মৃত্যু চতুরঙ্গ

ফরিদ ছিফাতুল্লাহ



দুঃসময় সুসময় বলে কি কিছু হয়? সময়তো এক রৈখিক। এর কোন অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যৎ নেই। এর কোন রঙ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই। এর কোন শব্দ নেই, নৈঃশব্দ্য নেই। এর নেই কোন ক্রোধ, প্রেম, অনুরাগ বা বিরাগ । আমরা মানুষেরাই আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের ফলাফল, পূণ্য-পাপ, সময়ের ঘাড়ে সওয়ার করিয়ে দিয়ে বলি এটা দুঃসময় ওটা সুসময়।
কাল তো আসলে নিরবধি। বয়ে চলে। বয়ে নিয়ে যায় আমাদের সকল আনন্দ-বিষাদের বিহার, প্রেম-অপ্রেম, রহ বা বিরহ। কোন এক ধর্ম গ্রন্থের ঈশ্বর বলেছেন - তোমরা সময়কে দোষারোপ করো না, কেননা আমিই সময়। তবুও সেই ইশ্বরবাদী মানুষও সময়কে দোষারোপ করে। মানুষ স্বভাবতই এমন প্রাণি। অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে পছন্দ করে।

এখন কি পৃথিবীর দুঃসময়? আমরা প্রায়শই নিজেদের ভালো মন্দের সাথে পৃথিবীর ভালো মন্দ একাকার করে ফেলি। অথচ মানুষ ছাড়াও পৃথিবীর আরো কত শত সন্তান আছে! পৃথিবী ও তার প্রকৃতি মানুষকে অকৃত্রিম দানে, বিপুল ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দিয়েছে। অথচ মানুষ কত প্রতারক প্রাণী, নিজেকে প্রভু দাবী করে দম্ভ প্রকাশ করছে। ভুলে গেছে মায়ের কথা, দানের কথা। বলছে সে আশরাফুল মাখলুকাত-সৃষ্টির সেরা। নিজেকে নিজে একপাক্ষিক এই সেরা দাবী করাই প্রমাণ করে কত হাস্যকর এক নির্বোধ প্রাণির নাম 'মানুষ'। এখনো মানুষ বাবুই পাখির মতো সুনিপুন বাসা বাঁধতে পারে না, পিঁপড়েদের মতো আবহাওয়া সংবাদ জানে না, গোলাপের মতো ফুল ফোটাতে পারে না অথচ নিজে নিজেই নিজেকে সৃষ্টির সেরা দাবী করে বসে আছে। শুধু হাস্যকরই নয় এর সাথে জড়িয়ে আছে আরো এক মর্মন্তুদ বিষয়- এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবী নিয়ে প্রকৃতির অন্য সন্তানদের উপর মানুষ চালিয়ে আসছে এক নির্মম নিপীড়ন । প্রকৃতির অন্য সন্তানদের ধরে নিয়েছে নিজেদের দাস বলে। নিজেদের পাপাচারী বুদ্ধি দিয়ে বানাচ্ছে হাইড্রোজেন বোমা। আরো নানা রকমের গোলা বারুদ, মারণাস্ত্র। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ পাল্টে দিতে চাইছে মানুষ। মা প্রকৃতি এসব কারণে মানুষের দিক থেকে মুখ তো ফিরিয়ে নেবেই। প্রকৃতির অন্য সন্তানেরাও বা তা সইবে কেন? তাই দুর্যোগ নেমে আসে মানুষের উপর। আকাশ কালো হয়ে আসে। আশা ভরসার আলো কালো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে। জড় বা জীব কোনটাই নয় এমন এক দূরবীক্ষণীয় অদৃশ্য বস্তুর তান্ডবে সারা পৃথিবীর মানুষের ঘুম আজ টুটে গেছে।

