বিস্ফোরণ, নবারুণ এবং প্রসঙ্গ পরজীবী

সরোজ দরবার





‘চুল্লি অফ করে দে! ভেতরে ফাটচে!’
ভেতরে ফাটার কেসটা পুলিশ-ই বুঝেছিল; যেদিন পোড়ানো হচ্ছিল হারবার্ট সরকারকে; যথোপযুক্ত উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সেদিন তাদেরই কেউ চেঁচিয়ে চুল্লি বন্ধ করতে বলেছিল। বং জুন-হো – ‘প্যারাসাইট’ ছবির পরিচালক - অবশ্য সেই অবকাশই দিলেন না। উলটে ভিতরে চালান করে দিলেন আরও এক ডিনামাইট স্টিক। সে যে কবে আবার ভিতরে ফেটে পড়বে কি বেরিয়ে এসে সব তছনছ করে দেবে, তার ঠিকঠিকানা নেই। কিন্তু আলো যেভাবে সংকেতে জ্বলে আর নেভে, পরিচালক বলুন ছাই না-বলুন, পাতালের চিরকুটে লেখা থাকে ভবিতব্য- তছনছ অনিবার্য; যা ফাটার তা ফাটবেই; কিন্তু কখন, তা কেউ জানে না। সত্যি বলতে, ‘কখন, কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তা কে ঘটাবে সে সম্বন্ধে জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও বাকি আছে।’ ঢের বাকি ধনতন্ত্রেরও। তার আপাত নিরাপদ শৌখিন বিলাসশয্যায় দুরন্ত সঙ্গম আর ঘন শীৎকারের নিচেই যে কখন কোন পরজীবী লুকিয়ে থাকবে আগামী তছনছের সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে, তা তার জানা নেই। জানা থাকার কথাও নয়।
আশ্চর্য হয় শুধু প্রাসাদের বালকটি। গোটা পরিবারে একমাত্র যার উন্নত নাসিকায় এসে ধরা দিয়েছিল প্রলেতারিয়েত-গন্ধ। বালক বোঝেনি, কিন্তু তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় জানান দিয়েছিল, কোথাও একটা যূথবদ্ধতা আছে। তা যেন ঠিক নয়। অন্তত কাঙ্ক্ষিত তো নয়ই। কী সেই গন্ধ? চরিত্রদের মুখ দিয়ে পরিচালক জানিয়ে দেবেন, তা হল কলোনিজীবনের গন্ধ। বস্তিবাসীর গায়ের গন্ধ। গরিবের গন্ধ। এই গন্ধের জমাট বাঁধা এবং একই ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া তাই স্বাভাবিক নয়। বিশেষত যে-ঘর তৈরি হয়েছে মায়াপুরী হয়ে! সমস্ত উদ্বৃত্ত আহরণ করে ধনতন্ত্র তার একান্ত ভক্তদের জন্য ঐশ্বর্যময় নিশ্চিত আরামের যে-প্রাসাদ বরাদ্দ করে, সেখানে এই গন্ধ থাকবে কেন! ফলে, এই বালক, সেই প্রাসাদেরই কনিষ্ঠতম সদস্য, একদা সে দেখিল কোন ভূত! তা কি কেবলই দুঃস্বপ্ন! ট্রমা! পরিচালক, তাকে একেবারে শেষে, তার কল্পিত যাবতীয় ভয়ের গল্পের রহস্য ছিঁড়েখুড়ে সেই অবধারিত তছনছের দৃশ্যে দেখিয়েই দিলেন তার ভূতের স্বরূপ। বালক মুছ্‌ছো গেল। ধনতন্ত্রের উত্তম সন্তান ভূত দেখে অজ্ঞান হল, আর সেই সুযোগে ভিতরে চালান হয়ে গেল আর এক পরজীবী! আমাদের কেন কে জানে, আচম্বিতেই মনে পড়ে যায় অরুন্ধতী রায়ের লেখার সেই শিরোনাম,- ক্যাপিটালিজমঃ আ ঘোস্ট স্টোরি।
