আমাদের যা নেই,যা আছে

তমাল রায়



খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কেমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মন-বেড়ী দিতাম তাহার পায়।

আমার অনেক কিছু আছে। আমার অনেক কিছুই নেই। এলিয়টের যেমন এজরা পাউন্ড আছে, এজরা পাউণ্ডের যেমন এলিয়ট ছিলোনা। সে কথায় না হয় পরেই আসা যাবে৷ আপাতত জানাই আমার একটা খাট আছে। আর খাটের তলায় পাহাড়৷ পিঁপড়েরা যেখানে দলবেঁধে ওঠে বা নামে। আমার অনেক কিছু নেই, কিন্তু ওই একটা খাট আছে, সেই যে জাহাজ ডুবি হল, ১৯৭০ এ। তারও আগে আমার বন্ধু ছিলো লুসিয়ানো। লুসিয়ানো যখন আর আমি, আমি আর লুসিয়ানো রাতের ভেনিসে ঘুরে বেড়াতাম, পিজ্জা খেতাম, ভেসে বেড়াতাম। লুসিয়ানোকে দুই দিয়ে গুণ করলে আমায় পাওয়া যেত। মানে নৃতত্ত্ববিদরা তাই বলতো। আর আমায় আট দিয়ে গুণ করলে লুসিয়ানো। এ সবই ছিলো গাণিতিক হিসেব নিকেশ। যাকে বলে জিওমেট্রিক প্রোগ্রেসন। কেবল ধ্রুবক ছিলো একটা সায়ানো নিওন আলো। যা ছড়িয়ে থাকতো সারাটা পথেই। আর কোবাল্ট গ্রিন কিছু বাড়ি৷ এখানে মনে রাখতে হবে, এনো ডমিনোজ এ তখনও ১৯৭০ আসেনি। জর্জ হ্যারিসন আর রবিশংকর ক'দিন পর জোট বাঁধবে, নকশালবাড়িতে চারু মজুমদার আর ৩২ নম্বরে শেখ মুজিব... দাঁত পড়ে যাওয়া ছোট পিসি হামানদিস্তায় পান ছাঁচছে... অবশ্য দাঁত কখনোই পড়েনা, কেবল নতুন দাঁতের জন্ম হবে বলে তারা জায়গা করে দেয়। এও এক রেজারাকশন! সে যাই হোক ছোট পিসিই প্রথম উঠে এসে বসেছিলো আমাদের সেগুন কাঠের খাটে, তারপরের গল্প অনেকে জানে, অনেকেই জানেওনা। জ্যেঠু এক কোণে বসে গোপাল জর্দার সুগন্ধ ছড়াতে ছড়াতে বলে চলছিলো তাদের আমহার্স্ট স্ট্রিটের ৩২,৩৩,৩৪ নম্বর বাড়ির কথা। যেখানে উমেশ নামের গৃহকর্ম সহায়ক সকাল বেলা মাখম লাগিয়ে ব্রেড দিতো। আর কাঁচের গ্লাসে তেজপাতা সহযোগে সর পড়া গোরুর দুধ। 'মাখন'- এর ন কার লুপ্ত হয়ে ম বসেছিলো ওম জড়িত আবেশে। কারণ ওই সায়ানো নিয়ন আলো, যা ছড়িয়ে থাকতো শৈলজনার্দনের শৈশবে। ছোট পিসি হাতে করে পানের বোঁটায় চুণ লাগিয়ে জিভে ঠেকিয়ে বলেছিলো, শৈল উঠে বোস ভালো করে, বড়দি নইলে উঠবে কি করে? খাট নডে চড়ে চৌকাঠ পেরিয়ে জলে ভাসার আগে, রাশভারি বাবা রামচন্দ্র ওরফে রামুকে এক ধমক মারে বড়দি সরযুবালা, রামু তখন কোনোক্রমে বগলে বই নিয়েই খাটে জায়গা করে নেয় খাট তখন এগোচ্ছে, আর দ্রোহ আর বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা ও কলকাতা। মৌলানা ভাসানির সাথে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সেরে নিচ্ছেন মুজিব, আর চারু মজুমদারের পাশে যোগ দিলো কানু সান্যাল...


আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না-মহল তায়।
মা আরতি, ওরফে আরু গম ছড়িয়ে দিচ্ছিলো ছাদে, পায়রারা আসে,তাদের খেতে দেওয়াও ধর্ম। আর,পায়রা গৃহী হলে সুখ বিরাজমান হয়ে ঘরে। ছোটো পিসি ষোড়শী হাঁক পারলেন - আরু...
মা গম হাতে নিয়েই স্ফীত উদরে রওয়ানা দিলো খাটের উদ্দেশ্যে, কিন্তু খাট তখন ভাসতে শুরু করেছে, অগত্য এথলিট আরু, তেমন কিছু করতে না পেরে খাটের পায়া ধরে, ঝুলে পড়ে। আমি তখন প্যারি শহরের রাস্তায় লুসিয়ানোর সাথে সাইকেলের খোলা টায়ারের পেছনে দৌড়চ্ছি...শূন্য বৃত্ত বলতে অনেক কিছুই বোঝায়, এই 'সং' সমন্বিত সারের অন্তঃসারশূন্যতা! কৃষ্ণগহ্বর অথবা ফাঁপা আরবানিটি। গম রঙা দুপুরে মা'র, ডাক শুনে লুসিয়ানোকে ফেলে আমিও ঢুকে পড়ি... খাটের তলায়, খাটের পেটে নই, মায়ের পেটে। মহামতি প্লেটো থাকলে পরিস্কার ভাবেই বুঝিয়ে দিতেন তিনটি ক্লিয়ার স্তর বিন্যাসের কথা, প্রথমটি খাটের ওপর যারা রয়েছে, দ্বিতীয়টি খাটের নীচে, আর তৃতীয়টি যারা খাটের বাহিরে থাকা মহাজ্ঞানী মহাজন, যাদের আমরা ইতিহাস বলে অভিহিত করে থাকি। মহাকাল যাদের রেডি স্টেডি স্ট্যাচু বলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যে কোনো ট্রাফালগার বা তিয়েনয়ান মেন স্কোয়ারে। দাদু সুরেশচন্দ্র খাট থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, তেমনই এক রাস্তার মোড়ে। এখানে রাস্তা আর ঠিক রাস্তা নয়, জলজ ভেনিস শহর। যেখানে জলের মধ্যেই রাস্তা, রাস্তার মধ্যেই স্ট্যাচু... দাদুকে দেখে চমকে গিয়ে ধাক্কা খায় খাট, ওই স্ট্যাচুতেই আর দাদুর ইচ্ছেতেই গতি পরিবর্তন করে, বয়ে যেতে থাকে, একটা প্রুশিয়ান ব্লু খাঁড়ি বেয়ে... ইতিমধ্যে দিদি ছোট পিসির কোল থেকে নেমে এসেছে খাটের নীচে। ইঁদুর টিকটিকি সেলোফিন পেপারে মোড়া যা কিছু প্রাচীন কোরাল রিফ, পেরিয়ে খাট সুয়েজ ছুঁয়ে ধর্ম ঘেঁটোগুলোয় প্রবেশ করে৷ সে করুকগে, আমরা তখন, মানে আমি লুসিয়ানো মা আর দিদি তখন খাটের নীচে বসে লুডো খেলি। আর এক একটা লবণাক্ত ঝাপ্টা আমাদের লুডোর মাঠে এসে ঘুঁটি ভাসিয়ে দেয়... আমরা আবার সেগুলো নিয়ে এসে সাজাই...


কপালে মোর নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার
খাঁচা খুলে পাখী আমার
কোন বনে পালায়।।
লুসিয়ানোকে চেনা দুস্কর। ও গীনেসবার্গের ওরলোভস্কিও নয়,আবার সিধুর কানুও নয়৷

