লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ

সাদিয়া সুলতানা




১.
হারিয়ে যাওয়ার ঠিক তিন সপ্তাহ পাঁচ দিন পর লিলিয়ানা গর্ভাবস্থায় ফিরে এসেছে।

ওকে সতর্ক পায়ে বাড়িতে ঢুকতে দেখে আম্মা চিৎকার করে ওঠেন, ‘প্যাট বাঁধায় আসছে দ্যাখো গিয়া।’ আম্মার কণ্ঠস্বর এত অশ্লীলভাবে কানে ধাক্কা দেয় যে মুহূর্তের মধ্যে আমি ভুলে যাই আমাকে লিলিয়ানার কাছে যেতে হবে। আমি পা ফেলতে পারি না। শরীর ভারি লাগে।

অভিমানী লিলিয়ানা বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দার গাছগুলোতে মড়ক লেগেছে। মেঝে আর গ্রিল মিলিয়ে নানান আকৃতির সাতান্নটা টব বারান্দায়। আগাছা শ্রীহীন টবগুলোর শুকনো মাটি আঁকড়ে ধরেছে। পর্তুলিকার গাছগুলো মাটিতে নুইয়ে দিয়েছে মিলিবাগ। রুয়েলিয়ার আধফোটা কলিতে কালো পিঁপড়ার দল নাচছে। মাল্টিফ্লোরা পিটুনিয়ার নিষ্প্রাণ গাছেরা কলি ছাড়েনি এখনো। মহামারীর দিনে সাধারণ ছুটি ঘোষণার কয়েক দিন আগে ফাল্গুনী আমাকে কীটনাশক এনে দিয়েছিল। কোথায় রেখেছি মনে করতে পারছি না।

ফুলহীন সাদা অপরাজিতার টবের পাশে দাঁড়ানো আমার সিনোরিটা উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লিলিয়ানার জ্বলজ্বলে চোখজোড়া দেখে বুক তোলপাড় করা আনন্দ জাগছে আমার। লিলিয়ানা! কতদিন পর দেখছি ওকে!

‘যাও বৌমা সোহাগ করো এখন। আমার ছেলে তো বাড়িতে থাকে না, মেহমানের মতো আসে। সে তো আর জানে না মাছভাত দিয়া সংসারে সে কালাচ সাপ পুষতেছে। একদিন ছোবল খাইলে বুঝবো। আমার হইছে জ্বালা...সইতে পারি না, কইতেও পারি না...চাইরদিকে সব জাতি সাপের মতোন ফণা তুইলা থাকে।’

আম্মার কথা আর শুনতে পাই না আমি। টলতে টলতে লিলিয়ানার কাছে যাই। হাত বাড়াতেই নরম পায়ে আমার শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায় লিলিয়ানা। ঘাড় নিচু করে আছে ও। এত দিনের আদরের ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টাই ওর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। আমি লিলিয়ানার চিবুকে হাত দিই। ওর চোখের আলো নিভে গেছে। ওকে এখন বিষণ্ন দেখাচ্ছে। বিমর্ষ লিলিয়ানা আমার বুকে নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে।

আমার কাছ থেকে দূরে থেকে কষ্টে ছিল কি লিলিয়ানা? নাকি ভালোবাসার সঙ্গীকে ছেড়ে আসায় এমন বিমর্ষ ও?

লিলিয়ানা আমার হাত ছাড়িয়ে শোবার ঘরে চলে যায়। হাই তুলতে তুলতে শরীর ভাঁজ করে ও বিছানায় শুয়ে পড়ে। ওর চোখে-মুখে এখন প্রশান্তির ঝাপটা। আমার দিকে তাকিয়ে প্রিয়ভঙ্গিতে নাক কুঁচকে নিয়ে ও চোখ বন্ধ করে। পিংকিং আপে শায়িত লিলিয়ানাকে অপূর্ব সুন্দরী লাগছে।

