গ্রো ওল্ড অ্যালং উইথ মি

অনির্বাণ ভট্টাচার্য




ওয়েল, সব ঠিক হয় যাবে একদিন। একটা আলো দেখা যাবে। আলোর ওপারে আলো। শুধু মাঝেরটুকু অন্ধকার। সেই রাস্তাটুকু হেঁটে পেরোনো। কিভাবে? যেভাবে মানুষ স্বপ্ন দেখে। যেখানে স্বপ্নে রং চেনে, চেনে সাপ আর ঘুম ভেঙে ওঠার পর খোঁজে কোন মৃত মানুষটাকে সে আজ পর্যন্ত স্বপ্নে বেঁচে উঠতে দেখেনি। রোগ নেই, অসুখ নেই, মহামারী নেই। ওই তো আমাদের হাত ধরাধরি জীবন। আমাদের অ্যাপলিটিকাল লাইফ। দেখো, আমরা হাসছি। বাচ্চাদের পার্কে নিয়ে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি আসলে আমাদের মধ্যে শরীর আসেনি অনেকদিন। বা এলেও মন থাকেনি সেভাবে। জোর করা। লাল আলোর মতো। আমার সানা আল্লাহ গাজীর মসজিদের পাশ দিয়ে হাঁটা মনে পড়ে। মনে পড়ে চিৎপুর রোড। লাল আলোর রাস্তা। মা কাঁদছে। কেন? কেঁদো না মা, আই হ্যাভ টার্নড ইনটু এ গাজী। মরতে ভয় কী? মরা। সেই লাল আলো। হৃদয়বিহীন শরীর। আর ভাইসে ভার্সা? শরীরবিহীন হৃদয়? আঃ, প্লেটোনিক। শান্তি।

একদিন দাড়ি কাটতে কাটতে তোমার মুখ দেখতে পাব সামনে। আয়না। ওখানে নিজের মুখ দেখা বন্ধ করেছি অনেকদিন। দেখো, চিবুকের ঠিক ওপরে একটা কাটা দাগ। কিলার। একদিন ভেঙে ছিলাম কাচ। দুদিন ভেঙে ছিলাম। তিনদিন‌। বাড়ির লোক কাচ পাল্টে দিল। আমি মুখ। এখন তোমাকে দেখি। তুমি ছেলেকে নিয়ে, মেয়েকে নিয়ে পার্কে হাঁটো। একটা ভিড় বাসে ওঠে মুখে মাস্ক পরা লোক খোঁজো। পাও না। কারণ তখন কারও কোনও অসুখ নেই। ভাইরাস নেই। শুধু পৌরুষ আছে। দাপট আছে। চিরকালীন আছে। তুমি গ্লাভস থেকে দশ টাকার কয়েন দিলে কন্ডাক্টরকে দিলে বৃদ্ধ শিউরে ওঠেন। অপত্য সন্দেহে। অপত্য স্পর্শে। কারণ এখন আর কোনও নার্স বেঁচে নেই। বা সবাই বেঁচে উঠে আর নার্স নেই। অসুখে মুখ বদলেছে। সেসব মুখ, চেনা যাচ্ছে না আর।

ওই দেখো, আমরা দুটো মুখের ভেতর এক ইঞ্চির ব্যবধান নিয়ে বসে। কে ঠিকমতো হাসছি, কে বানানো, বোঝা দায়। তবু। আমাদের কত গল্প ছিল আগে, মনে করছি। মনে করছি মারণকাল। আর যারা একা, তাদের বলার মত তো কিছু গল্প থাকে না। আমরা কথা বলছি মেঘ নিয়ে, বৃষ্টি নিয়ে, আবহাওয়া নিয়ে। আমাদের সামনে, পেছনে, পাশে একটা গোটা না-খাবলানো আস্ত ইউনিভার্স। শেষ বুকসেল্ফ। শেষ বই। চ্যাপ্টার। একসময় শেষ পাতা। যখন পড়ে ফেলব, তারপর? ভেবেছ কখনও? তারপর কী হবে? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে হবে তোমার দিকে, তুমি আমার দিকে, আমৃত্যু?