বলা বাহুল্য, এ ছবিতে কে আসলে পরজীবী, তা নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে; হচ্ছেও। সে-কথা থাক। আমার শুধু কান পাতলে শুনি, গোটা ছবিটায় একটা অনুচ্চারিত শব্দবন্ধ জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা কয়ে চলেছে- ‘চ্যাং দেকবি?’ কে বলেছেন? ছবির কোনও চরিত্র! না পরিচালক? তা আমরা জানি না। কিন্তু বাঙালি দর্শক আমি, কেন যে বারবার এই কথাটাই শুনতে পেলাম সে একমাত্র হারবার্ট সরকারের সুইসাইড নোট-ই জানে।
চলচ্চিত্রবেত্তারা বলছেন, এই যে তিন ধাপে বসবাস করা তিনটে পরিবার দেখানো হয়েছে, এতে শ্রেণির ফারাকটা একেবারে চোখে আঙুল দেওয়া। অর্থাৎ, একটা পরিবার থাকে ধনতন্ত্রে উপরকাঠামোয়- মাটির উপরের প্রাসাদে। আর-এক পরিবার – যারা কিনা কৌশলে ওই উপরকাঠামোর পরিবারে ঢুকে পড়বে – তাদের আদত থাকা মাটির কিঞ্চিৎ তলায় একটা সাবওয়ের মতো জায়গায়। এদিকে, পরিচালকের তুরুপের তাস লুকিয়ে আছে ওই ধনাঢ্য বাড়ির পাতালে। আজ চার বছরের বেশি সে ওখানেই আছে। তার স্ত্রী এই বাড়িতেই হাউসকিপারের কাজ করত। যাকে ছলনা করে সরিয়ে দিয়েছে এই মাঝামাঝি থাকা পরিবারের সদস্যরা। কেন যে সে বেঁচে থাকে, সেটাই এক ধাঁধা! এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুই কি শ্রেয় নয়! আর, আশ্চর্যভাবেই এ-প্রশ্নে পৌঁছে আমাদের মনে পড়ে যায় এক অন্তর্মুখী মানুষের ডায়রির দু-একটা লাইন। চাকরি খুইয়ে বেকার জীবনানন্দের দিন যখন কাটছে নিদারুণ অসুখী হয়ে, তখন একদিন তিনি লিখছেন – ‘A man, all things considered should not live in this scheme. But, why does he not die? A man like me thinks he may be misunderstood , and leave his message real unsaid by an early death.’ অতএব, কিছু বলিবার থেকে যায়। গোটা জীবন তো জীবনানন্দ কেন্দ্রকে অস্বীকার করে পরিধির শীতলতায় কাটানোর স্পর্ধা দেখিয়ে গেলেন। তা, ছবির এই পাতালের লোকটি এরকম অসহনীয় অবস্থায় বেঁচে আছেই বা কেন? না, ওই কিছু বলিবার আছে তার-ও। কী সে কথা? কার কাছে? জীবনের সবরকম যুদ্ধে পর্যুদস্ত যে-মানুষ, শকুনি ধনতন্ত্রের কানে তার কী কথা বলার আছে? আর তা শোনাই বা যাবে কোন উপায়ে?

ঘটনাপরম্পরায় এগিয়ে এবার আমরা দেখব, এক ঝড়ের রাতে এই শেষোক্ত দুই পরিবারের মধ্যেকার দেওয়াল ভাঙে; তাদের দেখা হয়ে যায়। তাদের উপলব্ধি করার কথা ছিল, যে, শ্রেণির সুবাদের তাদের মধ্যে আদত কোনও প্রভেদ নেই। কিন্তু গোল বাধায় মাঝের পরিবারটিই। যথারীতি অনিবার্য স্বার্থ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা। যে সংঘাতের দরুণ, ধনতন্ত্রের মূল ব্যবস্থার ভরকেন্দ্র বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না কোনোদিন। এখানে ধনাঢ্য বাড়ির সদস্যরাও তাই আচমকা ফিরে এসে এর কিচ্ছুটি টের পেল না; বরং ডুবে গেল প্রচুর খাবার আর নারীর স্তনে; কিন্তু বলার কথা সম্ভবত এই যে, যা ভিতরে থাকে, তা একদিন না একদিন ফাটবেই। সে বিনু ঘোষালের রেখে যাওয়া ডিনামাইট হোক কি কলোনিগন্ধ গায়ে মাখা কোনও ব্যক্তি। ফলে পাতালে যে গুপ্ত ছিল একদিন