দেখে ঘোর লাগে চোখে। যেন এক অন্য লিলিয়ানাকে দেখছি।

"The secret in their eyes" মুভির একটি দৃশ্যে লিলিয়ানার নগ্ন মৃতদেহ বিছানা থেকে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকে। আমার লিলিয়ানা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতি রাতে মুভির লিলিয়ানা আমার সামনে হাজির হয়। মেয়েটির সুকোমল শরীরের ছোপছাপ রক্ত আর আধখোলা চোখের বিস্ময় আমার অন্তরে বিদ্ধ হতে হতে হারিয়ে যায়। আবার ফিরে ফিরে আসে স্বপ্নডোবা ঘুমের ভেতরে।

দুঃস্বপ্ন থেকে ফিরে এসে আমি লিলিয়ানার নরম শরীরে হাত বুলাই।

আহ লিলিয়ানা! আমার সিনোরিটা! কতকাল শান্তিতে ঘুমাওনি তুমি? ঘুমাও। আয় ঘুম...

২.
লিলিয়ানা ফিরে আসার পর আমার শম্বুক বেলা ঝড়ের গতিতে এগোয়। ও ঘুমিয়ে গেলে বেদখল হওয়া উনুনের আঁচ থেকে নিজেকে সরিয়ে বারান্দায় এসে রোজ আলোর ব্যাসার্ধ মাপি। গাছেদের দেখি। বৈশাখের সুষম হাওয়ায় গাছগুলো তরতর করে বাড়ছে। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লিলিয়ানার পেটও স্ফীত হচ্ছে। বেচারির খাওয়া বেড়েছে খুব।

এখন লিলিয়ানার জন্য কী করলে ভালো হবে তা জানতে ফাল্গুনীকে ফোন দিই। এই পৃথিবীতে ফাল্গুনীই আমার একমাত্র চেনা মানুষ যে দুনিয়ার সকল বিষয়ে জ্ঞান রাখে।

‘ওর খাবারও স্টক করে রাখ। অবস্থা ভালো না, ছুটি বাড়বে আরও। ঘন ঘন খাবার দিবি, আবার খুব বেশি দিস না। বমি করে ভাসাবে। তখন আরেক কেলেংকারি হবে। তোর শাশুড়ি আবার সাপ নিয়ে পড়বে। এমনিতেই ঝড়-বাদলের দিন আসছে। সাপের প্রকোপ বাড়বে। তার গল্পও। আমি ঠিক করেছি। মহামারীর দিন ফুরালে তোর শাশুড়ির জন্য বাকশে ভরে একটা দাড়াজ সাপ নিয়ে আসবো। বলবো, খালাম্মা নেন, পোষেন।’

আমার খিলখিল হাসির শব্দে লিলিয়ানা আহ্লাদী ভঙ্গিতে আমার কোলে মাথা রাখে। আম্মা রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আমাদের দেখেন। ফরিদাও ঘর মোছায় বিরতি দিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। কত দিন হাসিনি এমন করে।

ওপাশ থেকে ফাল্গুনী বলে, ‘বাইরে বের হলে খুব সাবধান থাকবি। খোলা বাজারে যাবি না। ওয়ান স্টপ মলে যাবি। লোকজনের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবি। আবার বলছি শোন, লিলিয়ানার জন্য বেশি করে খাবার কিনে রাখিস। আর তোর জন্য প্যাডও কিনিস বেশি করে। ছুটি কত দীর্ঘ হয় ঠিক নেই। আর ঘরে ফিরেই গোছল করে নিবি আগে।’

লিলিয়ানাকে গোছল করিয়ে আমি পোশাক পাল্টাই। ওর খাবার ফুরিয়েছে। ‘সুইট হার্ট’ এর বাকশো পুরো খালি। ফয়সাল কাঁটাবন থেকে অনেক খাবার এনেছিল। ক'দিন হলো এত ক্ষুধা বেড়েছে আমার সিনোরিটার! কেবল খাবার চাই তার। ভারি শরীরে সে থপথপ করে হাঁটে আর পড়ে পড়ে ঘুমায়। ফাল্গুনীর কথাটা মনে পড়ে আমার হাসি পায়, ‘এই দফা ডেলিভারি হলে লাইগেশন করিয়ে আনবি। নইলে জ্বালিয়ে খাবে তোর সিনোরিটা। তোর শাশুড়িও।’

