বিধানের সংসার

বিধান সাহা



ছবিটা তখনকার, যখন আমার উড়নচণ্ডী দিন। যখন আমার আমি বলতে আমিই শুধু। যখন আমার পকেট থেকে মুদ্রা-উধাও, উদাস দুপুর পায়ের তলায় শহর পালায়। ছবিটা তখনকার, যখন আর্ট কলেজের বারান্দায় বসে কেউ জলরঙে খাতা ভাসাতে থাকলে আমি তন্ময় হয়ে নিজস্ব পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে চাইতাম। আর সজীব ছাত্রাবাসের দুই নাম্বার রুমের কোন এক কোনায়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোন এক ভাঙ্গা চৌকিতে শুয়ে, অসহ্য গরমে ঘেমে-নেয়ে স্বপ্ন দেখতাম আকাশ ফুঁড়ে উড়ে যাওয়ার। সেই উড়ে যাবার ভেতর থাকতো বাঘের ভঙ্গিমা। অর্থাৎ একটা ব্যাঘ্র-বজ্র হৃদয়ে ধারণ করে আমি উড়তাম। উড়তাম কল্পনায়, স্বপ্নে। আর নিজেকে নিশ্চল, স্থবির করে দিয়ে অনুভূতির চূড়ান্ত সাক্ষাতে টের পেতাম আকাশটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। এসব না জেনেও তারা হাসতো। হাসতো মানে হাসার ভান করতো। আর তখনই ঠনঠনিয়া টার্মিনাল-মসজিদ থেকে সাইরেন ভেসে আসতো। সাইরেন— এখানে শঙ্কার বাহক নয়। এখানে সে স্বপ্নের। সকল দূঃস্বপ্নের ব্যারিকেডই ভাঙ্গতে জানতো রাজু’দা। বহু বহু রাত আমরা একসাথে দূঃস্বপ্নের ব্যারিকেড ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সুস্বপ্নের ঠিক নিকটে গিয়ে জেনেছি এ এক ভ্রান্তি মাত্র। তবু আমরা বিভ্রান্তির বিভিন্ন নকশাকাটা ঘরে স্বেচ্ছায় আটকে থাকি, থাকতে চাই।

রাজু’দা জলরঙে জীবন আঁকতে চেয়েছিলো। রাজু’দা জীবনের সমস্ত কিছুকে নীল রঙে সাজিয়ে হো হো করে হাসতে চেয়েছিলো। হতে চেয়েছিলো নীলাশ্রয়ী। ছবিটা তখনকার। আমি বলতে তখন কেবল আমিই শুধু। ছবিতে দৃশ্যমান বস্তুগুলো নিয়েই আমার সংসার। নিজেকে সংকুচিত করতে করতে একটা চৌকি আর দেয়ালে টাঙানো এইসব, এইসব নিয়েই আমার সংসার। অথবা এইসবই আমি। নামও দিয়েছিলো ‘বিধানের সংসার’। নামটা নিয়ে তারা হাসতো। হাসতাম আমিও। আমাদের সামষ্টিক হাসির ধ্বনিতে পাশের মেস থেকে সাইফুল ভাই মেয়েলি ঢং করতে করতে বেরিয়ে এসে কি বলতো মনে নেই। কিন্তু তার সেই মেয়েলি ঢংয়ে বলা কথাগুলোর এখনও আমি যথার্থ অনুবাদ করতে পারি। দো-তলায় দাঁড়ানো সনি আপার হাসিটারও। রাজু’দা এঁকেছিলো একদিন। এঁকেছিলো ইচ্ছে পাখির ডাকে একদিন বৃষ্টি হবে এমত সম্ভাবনায়। অথবা অজস্র সাইরেনের শব্দ ও সংকেতে কেটে যাবে এই অমানিশা, এই ভেবে। হয়তো।

পুনশ্চ :
শিরোনাম : বিধানের সংসার
শিল্পী: রাজীব রাজু
মাধ্যম : জলরং
সাইজ : ১১” X ১৬”
সময়কাল : ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