কিয়েরোস্তামি, ক্লোজ-আপ ও একটি চলমান দৃশ্য

হাসনাত শোয়েব



এই দৃশ্যটি নিয়ে কিছু লেখার যোগ্যতা আছে কিনা আমি ঠিক জানি না। ফ্রিজ হয়ে যাওয়া এই ছবিতে লুকিয়ে থাকা যে ইটার্নাল লোনলিনেস সেটা মাপার সাধ্য আমার নাই। এটি আব্বাস কিয়েরোস্তামির ক্লোজ আপ সিনেমার একেবারে শেষের দিকের দৃশ্য। সিনেমার পোস্টারেও ব্যবহার করা হয়েছিল এটি। এই দৃশ্যের তীব্রতা মাপা আমার জন্য কঠিন। কেবল কিয়েরোস্তামি ও তার চোখই জানে কিভাবে মেপে নিতে হয় এমন একটি দৃশ্যকে। এটি আমার কাছে এমন দৃশ্য, যার সঙ্গে তুলনা করা যায় বোর্হেসের বর্ণিত সেই ‘আলেফ’কে। যার মাঝে সৃষ্টিতত্বের পুরো রহস্যটাই লুকিয়ে আছে। যাকে জানতে পারলে জানা হয়ে যায় মহাবিশ্বের আদি ও অন্ত। এটি তেমনই এক দৃশ্য আমার কাছে।
আমি জানি আমার সাথে হয়তো অনেকেই একমত হবেন না। না হওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়তো এরচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য কেবল কিয়েরোস্তামির সিনেমাতেই ভুরিভুরি আছে। আছেই তো। যেমন টেস্ট অব চেরির সেই দৃশ্য, যখন মি. বাদি প্রথমবার একজনকে বুঝানোর চেষ্টা করছিল আত্মহত্যার পর কিভাবে তাকে কবর দিতে হবে, এটিও তেমন অসাধারণ। এমন অনেক দৃশ্য তৈরি হয়েছে কিয়েরোমাস্তির চোখ দিয়ে। কিন্তু ইরানি সালতানাতের মহান এই শিল্পীর নাম বললে আমার কাছে সবার আগে ক্লোজ আপের এই দৃশ্যটিকেই মনে পড়ে। সিনেমার প্রেক্ষাপটে এর আলাদা গুরুত্ব আছে। অবশ্য ক্লোজ আপ গোটা সিনেমাটাই যেন আলাদা আলাদা ভাগ করে সাজিয়ে রাখা যায়। কিন্তু এই একটি দৃশ্যটিকে আমি সবসময় আলাদাভাবেই দেখি। যখনই দেখি চলচ্চিত্র জগতের সমস্তটাই যেন আমার সামনে উন্মোচিত হয়ে যায়। একজন হতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক এবং একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের এই যাত্রা যেন কখনো শেষ হওয়ার নয়, যদিও তা এক পর্যায়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কিয়েরোস্তামি যেন কিছু না বলেও অনেক কথা বলে দিয়েছেন।
আমার মনে নেই আমি প্রথম কবে ক্লোজ আপ দেখেছিলাম। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে থাকার সময় দেখেছিলাম। মনে আছে, আগের দিন দেখেছিলাম ‘হোয়্যার মাই ফ্রেন্ডস হোম’, কোকের ট্রিওলজির প্রথমটি। একদিন পর দেখলাম ক্লোজ আপ। কিন্তু এটি দেখার পর একটা আলোর পর্দা যেন চোখের সামনে দুলে উঠল। জীবনের যে তিন চারটি দৃশ্য মাথার ভেতর গেঁথে আছে, এটি তার একটি। আমি জানি না, কেন এমনটা হলো। এটি নিচকই একটি সিনেমার দৃশ্য। এমন নয় যে, এতে আবেগ প্রকাশের বাড়তি কোন আয়োজন আছে। অনেকে হয়তো এই দৃশ্য সেভাবে মনেও রাখবেন না। বিশেষ করে ক্লোজ আপে এর আগ পর্যন্ত কিয়েরোস্তামি যা যা দেখিয়েছেন তার বিপরীতে। কিন্তু আমি বুঝতে পারি এই দৃশ্য আমার মাথা গেঁথে গেছে। যেভাবে নি:সঙ্গতার একশ বছরের কল্পনার সেই দৃশ্য, যেখানে বরফের ওপর হাত রেখে বলা হয়, মানুষ এক মহান জিনিস আবিস্কার করেছে। কিংবা শহীদুল জহিরের ‘কোথায় পাব তারে’র সেই লাইন যেখানে বলা হয় ‘দুপুরবেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টো দিকে, ছেওয়া না থাকলে, যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেই দিকে’। এই সব কল্পনার দৃশ্যের মতো ক্লোজ আপের এই দৃশ্যটিও হয়তো আমি আমৃত্যু বয়ে বেড়াব।

স্ন্যাপশটঃ ক্লোজআপ,আব্বাস কিয়েরোস্তামি