প্রায় এক মাস পর বাইরে যাচ্ছি। আশেপাশের দোকানপাট খোলা নেই। কাচারি বাজারের দিকে লাজ ফার্মার বড় একটা শপিং মল আছে। ওদিকেই যেতে হবে।

‘কিছু লাগবে আম্মা? একটু বাইরে যাবো। রোজার বাজার তো করা হয়নি। আপনার ওষুধও শেষ। আপনার ছেলে এই সপ্তাহেও ফিরতে পারবে না।’ বলতে বলতে আমি হাতে গ্লাভস পরি। আম্মা ভ্রু কুঁচকে তাকান। দুদিন ধরে আমার সঙ্গে কথা বলছেন না তিনি।

দুদিন আগে লিলিয়ানা আম্মার ঘরে বমি করেছে। খাবারের প্রতি ওর আকর্ষণ যেমন বেড়েছে তেমনি সে খুব অনাসৃষ্টিও করছে। আমি কান মলে দিয়েছি ওর।

আমি কান পাতি। আম্মা কিছু বলছে।

‘কার্বলিক অ্যাসিড না কি কয় সেইটা আইনো। বারান্দায় যেই গাছের বাহার বসাইছ। জঙ্গল হইছে। ঝড়-তুফানের দিন এহন। ফুলের গন্ধে সাপখোপ আসবো। আমার ভাই কইল ওদের পাড়ায় দোতলার এক বাড়িতে মালিকরে সাপে কামড়াইছে। ফুলের গন্ধে শ্যামাসুন্দরী খাল থেইকা উইঠা দোতলা বাইয়া সাপ ঘরে ঢুকছে। আর পারলে তোমার ছাওটারে বাইরে ফালায় আইসো। শুনি সারা দুনিয়ার বাতাস বিষাক্ত হইয়া যাইতাছে কি না কি ভাইরাসে। আর আমার তো ঘরেই বিষ।’

দুদিনের কথা এক নিশ্বাসে সেরে ফেলেন আম্মা। আমার বলতে ইচ্ছে করে, সাপের আপনার মতো ঘ্রাণশক্তি নেই আম্মা। কিছু বলি না আমি। চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি।

৩.
‘এই যে মায়া, চোখে দেখা যায়? যায় না। অজগরের মতোন সারা শরীর প্যাঁচায়া ধইরা রাখে। তুই ছাড়াইতে যাবি, ফোঁস কইরা ফণা তুলবো, ছাড়াইতে পারবি না, ছাড়াইলে তোরই মরণ। এর চেয়ে সাপের সাথে জড়াজড়ি কইরা বাঁইচা থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।’

‘বাবা তুমিও কি আমার শাশুড়ির মতোন সাপ বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলে নাকি? সাপের কথা শুনতে ভাল লাগে না আমার। ফোন রাখছি।’

বাবাকে আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিই না। কর্ডলেস ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলি। লিলিয়ানাকে খাবার দিতে হবে। চারটি তুলোতুলো বাচ্চা নিয়ে ও বিছানায় শরীর টান টান করে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে ওরা সবাই খচমচ করে বিছানা ছেড়ে আমার শরীরে উঠতে শুরু করে। ছোট্ট বেঞ্জামিন, আমার বেঞ্জু এত পাজী, এখনই ঘাড়ে উঠতে শিখে গেছে।

আমি ওদেরকে বেশিক্ষণ প্রশ্রয় দিই না। ফয়সাল অনেক রাতে ফিরেছে। ছুটির ভেতরে ও ঢাকায় আটকা পড়েছিল। অনেকদিন পর সে বাসায় ফিরেছে। ফিরে রাতের খাবারও খায়নি। ছুটির সকালে পোলাওর চালের খিচুড়ি, তেলডুবানো ডিমভাজা আর টমেটো বা তেঁতুলের চাটনি করে দিলে ফয়সাল খুব পছন্দ করে খায়। এমনিতেই আমার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। তারপর এলো বাবার ফোন। ফয়সাল ওঠার আগেই এখন নাস্তা তৈরি করে ফেলতে হবে।