সে-প্রকাশ্য হল, সংহারকের বেশে। তখন তো বৃষ্টি থেমে গেছে। তা-ও কালো মেঘের আড়াল ধরে এ কী গভীর বাণী এল, আর, আমরা টের পেলাম শুরু হয়ে গেছে সেই যথেচ্ছ তছনছ। অবধারিত হত্যালীলা। এ তো হওয়ারই ছিল। এই পারস্পরিক খুনোখুনি। এই মৌষলপর্ব; এই কি ধনতান্ত্রিক সমাজের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নয়! যুগে যুগে সে কেবল যুদ্ধই বাধিয়ে চলছে না কি! তবু কারা যেন শতকের পর শতক ফলাও করে প্রচার করে এ-ভিন্ন আর বাঁচার পথ নেই। বহু বহু লোক তা মেনে নেয়; এমনকি যারা এই ব্যবস্থার শোষিত, তারাও মেনে নেয়। জড়িয়ে পড়ে সংঘাতে। ফলে কুসুমে কুসুমে কোন চরণচিহ্ন লেখা হয় তা পড়ার দায় থাকে না তার। বরং নিরাপদ এই চিন্তাতেই ধনতন্ত্র নিজেও ডুবে যায় মদ আর রমণের প্রাচুর্যে; কিন্তু খেলাটা থাকে সেখানেই। একদা যে-বালক পেয়েছিল গরিবের গন্ধ আর ঘরজুড়ে সেই গন্ধের আনাগোনা, একদা যে দেখেছিল কোনও ভূতের অবয়ব, ছবির শেষে সেই সত্যি দেখে ফ্যালে ভূতকে। বলা বাহুল্য, এই ভূত তার পিছু ছাড়বে না। এই ভূতকে সঙ্গে নিয়েই সে বড়ো হবে প্রাচুর্যের সভ্যতায়। একটা ভূত লুকোনো আছে, এই সত্যি তাকে বিলাসের সমগ্র আয়োজনেও কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে তো রাখবেই। কারণ সে জানে, দরকারে ভূত আবার বেরিয়ে আসবে। এবং, পরিচালক দেখান আমাদের, সত্যিই পুরনোর বদলে নতুন একটা মানুষ ঢুকে পড়েছে পাতালে। সে-প্রাসাদের লোক যদিও বদলে গিয়েছে এতদিনে। তারা ঘূণাক্ষরেও জানেও না এ-কথা। যেমন কেউ জানত না হারবার্টের বিছানায় থাকা সেই ডিনামাইটের কথা। তবু ফেটেছিল তো! কখন যে বিস্ফোরণ হবে তা কেউ কোনোদিন জানতে পেরেছে নাকি! ছবি তাই শেষ হয় বটে, কিন্তু আবার চলতেও তাকে। পাতালের সংকেতে আলো জ্বলে-নেভে। এবং, এ-কথা ঠিক যে, তছনছ আবার একটা হবেই। ধনতন্ত্র কোনও যুক্তিতেই তা প্রতিহত করতে পারবে না। কিন্তু এই তছনছ এই সাময়িক বিস্ফোরণে তার কিছু যাবে আসবে কি না, আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু তো অনুভব করাই যায়, যে, কেউ যেন ফিসফিসিয়ে বলে চলেছে ‘চ্যাং দেকবি’?
কে বলল? আমরা জানি না। কিন্তু এই শুনতে পাওয়া যে আধিভৌতিক নয়, তা স্পষ্ট। কেন? না, তাঁর ছবি কী করে সারা পৃথবীর দর্শককে এমনভাবে মোহিত করল, পরিচালককে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি জানান, ‘Essentially, we all live in the same country called capitalism.’
এই হচ্ছে সেই অমোঘ যোগাযোগ, যা সমগ্র বিস্ফোরণ বা তছনছকে একসূত্রে বেঁধে এই ধনতন্ত্রের দৈত্যের প্রতি এক অমোঘ ব্যঙ্গ ছুড়ে দেয় গোপনেই। কারণ ক্যাপিটালিজম নামক দেশটার ভিতরে সততই কেউ-না-কেউ গোপনে ফেটে পড়ার জন্য বসে থাকে। আর যেন ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে, ‘...দোবেড়ের চ্যাং / দেকাব? ক্যাট ব্যাট ওয়াটার ডগ ফিশ’
~~