আমৃত্যু। আজীবন। কোথায় তফাৎ? মিল? শেষটুকুতে আসলে তো একটা জীবন লুকিয়ে আছে। আফটারলাইফ। সুন্দর। সেখানেই যাওয়া। ফেরা। আমাদের দুজনের দেখা হওয়ার ঠিক মাঝখানে কোথাও। জাক্সটাপোজিশন। দুটো পরী ঘুরে যাচ্ছে মাঝে। ঠিক ওইখানটায়। আলো। ঘরময়। দেখো, দেখো, দেখো, সে আলোয় কোনও অসুখ নেই। একটা ছেলে ঘুম থেকে উঠে দাড়ি কাটতে কাটতে মেয়েটার মুখে ঘষে দিচ্ছে সাবান। সারারাত তীব্র শরীরের পর পোশাক পরতে ভুলে যাচ্ছে দুজন। ভুলে যাচ্ছে আসলে কার শরীরে ভর করে আছে কে? আলো নিভিয়ে একটা এক মিনিটের দেশলাই জ্বলার দৃশ্য স্লো-মো করে দীর্ঘায়িত হচ্ছে অনেকটা। তিরিশ সেকেন্ড। ছেলেটা বলছে, নাঃ এখনও হয়নি। পঞ্চাশ। এখনও না। মেয়েটার ঘাম জমছে। সম্পর্ক। যুদ্ধ। অসুখ। সন্তানহীনতা। আঃ। এক মিনিট। ঘাম ছেড়ে মেয়েটা ছুটে দরজা খোলে। ঠান্ডা হাওয়া। বৃষ্টি। ছেলেটা বলে, তোমায় খুব সুন্দর লাগছে। মেয়েটা হাসে। দূর থেকে, না?

আসলে অসুখ থেকে সেরে ওঠার পর আর একটা অসুখ। আসলে অসুখ সারেনি কোনওদিন। অথবা, আসলে অসুখ বলে যাকে ভাবছ, হয়নি কোনওদিন। তুমি আসলে যাকে অহঙ্কার বলেছ, সে তাকেই ভাবছে মনোরোগ। লেখা বলে যাকে মাথায় তুলেছ এতদিন, তোমার প্রিয়তম বন্ধুর কাছে সেসব মিলিপেড, সেন্টিপেড। তার আঙুল বেয়ে উঠতে উঠতে একদিন সেসব তোমার সঙ্গে বুড়ি হবে। বুড়ো হবে। গ্রো ওল্ড অ্যালং উইথ ইউ। নাঃ, তুমি এর চেয়ে বেশি ভাবতে পারছ না আর। একটা আগুন। একটা মিনিট। আলেকজান্দ্রিয়া। একটা ঘর। গানশট। পারছ না। তুমি পারছ না কিছু। সৃষ্টির মধ্যে আগুন, ধ্বংস, বীভৎস এক মেলানকোলিয়া। তোমাদের যুগপৎ স্বপ্ন। দুঃস্বপ্ন। দুটোর ভেতর এক সূক্ষ্মতম তফাৎ। দ্বিতীয়টা একটানা। তুমি মেলাতে পারো। ভয় পাও। প্রথমটা পারো না। কয়েকটা আলাদা ইমেজ। ওগুলোই মনে রাখতে পারে তুমি। ভাবো স্বপ্ন। ভাবো ভালোবাসা। একদিন পুরোটা মনে পড়ে। মেলাও। বোঝো নাইটমেয়ার। তোমার সেই পুরনো ঘাম ফিরে আসে। বারান্দার ঠান্ডা হওয়াটা। বৃষ্টিটা। তখন, তোমার অভিনয়ের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে অন্য কারও স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে তুমি আছ। পার্টিসিপেশন। সেই অন্য কেউ যেকোনও সময়ে জেগে উঠবে। তোমাকে দেখবে। তার ঘরে। জীবনে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার ভেতর। গানশটের ভেতর। তখন? সে কি লজ্জা পাবে?

ওদিকে দূরে, অনেক অনেকটা দূরে, টাইম স্পেসে এলিজাবেথ ব্রাউনিং স্বামী রবার্টের পাশাপাশি একসঙ্গে বয়স্ক হবেন। মরফিন। তবু, ব্যথা বাড়বে। আসলে, ব্যথা কমবে। শেষ মুহূর্ত। রবার্টের দুহাতে জড়ানো এলিজাবেথ ওপারটা দেখতে পাবেন। আলো দেখতে পাবেন। অসুখ সেরে যাবে। ব্যথা সেরে যাবে। রবার্ট শুনতে পাবেন, এলিজাবেথের শেষ কথা।

'বিউটিফুল'।



কৃতজ্ঞতা: ইঙ্গমার বার্গম্যান, জাঁ পল সার্ত্রে, রবার্ট ব্রাউনিং