোন করা আর ভেউ ভেউ করে কাঁদা ছাড়া। জাস্ট অসহ্য। বিরক্তিকর ছিঁচকাঁদুনে একটা। কিছুক্ষণ আগেও ভিডিও কলে কথা হয়েছে। ওর চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছিল। ফয়সাল হো হো করে হেসে দিয়েছিল । ‘আরে বোকা মেয়ে কাঁদছ কেন? মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী।’ বিশ্বে দুই লক্ষের ওপরে মানুষ মরেছে। তাদের সারির একজন না হয় আমি হলাম । থামো তো।’
তাতে রুমার কান্না আরো বাড়ে। ফয়সাল মুখে হাসি রেখেই যোগ করে, ‘দেখো, তোমার স্বামী জনগণের সেবা করতে গিয়ে যদি মরে যায় তুমি গর্ব করে বলতে পারবে। হুম আমি গর্বিত স্ত্রী বটে। হো হো হো। আচ্ছা গর্বিত শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ কি বলত? ভুলে গেছি।’ এবার রুমা আকাশ পাতাল তোলপাড় করে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নার মধ্যেই ফয়সাল ফোন কেটে দিয়েছিল। মায়ের সাথে একবারও কথা হয়নি। রুমা যখনই বলে মা তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন ফয়সাল চট করে ফোন ডিসকানেক্ট করে। সবাইকে ফাঁকি দিতে পারলেও মাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। ফয়সালের চোখের পানি টেনে বের করবেনই এই ভদ্র মহিলা।
দুবছরের ছেলে অর্ণব তেমন কিছুই বুঝে না। মেয়েটা বড়। ঋদ্ধি। ক্লাস ফাইভে পড়ে। মায়ের সাথে মাঝেমধ্যে এসে ভিডিওতে যোগ দেয়। বুড়ীর মত গম্ভীর স্বরে উপদেশ দিতে দিতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। কেন কাঁদে ওরা? এই ভাইরাসে সবাই কি মরছে? রুমা কিছুতেই হাসপাতালে যেতে দিতে রাজী নয় ওর ধারণা হাসপাতালে গেলেই ফয়সাল আর ফিরবে না। কিন্তু রুমা বেগম জানে না এই বাড়িটাতে তার স্বামী একা একা কতদিন থাকবে? কি খাবে?
ফয়সালের বাসা শহর থেকে সামান্য দূরে। এমনিতে লোকজন কম। ছুটি ঘোষণার পর থেকে জনশুন্য হয়ে গেছে। ফয়সাল অবশ্য জানালা খোলে না। বারান্দাতে উঁকি দিয়েও দেখে না। কেন জানি ভালো লাগে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখো । শারিরীক দূরত্ব বজায় রাখো। ফয়সালের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার মত কেউ নেই। সে নিজে আর এই দোতলা বাড়ি খাট আসবাব । শুধু একটা ঘড়ির অভাব বোধ করছে সে। সময়টা দেখা জরুরী।
প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। ফোন দুটো গোঙাতে গোঙাতে থেমে গিয়েছে। ফয়সাল ওঠে। রান্নাঘরে যদি কিছু পাওয়া যায়। সব ঘরে লাইট জ্বলছে। ফয়সালই জ্বালিয়ে রেখেছে যদিও সে জানে না এখন রাত নাকি দিন। রান্নাঘরের তাকে গোটা কয়েক কৌটা। তারই একটাতে ভর্তি মুড়ি। এই অখাদ্য ফয়সাল কখনোই খায় না। সম্ভবত মোবারক চায়ের সাথে মুড়ি খায়। কিন্তু আজ মুড়ি দেখে ফয়সালের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়েই গোগ্রাসে মুঠো মুঠো খেতে থাকে। একটু লাল চা করতে পারলে হয়ত জমে যেতো কিন্তু সেটুকু ধৈর্য্য বা শক্তি আপাতত নেই। ফিল্টার থেকে পানি খেয়ে বেডরুমে এসে দড়াম করে বিছানায় পড়ে যায়। কাত হয়ে শুতে গিয়ে জিনিশটা চোখে পড়ে। খাটের সাইড টেবিলে রাখা। সাদা রঙের ভাঁজ করা এপ্রোন মত কিছু একটা। প্রথমে জিনিসটা কি মনে করতে পারে না ফয়সাল। হুট করেই মনে হয়, পিপিই। পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইমপমেন্ট। অফিস থেকে দিয়েছিল। ত্রাণ কাজ তদারকি করতে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে তার জন্য। কোন এক কর্মকর্তা এটি পরে ছবি দিয়ে দিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। হয়ে গেলো ভাইরাল। তোমরা কেন পিপিই পর? তোমরা তো ডাক্তার নও। এখন ঠেলা সামলাও। ফয়সাল ফেলে রেখেছে। পরেনি । বিশ টাকা দামের মাস্ক আর পলিথিনের হ্যান্ড গ্লাভস পরে গিয়েছিল ত্রাণ দিতে। দরিদ্র মানুষ গুলো পারলে কোলে চড়ে বসে। কে যে করোনা রোগী, কে যে নয় কি ক্ষমতা আছে বুঝার? জায়গাটা হাসপাতাল নয়, আর নিজেরাও ডাক্তার নয়। ভালোবেসে তাদের কেউ জনোয়ারটাকে ফয়সালের কাঁধে চাপিয়ে গিয়েছে। আরো অনেক অফিসারই আক্রান্ত। এখন কে করে কার কাজ! পিপিইটার গায়ে হাত বুলায় ফয়সাল। ভাবছে কোন হাসপাতালে দিয়ে দেবে। ডাক্তার বা নার্সের কাজে লাগুক।
মোবাইল গোঙাতে শুরু করেছে আবার। রুমা। ধরবে নাকি? ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখবে একটু। মাকে দেখা হয় না কতদিন। রুমাকে অবশ্য স্থাবর অস্থাবর যাকিছু আছে ফয়সালের সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে। স্মার্ট মেয়ে। বাচ্চাদেরকে মানুষ করতে সমস্যা হবে না। কিন্তু সত্যি যদি ফয়সাল মারা যায় রুমা কি বিয়ে করবে না? সৎ বাপ দেখবে ওদেরকে? হাহাহা কি ভাবছে এসব!
