কাঁচা ডুমের আলোঃ

সোমনাথ ঘোষাল



রাতের অসুখ করেছে। তাই রোজ রাত আড়াইটে থেকে একটা নাম না জানা পাখি ডাকে। আজকাল রাতে ঘুম হয় না। ভোরের দিকে যখন হালকা ঠাণ্ডা আলো আসে। আমার এলোমেলো ঘরে তখন ঘুম আসে। রোজ পাখির ডাকটা মন দিয়ে শুনি। রোজ নতুন নতুন কথা মনে হয়।

প্রথম রাত:
মনে হয়েছিল আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলছে। এই চুপ লেগে থাকা অন্ধকারে আমার গায়ে হাজার হাজার জোনাকির জন্ম হয়। সবুজ উজ্জ্বল হয়ে উঠি। বালিশে চাপা চাপা অক্ষরের ভিড়ে মনে হয় ফাঁকা বিটি রোডে হলদে হয়ে শুয়ে আছি। এখন কোনো শব্দ নেই। এখন কোনো মানুষের জন্ম নেই। মাতৃসদন থেকে বাচ্চাদের চিৎকার ভেসে আসে কানের পাতায়। দূর থেকে আরও দূরে মানুষের উল্লাস। তারা সবাই মুখোশ পড়ে আছে। কথা বলতে পারছে না। এই মাঝরাতে বিটি রোডের অনেক মানুষকে আলো জ্বালতে দেখেছি। দেখেছি খালাসিদের ছায়া। তীব্র হয়ে যায় এই যাতায়াত। গতি বাড়তে থেকে সবকিছুর। মায়াজনিত কারণে যেসব মহিলারা হলদে আলোর তলায় নিজের যোনি বুলিয়ে নেয় আসামীদের জিভে, তারাও এখন লম্বা লম্বা শুয়ে থাকে চোখ বেঁধে। আসামীদের আস্তানা এখন বন্ধ দোকানে। মৃতশিশুদের দেহে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। তারা চায় না। শিশুদের সকাল। শুধু সদ্যোজাত চিৎকার ওদের ভালো লাগে। দূর থেকে তীব্র গতিতে আসা একটা লরি মাথা ফাটিয়ে চলে যায়। জোনাকিরা শরীর খুঁজতে থাকে। আমার মাথার থেকে বেরিয়ে যাওয়া শব্দদের গন্ধ শুঁকতে থাকে আসামীরা।
পাখিটার ডাক আরও স্পষ্ট হয়েছে। ভোরের আলোতে। মাথার ভেতর তখনও একটা কাঁচা ডুমের আলো জ্বলতে থাকে।

দ্বিতীয় রাত:
পাখিটা আজ দুটো পনেরো থেকে ডাকছে। আমি খাটের জানলায় হেলান দিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়েছি। আজ সকালে চাল, ডাল, তেল, মশলা, সব্জি আর ডিম নিয়ে নিলাম। এখন সাতদিন বাজারে যেতে হবে না। পাখিটার ডাক সেই ছোটবেলাই শুনি। কিন্তু এখনও নাম জানি না। আজ কেমন যেন ডাকছে! অনেকদিন না খেয়ে থাকলে যেমন হয়। ভাবছি কিছু খাবার দেব কি না! কিন্তু এই অন্ধকারে কোথায় পাখি? শুধুই তো ডাক! এখন লক্ষ লক্ষ মানুষ খেতে পাচ্ছে না। পা হেঁটে শ’য়ে শ’য়ে রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির পথে। ওদের কোনো পাখি নেই। ডানা নেই। শুধুই শূন্যতা। বাচ্চার কান্নার মতন পাখিটা বেসুরে আজ গান করছে। যেন হাজার হাজার থালা বাটি বেজে উঠছে। কান্নার ছাই জমে আছে মাইলে মাইলে। শুকনো কোনো পাখির মৃতদেহ যেমন পিঁপড়েরা কেটে কেটে খায়। সেই ডাক তেমনি আজ।
চোখেমুখে জল দিয়ে, জল খাই। মোতার সময় বাথরুমের জানলা দিয়ে রাতটাকে দেখলাম। কেমন যেন কালো কুকুরের মতন তাকিয়ে আছে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে। পাশের বাড়ির পাখার শব্দ শোনা যায়। সিগারেট ধরিয়ে ছাদে যাই। আমার ছায়াটা এখনও জীবিত। আমার সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়িতে উঠছে। ক্রমশ ছায়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে। কখন যেন ত্রিভুজের আকার নিয়ে নেয়। তিনটে বিন্দুর ওপর আমি। অক্ষর। আর অপার শূন্যতা। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী ছায়ারা আমাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের হাতে আলো। মুখ আবছায়ায় ঢাকা। যেন মেঘ জমে আছে। বৃষ্টি হবে। পাখিটার ডাক ফিকে হয়ে আসে। শীত জমতে থাকে চামড়ায়। লোমকূপে। চাদরটা জড়িয়ে নিই। কাকের শব্দ। মাছওলা। আঁশটে গন্ধ আসে। ঘুমে। কাঁচা ডুমটা জ্বলতে থাকে।


