নীল রঙ অন্ধকার

সুমী সিকানদার



পেছনে নদীর কথা কাটাকাটি , সামনে হাল্কা থেকে ফের গাঢ সবুজ অকারণে বিস্তারিত বহুদূর, মাঝখানে আমি। আমি সঠিক নিশ্চিন্ত নই যে এখানে আসলেই আমিই কি না । কোনও কোনও মুহূর্তে মনে হয় আমি নিজেকে ছেড়ে নিজের থেকে অনেকখানি দূরে চলে এসেছি।
কোথাও কোনও ছবিয়ালের অবসন্ন স্ন্যাপ নেই যাতে তোমাকে দেখা যায়। কোন জুম করা বেগুনীফুলের পাশে তোমার ফেলে রাখা হ্যাট কিংবা ঘাসের ওপর গড়াগড়ি করা তুমি ফ্রেম আউট। ।

যাবার তাড়ায় জড়িয়ে না ধরেই চলে যাওয়া কি ঠিক হলো সাব্রিন ! অথচ তুমি জানো একবার জড়িয়ে ধরার চাইতে দ্রুততম কোন মেইল হয় না মেসেজ হয় না ফোন হয়না ।
আন্ধকার কে খুঁটিয়ে দেখি।নাকি অন্ধকার আমাকে । আমার মুখ কি অন্ধকারের চাইতে ধাতব। তাকিয়ে না থাকলেও দেখতে পাই তোমার পা রাখা সরে সরে যাওয়া পথগুলো, নির্ভুল ঘাসগুলো , হাত ফস্কানো কামিনী বাতাসগুলো ।

তোমাকে ফোন করে করে যখন কোন ভাবেই পাচ্ছি না তখন কানে বাজছিলো বিক্রম সিং এর ‘’নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে।‘’ এই গান পর পর শুনতে ভাল লাগে দেখে পর পর রেকর্ড করে এনে দিয়েছিলে ।এতক্ষণ বাড়ি ফিরে চা পেঁয়াজু মুড়ি মাখা তোমার হাতে থাকার কথা। সন্ধ্যা ঘনতর। তোমার ফোন না পেয়ে আমি ভার্সিটিতে গেছি। তুমি যে কত বকবে খুঁজতে গেছি দেখে। ‘’আমি বড় হয়েছি মা ।কী যে করো ।‘’

তোমার বাবা গাড়িতে ওঠার আগেই ড্রাইভার কে জানিয়ে দিলো আমরা কোথায় যাবো, আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতেতে ডুবে গেছি। রবিনাথে ডুবে যেতে আমার লাগে শুধু অছিলা। আমি আসলে ডুবেই থাকি।

পৌছে দেখি তোমার নতুন সব বন্ধুরা , সবার সাথে পরিচয় হল কোথায়। এশা, মাধব , রিয়াজ। অনেক সই করলাম। এত সই করতে হবে কেন?। আমি আনমনে হাঁটি। পাশে কেউ নেই। সবাই তোমাকে ডাকতে গেছে । আমি আবেশে হাঁটি । কোনও ভাবনা আমাকে গ্রাস করেনা। আমি মাটিতে খালি পায়ে হাঁটছি যখন, ততক্ষণে তুমি নিজেকে নিয়ে তলিয়েছ অতলে। নদীর নাম খোয়াই। এখানেই খোয়ালাম আমার কহতব্য ব্যাথা। ভুলে গেলাম ভুল কি। দু;খ কি। গান কখন যেন থেকে গেয়ে চলেছে। তোমার নিয়ে আমার কিছু গান করার প্লান ছিলো সাব্রিন। কবে করবে?

রিয়ার বিয়েতে, তুমি স্টেজ প্রোগ্রামার ,কোরিওগ্রাফার, তুমি গায়ক , নায়ক। রিয়ামনির বিয়ে আগামী মাসেই। বোনের মেয়ে। তুমি কার কার কি কি নাচ গান , ড্রেস সব লিস্ট করে এবার কাজিন আর মা খালাদের বুঝাচ্ছো কিভাবে কি কি কাপড় কবে বানাতে দিতে হবে।

সাব্রিন তুই ছাড়া কিচ্ছু হবে না। ‘আমার স্টুডেন্টদের পরীক্ষা শেষ হতে দে । পুরা সময় রিয়াদির জন্য।‘’ রিহার্সেলের নামে আমরা হেঁড়ে গলায় গানাবাজনা লাগিয়েছি। এহে কি গান , নাইট গার্ড পালিয়ে গেলো।

