কনের স্নানঘর

শাফিনূর শাফিন




গায়ে হলুদের দিন পাঁচ নারী পরস্পরের হাতে হাত ধরে দুঃখের গান গাইতে গাইতে হলুদ ছুঁয়ে দেয় কনের হাতে মুখে। কনে লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়। তার সামনে এসে দাঁড়ায় তাঁর অতীত আর ভবিষ্যৎ। অতীত নিয়ে আসে ছেলেবেলার ঘ্রাণ। শিউলি কুড়ানো বিকেল। এলাটিং বেলাটিং সইগো। দৌড় ঝাপ। কুমির পানিতে নেমেছে। স্কুল। নীল সাদা ইউনিফর্ম। ব্যাগের ভিতর গল্পের বই। টিফিন ছুটিতে স্কুলের পেছনের দেয়ালে উঠে বসে থাকা। ছুটির পরে জেলেপাড়া ফেলে আসা। সবসময় কিছু ন্যাংটো বাচ্চা আর ভীষণ ক্ষীণকায় কিছু নারী দাঁড়িয়ে থাকে কলসি হাতে রাস্তার কলের ধারে। ঘরে ফিরে মায়ের গায়ের গন্ধ। মা হাতে ভাতের লোকমা নিয়ে দাঁড়িয়ে। পুরনো বাড়ির আয়নাবিহীন স্নানঘর। আধো অন্ধকার মাথার উপর স্যাতস্যাতে ছাদ, দেয়াল। একটা স্নানঘরে কেন তিনটা দরজা থাকবে তা নিয়ে শৈশব বিস্মিত হয়।

মেয়েটা ফিরে আসে বর্তমানে। বিভিন্ন বয়সী নারীদের কন্ঠে তখনও দুঃখের গীত চলে। মেয়ে যাচ্ছে স্বামীর ঘরে, সোনার বরণ কন্যা। মেয়ে হাসে। আপন মানুষদের কাছে তার প্রিয়জনমাত্রই সোনার মতো দামী জহরত। দামী গয়না যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়ি বিষের হাড়ি। প্রবচনগুলো কি এমনি এমনি তৈরি হয়? মেয়েটা ভাবে পিঠে চন্দন ঘষে দেয়া নারীটির কথা। মুখ বুজে সহ্য করার জন্য যার সুনাম আছে। মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো, তাকেও কি সব সহ্য করতে হবে? মুখ বুজে? চন্দন ঘষতে ঘষতে নারীটি বলে উঠে আপনমনে নিজের কথা। যেদিন তার বিয়ে হয় সেদিন তাকেও এমন আশপাশের নারীরা এসেছিলেন স্নান করাতে। "বিয়ের গীত গাইছিল তারাও। তার একটা গীতে এমন ছিলো কথাগুলো, কোন এক বিয়ের কনে চোখে রংবেরঙের স্বপ্ন নিয়ে গেলো শ্বশুরবাড়ি। স্বপ্ন ভেঙে দেখলো সে আসলো যমের বাড়ি। বিয়েতে কত কাহিনীর গীত গাওয়া হয়। সুখের দুখের। যেকোনোটা জীবনে মিলে যাবে। আমার জীবনে দুঃখ মিলে গিয়েছিল!" মেয়েটা ভয় পেয়ে থামিয়ে দেয় গীত। মেয়ের গায়ে তখন চন্দনের ঘ্রাণ। নারীরা তার মাথায় পানি ঢালতে থাকে। তিনটা কাঠের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে সুখ, দুঃখ আর নিরাসক্তি।


(ছবি অমৃতা শেরগিলের ব্রাইডস টয়লেট। এই ছবিটির দিকে যতবার চোখ পড়েছে আমার মনে হয়েছে, এই গোল হয়ে বসে থাকা নারীদের জীবনে কি কি গল্প থাকতে পারে কিংবা যে শিশুটি তাদের কথা গিলছে তার মাথার ভিতর কি চলছে। নারীরা কি শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত গল্প করে যায় ব্রাইডাল শাওয়ারের সময় নাকি মেয়েটার সাথে চটুল রসিকতায় মেতে উঠে। আর যে মেয়েটা নতুন একটা জীবনে পা দিতে যাচ্ছে এতদিনের জীবন পেছনে ফেলে, তার মনে কি কি ভাবনা আসছে! সে কি অতীত ভেবে গুমরে গুমরে মরছে নাকি ভবিষ্যত ভেবে শংকিত বা পুলকিত!

অমৃতা হাংগেরীয় মা এবং ভারতীয় পিতার ঔরসে জন্ম যার। বুদাপেস্ট জন্মস্থান আর মৃত্যু লাহোরে, পাকিস্তান। মা ইহুদী, বাবা শিখ। কিন্তু তিনি ভীষণ স্বাধীন, পাখির মতো জীবন। উড়ে বেড়ানো। ছিঁড়ে ফুড়ে নতুনত্ব সন্ধানী। যাকে বলা হয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আভান্ত-গার্দে আর্টিস্ট। মডার্ন ইন্ডিয়ান আর্টের সূচনা যাদের হাত ধরে অমৃতা তাদের অন্যতম। অমৃতার ছিল নারী পুরুষ উভয়ের প্রতি প্রেম। ক্ষণজন্মা এই শিল্পী ভারত এবং বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন শিল্পের অনুসন্ধানে এবং যেসব অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন তা তার তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছিল একেকটি ক্যানভাসে।)