কটা বাজে। ইশ একটা ঘড়ি আনিয়ে রাখা দরকার ছিল । নাকি ঘরেই ছিল মনে করতে পারছে না ফয়সাল। ঘুরে ফিরে ঘড়ির কথা কেন ভাবছে ফয়সাল। সময় থমকে গেছে বলে? নাকি পিছিয়ে গেল! ঘড়ির কথা ভাবতে ভাবতেই মনে হলো কোথাও তলিয়ে যাচ্ছে। না ঘুমুনো যাবে না। জোর করে টেনে তোলে নিজেকে। গত কদিন ধরে এভাবেই নিজেকে জাগিয়ে রাখছে সে। যেনো ঘুমুলেই অচেনা দূরের দেশ। বুকের ভেতর চাপ অনুভুত হয়। মনে হচ্ছে ঘরে অক্সিজেন কমে গেছে। হাঁফাতে হাঁফাতে ফ্যানের স্পিড বাড়ায় ফয়সাল।
নাহ বুক ভোরে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না কোথাও যেনো আটকে যাচ্ছে। হাসপাতালে যাওয়া দরকার। ফোন দেয় হটলাইনে। ক্রমাগত এঙ্গেজড। এভাবে হবে না। বস আগেই হাসপাতালে পাঠাতে চেয়েছিল, ফয়সাল যায়নি। অগত্যা তাকেই ফোন করে ফয়সাল। নির্ভার লাগে। এখন আর তলিয়ে যেতে দোষ নেই।
কত সময় পর যেন! অনেক দূর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। কোন এক অন্ধকার গুহায় শুয়ে বহুক্ষণ ধরে শুনতে থাকে ফয়সাল। কিন্তু শব্দের উৎপত্তিস্থল কোথায় বুঝতে পারে না। বেজেই চলেছে। কলবেল বাজছে না? হুম তাইতো। অবসন্নতা আর ক্লান্তি চেপে ধরেছে। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে দরজার কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু দরজা খুলেই আতংকে জমে যায়। সাদা পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা দুটো মূর্তি। দ্রুত দরজা বন্ধ করতে যাবে যখন একটি মূর্তি কথা বলে ওঠে, ‘আমরা হাসপাতাল থেকে এসেছি আপনাকে নিয়ে যেতে।‘ শব্দ করে হাসার শক্তি নেই কিন্তু মনে মনে একচোট হেসে নেয় ফয়সাল। ওহ, এই সেই পিপিই। ‘দ্রুত তৈরি হয়ে আসুন।’ আরেক্ মুর্তি প্রায় অর্ডারের সুরে বলে।
কি আর তৈরি হবে? ছোট একটা ব্যাগে কটা কাপড় ঢুকিয়ে নেয় আর পিপিইটা। ওরা সাথে করে স্ট্রেচার নিয়ে এসেছে। স্ট্রেচারে শুয়ে নাচতে নাচতে দোতলা থেকে নীচে নামার সাথে সাথে একঝাঁক রোদ্র ওকে ঝাঁপটে ধরে। এম্বুলেন্স যখন ওকে পেটে ঢুকিয়ে আর্ত চিৎকার শুরু করেছে তখন মনে পড়ে দুটো মোবাইলই সে বাসায় ফেলে এসেছে। আজ কত তারিখ জানার জন্য এখনো মনটা খচখচ করছে। ওদেরকে জিজ্ঞেস করবে? নাকে মুখে অক্সিজেন গুঁজে দিয়েছে কথা বলবে কিভাবে?