রান্নাঘরে পা দিতেই নাকে শুকনো মরিচ পোড়া ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দেয়। আলুভর্তা, ঘন ডাল আর ভাত নিয়ে আম্মার ব্যস্ততা দেখতে দেখতে নির্লিপ্তমুখে এক মগ র চা বানিয়ে আমি বারান্দায় আসি। আম্মা পেছনে পেছনে বলে, ‘ছেলেটা অনেকদিন পরে ফিরলো। নিজে দূরে না থাকো, তোমার ছাও-পাও গুলারে দূরে রাইখো।’

আম্মার ঝাঁঝালো কণ্ঠের আঁচে আমার মনে পড়ে যায়, রাতে ফয়সাল আর আমার মৈথুনের কথা। মুহূর্তেই সচকিত হয়ে ওঠে আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ। রাতের অপরিমেয় সুখ ভুলে বিষের পাত্রে ডুবতে থাকি আমি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।

আম্মার ঘরের সঙ্গে আমাদের ঘরের পার্থক্য শুধু একটা দেয়াল। মাঝেমাঝে আমার মনে হয়, এই দেয়ালটা ইট-সিমেন্টের না, হাওয়ার তৈরি। হাওয়ার ফিনফিনে পর্দায় আমার আর ফয়সালের সুখ-সান্নিধ্য ধাক্কা খায়।

বিয়ের পর পর আম্মা আমাকে সকালে রান্নাঘরে দেখলেই আঁতকে উঠতেন, পাড়া-প্রতিবেশি শুনিয়ে বলতেন, ‘ফরজ গোছল ছাড়া রান্নাঘরে পা দিবা না।’ রাতে আমি ফয়সালের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে করতে বলতাম, ‘প্লিজ আজ না, মা সব টের পান। আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়। সকালে উনার দিকে তাকাতে পারি না আমি।’

ফয়সাল হাসতো, ‘ইস, মা যেন জানেন না এসব!’ মাঝেমাঝে নিজেকে সমর্পণ করতে করতে আমিও হাসতাম। সতেরো বছর হয়ে এলো এখন আর হাসি পায় না আমার।

আম্মা এখনো আগের মতোই বলেন, ‘লাভ কি অত শরীর ভিজাইয়া!’

শব্দগুলো সাপের মতো হিল হিল করতে করতে আমার কানের ভেতরে ঢুকে যায়। নীল বিষের স্রােতে আমার শিরদাঁড়ার ভাঁজ ভেঙে যায়। নিজেকে শক্তখোলের ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে আমি মেঝেতে বসে পড়ি। আমার দেহের ভারে টব কাত হয়ে পর্তুলিকা ফুলের নরম দেহ মুচড়ে যায়।

হঠাৎ আমার কোলে মুখ গোঁজে কেউ। লিলিয়ানা! আমার সিনোরিটা!

লিলিয়ানা সদলবলে বারান্দায় এসেছে। আমি ওদের আদর করতে করতে সবুজে চোখ রাখি। গাছগুলো ভীষণ সজীব এখন। পিটুনিয়ার টবে ফুল ধরার জায়গা নেই। রুয়েলিয়ার গোলাপি বেগুনি তোড়াগুলো লাজুক ভঙ্গিতে হাসছে। সাদা-নীল অপরাজিতার লতা ছড়িয়েছে বারান্দার গ্রিলের এপাশ থেকে ওপাশ। ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা পর্তুলিকার টবের কোণায় দাঁড়িয়ে লিলিয়ানা গ্রিলের বাইরে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। ছানাপোনারা মায়ের মতো বাইরে তাকানোর সাহস করতে না পেরে আমার পায়ের পাতায় শরীর গুটিয়ে শুয়ে চোখ পিটপিট করে।

ফুলের শোভায় আমার মন ভরে যায়। আমি আদুরে কণ্ঠে ডাকি, ‘লিলিয়ানা...তোর বাবুদের করোনামুক্ত পৃথিবী দেখা।’

৪.
বারান্দায় সাপের খোলস পড়ে আছে শুনে আমি আঁতকে উঠি না। আঁতকে উঠি আম্মার বিলাপ শুনে।

আম্মা চিৎকার করে চলেছেন। বারান্দার গ্রিল কাঁপছে। টবগুলো কাঁপছে। রৌদ্রস্নাত সাদা-বেগুনি পিটুনিয়া ঝলমল করছে। ওদের কাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আমি চমকে উঠি।

বেবি টিয়ার্সের জলভরা লতার পাশে পড়ে আছে বাদামি, কালো ফুটিফুটি এক খোলস। সাপের খোলস!

