অনেকগুলো বক উড়েছিল যেদিন

শতানীক রায়




[আকাশে যেদিন অনেক অনেক মানুষ একসঙ্গে বক হয়ে উড়েছিল]


'কেমন একটা অবাধ, খোলামেলা আর নৈর্ব্যক্তিক ভাব থেকে যাচ্ছে এভাবে বৃষ্টি দেখার মধ্যে। শুধুমাত্র দেখে বা দেখতে দেখতে কল্পনা করে নেওয়া যায় অনেক কিছুরই। অথচ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল নিয়মমাফিক। বড়ো বড়ো ফোঁটা দিয়ে শুরু তারপর একনাগাড়ে। এখান থেকেই কাঞ্চনমালার ফ্ল্যাট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তা মুহূর্তের মধ্যেই ধূসর বর্ণে পরিণত হচ্ছিল দ্রুত— অস্পষ্ট এক ধূসরতায় প্রসারিত হবার প্রক্রিয়ার মধ্যে দাঁড়িয়েই ছিলাম এমনভাবে যেন কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যেতে থাকে। চতুর্দিক জল থৈ থৈ, কোনটা পথ, কোনটা নিছক ফাঁদ ছাড়া অন্যকিছু নয় বুঝবার কোনো উপায় নেই। তখন ফিরে আসতে হয়।' পীযূষ ভট্টাচার্যর উপন্যাস 'তালপাতার ঠাকুমা'-র দ্বিতীয় ভাগ এরকমভাবে শুরু হচ্ছে।

অনেক কৃতকর্ম জীবনে করে ফেলেছি যা প্রথম দিকে ঝুঁকি মনে হলেও পরবর্তীকালে ফাঁদ মনে হয়েছে। এভাবেই ফাঁদের ভেতর নিজেকে সঁপে দিতে দিতে কখনো মনে হয়নি কেন জেনে বুঝে এ-সব নিরন্তর ঝরে পড়া বিষের কুয়োর ভেতর ঝাঁপ দেওয়ার ঝুঁকি আর ঝোঁক সামলাতে না পেরে কেমন এক চরম বৃষ্টিমুখর থৈ থৈ অবস্থার ভেতর থেকে তাক করে থাকি। কখন কীভাবে ধ্বংসের হাতছানির কাছে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া যায়। এখানে আঙুল অযথা নির্জীব প্রাণীর মতো দেখাতে থাকে। বৃথা মনে হয় বারবার একই রাস্তায় প্রতিবার কেন এসে পড়ছি আমি। নিজেকে অনেক একত্রে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করেও কেন হারিয়ে ফেলেছি। কোনো এক দুপুরে কিংবা মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরে এরকম বোধ হতে থাকে— একজন দম আটকে আসা মানুষের মতো। যে বাক্-হীন হয়ে যেতে চায়। এক চূড়ান্ত হতাশার দিকে চলে যেতে চায় ডুবতে চায়।
বিভিন্ন মানুষের দিকে তাকিয়ে আমি পরিষ্কার হতে চেয়েছি। মিশে যেতে চেয়েছি তাদের সঙ্গে। একে আত্মবিনাশ বলে মনে হলেও ঠিক তা নয়। সত্য মিথ্যা এখানে কিছু নেই। একজন কেউ গান গাইছে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি। কখনো শ্রোতার আসনে শুধু আমি একা নেই পরপর সাজানো একটার পর একটা দলা। দুঃখ সুখ রাগ ঘৃণায় ভরা পিণ্ড নিয়ে তারা গান শুনতে আসে। তার গান শুনে বিচিত্র শান্তি পেয়ে ফিরে যায়। এখানে অজানা হাতছানির কাছে এরকম মুগ্ধ থাকতে থাকতে কোথাও কোনো বন্যার জলে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে। ফিরে যেতে চেয়েছি তবে মনে রাখতে হবে ফিরে যাওয়ার রাস্তা তো নিজেই আমি স্বইচ্ছায় বিস্মৃত হয়েছি। সুযোগ করে দিয়েছি আমি। সে গান গাইবে আর আমি তার শুনে যাব। শুনতে শুনতে ধর্ম অধর্ম আর সবকিছু। সবচেয়ে সুন্দরতম মুহূর্তে তার গান আমার শূন্যতাকে আস্তে আস্তে মুছে দিয়েছিল। গান থেমে গেলে মনে হয়েছে আরও শুনি। তখন রক্তমাংসের দলার কাছে প্রার্থনা জানিয়েছি সে যেন গান শোনায় আমাকে।