মাকে দেখা হলো না ছেলেমেয়ের সাথেও দুটো কথা হলো না। এর আগেরবার যখন রাজশাহী গিয়েছিল বেশি করে বাজার করে দিয়ে এসেছিল? কটা মুরগী কিনেছিল মনে করার চেষ্টা করে ফয়সাল। মনে আসে না। থাকগে, রুমা নিজেও সব পারে এখন।
খুব বেশি সময় নয়। এ্যাম্বুলেন্সের পেট থেকে স্ট্রেচার টেনে বের করে ওকে। এই হাসপাতালে আগে কখনো আসেনি ফয়সাল। তাকে যে রুমে নেওয়া হলো সেখানে বেশ দূরে দূরে কয়েকটা বেড। প্রত্যেক বেডে কেউ না কেউ শুয়ে আছে। এটাকে কি আইসোলশেন বলে? ভেন্টিলেটর কটা আছে এখানে? ভেন্টিলেটর কি সেটাই জানে না ফয়সাল । ফয়সালকে বেডে শুইয়ে দেবার পর অনেক্ষণ কেটে গেছে কেউ কাছে আসেনি। এ কি ভয়ংকর নির্জনতা। ফয়সাল ঘড়ির খোঁজে চারদিকে তাকায়। নাহ কোন দেওয়ালে ঘড়ি নেই। কোভিড-১৯ এর কাটাকাটা ফল সদৃশ্য ছবি চারপাশে ঝুলছে। সাথে সতর্কবাণী। দূরের টেবিলে হালকা নীল রঙের দুটো মূর্তি কিছু লেখালেখি করছে। নার্স সম্ভবত। ওদের একজন ফয়সালের বেড থেকে কিছুটা দুরুত্বে দাঁড়িয়ে মনিটর থেকে রিডিং নিতে আসে। মুখে প্ল্যাস্টিক জাতীয় ট্রান্সপারেন্ট ঢাকনার মধ্য দিয়েও মেয়েটিকে অসম্ভব সুন্দর মনে হয় ফয়সালের। এদেরকে বলা হচ্ছে করোনার সামনের সারীর যোদ্ধা। কি নাম মেয়েটির? ওর হাতে ঘড়ি দেখা যাচ্ছে কিন্তু এমন কুঁচকে আছে কেন ঘড়িটা? উফ! চোখের ভুল। ফয়সাল ঠিক করে পিপিইটা সে এই মেয়েটিকেই দেবে।
হঠাৎ করে প্রচন্ড শীত লাগছে ফয়সালের। পা দুটো ব্যথায় টনটন করছে। চারদিকে কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে। সবকিছু আবছা। বুকে তীব্র যন্ত্রণা। মেয়েটির নাম কি? ডাকবে ওকে? সিস্টার এদিকে একটু আসুন প্লিজ। নাহ শুনছে না। অক্সিজেন কি বন্ধ হয়ে গেল? শেষ পর্যন্ত ডায়েরী আর লেখা হলো না। ফয়সাল কি হেরে যাচ্ছে?
‘I’ve found that there is always some beauty left – in nature sunshine, freedom, in yourself, these can all help you’
কার কথা যেন! স্মৃতি হাতড়ায় ফয়সাল। হুম মনে পড়েছে আনা ফ্রাংক লিখেছিল । মাত্র পনের বছরের একটা মেয়ে নাৎসি বাহিনীর ভয়ংকর থাবার মধ্যে বসেও যদি এমন আশার কথা লিখতে পারে ফয়সাল তো তাগড়া জোয়ান। সামান্য একটা জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করছে । কিন্তু নিজের মধ্যে কি কি সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে ভাবতে গিয়ে ক্লান্তিতে মন অবশ হয়ে আসে।
প্রিয় কটা মুখ খুঁজতে চারপাশে তাকায়। কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। না থাকুক। দারা পুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার? একা এসেছিল একাই যেতে হবে।
মেয়েটি কাছে এসেছে। কিছু একটা বলছে ফয়সালকে । ফয়সাল শুনতে পাচ্ছে না। মেয়েটি দৌড়ে ফিরে যাচ্ছে আবার আসছে। ফয়সাল একবার ভাবে পিপিইটা মেয়েটিকে দেওয়া হলো না। এখানে ভেন্টিলেটর কটা আছে? ফয়সাল কি ভিআইপি? বয়স কত ওর? ও কি ভেন্টিলেটর পাবার যোগ্যতা রাখে? ফয়সালের আফসোস হয় আজকের তারিখটা জানতে না পারার, আজকের বার কি ছিল সেটাও জানা হলো না, আর সময়?
শরীর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সামনে থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। মেয়েটির মুখ, সারি সারি বেড, সতর্ক বাণী লেখা দেয়াল।
‘where there’s hope, there’s life. It fills us with fresh courage and makes us strong again’
এটাও আনা ফ্রাংকের কথা। ফয়সাল জানে এই নৈঃশব্দ থাকবে না। পৃথিবীর সকল ঘড়ি একদিন সময় জানাতে শব্দ করে বেজে উঠবে। ঢং ঢং, ঢং ঢং, ঢং ঢং…।

চিত্র - সালভাদর দালি – পার্সিস্টেন্স অব মেমোরী