ভায়া ডরেলোসা

মেঘ অদিতি




কী নিস্তরঙ্গ এইসব দিন-রাত। সুদীর্ঘ রাতের পেটের ভেতর এক অজগর সাপ যেন গুড়ি মেরে বসে আছে। রাত শুষে নিচ্ছে দিনের সমস্ত আলো। কান পাতলে, বুকের গভীর থেকে সরসর করে মেঘেরা সরে যাচ্ছে দূরে। স্তরে স্তরে সেখানে জমাট বেঁধেছে ক্যাডমিয়াম। বিষের পুটুলি হয়ে সারা রাত নির্ঘুম, চেয়ে থাকি অসহ্য অন্ধকারে। কে আমার চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিয়েছে?

সব ভুলে যাচ্ছি কেন, সব ভুলে যাচ্ছি.. মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে আসছে আমার..

কিদ্রন নদীর ধার ঘেঁষিয়া অনেক আগেই সন্ধ্যা নামিয়াছে। প্রার্থনা শেষে ইয়েশোয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছেন কী অপরূপ মোহন রেখার বিস্তার ওই আকাশ জুড়িয়া। তিনি শান্ত। নির্ভার।

কতদিন বন্দি আছি নিজগৃহে, দীর্ঘ পরবাসে। আমাকে লাভ রোড ডাকে। ডাক পাঠায় সাজেক। হাতির ঝিলে পা ঝুলিয়ে স্কেচবুকে আমার স্কেচ করতে ইচ্ছে করে। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই ভাওয়াল এস্টেটের হাতিরা স্নান করতে এসেছে ঝিলে। চোখ খুললেই আমার দিকে ভ্রূ উঁচিয়ে হেঁয়ালি করে সার্স সিওভি টু। সমস্ত পথ রুদ্ধ করেছে ও। নিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে কোথাও আর পৌঁছাতে পারি না। অপলক চেয়ে থাকি ব্রেকিং নিউজের সর্বগ্রাসী আপডেটের দিকে..
এই অসহনীয় হ্যাংওভারের মাঝেও আমার অবাধ্য আঙুল ফ্লেমিংগোর শরীর থেকে রং তুলে সাজাতে চায় ছবি। আমার গোলাপি জমিন একটা আকাশ ছিল। ব্রহ্মপুত্র নামে একটা নদী, যার ঢেউয়ে ফুটে থাকত স্যান্ড সিলভার। আলো-অন্ধকারে এক একটা চারকোলের টানে এখন সেখানে চাপচাপ কুয়াশা। তোমাকে জড়িয়ে ধরা কোনো ছবি দেখলেই চমকে চমকে উঠছি। ভুলে যাচ্ছি ওসব অতীত। ভয় করছে আমার। মনে হচ্ছে কেন আমরা পরস্পরকে এমন জড়িয়ে.. যখন নিরাপদ নয় কিছুই আর! রোজ হারিয়ে যাচ্ছে কত চেনা মুখ। এ মুষলকাল আর শেষ হবে না?

অতঃপর যিহুদা ইসকারিয়োতের (যুডাস) সাহায্যে রক্ষীদল গেৎশিমানি উদ্যানে যিশুকে গ্রেফতার করিল। বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার স্বরূপ যিহুদাকে দেওয়া হইলো ৩০টি রৌপ্যমুদ্রা।

তোমরা বলো শব্দই ব্রহ্ম। শব্দ কি ব্রহ্ম?
শব্দ আসলে রং, অথবা রং-ই শব্দ। যেমন এখন গোলাপিকে আমি আর রং বলছি না। ও আসলে একটা পিংক নয়েজ। শব্দ। যেমন করে শব্দ হয়ে উঠতে চায় কারনেশন। বৃষ্টির শব্দের ভেতর, অবিরাম পাতা ঝরে পড়ার শব্দে যাকে আরও তীব্র আরও গভীর প্রশান্তিতে আমি চাইছি। পিংক নয়েজ আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিক এখন। দীর্ঘ এক ঘুম শেষে জাগলেই ফিরে পাব আবার সেই পুরনো পৃথিবী..

পাসওভারের রাতে শেষবারের মতো ইয়েশোয়া বসিলেন নৈশভোজে। তিনি বলিলেন, তোমাদের ভেতর থেকে কেউ একজন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তৎক্ষণাৎ চাঞ্চল্য, উদ্বিগ্নতা, চাটুকারিতা আর ভয় নিজেরা চারটি দলে ভাগ হইয়া গেল। আর সব রং শুষিয়া নিয়া কালো ওই যুডাসের হাতে শোভা পাইতে লাগিল তিরিশটি রৌপ্যমূদ্রার এক থলে। যিশু নির্মোহ, নির্লিপ্ত।

কিছুই আর সহজ নয় আজ। আঁজলা পেতে সবার কাছেই সহজতা চেয়েছি। নির্মোহ হতে চেয়েছি। কিন্তু এত আঁধার। ভুলের পৃথিবীতে চারদিকে শুধু শব্দের সন্ত্রাস। তোমাদের ক্রূর মুখ আর দুরভিসন্ধির ছায়া পড়ে ক্যানভাস জ্বলে পুড়ে ছাই। স্বপ্নে বারবার বারোটি ভুলের পুতুল নেচে যায় আজ অবিরাম আর উইন্ডচাইম শরীরে জড়িয়ে ডেকে আনে অবিশ্বাস। নৌকোগুলো ঘাটে ভিড়ল না। দিনের আকাশ অন্ধকার করে নেমে এল রাত। সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় আমার চুল বড় হলো, নখ বাড়লো আর সারা দুপুর সারা বিকেল ঝরে চললো অঝোর বৃষ্টি। এখন এই বেঁকে ওঠা আঙ্গুল, ঈষৎ শক্ত হয়ে ওঠা ঘাড়, আমার নীরবতা জেট ব্ল্যাকে বারবার জুডাসের মুখ এঁকে চলে, আর দিনরাতে এক করে ঘূর্ণি তোলে, একটানা, অবিশ্বাস..

কিদ্রন নদীর জল তীব্র তখন আর যিশুর গালে যিহুদা ইসকারিয়োতের ওই অবিশ্বাসী ঠোঁট…

ঠিক কতগুলো দিন, কতগুলো রাত ক্রুসিফিকেশনের যন্ত্রণায় আমিও চীৎকার করে চলেছি। আমার সোনারঙা অনুভূতিগুলো হারিয়ে গেছে। সমস্ত আহ্লাদ শুষে নিয়েছে কেউ।
ইয়েশোয়া ‘ভায়া ডরেলোসা’র বিষাদ ওই পথ হেঁটে চলেছেন গলগাথার পথে.. অন্ধকার নেমে আসছে। গ্রাস করে নিচ্ছে সবকিছু।

বহুদূরে চলে যাব আমিও .. সমস্ত যন্ত্রণাকে ছুটি দিয়ে হারিয়ে যাব..
কিন্তু কোন পথে যাব?
সব পথ অন্তহীন ‘ভায়া ডরেলোসা’..

এসো, তোমাদের পা ধুয়ে দিই আজ…



ছবিঋণ: লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার।