গল্প: ঝরাপাতা ও স্রোতস্বিনী

নিবেদিতা আইচ



সেদিন এমন মেঘলা কাজলা আকাশ ছিল। আমি ভেবেছি ঝুপ করে হয়ত ঢল নামবে। ছাতাটা হাতে নিয়ে বেরিয়েছিলাম তাই। ফুস করে রিকশার চাকার হাওয়া বের হয়ে গেলে চমকে উঠেছিলাম খুব। নেমে গিয়ে দ্রুত পা ফেলছিলাম অটো স্ট্যান্ডের দিকে।
ঠিক সাড়ে সাতটায় ফেরিটা ছেড়ে যাবে সুগন্ধা থেকে। আমার হাতে তখন ছয় মিনিট। ভেজা হাওয়ার ওড়াউড়ি ছিল ভীষণ। সেই হাওয়ার বিপরীতে হাঁটছিলাম।
তারপর হঠাৎ আমাদের দেখা। চশমার কাচ মুছে চোখে দেবার ভঙ্গি দেখেই আমি জমে গিয়েছিলাম ওখানে। আরো কয়েক সেকেন্ড পর ওর চোখ জোড়া রাস্তার এপারে দাঁড়ানো আমার মুখের উপর এসে স্থির হলো। শরীরের মানচিত্রটা বেশ কিছুদিন হলো বদলাতে শুরু করেছে। সেই বছর পাঁচেক আগের ক্ষীণাঙ্গি আর নেই আমি তখন। তাই জানতাম আমাকে চিনতে ওর সময় লাগবে। ও স্থিরচোখে তাকালো কয়েকটা মুহূর্ত । তারপর চোখ দু'টো ছোট করে সেই আগের ভঙ্গিতে হাসলো। আমাদের দেখা হলো এভাবে, সেই পুরনো আর বিস্মৃত কাননপুরে।
এখনো সে দৃশ্যটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আর মনে হয় আমি সময় ভ্রমণ করে ফিরে গেছি সেই দিনটায়। যেদিন দু'টো পাতাঝরা গাছের মাঝে দীর্ঘদিনের মৌনতা ভেঙ্গে গিয়েছিল আর ডাক ভুলে যাওয়া পাখিদল উড়ে উড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল কথার রেণু।
চোখ বুজলে দেখতে পাই আমার পরনের যশোর স্টিচ শাড়ির কুচিগুলো পায়ের সাথে লেপ্টে আছে৷ হাওয়াটা এমন তীর্যকভাবে ধেয়ে আসছে যে ওর চোখেমুখে চুলগুলো ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। হাতের ইশারায় আমাকে দাঁড়াতে বলে রাস্তার উল্টো পাশ থেকে সে হেঁটে এলো আমার দিকে।
কবে এলে?
প্রশ্নটা আমারই ওকে করবার কথা ছিল। তাই উত্তর দিতে পারিনি সাথেসাথে। আমি বারবার ঘড়ি দেখছিলাম। ও কিছু একটা বলছিল। আমি ওর দিকে তাকালাম। ঠোঁটজোড়া নড়ছে আর দৃষ্টিটা স্থির। আমি ওকে দেখবো নাকি ওর কথা শুনবো তাই ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি।
ও আবার বললো - ফেরি তো এই একটু আগে ছেড়ে গেল। তোমার কি আজই ফেরার কথা?
বুঝতে পারলাম আমার হাতঘড়িটা ধোঁকা দিয়েছে । নাকি ফেরিটাই অমন অদ্ভুত স্বেচ্ছাচারিতা করলো ! ফেরার কথাটা জিজ্ঞেস করায় বিস্ময়ের সাথে আবিস্কার করলাম আমার আসলে আর ফেরার তাড়া নেই। বছর পাঁচেক পর মানুষটির সাথে যখন দেখা হয়ে গেলো তখুনিই তাকে বিদায় জানাতে ইচ্ছে করলো না আমার। দীর্ঘ সময়ের এই বিচ্ছিন্নতাটাকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে কথার ফুলঝুরি নিয়ে দু'দন্ড বসতে ইচ্ছে করছে কোথাও।
হয়তো আমার ইতস্তত ভঙ্গি, চোখের পাতার কাঁপুনি অনূদিত করেছিল ভেতরের কথাগুলো । তাই সে বললো- আমি এখনো কিছু খাইনি, চলো ওদিকটায় গিয়ে বসি।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো ওকে অনুসরণ করলাম। কতকাল পর একই পথে হাঁটছি আমরা! সেই নীলমণিলতার গালিচা বিছানো পথে। ছিরিছাঁদহীন কাননপুরে ঘরের বাইরে আমাদের চোখে একমাত্র মাধুরী ছিল এই নীল রঙের গালিচা। আমাদের প্রেম আর স্বপ্নের গল্পগুলো যার পরতে পরতে লেখা ছিল। লেখা ছিল বিচ্ছেদের সেই দিনটির কথাও। এই পথ ধরে হেঁটে এসে আমাকে ও বিদায় দিতে এসেছিল সুগন্ধার তীর অব্দি।
আমরা হাঁটছিলাম পাশাপাশি। আশেপাশে পুরনো কিছু সস্তা হোটেল, তেমন ভদ্রগোছের কোনো কফিশপ নেই এদিকে। ছিলও না কখনো। আমরা বসলাম একটা ভাতের হোটেলেই। এবার সে নিশ্চুপ। আমাকে তাই পাখিদলকে ডাক পাঠাতে হলো, কথার রেণু ছড়াতে।
জানতে চাইলাম কেমন আছে সে। কেমন ছিল এতগুলো দিন সেটা জানবার আগ্রহটা ছিল দ্বিগুণ। ও চোখ তুলে তাকালো, ছোট করে উত্তর দিল -যেমন থাকা যায় ওভাবে।
কিভাবে?
দ্বীপান্তরে।
ওর দ্বীপান্তরের খবর আমি জানতাম। কীকরে যেন ওর জীবনের আবহগান আমার কানেও ভেসে আসতো। দেশের বাইরে পাড়ি দেবার খবরটাও পেয়েছিলাম তাই। বোধ হয় আমাদের বিচ্ছেদের পরের বছর ছিল সেটা। শুনে স্বস্তি পেয়েছি তখন। ভেবেছি আমাদের মধ্যে একজন অন্তত তার জীবন গুছিয়ে নিক।
কোথায় আছো এখন? কী করছো? আমার ভেতর থেকে পাখিদল এভাবে বেরিয়ে আসছিল, একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে।
এখানেই পোস্টিং আমার। মাঝে দু'বছর বাইরে ছিলাম।
সে জানালো প্রবাসে দু'বছর পড়াশোনা শেষ করে গত বছর সে এই কাননপুরে ফিরে এসেছে। কী সহজ ছিল ওকে খুঁজে পাওয়া! একবার অন্তর্জালে ওর অফিসের ঠিকানায় খোঁজ নিলেই জানতে পারতাম ওর এখনকার পোস্টিং এর কথা। গতকাল বিকেলেও ওর কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে যাবার সময় রিকশা থেকে উঁকি দিয়েছিলাম একবার। যদি ওর ফেরার খবরটা জানা থাকতো তাহলে কি এই বিচ্ছিন্নতার ইতি আমিই টানতে পারতাম না? এমন হঠাৎ যোগাযোগের অপেক্ষায় থাকতাম না হয়তো। পরমুহূর্তে মনে হলো পুরোটাই আমার বিভ্রম। গত পাঁচ বছরে তিলে তিলে তৈরি করা ব্যক্তিগত দুর্গটা ছেড়ে তখন আমি আসলে বেরুতে পারতাম না।
তুমি হঠাৎ এখানে?
সম্ভাব্যতার সূত্র নিয়ে কাটাকাটি খেলাটা থামাতে হয় ওর প্রশ্নটা শুনে। আমাকে আপাদমস্তক কাঁপিয়ে দেয় উচ্চারিত শব্দগুলো। আমি ওকে বলতে পারিনা অফিসের প্রজেক্টের কাজে এতদূর আসবার কারণ শুধুমাত্র স্থানীয় লোকদের তথ্য সংগ্রহ করতে নয়, আমার ব্যক্তিগত কিছু স্বার্থও ছিল তাতে। তবু অর্ধসত্যই বলতে হলো- এসেছি একটা প্রজেক্টের কাজে, ডেটা কালেক্ট করবো বলে। আজ ফেরার কথা ছিল।
সে চায়ের কাপে চুমুক দেয় ধীরে ধীরে। আমি ওর কপালের ভাঁজগুলো দেখি। বদলে যাওয়া চশমার ফ্রেম দেখি। বোধ হয় পাওয়ারটা বেড়েছে ওর। চিবুকের জরুলটাও দেখি। তারপর যখন চোখে চোখ পড়ে যায় সামলে নিয়ে বলে উঠি-তুমি এখনো এখানে কেন, তোমার কি প্রমোশন হয়নি?