নিজেদের বাড়িতে হলুদ । বিশাল জায়গা। প্রকান্ড উঠোনে রং করা বাঁশের আগায় লাইট বসিয়ে লাল নীল কাগজ দেয়া হলো বরফি কাট করে। কী যে সুন্দর। ফুল ফুলে এই বসন্তে একাকার । হলুদ গাদার মালা সব মেয়েরাই মাথায় পরবে সবই নিজেদের গাছের। পিঠগুলো সুঁই দিয়ে নকশা করে ফুপু বানাচ্ছে। প্রতিদিন চলছে বাহারি ভর্তা, গরুরমাংস , টানা ডাল এবং চাটনির আসর। ক’দিন পরেই হলুদ।

তোমাকে নাচ শিখতে শিবলী মোহম্মদের কাছে দিয়েছিলাম দেখে কোটি কোটি কথা শুনেছিলাম । পাত্তা দেইনি। কানে তুলা পিঠে কিল। আমার ছেলে নাচবে। সত্যিকারের পৌরুষ দীপ্ত নাচ। আমার সারাজীবনের শখ, নাচবেই মায়ের ছেলে মেয়েরা। মেয়ে হয়নি , মন টা খারাপ ছিলো>তো কি হলো> ছেলেই নাচবে।


রোজ সন্ধ্যা আসে। কিন্তু আজ দেরী হছে দেখে তোমার ট্রিম করা দাঁড়িতে হাত চালাতে বড় মিস করছি সাব্রিন।আমার মত তোমার এক ঢাল চুল। আমি ব্যান্ড কিনে দিলাম।সবুজাভ মুখে প্রপার দাঁড়ি এবং পেছনে ঝুটি আমার বড় শখের সাব্রিন।

এখানে এত ভীড় ।্কান্নার শব্দ চিৎকার কেন কে জানে।এই ভীড়ের মধ্যে দেখি বোর্ডে তোমার ছবি। সাথে তোমার নাম সাব্রিন শারার। পাশেই ম্যাপ। তুমি কি আবার বিতর্কে পুরস্কার পেয়েছ? ঘর ভর্তি ক্রেস্ট তার। ম্যাপ দিয়ে কে তোমাকে খুঁজছে সাব্রিন মাই বয়। মায়ের কাছেই তো ছেলে ফেরে। কিসের ম্যাপ?

বন্ধুরা যখন জোর করছিল নদীতে যেতে চাওনি শুনলাম। মেহরান চিৎকার করে করে কাঁদছে আর বলছে , ইলোরা তোমাকে জোর করেছে। তাই তুমি আমাকে একবার জড়িয়ে না ধরেই চলে এসেছ এই তিন ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে , এই স্বচ্ছ খোয়াই নদীর ঢেউয়ে নেমে চলে গেছ। আমি তো চোখের দৃষ্টিটুকু জমা দিয়েছি বাজপাখির কাছে।

সই দিয়েই চলেছি। এত সই কেন লাগে। কিহয়েছে? মায়ের পেটে প্রতি মাসের পড়ন্ত নড়াচড়া কি আর কেউ গুনতে পারে ?এক্স রে প্লেটের সাদাকলোতে ক্রমাগত পা এবং বুকের ধুকধুক কি তারা দেখতে পায় যারা আমার ছেলেটাকে নিয়ে চলে যায়?

আমি মাঝামাঝি হাঁটছি ।লম্বা রেখা করে গাছগুলো লাগানো। তারা একই ভাষায় কথা বলে,বাতাসে চলে একই ইশারা। দুইপাশে একই রঙ ইটের দালান। তারাও যমজ ভঙ্গিতে দাড়িয়ে থাকে। এক সময় গাছেরা কথা থামিয়ে বোবা। আমার মতোই। আচ্ছা আমি কতক্ষণ কথা বলছিনা?
দালানের রঙ্গেরা তাদের কে পৃথক করে ফেলেছে ক্রমশঃ কান্নায়। শুধু বেঞ্চিতেপড়ে থাকা বাদামে খোসা গুলো নির্লিপ্ত । সম্পর্ক আসলে কোথাও না কোথাও গিয়ে শেষ হয়। আমরা বুঝিনা।