নতুন গজানো ডানায় উড়াল শুরু তাই
বাতাসের ঢেউয়ে নাচে যমুনার যমজ ভাই
উঠে এসেছে ঋগবেদের ঘুমন্ত পাতা ফুঁড়ে
তাণ্ডবে মণ্ডপেও রক্ষা নাই পৃথিবী জুড়ে
প্রকৃতি জবাবদিহী করে না মানুষের কাছে
তবু সকল উত্তর তার কাছে গচ্ছিত আছে
প্রজাপতিটি তোমার কাছে হতে পারে ক্ষুদ্র
কিন্তু তার প্রতি সামান্য অন্যায়ে প্রকৃতি রুদ্র
হতে পারে একটি ফড়িং একেবারে মূল্যহীন।
তাই বলে তাকে তুমি বাস্তুচ্যুত করো যেদিন
কেঁদে বুক ভাসিয়ে তার মা বন্যা নিয়ে আসে
সে ক্রন্দনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে ভয় তরাসে
ডেউয়া গাছের নীচে বুভুক্ষু মাছরাঙা ঠোঁট
অকারণে তোমার মন দিলে কেন জাগে চোট?
তুমি যে হিংসার আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছো বন
সেই আগুন পাখি হয়ে ওড়ায় ধ্বংসের কেতন।
তুমি শুধু মুখে বলো মরিতে চাহিনা সুন্দর ভুবনে
ভালোবাসো কই ভুবনের ভাই বেরাদর চুম্বনে?
তোমাকে তাই তাড়া করে ফেরে আগুনপাখি
ফড়িং এর মা বলে কীকরে তোকে বাঁচিয়ে রাখি?
ফড়িং আর প্রজাপতির মায়েরা যে তিন বোন
তোমার দুখিনী জননী ধরণী তাদেরই একজন।


মানুষ আজ মৃত্যু আতঙ্কে আতঙ্কিত। মৃত্যু তো আতঙ্কিত হবার মতো কিছু নয়। সুস্থ মস্তিষ্কের কোন মানুষ কি জানে না যে তাকে একদিন মরতেই হবে? তবু কেন এই মৃত্যু ভয়? এর মূলে আছে আনন্দ। আনন্দিত মানুষ মর‍তে চায় না। মৃত্যুকাল উপস্থিত হলেও সে পুনঃতফশিল চায় মৃত্যুর পঞ্জিকায়। আর ব্যথিত মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়-- মরনরে তুহু মম শ্যাম সমান। চর্চিত ধর্ম ও লোকাচারে যাই বলা থাকুক মানুষের মৃত্যু ভয় আসলে অন্ধকারের ভয়। ফ্রান্সিস বেকন যেমন বলেছেন- Men fear death as children fear to go in the dark। মানুষের পার্থিব আনন্দ বা ভোগবাদিতাই মানুষকে এই জীবনের প্রতি প্রলুব্ধ করে। মানুষ তাই মরিতে চাহে না এই সুন্দর ভুবনে। মরনের পর চরম ও অসীম স্বর্গসুখের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে ধর্মের যত সুললিত বাণীই উচ্চারিত হোক, মানব মন চায় না এ পৃথিবী ছেড়ে যেতে- এবং এটাই সত্য, এটাই ধ্রুব । মানুষ চায় মায়ার বাঁধনে জড়ায়ে এ জীবন যাক গড়ায়ে এই ধুলি ধুসর জগতেই। স্বর্গলোকের হাতছানি তাই মানুষ দূরে ঠেলে দিতে পারে অসীম উপেক্ষায় এই মর্ত্যলোকের মায়ায়।

