পতঙ্গ

ইন্দ্রনীল ঘোষ



আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম।
কোথায় যাচ্ছে ওরা? কোন দিকে? দল বেঁধে, কাতারে কাতারে মানুষ এগিয়ে চলেছে… এক সৌর বৃষ্টির দিকে… এক খাদের দিকে। আমি দেখতে পাই, খাদের সামনে গলে পড়ছে আপামর সূর্য, সেই অসীম আগ্নেয় অবয়ব, মানুষের আজ অব্দি লালিত আলোর সংজ্ঞা – তাপের সংজ্ঞা… ধ্বসে পড়ছে। ওরা ছুটে যাচ্ছে — সেই খাদ থেকে, উচ্চতা থেকে, জীবন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আলোর মধ্যে, সৌর বৃষ্টির ধারাবাহিকতায়… যেভাবে পতঙ্গ ছুটে যায় প্রজ্বলনের দিকে। তবে কি মানুষেরও পতঙ্গ-গুণ থাকে? তবে কী যেকোন সৃষ্টিই ধ্বংস করতে চায় নিজেকে, খুব সহজাত প্রবৃত্তিতে? তা তো নয়, তা তো নয়, তা তো নয়। আমি খুঁজতে থাকি মানুষ বাদে আর কোন প্রাণী? আর কার আত্মহত্যা? কুকুর, হরিণ… আমি পাতা ওল্টাই।
যেন অনেক বছর আগের কথা। যেন একটা উপন্যাস লিখছি আমি। আমার সামনে ঝুঁকে সেই উপন্যাসের সত্তর বছরের নায়ক। ব’লে চলেছেন, “বোর হয়ে গেছি। একই খেলা কাঁহাতক খেলা যায়? যখন তার রুলগুলো এক, শর্টগুলো, এমনকি জোচ্চুরি ফাঁকিবাজিগুলোও এক। বোরড। তাছাড়া, মরা নিয়ে বাকি লোকের মতো আমি ভাবি না। ভাল্লাগছে না, তো quit করবো, ব্যাস। যেমন, তোর যদি এখন আমার সাথে কথা বলতে ভালো না লাগে, তো তুই কী করবি? উঠে চ’লে যাবি। এটাও, এতটাই সিম্পল। তোমাদের যদি ওই খোপ থেকে খোপে নিজেকে জমাতে ইচ্ছে করে তো জমাও, বাচ্চা মানুষ করো, চাকরিতে প্রোমোশন পাও, নতুন গাড়ি কেনো, আমায় শুধু একটু সুইসাইড করতে দাও – নিজের মতো, একটা মানুষের ঘুম পেলে, যেমন তার ঘুমোনোর স্বাধীনতাটুকু থাকে। অনেকবার এমন হয়েছে, সন্ধের দিকে, ঘরে জানলা বন্ধ ক’রে ব’সে আছি, ঘষা কাচের ওদিক দিয়ে আলো ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে... মনে হতো, আমি মরে গেছি, বাকি পৃথিবীর থেকে আলাদা, আর জীবনগুলো ওই কাচের ওপারে। মনে হতো, এ’ ফ্রেমটাই শুধু লাস্ট ফ্রেম। এটা পেরোতে পারলেই পৃথিবী শেষ, তার এ বি সি ডি-র ক্ষেত খামারি শেষ”।
— তাই আত্মহত্যা? — আমি জিজ্ঞেস করতাম সেই চরিত্রকে। আমার চারপাশে ইকো হতো আমারই প্রশ্নগুলো। সকাল থেকে সন্ধে হতো। বদ্ধ জানলার এক ঘরে আমার খাওয়া স্নান কিছুই ঘটত না, শুধু আরও ঝুঁকে পড়তাম Stanislav Sidorov এর এই অমোঘ ছবির দিকে। কোথায় যাচ্ছে ওরা? জানলার বাইরে পাখিদের ডাকে বেলা বদলাত।
“নবনীতাকে প্রথম দেখি, এক জানলা-আঁটা শ্বাসনালীর ভিতর। ঘষা কাচের ওপারে, আলো ম্রিয়মাণ আঁচড় কাটিছে।
ফোঁটা জমছে সাধুভাষা—কাটিছে… কাটিতেছে…
আমি ভাষার জুটকল শুনতে পাই, পড়ন্ত বিকেলের সেই ভোঁ বইতে বইতে মানুষ ঘরে ফিরছে, ফিরে আসছে বাবা থেকে আরও বড় বাবা—সমুদয় জন্মের মানচিত্রগুলো…
কিন্তু সেসব বাদ দাও। শার্সিতে, পালকি নামিয়েছে রোদ। তার জিরোবার স্থির এক ছুরি দিয়ে, চলো আঙুর কাটি। ওই জানলার গলাতে, নবনীতা সমেত একটা শ্বাসনালী মেপে মেপে বসাই।
আজ নিঃশ্বাসের ঘনত্ব, বড়ো পরিবার-টরিবার হচ্ছে। একটা বউ আঁকো, একটু আলো হাঁকাই...”

ছবি ঋণঃ সোলার রেইন
স্তানিস্লাভ সিদোরভ