আসামীরা বিন্দু বিন্দু ছায়ার আলোতে
জমতে থাকে মৃত পাখির চামড়ায়
খিদের পোকামাকড় শব্দের নালি
চুষতে থাকে নাগরিক ডানায়

আমাকে শব দাও শব্দ দাও আলো দাও
রাষ্ট্রের গা দিয়ে পায়খানার গন্ধ বেরোচ্ছে

আসামীদের মুখভরতি সদ্যোজাত শিশুদের
উৎসব
ছায়ার বিপরীতে মৃতশিশুদের গন্ধ খাচ্ছে
পরিযায়ী রাস্তা ...

তৃতীয় রাত:
বৃষ্টি হচ্ছে রাতে। তুমুল বৃষ্টি। গাছেদেরও আর ভালো লাগছে না। ভয় করছে। ভেঙে যাচ্ছে। নুয়ে পড়ছে। প্রথমদিকে জানলার ধারে বসে জলের হাওয়া খুব ভালো লাগছিল। এখন হাত ঘামছে। শীত করছে। চামড়ায়। আলোরা ভিজে যেতে যেতে খুব ক্লান্ত। গতি বাড়তে থাকে বৃষ্টির। পাখিটা এখনও ডাকেনি। তার প্রায় তিনটে। বারান্দায় পায়চারী করতে করতে পাখির ডাক খুঁজতে থাকছি। পাখিটা কী আদৌও ছিল। পাখিটা কী ডাকে? না কি রাতে ভ্রম! ভয় করতে থাকে প্রতিটা পায়ের ছাপে। জলে আমার পা ভিজে যাচ্ছে। ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ! এইসময় চুল্লিতে অনেক মেঘ জমে থাকে। মৃত দেহগুলো একের পর এক টানতে থাকে মোটা ইঁদুরে। ওদের আঙুল খুব প্রিয়। পাঁচিলের গায়ে বৃষ্টির জলের সঙ্গে দেহ জমতে থাকে আলোতে। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে চামড়া। আজ আমার শরীরে আবার জোনাকিরা ভিড় করেছে। নিজেকে বড্ড সবুজ উজ্জ্বল লাগছে ওই মৃত দেহগুলোর মতন! নখের ভেতর পোড়া চিৎকার। আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। মৃত সার্কাসে। বিটি রোডের আলো আবছা হয়ে আসে। যে পাখিটা রোজ রাতে ডাকত, তার এক একটা করে পালক খুলে নিচ্ছে আসামীরা। এখন আর বৃষ্টি নেই। লক্ষ লক্ষ শুকনো পালক ঝরতে থাকে রাতভোর। পালকে ঘুম আসে। ঘুমহীন শূন্যতায় মাইলের পর মাইল পাখির ডাক শোনা যায় মানুষের মতন...
কাঁচা ডুমের আলো জ্বলতেই থাকে। এই অজানা মৃত সার্কাসে। যেখানে সকাল হয় না। দিনের আলো দেখা যায়। অপেক্ষা অপেক্ষা অপেক্ষা...
সকাল কবে আসবে? সকাল!