তবু আমাদের মরে যেতে হয়। কেননা মৃত্যুই এ বিশ্বজগতের সত্যিকারের রাজা। একমাত্র মৃত্যুর কাছেই প্রত্যেক জীবনকে আত্মসমর্পণ করতে হয়। মৃত্যুই তাই শেষ পর্যন্ত মহাপরাক্রমশালী রাজাধিরাজ। চেনা এক জগতের রুদ্ধদ্বার আর অজানা এক জগতের প্রবেশদ্বার। কী আছে মৃত্যুর পর? কেউ জানে না। কোন মানুষ সেই জগত থেকে ফিরে আসেনি। তাই হয়তো কোনদিনই জানা হবে না আসলে কী ঘটে মৃত্যুর পর। আমার যুক্তিহীন ভিত্তিহীন এক অনুমান আছে এ সংক্রান্ত। একেবারেই একান্তই অবান্তর এক ব্যক্তিগত চিন্তা। আমরা তো বিজ্ঞানের বদৌলতে মোটামুটি জানি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিলো। জড় থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে জীবের উৎপত্তি হয়েছিলো বলে মেনে নেয়া হয়েছে। তাহলে জীবদেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে জড়তেই পরিণত হয়- বলা যায়। জড়>জীব>জড় - এই হচ্ছে আসলে জন্ম-মৃত্যু খেলার সমীকরণ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জড়বস্তুর নিরন্তর বিবর্তন বা রূপান্তর প্রক্রিয়ায় একটা অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়কাল স্থায়ী স্ফুরণের নাম হলো জীবন। তাই আমার ধারণা মরে যাবার পর আসলে কিছু নেই। একেবারেই কিছু নেই। মৃত্যু আমাদের চৈতন্যের সমাপ্তিরেখা টেনে দেয়। কেউ বলবেন - মৃত্যুর পর অসীম অন্ধকার। আমি বলি তাও নয়। কারণ অন্ধকার বা আলো অনুভব করতেও চৈতন্য দরকার। কিন্তু মরে যাবার পর আমাদের সেই চৈতন্যই যেহেতু থাকে না তাই আলো বা অন্ধকার উপলব্ধি করাও সম্ভব নয়। আর আত্মা? সে তো সবই বানানো আজগুবি গল্প ছাড়া কিছু নয়। বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত আত্মার কোন অস্তিত্ব আবিষ্কার কর‍তে সক্ষম হয়নি।

মৃত্যু নিয়ে এই এত সব কিছুর পর মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে না ভাবলে কি চলে? আসলে 'এই সূর্যকর এই পুষ্পিত কানন' ছেড়ে যাবার কষ্ট ছাড়া মৃত্যুযন্ত্রণা বলে আলাদা কিছু বোধ হয় নেই। মৃত্যুকালীন মৃত মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই আমার নিয়ত প্রতীতি জন্মায় - মৃত্যু আসলে ততটা যন্ত্রণাময় নয় যতটা ভাবা হয়। হ্যাঁ, যে আঘাত বা ক্ষত মানবদেহের মৃত্যু ঘটায় তা নিশ্চয়ই কিছু যন্ত্রণা সৃষ্টি করে তবে তা আলাদা করে মৃত্যুযন্ত্রণা বলে কিছু নয়। বেঁচে থাকাকালীন মানুষ এরকম যন্ত্রণা অনেক সয়ে থাকে।

মানুষের চৈতন্য আর সজ্ঞাই মূলত মানুষের সম্পদ আবার একই সাথে আপদও। নিরানন্দে কাতর অসহায় মানুষ তাই তার অনুভবশক্তিকেই দায়ী করে সকল দুঃখানুভূতির জন্য। জড় এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত। ভাগ্যবান জড়। অভাগা জীব। কখনো পাখি বা বৃক্ষের কথা মনে হতে পারে সুখময় জীবনের অধিকারী বলে। কিন্তু আমরা তো নিশ্চিত জানি না তাদের দুঃখ গাঁথা। সুতরাং এ শুধু জীবনের 'এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস' ছাড়া কিছু নয়।

এই যে মায়াময় জগত সংসার। এ এক বিভ্রম ছাড়া কিছু নয়। ভালোবাসার কাঙালপনা করে মন। অথচ ভালোবাসা পাওয়াতে নয় ভালবাসাতেই যত সুখ, যত আনন্দ। যে ভালোবাসে সেই জানে এর আনন্দ। মানুষ তাই ভালোবাসে সেই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে আর বাজায় বাঁশি। শেষ পর্যন্ত হয়তো মৃত্যুই জয়ী হয়। তবু এই ক্ষণিকের জীবন এক পরম্পরায় প্রবাহিত হয় অনন্তকাল। মৃত্যু বিষয়ে তাই ব্যষ্টিক হতাশা থাকলেও সামষ্টিক আশা থাকে। ব্যাষ্টিক সকল প্রাণ এক মহাপ্রাণের অংশ যদি হয়ে থাকে তবে মহাকালে আমাদের কোন ক্ষয় নেই হয়তো।

ছবিসূত্র - ইঙ্গমার বার্গম্যানের চলচ্চিত্র 'দি সেভেন্থ সিল'