নীল সার্কাসের ঘোড়া

সুজন সুপান্থ




সার্কাসের প্রসঙ্গ এলেই কেবল তারাদির কথা মনে পড়ে। মন পোড়ে খুব। মনে হয়, ওই যে নিদারুণ চিৎকার বুকের ভেতর চেপে মৃত্যুর ভান করে শুয়ে আছে তারাদি। জানেন, তাঁর সিঁথিতে পলাশ ফোটেনি কোনোদিন। এর আগেই গর্ভমুক্তির তীব্র চিৎকার ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই চিৎকার পেরিয়ে পেট থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট আকাশ। প্রাণের ভেতর থেকে আরও প্রাণ বেরিয়ে আসার আনন্দে তারাদির মুখে আলোর ঝলকানি। অথচ আকাশের বুকে তারা জ্বলে ওঠার আগেই আনন্দ সার্কাসের দল চুরি করে নিয়ে গেছে একান্ত আকাশ। সেই থেকে আকাশের কথা মনে হলেই মৃত্যুর ভান করে শুয়ে থাকে। ভান থেকে বহুবার ফিরে এসেছিল। মার্ক শাগালের সার্কাস নয় বরং অনিচ্ছার রণ ও রমণ পেরিয়ে একদিন আর কোনো দিনের জন্য ফিরতে পারেনি তারাদি। সত্যি হয়েছিল ভান। অ্যাক্রোবেটের মতো দুলে দুলে নয়, পাখিদের গানের ভেতর দিয়ে ঝুম বৃষ্টির জলে, তারাদি জ্বলে জ্বলে গেছে। আহা, তারাদি, দেখো আজ কেমন এই সার্কাসের ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে পুড়ে পুড়ে যাচ্ছি। জেনো, এই মারি ও মড়কের দিনেও জানালা খুলে দিয়েছি। পারলে কিছু মেঘ পাঠিয়ে দাও, দিতে পারো তোমার গুণে রাখা মৃত পাখিদের গান! কান পেতে শুনে নেব গান। তারপর শ্বাস ছেড়ে কালো মেঘে ঢেকে দেব সুর।

২.
ফুল নাকি ঝুল? এই প্রস্তাবে সব সময় আমি ফুলের পক্ষে। তখনো বাগান হয়নি আমাদের। তাই আমার পক্ষে গিয়ে জুতার ফিতা বেঁধে ফুল করে দিত মা। সেই ফুল কত পথ-স্কুলের মাঠ-ঘাট পেরিয়ে ঝরে ঝরে যেত। মন খারাপ হতো খুব, এখনো যেমন। পরদিন আবারও ফুল নিয়ে সেই পথ-ঘাট-মাঠ পাড়ি দিয়েছি। সেই প্রথম ফুলের ধারণা। এই ধারণা পেরিয়ে ফুল চিনেছি মায়ের পুরোনো শাড়িতে নতুন কাঁথার সেলাইয়ে। কাঁথার জমিনে নাম না জানা ফুলের বাগান ছিল মার। মা এই বাগান করা শিখেছিল রওশন সার্কাসের রমলা মাসির কাছে। আমার যখন অনেক ছোটবেলা, তখন বাড়ির পাশে এসেছিল দ্য রওশন সার্কাস। শো হতো রাতে। বাড়ির পাশে বলে, দিনে মা, ললিতা দি ও এলাকার মাসিদের সঙ্গে আড্ডা জমাতো রমলা মাসি। তখনই শিখিয়ে দিয়েছে কাঁথার জমিনে বাগান করা। ললিতা দির কাছে শুনেছি—রমলা মাসির নাকি ছোট্ট আমাকে খুব পছন্দ হয়েছিল। সার্কাসের পোষ মানা ঘোড়ার পিঠে নিয়েছিল কয়েকবার। নিয়ে যেতে চেয়েছিল সার্কাসের দলে, তারাদির আকাশের মতো। এই কথা চাউর হলে, সার্কাস বন্ধ হয়ে যায়। রাতের মধ্যেই পালিয়ে যায় সবাই। রমলা মাসিকে আর দেখিনি কোনোদিন। ভয়ে খুব কেঁদেছিল মা সেদিন। এখনো কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমালে, রাতে মার কান্নার সুরে ডেকে ওঠে তাঁর সমস্ত সুতোর ফুল।

