বাচাল শূন্যতা

রুদ্রদীপ চন্দ



পাশ থেকে কচুরীপানা ভর্তি জল সরে সরে যাচ্ছে। সরে সরে যাচ্ছে ফেলে রেখে আসা ধার, ধোঁয়ায় ভরা ঘর, অনেক মানুষ, তাঁদের ভিড়। অনন্ত বৃষ্টির ফোঁটা রাত ন'টা পঁয়তাল্লিশের লোকালকে ফাঁকা করে দিচ্ছে, যেভাবে পরাজিত প্রতিযোগী সরে যায় জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো থেকে। একের পর এক স্টেশন পরীক্ষকের মতই বান্ধবহীন। হেরে যেতে এত ভালো লাগে তা আগে বুঝিনি কখনো। স্বেচ্ছায় টুপটাপ খসে পড়ছে চেক শার্ট, রাবারের চটি, হা ক্লান্ত চশমার কাঁচ। দত্তপুকুরে হাসতে হাসতে নেমে গেল কুঁচকীর ভাঁজে জমে থাকা দাদ, হাত ধরে সাবধানে তাকে প্লাটফর্মের কংক্রিটে নামালো চুলকানি। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম ওদের। লাল মুখ জুড়ে সে কী মিষ্টি হাসি! আমি জানি ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকা টিআরপির জ্যোতিতে আলোকিত রিয়েলিটি শো আসলে কোনো প্রতিভার কথা বলে না। ক্যামেরার সামনে, চকচকে জামা পরা গান আসলে বাড়ির কথা বলে। ঘরে যাওয়ার ছন্দ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় নাচগুলো। এইসব ভাবনার মাঝেই আমার পাশে নিম্ন বুনিয়াদি স্কুলের চেহারায় টিকিট চেকারের কোট পরে আত্মহত্যা এসে বসল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'কোন স্টেশন?' স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিইনি আমি। টিকিট চেকারের সঙ্গে টিকিট থাকলে কেই বা কথা বলে? যদি জানতেই হয় তাহলে টিকিট চাইলেই পারত, দেখে নিত। ও নিজে থেকেই বলল, 'আসলে ডিউটি শেষ তাই বাড়ি ফিরছি। কালো কোট আর ছাড়া হয়ে ওঠেনি।' এত কথার পর সৌজন্যবশত আমারও কিছু বলা দরকার। তাই ঘুরে বললাম, 'ক'জনকে ধরলেন আজ?' আত্মহত্যা হেসে বলল, 'আজ একটাকেও পাইনি জানেন। সব শালা টিকিট কেটেছে।' তারপর অল্প থেমে কিছুটা স্বগোতক্তির মত গোঙালো, 'এক বছর হয়ে গেল এখনও না দাস দা'র মত পাখি চিনতে পারি না আমি।' আমি আর কথা না বাড়িয়ে পড়ব বলে প্লাথের বইটা বের করলাম ব্যাগ থেকে। বইটা দেখেই ও যেন কীরকম তড়িঘড়ি উঠে গেল সিট ছেড়ে। গেটের কাছে দাঁড়ালো আত্মহত্যা। যদ্দূর মনে হল, যেতে যেতে দাঁতে দাঁত চিপে 'খচ্চর শালা' না কী একটা বলল যেন। কী জানি হয়তো ইংরেজি বই দেখে... আমার তখন সত্যি পড়ার ইচ্ছে ছিল না। যাতে আর ঘ্যানঘ্যানে কথায় ফিরতে না হয় তাই প্লাথ খুলেছিলাম। আমার কবি যাঁরা তাঁদের বইকে আমি পেঁয়াজের খোসার মত খুলি। একটার পর একটা পরত আমার চোখ জ্বালা বাড়ানো ছাড়া আর কিচ্ছু করতে পারে না। জ্বলতে থাকা চোখ নিয়েই বাইরে তাকালাম আমি। ভাদ্রের মেঘে তখন বাঁশি শোনা যায়। ডি স্কেল, বাগেশ্রী রাগ। অনেক রাত হল। কোনাকুনি বসে থাকা এক নতুন দম্পতি, ছেলেটি কোন এক আশ্চর্য সমাপতন শেষে লোহার দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমোচ্ছে, তার মুখ হাঁ করা। আজকাল যদিও বিশেষ খিদে পায় না আমার তবুও ওর ওই অসীম মুখগহ্বর দেখে খিদে পেলো। জানলার ধারে, ছেলেটির পাশের যে সিঁথি তার মধ্যে পুরনো এক ক্ষতের চিহ্ন। সেই ইতিহাসে মলম হয়ে বুলোয় 'সিঁদুর' নামের কিছু শুকনো রক্তের গুঁড়ো... এত অধিকার! আমার ওই রাত্রিকালীন ডাগর চোখদুটোকে খাদ্য বলে ভ্রম হয়। দেখি, ও চোখ আমায় দেখে। অধিকারবোধ হাসায় আমাকে। ভাবি, ছেলেটিকে ডাকি, বলি, 'প্রহরীর মত যে দাগিয়ে দিয়েছ ভাই, এখন ঘুমোলে চলে? মুহূর্তময় কিছু ওম যে পাচার হয়ে গেল।' কিন্তু যে ঘুমায় তাকে অযথা ডাকতে নেই, মা বলে। তাই আবার জানলা দিয়ে জীবনের সমান্তরালে তাকালাম। জীবনের সম অন্তরালে কী থাকে? মৃত্যু? নাকি ডাউন