'My house says to me, “Do not leave me, for here dwells your past.”
And the road says to me, “Come and follow me, for I am your future.”
And I say to both my house and the road, “I have no past, nor have I a future. If I stay here, there is a going in my staying; and if I go there is a staying in my going. Only love and death change all things.”' কাহলিল জিব্রানের 'Sand and Foam' বইয়ের একটি অ্যাফোরিজম।
এই গদ্যটা আমার নরক যন্ত্রণার গদ্য। একসময় আমি যে-ভ্রম আর ভ্রান্তির ভেতর বিলাস খুঁজতে চেয়েছিলাম তা আসলেই একটা নরক। ক্ষণিকের সেই নরক দর্শন আমাকে করতে হয়েছিল। আমার আজও মনে হয় সেটাই আসল জগৎ। যেখানে আয়নার মতো আমাদের কৃতকর্মের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। আমি স্বইচ্ছায় সেখানে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নিজেকে পরখ করে দেখি কিন্তু আমার পরখ যে আমার বন্ধন হয়ে উঠবে ভাবিনি। একটা সূক্ষ্ম ফাঁদ যেন আমিই রচনা করেছি নিজের জন্য। জিব্রান আরেক জায়গায় লিখছেন: 'Strange, the desire for certain pleasures is a part of my pain.'
আমি যখন নিজের শূন্যতা নিয়ে ত্রস্ত থাকি। একাকিত্বে জর্জরিত থাকি এমন সময় একদিন আমার এক বন্ধু বলল, নিজেকে মার্জিনাল ভাবা বন্ধ কর। প্রথমে একটু পাহাড় থেকে খসে পড়া টুকরো পাথরের মতো মনে হল। যেন কোনো কিছু আসে যায় না এতে। তখন বুঝতে পারিনি, পরে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। আসলে যে-সমস্ত মানসিক প্রতিবন্ধকতায় জড়িয়েছি আমি তার সবটাই হল আমার নিজেরই তৈরি করা ভ্রম। নিজেকে ছাড়িয়ে আমি কখনোই বাইরের পরিবেশের কথা ভাবিনি। ভাবিনি আমার বাড়ির কারো কথা। বন্ধুর কথা ভাবিনি। ভাবতে শিখিনি বললে ঠিক হবে। আমরা নিত্য নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাই আর যেতে গিয়ে নিজেকেই ভুলে যাই কখন কীভাবে আবার ফিরে আসতে হয়। ফিরে আসার যন্ত্রণা একটা কঠিন দুর্গম পথের মতো। আমি যা ভাবি যা ভেবে চলেছি এর ভেতর এমন সব নারকীয় কৃত্রিম অনুভূতি, পরখ না-করা চিন্তা এবং বোধ মিশে থাকে যার থেকে একজন মানুষ ক্রমাগত তলিয়ে যেতে থাকে। তলিয়ে থেকেই সে আরও বেশি নিজের মুদ্রাদোষে একা হয়ে যায়। জীবনানন্দের সেই পঙক্তি: 'নিজেরই মুদ্রাদোষে আমি হতেছি একেলা'। আসলে অনেকেই ধারণা করে থাকেন জীবনানন্দ এটা লিখেছেন কোনো মুদ্রাদোষের কথা। আমি বলব এটাই হল একজন মানুষের পাপবোধ। তিনি যে সবার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন তারহ বহিঃপ্রকাশ এটি।
আমার অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে যে, কোনো ঘটনাকে শুরুতেই কোনো অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে না দেখতে কারণ, আমরা যদি ঘটনাকে আগে প্রাধান্য দিই তবেই বিস্মিত হওয়ার জায়গা থাকবে। যেমন খাঁচার ভেতর অচিন পাখির প্রসঙ্গে লালনের সেই চিরন্তন উক্তি। তথাপি আমরা চলতে চলতে আরও স্তিমিত হই। নরম হওয়ার প্রক্রিয়ায় আরও নরম হই। নরম মানুষের চিন্তাশীলতার একটা গতি থাকে। এ হল গিয়ে অন্য কথা। আমি বলছিলাম না, প্রতিবার ফাঁদে পা দিই আর ধরা পড়ে যাই। আবার পালানোর চেষ্টা করি। চেষ্টা করি বাড়ি ফেরার। বাড়ি ফিরে নিজেকে ভালোভাবে ফিরে দেখা। নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার উদ্দেশ্য ছিল মৃগয়ায় বেরিয়ে পাখি শিকার করব কিন্তু শিকার করে বসলাম বাঘ। এখানে যতটুকু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছি তার সবটাই বৃহৎ কোনো আত্ম-রিরংসা বা অতিবাসনা থেকে। এরকম করে চলতে চলতে ঘরে ফেরা হয় না। নিজেকে যখন দিনশেষে দেখি তখন মনে হয় আগের মূল অবস্থান থেকে কতটাই না সরে এসেছি আমি। আর এতটাই আমার রূপান্তর হয়েছে যে, আর ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই। এভাবে আমরা সবাই ঘুরপাক খাই ক্রমাগত। চক্রাকারে ঘুরি। এরপর একটা সময় আসে যখন আমাকে ফিরে দেখতে হয় এই সমস্ত ক্রুর কঠিন সত্যের দিকে তখন গণেশ পাইনের এই 'নরক' চিত্রটির কথা মনে হয়। যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শন।

প্রতিবার তারপর থেকে দিন-রাত এক সমান অনন্ত গতির মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এটাই হয় অনন্ত বৃষ্টিধারার মধ্যে, সবকিছু হারিয়ে যায়। বেরিয়েছিলাম এক উদ্দেশ্য সাধন করতে তবে ফিরতে আর পারিনি বাড়িতে। এই ফেরার চেষ্টা এখনও করে যাই। না থামা সময়হীনতা। এক অনন্ত ধারা অব্যাহত থাকে।


ঋণ:
পীযূষ ভট্টাচার্য। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মর্কেস। প্লেটো। কাহলিল জিব্রান। জীবনানন্দ দাশ।