৩.
ফুলের সঙ্গে ম্যাজিকের সম্পর্ক কী?—এর উত্তর নীলু পিসির মেয়ে চানু শেখানোর আগে বাবা বলেছিল, হাটের দিন এক জাদুকর গোলাপ ফুলে ফুঁ দিলেই নাকি পায়রা উড়ে যায়। সার্কাসের খেলার মতো। পায়রা তো শান্তির প্রতীক! কিন্তু শান্তির বদলে ভয় দিয়েছিল চানু। বয়সে বড়, চানু তবু সহচরী। সে আমাকে ফুল ফোটার শব্দ শোনাতে চেয়েছিল। চেরি ফুলের কুঁড়ি আঙুল দিয়ে টিপ দিলে ফুটে ওঠার আগে যেমন শব্দ হয়, তেমন শব্দ। ম্যাজিকের মতো। চেয়েছিল মখমলি আদরের সুর তুলে দেবে কোচড়ে আমার। আমরা দুজন ফুল ফোটার শব্দ শুনতে গিয়েছিলাম। বহু আলপথ পেরিয়ে তুঁত বাগানের গহিন ভেতর। সেখানে কোচায় তুঁত তুলতে তুলতে সিল্কের আড়ালে সে আমার পুরুষফুলের কুঁড়ি ফোটাতে চেয়েছিল। চেরি ফুলের কুঁড়ির মতো। ফুটতে চেয়েও ফোটে না। ব্যথা আসে। আরও আসে ভয়। ভয় নিয়ে চানুর গলা ধরে ঝুঁকে থাকি। দেখি গলা বেয়ে একটা রাস্তা নেমে গেছে আরও আরও ভেতরে। সেখানে কী যেন দেখা যায়। ছুঁয়ে দেখি, মুখে দেওয়া মৌরি দানার মতো হিম ধরে আছে। জানতে চেয়েছিলাম কী। আলতো সরিয়ে বলেছিল-এই দ্যাখ, এ দুটো রানী রেশম পোকা। এখনো ছোট। বড় হলে এদের মসলিন ডানা হবে, কোমল। খুব ঝড় এলে তখন এই কোমল ডানায় ভর দিয়ে ঘুরে আসা যাবে ভিন্ন তুঁতের বন।

বলেছি তাকে, রানী রেশম পোকা বড় হোক তবে। ফুটে উঠুক মখমলি ডানা। উঠুক ভীষণ ঝড়, খুব করে ডেকে নিও তোমার ভেতর, কেমন। ডানায় ভর দিয়ে একদিন চলে যাব ভিন্ন তুঁতের বন। অথচ বলেছে সে, তার আগে জানা চাই ফুল ফোটার শব্দ, সেই শব্দে দাও মখমলি আদরের সুর। ফুলের কুঁড়ি ফোটানোর শব্দে সুর দিতে গিয়ে পাতাল ব্যথা হয়েছিল সেদিন। আমার ভয়ে হেসে ওঠে চানু। খোসা ছড়ানো রোদের ভেতর তার রেশম পোকার ছোট্ট ডানা আরও হিম হয়ে যায়। ব্যথাভর্তি ফুলের কুঁড়ি নিয়ে সূবর্ণদহের গলা জলে নামি। ব্যথা আরও জ্বলে জ্বলে যায়। নড়ে ওঠে অশ্রুনুড়ি। সেই থেকে ফুল ফোটার শব্দে আমার ভয়। চেরি ফুল ফুটে উঠলেই ভয়ে মুখ লুকিয়ে নিতাম নিজের ভেতর। চানুর ভেতর।

৪.
রাস্তার পাশের জঞ্জাল কেউ সরিয়ে ফেললেই সবাই বুঝে নেয় নেয় এটা পাগলা প্রিয়র কাজ। সবাই তাঁকে পাগলা প্রিয় ডাকে। প্রিয়রঞ্জন, আমার প্রিয় দা। কাঠ কুঁদে কী দারুণ নারী মুখ এঁকে রাখে। কী নিপুণ কাজ তাঁর! সারা দিন বকুল তলায় বসে আপন মনে কাঠ কুঁদে নারী মুখ ফুটিয়ে তোলে। শুনেছি, এক সময় সার্কাস দলে কাজ করত। ঘোড়ার সহিস। শখ করে রিংয়ে ঝুলতে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে পড়ে কোমড়ে চোট পেয়েছিল ভীষণ। সেই থেকে তাঁর স্মৃতি কাজ করে না তেমন। খুঁড়িয়ে হাঁটে। প্রয়োজন না হলে কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না।