আমার তো কাননপুর কখনো খারাপ লাগেনি ঝরা! আমার ঘরটা এখানেই। ফিরেছি তাই।
সে জানতে পারে না আমি তখন ভেতরে ভেতরে ঝরেই যাচ্ছিলাম। অথচ ঠিক উল্টোটা হবার কথা ছিল। বিষাদের ভার একা বইবো বলে, স্বার্থপরের মতো ঘরটা ভেঙ্গে দিয়ে ওকে বিদায় জানিয়েছিলাম। আমিই ওভাবে কাননপুর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। অতগুলো দিন পেরিয়ে এসে সেসব কতটা পেরেছি তা নিয়ে সংশয় ছিল মনে মনে। সবকিছু আরো বেশি জট পাকিয়ে গেল তখুনিই যখন সে আমায় বললো 'ঘরটা রয়ে গেছে এখানে।'
তুমি কেমন ছিলে এতদিন? এখন কেমন আছো?
বরাবরের মতো সহজ আর স্পষ্ট ওর প্রশ্নগুলো। কেন আমি ওর মতো করে ভাবতে পারিনা এখনো? ভাবতে পারলে আমার ঘরটাও হয়তো এই কাননপুরে ফিরে পেতাম। একা থেকেছি কিন্তু ভালো আমি থাকতে পারিনি। ওর প্রশ্নের উত্তর‍টা সরলভাবেই দিলাম।
তোমার কাছে আমি যেমন চেয়েছিলাম একা থাকবো,সেই একা আছি... সজল।
ভালো আছো তাহলে?
এরপর কথার পাতাগুলো ঝরে গেল টুপটাপ। পাতার সাথে সাথে আমি কাঁদলাম, হাসলাম। আমাদের আত্মজা, সুগন্ধা নদীকে ভালোবেসে আমরা যার নাম রেখেছিলাম স্রোতস্বিনী, ভ্রুণ অবস্থাতেই যে ঝরে গিয়েছিল আমাদের কিছু বুঝতে দেয়ার আগেই, যাকে হারিয়ে পাথর আমি নিজেকে বিচ্যুত করে নিয়েছিলাম সজলের কাছ থেকে,বিষাদে ডুবে যেতে যেতে কারো সাহচর্য সহ্য হয়নি বলে সব ফেলে চলে গিয়েছিলাম অনেক দূরে,সেই আত্মজা, স্রোতস্বিনীকে স্মরণ করে দু'জন হাতে হাতও রাখলাম।
অনেকক্ষণ চুপ থাকবার পর সে ধীরে ধীরে বললো- শোনো ঝরা, আমি স্রোতস্বিনীকে ভুলিনি একটা মুহূর্তের জন্য। আর তোমাকেও। তাই কাননপুর ছাড়তে পারিনি কখনো। কিন্তু তুমি কেন এখানে এলে বলো তো? কেন এলে এভাবে?
এমন অমোঘ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলে যে প্রস্তুতির প্রয়োজন তা আমার ছিল না সেদিন। ভীষণ বাজেভাবে নিজেকে ধরা দিতে হলো ওর কাছে। আমি বললাম- কাননপুরে আমার ঘরটা কেমন আছে তাই একবার দেখতে ইচ্ছে হলো।
এরপর আমরা বহুক্ষণ কথা বলিনি। শুধু মুখের রেখায়, জলের রেখায় দেখছিলাম পরস্পরকে।
বেলা ফুরালো দ্রুত৷ আমার ফেরার কিছু ব্যবস্থাও হয়নি তখনো। তবু নীলমণির প্রগাঢ় নীল গালিচায় অন্যমনস্ক আমরা হেঁটে গেলাম অনেকটা পথ। সুগন্ধার চেনা ঢেউ থেমে থেমে আছড়ে পড়ছিল তীরে। হাওয়াগুলো মুহুর্মুহু চঞ্চলগানের মতো ধেয়ে আসছিল আমাদের দিকে।
সেদিন আর বৃষ্টি নামেনি। জলভরা মেঘগুলো বোধ হয় থমকে গিয়ে আমাদের দেখছিল। আর আমাদের মাঝে ছিল কথার পাখিদের ওড়াউড়ি, একটা, দু'টো বা অগুনতি। কখনো ডানা ঝাপটে, কখনো আলতো হাওয়ার পালকে ওরা ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাদের।

(আলোকচিত্রীর কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, ছবির সূত্র আর শিল্পীর নাম জানা নেই বলে উল্লেখ করা গেল না)