নৌকায় এক চক্কর দিয়ে ফিরে আসবার সময়েই সেলফি তুলতে চেয়েছিলো বন্ধু অনিন্দ্য।পাড়ে পাঁচ জন হাত ধরে সেলফি তুলবে। সূর্য ডোবার ঋন। তাদের সাথে সাথে মেঘ ভাসছিলো স্তুপ করে করে। ঢেউগুলো ছুটোছুটি করেই চলেছে । এক প্রানে সাব্রিন , তার হাতে আইফোন। । শেষ মাথায় অনিন্দ্য। ‘তোকে তো ফ্রেমে আসেনা অনিন্দ্য। একটু কাছে আয় ‘। অনিন্দ্যের সাথে তাল মিলিয়ে ওরাও । সাব্রিন একটা তুখোর ছবির জন্য মাত্র এক পা এগিয়েছে। নরম ভেজা মাটি ঠাহর করার আগেই মূহুর্তে সে জলে ।,একে একে হাত ধরে থাকা পাঁচ জনই ধুপধাপ করে জলে পড়ছে। এই ছবি কে তুলেছে? দ্ঘন্টা খানেকের চারজনকেই সেদিন পাওয়া গেল জীবিত। সাব্রিন কে পরের দিন দুপুরে , সে একাই ফ্রেম আউট।

ঘুড়িটা পতপত একা উড়ে গেলো। একার পথ তার যতটা বড় আকাশ , যতটা প্রস্তাবিত বাতাস সরিষার খেত , অনবরত কলরবসব শুদ্ধ ঘুড়িটা উড়ে গেলো নাকি ভেসে গেলো... সইটা ঠিক মতো দিতে পারছি না। সই দেয়া এখনো হলো না?

অন্ধকার এত গাঢ নীল কেন। দূরের বাড়িগুলো‍য় থমকে থমকে হলদে বাতি জ্বলছে , মাঝখানে শুধু বোরিং অন্ধকার। কালো নয় ,গাঢ নীল অন্ধকার এই খোয়াই নদীর তীরে।

চুপচাপ পা ডুবিয়ে বসে থাকি খোয়াইয়ের পানিতে। পানিতে ভেসে ভসে যায় আজ সমস্ত ছবি , নেগেটিভ। বিয়ের পর পর হানিমুনের ছবিগুলো সাগরে হারিয়ে গেছিলো সেগুলোও ভাসছে। দেখা যাচ্ছে সাব্রিনের একটা দাঁতের ছবি। তার পায়ে উলের মোজা , শেডেড উলের টপি ,পুলোভার। আমার হাতের বানানো। দৌড় শেখা বাচ্চার জন্য উল বোনার মতো সুখ কী আর আছে?

ছবিগুলো অ্যালবাম থেকে খুলে খুলে জলে কে যেন ভাসিয়ে রেখে গেছে দায়িত্বহীনের মতো। দুই দুইবার সন্তান আমার চলে গেছে । মদ্যপ স্বামী বাইরে থেকে এসে দিকবিদিক জ্ঞান শুন্য। মুখে বেধড়ক খিস্তি , মাটিতে ফেলে লাত্থি , আমার সাধের তাজমহল গড়ে দেয়া স্বামীই।

পায়ের তলায় কী যে নরোম ঠান্ডা পানি। আহা সাব্রিনের মতো শীতল। তৃতীয়বারে এলো সাব্রিন। বড় সতর্ক করে তাকে আনা হলো। আমার মা ছিলেন আমার সাথে। ছেলের মুখ দেখে কি মনে করে যেন মদ জুয়া ছাড়লো তার পিতা ।

সাব্রিনের পিছনে দৌড়ে মাপ নেয়াই দুরুহ কাজ ছিল। বাবা দাঁড়াও পিঠের মাপ নেই। উলকাটা বলের মধ্যে গেঁথে নিয়ে সারাদিন সাব্রিনের পেছনে পেছনে। এই রকম দৌড়াতে দৌড়াতে উলের গোলা হাত ছুটে ফস করে গড়িয়ে ঘাস ছাড়িয়ে, তুলে নেবার আগেই গড়াতে গড়াতে বিকেলের রং হারানো খোয়াই নদীর ধারে এলোমেলো উলের বল কখন যেন ঝুপ করে শব্দ । নেভি ব্লু উলের গোলাটা কি সাব্রিনের মতো ভেসে উঠবে? নাকি শীতল জলে এতক্ষণ পা ডুবিয়ে রাখা মায়ের মতো।

Women by Winslow Homer