একদিন তাঁর ঘরে দেখি, বড় একটা কাঠ কুঁদে এঁকে রেখেছে অবিকল চানুর মুখ। এঁকেছে তার মসলিন ডানা। চানুর রেশম পোকার ছোট্ট ডানা যেমন বড় হয়ে গেছে। এঁকেছে যোনীপুষ্প। বলেছি তাঁকে-প্রিয় দা কী এঁকেছ তুমি? বলেছে, এটা নামহারা পাখি। আর এই যে তার দুটো মখমলি ডানা, এই যে তার ফুল।

আচ্ছা, প্রিয় দা, তুমি কি ফুল ফোটার শব্দ শুনেছ কখনো? তুমি জানো মখমলি আদরের সুর? আচ্ছা, অন্তত এটা বলো যে, এই নামহারা পাখির ডানায় ভর দিয়ে ঘুরেছ কোথাও?—না রে! পাগলের সুখ মনে মনে। কাউকে পাগল ডাকলে, তার পাখির ডানায় ভর দিয়ে ওড়ার অধিকার কেড়ে নেয় কেউ। পাগলের তাই ওড়া নেই, ঘোরা নেই কোনো। পাগলের আছে শুধু খুঁড়িয়ে হাঁটার গান। আর নিজেকে নিজের আদর করার তাল। আমার কোঁচড়ে মখমলি আদরের সুর তুলে দিতে চেয়েছিল চানু। আর বহুদিন পর, প্রিয় দা শেখালো নিজেকে নিজে আদর করার তাল। প্রিয় দা বলেছে আরও, শোন ওড়ার অধিকার না থাকলে নামহারা পাখিদের ডানায় ধড়ফড় আসে। কেউ কেউ ছিঁড়ে ফেলে ডানা। ডানা ছিঁড়ে গেলে পাখি আর পাখি থাকে না। ফুল ছিঁড়ে নিলে তা আর ফুল থাকে না যেমন, কেবল একটা নাম হয়ে থাকে। তারাদি গুণে রাখে তাকে। এসব শুনে ভেতরে ভেতরে কেমন ধড়ফড় করে ওঠে।

৫.
প্রিয় দা আর কাঠ কুঁদে আঁকে না মানুষের মুখ। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বহু পথ হাঁটে আর আপন মনে গান গায় ‘ওগো প্রেম তুমি স্বপনেরও মায়ামৃগ, আজও বনপথে মায়াহরিনীর ঠিকানা দেবে নাকি গো’। পথ ভুলে আর ফেরেনি এদিকে। ঠিকানা পেয়েছি কিনা জানা নেই। তারপর একদিন সন্ধ্যার উলুধ্বনি শেষে ধূপের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে চারদিক। ছেলেবেলার চানু কিংবা প্রিয় দার নামহারা পাখিকে ডাকনামে ডাকছে মানুষ। অথচ তার নিজের কোনো ডাক নেই। আনন্দলোক শ্মশানের কাছে গাছের ডালে সার্কাসের দড়ির মতো সেন্টার রিংয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। কেউ ভুল পথে ঘুরে ছিঁড়ে নিয়েছে তার মসলিন ডানা, ছিন্ন ভিন্ন করেছে তার পুষ্প। রমলা নাকি চানু, চেনা যায় না ঠিক। ভেবে নিই, নামহারা পাখি। তারাদি ঠিক ঠিক চিনে নেবে তাকে।

৬.
কিছুটা বড় হয়ে গেলে কেবল পেছনের কথা মনে হতে থাকে। মনে হতে থাকে রেশম পাতা বিছিয়ে সমস্ত পথজুড়ে বসে আছে চানু। শেখানো তালে নিজেকে নিজেই আদর করতে করতে মনে হতে থাকে প্রথম স্পর্শের ব্যথা। এতদিন পর আবারও সেই ব্যথার আশায় ভীষণ বেদনা জাগে। তারাদি-প্রিয় দার কষ্ট-নামহারা পাখির কষ্ট নিজের ব্যথার কাছে এসে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আর মনে হতে থাকে, কাঁটাখুইড়ার ঝোপ থেকে সমস্ত কাঁটা কেবল বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সেই কাঁটা মাড়িয়ে হাসি মুখ নিয়ে একটি ঘোড়া কোথায় যেন দ্রুত চলে যাচ্ছে, যাচ্ছে আর যাচ্ছে...


##চিত্র ১: মার্ক শাগালের ‘দ্য ব্লু সার্কাস’ (১৯৫০)
##চিত্র ২: মার্ক শাগালের ‘সার্কাস হর্স’ (১৯৬৪)