লাইন? পাশ থেকে যে জলাজমি পার হল আমাদের ট্রেন তা আড়ে পার করলে কিছু আলো দেখতে পাওয়া যেতে পারে। যেই আলো আসলে গুল্মের মত অন্ধকার। এইসব অন্ধকার বিক্রি করে যারা তাদের সম্প্রদায়কে ছায়ামানুষ বলে। এরা দোকানের খাটে আলোর অন্ধকার সাজায়। এর বেশি জানি না আমি এদের সম্পর্কে। শুধু জানি এরা বৃদ্ধ হলে বৃদ্ধা স্ত্রী সমেত বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ায়। আকাশের না চাঁদ ওঠা আলোর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা শেষে এদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আলো সাজানো খাটটা পড়ে থাকে আলোকিত হয়ে। এদেরকে শেষ দেখে অজস্র ভিড় নিয়ে বেওয়াফা সিগনালে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়া কোনো একটা ট্রেন। একটা বিরাট গতিময়তা হঠাৎ দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থির হয়ে আছে বাড়ি ফেরা, সঙ্গমেচ্ছা, সন্তান স্নেহ সব। পাশের হা শূন্য মাঠ দিয়ে হাত ধরে ধীরে যারা চলে গেলো তাদের দিকে আমি জানি, কামরা ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকলে ট্রেনের হাতলগুলো প্রকাশ্যে ঢলানিগিরি করে। এ ওর গা টেপে, বুক মাপে। ওদের কাঁচুলি, ব্রায়ের বুক থেকে উঠে আসে পুরুষের স্বর। ভাবছি একদিন জিজ্ঞেস করব, 'তোমরা কোন রঙের লিপস্টিক ইউস করো?', উত্তর দিলে আরও এগোন যাবে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার সারাদিন অগুন্তি হাতের মুঠোতে থেকেও হাতলের বুকগুলো কিন্তু এতটুকু টসকায়নি। খোঁচা খোঁচা দাড়ির যে পোড়া ঠোঁটের লোকটা তামাক ডলছে তালুর মধ্যে তার জীবন রেখা হলুদ হয়ে গেছে। বীজ গুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে এধার ওধার। সভ্যতা যেখানে যেভাবে পারে মাথা তুলুক। তামাক খাওয়ার পর আমি জানি ও উড়ে যাবে। যেভাবে একের পর এক আমার বন্ধুরা উড়ে গেছে, জিৎ, সানি, পটলা... ওরা রাস্তাকে রানওয়ে বেছেছিল। এ অবশ্য হিমনের মত ট্রেন থেকে টেক অফ করবে। মৃত বন্ধুদের বাড়ির ছায়া দীর্ঘতম হয়, ওইসব ছায়া এড়িয়ে চলতে গেলে বুঝি সুপুরি, আকন্দর ছায়া আমাকে ডাকে, তার গলায় সুহৃদের আন্তরিকতা। আন্তরিকতার দিকে এগিয়ে যাই না আর। বরং সামনের দিকে ক্রমশ পিছিয়ে যাই আমি। যে স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ালো পুরো প্লাটফর্ম জুড়ে একজন লোক ফলের ঝুড়ি নিয়ে বসে, দুটো ঘেয়ো কুকুর একে অন্যের পিছনে মন দিয়ে ভাদ্রের গন্ধ শুঁকছে। ফলের ঝুড়িতে দুটো মজা, ধসা শবরি কলা পড়ে আছে। বাকি শূন্যস্থানে ভাগ্যফল মঁ মঁ করছে। মাছি বসছে তার ওপর। ভাগ্যের কোঁয়াতে শুঁড় ডোবাচ্ছে মাছিবৃন্দ। পিছনে টিএমসিপির পার্টিঅফিস একটা। জোরে গান বাজছে ওখান থেকে। ভাগ্যফল কিনব ভেবে দরদাম করতে চাইলাম জানলার এপার থেকে কিন্তু ফল বিক্রেতা পাত্তা দিল না খুব একটা। বুঝলাম, ট্রেন যদি ছেড়ে দেয়, ফল মেরে দিয়ে যদি পালাই। হাসি পেল। কিন্তু হাসি পেলে আমার ছায়ামানুষের মতই দুজনের কথা মনে পড়ে। তারা অভিশপ্ত। তাই অপেক্ষায় থাকে। যাবতীয় অভিশাপগ্রস্তরা অপেক্ষায় থাকে, অভিশপ্তদের অপেক্ষায় থাকাটা বাধ্যতামূলক। ওই দুইজন আমার অপেক্ষায় থাকে। বাড়ির বাইরে, রাস্তাতে দাঁড়িয়ে আগের ট্রেনের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করে ট্রেন লেট কিনা। যেতে যেতেই উত্তর সবাই দেয়, আমি বাদে। আমি রাস্তা পার হতে হতে দেখি আমিই এসে দাঁড়াচ্ছি বাড়ির সামনে। মায়ের দেরি করে ফেরার সামান্য অনুযোগ জড়িয়ে নিয়ে আমি ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছি বাড়ির ভেতর, বাবা পিছনে পিছনে।