ও সামথিং ডিফ্রেন্ট। অনেকটা আরকাতিকার জিপসি মেলকিয়াদেশের মত, অনেকটা একাত্তরের ভিয়েতনামের মত। আমি আর লুসিয়ানো, লুসিয়ানো আর আমি তখন সমুদ্রের নীচ থেকে পাথর কুড়োই, পাহাড় গড়ি, মাকে সেই পাহাড়ের ওপর লাইটহাউস বানিয়ে বসাই৷ দিদি টিউশন নেয়, অক্টোপাশের কাছে, যারা অষ্টবাহু ষড়যন্ত্রী, ব্লব ফিশ যারা দল বেঁধে বেড়াতে যায়, ফ্লিড ফিশ, বা প্রিডেটর ফিশের কাছেও। বাঁচাও অভিজ্ঞান, তবে মাস্টার তো লাগেই৷ আমার আর লুসিয়ানোর সাথে দেখা হয়ে যায় ফ্রয়েডের সাথে। আমরা বসি, তিনি বলেন। কেমন যেন সারমনের মতই কানে বাজতে থাকে কথাগুলো। 'অধিকাংশ মানুষই স্বাধীনতা চাননা, কারণ স্বাধীনতা মানে দায়-দায়িত্ব আর দায়িত্ব কি আর সকলে নিতে চায়?'
দিদি কেমন যেন হকচকিয়ে মা'কে ডাকে। মা'তো তখন আলো দেখানোর কাজে ব্যস্ত। কিন্তু মা'র আলো কই? আর আলো হয়ে ওঠার কষ্ট অনেক। কারণ প্রদীপের নীচেই তো ঘোর অন্ধকার। লুসিয়ানো আর আমি সাঁতার কাটতে থাকি মোহনার দিকে, কিছুটা পার হতে দেখা হয় লেননের সাথে, লেনন তখন গান বাঁধছে ভিয়েতনামকে মাথায় রেখে,
Imagine there's no countries
It isn't hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion too
Imagine all the people living life in peace



মন, তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর তৈরী কাঁচা বাঁশে
কোনদিন খাঁচা পড়বে খসে
লালন কেঁদে কয়।।
আমাদের অনেক কিছুই আছে,আমাদের তেমন কিছুই নেই। যেমন ভিয়েতনামের লেনন আছে, লেননের ভিয়েতনাম নেই! আমি আর লুসিয়ানো সায়ানো নিয়ন আলোয় পথ হাঁটতে থাকি, দুপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অট্টালিকাগুলোকে কেমন যেন ফাঁপা আর নিঃস্ব মনে হয়। রাস্তাগুলোও কোথাও যেন পৌঁছয় না। মা আলো দেখাতে দেখাতেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা দাদুও পথ দেখাতে ভুলে যান। পিঁপড়েরা কেবল হেঁটে চলে মুখে ডিম নিয়ে।
পিঁপড়ের মুখে ডিম থাকলে, বর্ষার আগমন ঘোষিত হয়। আকাশ কালো করে বৃষ্টি আসে। আর আমাদের খাট, যা না'কি এখন জাহাজ বৃষ্টির জলে টইটম্বুর হয়ে ভেসে থাকে তবু প্লবতার সূত্র মেনেই... বাবা, ছোট পিসি, বড় পিসি, দিদি মা, লুসিয়ানো আর আমি ছিটকে যাই পরস্পরের থেকে...মেটাফিজিক্সের সূত্র মেনে প্রতিটি অসংগঠনের পরই সংগঠিত হবার শুরু। নৈরাজ্যের পরই আসে স্বাদু স্বচ্ছতার ধর্মাশোক। খাট ধাক্কা খায় স্থলভূমিতে। এবার আমরা পাহাড় খুঁজতে যাবো। না পেলে বানিয়ে নেবো নিজেরাই। দূর থেকে দাদুর আকাশবাণী ভেসে আসে, পাহাড় আসলেই ব্যথাজনিত উত্থান। তবু সেই উচ্চতম...
হলোকস্ট পেছনে ফেলে হলো সিটির ফাঁপা অট্টালিকাগুলো পেরিয়ে তবু আমরা উঠে যেতে থাকি পাহাড়ের গা বেয়ে...
আমাদের সেই খাট তখন পলিমাটিতে ভরেছে, এবার সবুজে ছেয়ে যাবে ডেক...পাখি জন্মাবে।
আমাদের অনেক কিছুই নেই। আমাদের অনেক কিছুই আছে। তবু...
লালন কয় খাঁচা খুলে
সে পাখী কোনখানে পালায়???


ছবি ঋণ: মিস্ট্রি এন্ড মেলানকোলি অব এ নস্টালজিক স্ট্রিট
জর্জিও সিরোকো, ইতালি, সাররিয়ালিস্ট