আমি ফয়সালের শরীর ঘেঁষে দাঁড়াই। ওর আধখোলা বুকের নখের আঁচড় দেখা যাচ্ছে। কাল রাতেও কেঁদে কেঁদে খামচে দিয়েছি ওকে। হাতের আদরে আমার বেদনা জুড়াতে জুড়াতে ফয়সাল হেসেছে, ‘লিলিয়ানার মতোই হয়ে গেছো তুমি, আমার আদুরে বেড়াল।’

ফয়সালের হাত এখনো ছুঁয়ে আছে আমায়।

‘তুমি ভেতরে যাও।’

ফরিদা হাতের কাজ ফেলে ছুটে এসেছে। উচ্চকিত স্বরে সে বলছে, ‘কোন সাপ খালাম্মা?’

আম্মার মুখে শোনা সব সাপের নাম একে একে বলছে ফরিদা। গোখরা, কালাচ, দাড়াজ, শঙ্খচূড়, মাইছালাত, ধোঁড়া, বড়া, মাইট্টা, গোলবাহার, ঘরবউনি...বলতে বলতে ফরিদা হাঁপিয়ে ওঠে। শুনতে শুনতে আমি কাঁপতে থাকি। পিটুনিয়ার রংবেরংয়ের পাপড়িগুলোও কাঁপতে থাকে।

‘এই বউ হইলো আসল ঘরবউনি সাপ। ঘরে বায়-ছায়, ঘরেই খোলস ছাড়ায়। ঘরের খাইয়া ঘরের মানুষরেই কামড়ায়।’

ফয়সাল আম্মার দুহাত আঁকড়ে ধরে উচ্চস্বরে বলে, ‘মা, থামো তো। আমি দেখছি। এ সাপের খোলস না মা, কোথা থেকে কি উড়ে এসেছে। আমি ফেলে দিচ্ছি দাও।’

ফয়সালের হাতের পাতলা খসখসে বস্তুটা দেখে আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসে। আমার লিলিয়ানা! ওর সন্তানেরা! আইরিন, পাবলো, রিও, বেঞ্জু? ওরা কোথায়?

আমার মনে পড়ে যায়, করোনাকাল শুরুর আগে আম্মা দারোয়ানকে পাঁচশ টাকা দিয়েছিলেন, লিলিয়ানাকে বস্তায় ভরে দূরে ফেলে আসতে। অভিমানী লিলিয়ানা বাড়ি ফেরেনি তিন সপ্তাহ পাঁচ দিন।

আমি ফয়সালের হাত খামচে ধরি, "লিলিয়ানা কোথায়? ওর বাচ্চারা?"

‘বাঞ্জা মানুষ দিনরাইত বিলাই ছাও আর জঙ্গল নিয়া পইড়া থাকে। গুচ্ছের টাকা খরচ করে। আমার ছেলের ঘাম ঝরানির টাকা, ভাইসা আসে নাই।’

ফয়সালের বজ্রকণ্ঠ, আম্মার বিষবাক্য বাতাসে উড়িয়ে আমি এ ঘর থেকে সে ঘরে ছুটতে থাকি।

আমার চারদেয়ালের দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। সবকিছু অচেনা লাগে। আমি আমার ঘর খুঁজে পাই না। লিলিয়ানার ঘর খুঁজে পাই না। সমুদ্রজলে সব ডুবে গেছে। চমকে দেখি আমার পায়ের নিচে অতল সমুদ্র। সমুদ্রের উড়ুক্কু ঢেউয়ে পা ফেলে আমি ছুটতে থাকি। ছুটতে থাকি।

কোথায় পৌঁছে যাই আমি জানি না। এখানে আমার জন্য কেউ নেই, কোথাও কেউ নেই।

আমার লিলিয়ানা! আমার সিনোরিটা! আমার আইরিন, পাবলো, রিও, বেঞ্জু... কেউ নেই!

*********
ছবি: ফ্রিদা কাহলোর ব্রোকেন কলাম